ভাষার আলো ভাষার ছায়া

আহমদ সায়েম

খুব ভোরে ঘাসের মাথায় যে শিশির জমা হয় তার নাম কী ভাষা দেয়া যায়? বা মা বলে ডাকা যায় সেই শিশিরফোঁটাকে? কেউ কেউ মেনে নেবেন, আবার অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন শিশিরফোঁটারে মা ডাকব কোন দুঃখে ভায়া…? না, এই লেখা তাদের উত্তর দেয়ার জন্যে নয়। মাকে ছুঁয়ে দেখা আর মাকে নিজের মধ্যে ধারণ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

‘উফ’ শব্দটার কথাই যদি বলি—মা আর প্রেমিকার মুখে ‘উফ’ শব্দটা শুনলে একই-রকম মনে হলেও অর্থগত দিক থেকে কিন্তু সাদা আর কালোর মতোই বিস্তর ব্যবধান। নিজের জীবনের একটা দিনের গল্প এখানে শেয়ার করি সংক্ষেপে। হ্যাঁ, শরীর তো সবারই খারাপ ক‌রে, ব্যামো হয় মনের এবং দেহের। তো এক‌দিন খুবই বিগড়ে গেল শরীরের তবিয়ত। এক বন্ধুর সহায়তায় সে-যাত্রায় বেঁচেও গেলাম। পর‌দিন অ‌ফিস কামাই দি‌তে হলো। কো‌নো ছু‌টি না নি‌য়ে অ‌ফিস-অ্যাবসেন্ট থাকা যা‌বে না, শরীরও খুব ভা‌লো বোধ কর‌ছি না, ই‌চ্ছের বিরু‌দ্ধেই ঘ‌রের বাই‌রে পা ফে‌লতে হয়, এবং নিয়মমাফিক কাজে-কা‌মে হাত লাগাতে হয়। কিন্তু শরীরের সাথে মন যেন তাল দিচ্ছে না। কাজে হাত দিচ্ছি আর মন যেন শূন্যতায় সাঁতার কেটে হয়রান হচ্ছে।
অ‌ফি‌সের চারপাশে অ‌নেক গাছপালা, ডালে-ডালে খেলা করছে সূর্যের বাচ্চা-বাচ্চা আলো, আলোতে আলোতে খেলা করছে পাতাদের ছায়া। পা‌খির কি‌চিরমিচির শ‌ব্দে মুখররিত চারপাশ। তব‌ো যে‌ন অন্যকিছুর খোঁজে আলোছায়ায় ঘুরে ফিরছে নিজেরই ছায়া। আলো আর ছায়া, ছায়াপাখি, সারি সারি ফোলের লাইন মিশে গেছে ঘাসের সংসারে তবু মন ভোলে না, মন উডে চলে ভাষার ভাসা ভাসা মেঘে।
খুব কাছাকাছি সময়ের মধ্যে মা ও প্রেমিকার ফোন আসে, কিন্তু মায়ের ফোনে যতটা প্রশান্তি অনুভব করা গেল তার ফোঁটাটাও ধরাতে পারলেন না প্রেমিকা। না, আমার জীবনসঙ্গীকে এখানে ছোট করছি না, কোনো ভনিতার লাইন টানছি না এখানে। প্রকৃতির সংযোগ দেখছি মাত্র। আমার প্রেমিকাও একজন মা। তবে তিনি আমার সন্তানের মা। আমার না। আমার বাচ্চা তার মায়ের কাছে যে শান্তি খুঁজে পায়, আমার মায়ের কাছে তা পায় না। তার মানে কী দাঁড়াল?
ভাষা এমনই, অবিকল মায়ের মতো। আমার ভাষায় ‘ভালোবাসা’য় যে সুখ পাওয়া যায়, সারাদিন লাভ ইউ জপমন্ত্রে পেরেশান হলেও ওই সুখের একটুকুও হয় না পাওয়া ভিনভাষার ভালোবাসাজ্ঞাপনের বাক্যালাপে।

ভাষা আর প্রকৃতিকে দেখতে গিয়ে জানা হয় পা‌খির কিচিরমিচির শব্দ আর আলোছায়ার সংসারে বসে থাকলেই আনন্দ নেয়া যায় না, বিষণ্নতাও টের পাওয়া যায়। তার মানে আমার বোধশক্তিই আমাকে পরিবেশের সাথে মিলতে সাহায্য করে। আমার মনের অবস্থার সাথে প্রকৃতি দেখা যায় অথবা ভাষা বদলায় প্রকৃতিও। ভাষা আর মাকে আমি ওইভাবেই দেখতে পাই।