অবরোহণ

আফসানা বেগম

‘আমার পাঁচ বছরের রাইয়ান এসে দরজায় দাঁড়াল। কিছুক্ষণ চোখ গোল গোল করে আমাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকল আর তারপর গুটি গুটি পায়ে আমার দিকে এগোতে শুরু করল। আমি তখনো বুঝতে পারিনি সে কী করতে যাচ্ছে। কাছে এসে আমার ওড়না ধরে টানল, ঠিক আদর চাইলে যেমন টানত। আমি তাকে চুমু দেব বলে ঝুঁকতেই সে তার ছোট্ট নরম হাত দিয়ে আমার...’
‘আপনার কী, ফারিয়া?’
‘ছোটোকালে ঘুমিয়ে থাকলে সামান্য শব্দে মুঠো করা ছোট্ট হাতটা কেঁপে উঠে তারার মতো হয়ে যেত, আমি হাতদুটো চেপে ধরে মুঠো করে দিতাম, তার মাথার কাছে বুক ঠেকিয়ে আবার ঘুম পাড়িয়ে দিতাম। আর তখন আমি ঝুঁকতেই সে তার সেই তারার মতো সেই আঙুলগুলো দিয়ে আমাকে...’
আরো একবার জিজ্ঞাসা করার পরেও কথাটা কেন যেন কিছুতেই আর ফারিয়ার মুখে এল না। ওইটুকু পর্যন্ত বলে সে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। আমি তাকে সান্ত্বনা দেবার বদলে রিভলভিং চেয়ারটাতে আরেকটু এলিয়ে বসলাম। পেছনে পিঠ ঠেকিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। হাতদুটো মুখের উপরে চেপে ধরেছে সে। ফরসা সরু আঙুলগুলোর ফাঁক দিয়ে আমি তার সুন্দর আর তীক্ষ্ণ মুখটা বিকৃত হতে দেখছি। তার শরীরটা কান্নার দমকে কেঁপে কেঁপে উঠছে। তার দিকটায় আলো আর আমার দিকটা অন্ধকার। আলো-অন্ধকারের এরকম ব্যবস্থা করা থাকে যাতে রোগির মনে হয় সে ওই ঘরে একা আর অবলীলায় তার মানসিক পরিস্থিতি কিংবা অতীতের বর্ণনা করে যেতে পারে। সামনে কেউ থাকলে তার প্রতিক্রিয়া রোগিকে অনেক সময় কিছু কথা গোপন করে যেতে বাধ্য করে। অবশ্য আলো থাকলেও সে আমার মুখের ভঙ্গিতে তেমন পরিবর্তন হয়ত খুঁজে পেত না। বিশ বছর ধরে কাউন্সেলিঙের অভিজ্ঞতায় কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে আসল রহস্য বেরিয়ে পড়ার ঘটনা আমার কাছে নতুন কিছু নয়।
ছয় মাসের বেশি হলো ফারিয়া আমার কাছে এসেছিল। আগে আরো বেশি চিন্তিত দেখাত তাকে। কেমন যেন উদভ্রান্ত হয়ে থাকত চমৎকার সরু মুখটা। আমি ভাবতাম এত সুন্দর মেয়ে, সাজলে না জানি কত সুন্দরই লাগে তাকে। কিন্তু তাকে কখনো সাজতে দেখিনি। একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম বটে, ‘বরাবর এমনই থাকেন আপনি? আই মিন, এত সিম্পল?’ কাউন্সেলিং করতে করতে রোগির সঙ্গে এতটুকু বন্ধুত্ব হয়েই যায় যে তাকে কমবেশি ব্যক্তিগত প্রশ্ন করা চলে। আর সেটা অনেক সময় ইচ্ছে করেও করি, অনধিকার জেনেও। কারণ আমাকে তো রোগিকে এমন একটা ধারণা দিতে হবে যে আমি তার কাছের মানুষ, আমাকে সমস্ত কিছু গড়গড় করে বলে দেয়া যায় যা সে আর কাউকে বলেনি বা বলতে পারেনি। আমার প্রশ্ন শুনে ফারিয়া সামান্য হেসেছিল, তার চেয়ে বেশি হাসি তার সুখে আসতও না আর লিপস্টিক বা চ্যাপস্টিকবিহীন শুকনো ঠোঁটে ওর চেয়ে বেশি মনে হয় হাসাও যায় না। গোলাপি পাতলা ঠোঁটগুলো বরাবর যেন ভেতর থেকে রক্তের চাপে একটু বেগুনি হয়ে থাকত। বেগুনি শুকনো ঠোঁট চেপে ফারিয়া বলেছিল, ‘আগে অনেক সাজতাম।’
প্রথম যেদিন ফারিয়া এসেছিল, তার মুখের মৃদু হাসিটাও ছিল না। ভুরু কুঁচকে বলেছিল, ‘ম্যাম, আমার বান্ধবীর কাছে আপনার কথা শুনে এসেছি। সাইক্রিয়াটিস্ট হিসেবে আপনার এত নামডাক, শুধু সেজন্যে নয়, আপনাকে দেখেই কেন যেন আমার মনে হচ্ছে আপনি আমার সমস্যাটা বুঝবেন। আমাকে একটা কোনো উপায় বলবেন, আমি আর পারছি না।’ আমি তাকে আশ্বস্ত করেছিলাম, ‘আমি নিশ্চয় আপনার সমস্যার কথা শুনব। দেখা যাক কতদূর কী করতে পারি।’
‘করতেই হবে, ম্যাম, করতেই হবে। আমি কাউকে বোঝাতে পারছি না এই ব্যথা নিয়ে আর চলা যায় না...’
ফারিয়া একটা হাত দিয়ে তার গাল চেপে ধরেছিল। চেয়ারের সামনের দিকে ঝুঁকে কাঁদছিল। আমার কাছে রোগিদের এরকম আচরণ সাধারণ ব্যাপার। তাতে আমি বিচলিত হই না। রোগিকে বরং কাঁদতে বা রাগ ঝাড়তে দেই। রোগি যখন এসব করতে থাকে আমি আঙুলের ফাঁকে কলম ঘুরাই অথবা তার পরিস্থিতির মধ্যে খুব বেশি জড়িয়ে গেলে নিজের অজান্তে কলমটা কামড়াই। আমার প্রতিটা কলমের পেছনের ইঞ্চিখানেক খোবড়ানো। একা থাকার সময়ে কলমের দিকে চোখ গেলে কামড়ের গভীরতা অনুযায়ী কম-বেশি অসুখী মানুষগুলোর দুঃসহ অবস্থা আর সেসব বর্ণনার স্মৃতি আমার সামনে আসে।
‘কীসের ব্যথা?’
‘আমার গালে। এই যে এইখানে।’
ফারিয়া নিজের বাম গালের উপরে হাত বোলাচ্ছিল। আমি তার গোলাপি আভায় ভরা মসৃণ গালে কিছু খুঁজছিলাম। একটা গাঢ় বাদামি তিল ছাড়া কিছুই পেলাম না। বাম গাল আর ডান গালের মধ্যেও কোনো পার্থক্যও নেই। আর সবচেয়ে বড়ো কথা, আমি তো শারীরিক ব্যথা সারানোর ডাক্তার নই। গালের ব্যথা নিয়ে আমার কাছে আসার কোনো মানেই বুঝলাম না। সে নিজেই বলুক, এই ভেবে চুপ করে থাকলাম।
‘গালের ব্যথায় আমি কথা বলতে পারি না। হাসতে পারি না। ভালোমতো খেতে পারি না। এমনকি ঘুমাতেও...’
‘তো, মেডিসিনের ডাক্তারের কাছে গেছেন?’
‘অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি, ম্যাম। অসংখ্য টেস্ট করা হলো। তারা পারলে আমার গালের টিস্যুগুলো ল্যাবরেটরিতে খুলে খুলে দেখত। কিন্তু তার পরেও কিছুই তো বের করতে পারল না। যখন আর কিছুই ধরতে পারে না তখন ডাক্তাররা যেমন হয় আর কী, বলে দেয় কোনো সমস্যা নেই, এটা আপনার মানসিক।’
‘তাই বলল? মানে ব্যথাটা মানসিক?’
‘প্রত্যেকে তাই বলে। ডায়াগনোসিস করতে না পারলে আর কী বলবে বলুন। শহরের বড়ো কোনো ডাক্তার তো বাদ দেইনি।’
‘এখন আমার কাছে এসেছেন... তার মানে আপনি নিজেও ভাবছেন ব্যথাটা মানসিক, তাই না?’
আমার আকস্মিক প্রশ্নে ফারিয়াকে বিভ্রান্ত দেখাল, ‘না, মানে তা কী করে হয়! এই যে আমি আপনার সঙ্গে কথা বলছি, ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, বাম গালে যতটুকু কম চাপ দিয়ে কথা বলা যায় সেটা চেষ্টা করছি।’ ফারিয়ার সুন্দর মুখে বিপদগ্রস্ত ভাব এনে ফেলার জন্য আমার খারাপ লাগল। ভাবলাম বিব্রতকর প্রশ্ন না করে পরিস্থিতি খানিক হালকা করা যাক।
‘আমি আপনার গালটা একটু ছুঁয়ে দেখতে পারি, ফারিয়া?’
সে গাল বাড়িয়ে দিল। তার মসৃণ গালে আমার আঙুল পিছলে গেল।
‘আপনার স্বাস্থ্য আর ত্বক সুন্দর। মানে এই বয়সের জন্য ঠিক যেমনটা হওয়া দরকার। এককালে সবার থাকে বুঝলেন, তারপর এই যে আমার মতো হয়ে যায়,’ বলে আমি আমার গাল দেখিয়ে দিলাম।
‘ম্যাম, আপনি এখনো কত সুন্দর।’
‘কোথায়! গাল ভেঙে গেছে, দেখছেন না? আপনার বয়সে গোলগাল ছিল। এক বন্ধুকে একদিন বললাম, আচ্ছা, শরীর মোটা হয়ে যাচ্ছে কিন্তু গাল ভেঙে যাচ্ছে কেন বল তো? বন্ধুও ডাক্তার। কিছুক্ষণ ভেবে বিজ্ঞের মতো বলল, বুঝলি না, তুই তো খেয়েই চলছিস, শরীরে গিয়ে সব জমা হচ্ছে আর ব্যায়াম যা হবার হচ্ছে গালের। তাই সে বেচারা শুকিয়ে যাচ্ছে।’
ফারিয়া আমার কথা শুনে হেসে ফেলল। ওটা হয়ত তার সত্যিকারের হাসি। তবে হাসির এক পর্যায়ে তার হাত বাম গালে উঠে গেল, অস্ফুট ‘উহ্’ শব্দ করে সে মুক্তো ঝরানো হাসিটা মাঝপথে থামিয়ে দিল।
‘ব্যথার ওষুধ তো নিশ্চয় এর মধ্যে অনেক খেয়েছেন। আমি তো সেসব দেবার ডাক্তার না। আমি যেটা করব, আপনার গল্প শুনব। গালে ব্যথা নিয়েই আপনি যখন খুশি যা ইচ্ছে এসে বলে যান, তাতেই হবে।’
‘ব্যথার ওধুষ তো টানা দুইবছর, খেতে খেতে এসিডিটির প্রবলেম হয়ে গেছে। একজন বলল, এই হারে পেইন কিলার খেলে কিডনিও তো ড্যামেজ হয়ে যাবে।’
‘ঠিকই বলেছে। তা, ওষুধ খেলে ব্যথা কমে?’
ফারিয়া দুইদিকে মাথা দোলাল। তারপর ধীরে ধীরে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি বিশ্বাস করছেন তো যে আমার গালে অসহ্য ব্যথা? নাকি আপনিও অন্য ডাক্তারদের মতো বলবেনÑ’
‘না না, ফারিয়া, অবশ্যই আপনার গালে ব্যথা, কষ্ট না থাকলে এত ডাক্তারের কাছে ছোটাছুটি করতেন না, এটা আমি নিশ্চিত।’
আমার কথায় তার মুখটা স্বাভাবিক হয়ে এল। মনে হলো ভরসা পেল সে।

সেই থেকে ফারিয়া সপ্তাহ দুই-তিনেক পরপর একবার আসত। বলতে গেলে বহুক্ষণ চুটিয়ে আড্ডা দিতাম আমরা। ধীরে ধীরে কত কথা জানা হলো। তার স্বামী মধ্যপ্রাচ্যে চলে গেছেন বিয়ের পরপরই। বছরে দুবার আসেন। ফারিয়া একসময় শাশুড়ির সঙ্গে থাকত তারপর শাশুড়ি মারা যাবার পরে একদম একা। বাচ্চা হবার আগ পর্যন্ত ফারিয়া জানত সে স্বামীর কাছে চলে যাবে, কিন্তু আজ নেব কাল নেব করে স্বামী তাকে নিয়ে যায়নি। ফারিয়া অবশ্য নিশ্চিত নয় যে আসলেই তাকে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করা যায়নি নাকি ইচ্ছে করে তিনি তাকে নিয়ে যাচ্ছেন না। কারণ একবার দুঃসম্পর্কের এক আত্মীয়ের কাছে শুনেছিল তার স্বামী নাকি ওখানে একটা বিয়ে করেছে। স্বামী অস্বীকার করেছেন সে অভিযোগ। বরং মানুষের উলটোপালটা কথা বিশ্বাস করে তাকে সন্দেহ করার জন্য ফারিয়ার উপরে যারপরনাই রাগ করেছিলেন তিনি। এমনিতে সকাল বিকেল টেলিফোনে কথা হতো। ভিডিও কলে বহুসময় কেটে যেত। ফারিয়ার জোর করে তৃপ্ত হতে চাওয়া মুখ ঠোঁট উলটে বলেছিল, ‘আজকাল দূর আর দূর কই!’
সম্বন্ধ করে বিয়ে হওয়া, মফস্বল শহর থেকে হুট করে ঢাকায় এসে পড়া, একে একে একদম একা হয়ে যাওয়া সবকিছুকেই ফারিয়া তার জীবনের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসেবে ধরে নিয়েছিল। তবে তার মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল বাচ্চার কথা বলতে গিয়ে।
‘হঠাৎ দেখলাম আমি পিরিয়ড মিস করছি!’
‘তারপর?’ তার হাসিতে আমিও যুক্ত হয়েছিরাম।
‘আমার স্বামী তো তখন ফিরে চলে গেছেন। শাশুড়ি একেবারে বিছানায়, এই আছেন এই নেই অবস্থা। ওরকম সময়ে কাকে বলব, কী করব, বুঝলাম না। স্বামীকে বলাতে সে বলল ডাক্তারের কাছে যেতে। গেলাম এক বান্ধবীর সঙ্গে। আর সেখানে গিয়ে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে আনন্দের খবরটা জানলাম, বুঝলেন?’
‘বুঝলাম, ফারিয়া। আমার জীবনেও যে এমন সময় এসেছিল, বুঝব না কেন?’
‘হ্যাঁ, সেটাই। আরিয়ান, আমার ছেলে, একটা পুতুল, আমার সারাদিনের খেলাধুলা ওর সঙ্গে। নিজের বাচ্চা বলে বলছি না, এমন সুন্দর শিশু হয় না, ম্যাম।’
‘তা তো আপনাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে, আপনার ছেলে কেমন হতে পারে, সে সহজেই ধারণা করা যায়।’
ফারিয়া দ্রুত হাতে ব্যাগ খুলে ওয়ালেট বের করল। চেন খুলতেই স্বচ্ছ প্লাস্টিক কাভারের নীচে দেবশিশুর ছবি বেরিয়ে পড়ল। আমি আলোর দিকে ঝুঁকলাম। সত্যি, এমন মায়াময় মুখ দেখা যায় না সচরাচর। ছবি থেকে চোখ সরিয়ে আমি ফারিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে তাকালাম। ফারিয়াও ছেলের ছবির দিকে তাকিয়ে ছিল। এমন ভাবে দেখছিল যেন সে-ও আমার মতোই এই প্রথম নিজের ছেলের ছবি দেখছে। তার সরু চোখগুলো চকচক করছিল আনন্দে অথচ ঠিক সেই মুহূর্তেই আমি ফারিয়ার চোখ অশ্রুতে ভরে উঠতে দেখেছি। আমার ভুরু কুঁচকে গিয়েছিল ছেলের ছবি দেখে ফারিয়ার চোখে বিষণœতার ছায়া দেখে। আনন্দের অশ্রু হতে পারে কি? কিন্তু আমার মন আমার চিন্তাকে সমর্থন করেনি। যেন গভীর কোনো বেদনা জড়িয়ে আছে আরিয়ানের অস্তিত্বের সঙ্গে। জানতাম যে সরাসরি সে প্রশ্ন করলে ফারিয়া এড়িয়ে যাবে আর আমার জানাও হবে না। তাই নিজেকে সংবরণ করেছিলাম। ফারিয়া দিনে দিনে নিজেই বলুক, আমি ধৈর্য ধরতে রাজি বরাবর। ধীরে ধীরে একটা একটা করে পাতা বেরিয়ে একসময় যেমন পুরোটা চারা চোখের সামনে গাছ হয়ে উঠতে থাকে, ফারিয়াও তেমন নিজেকে মেলবে। আমি জানতাম। তাই বলে কোনো প্রশ্নই যে করতাম না, তা নয়।
‘আচ্ছা, ফারিয়া, আপনার নিজের বাড়ির লোকেরা কই? মানে আপনার বাবা-মা বা ভাইবোন?’
‘বাবাকে তো দেখিনি, মানে আমি খুব ছোটো থাকতেই বাবা মারা গেছেন। বড়ো ভাই আছে তবে না থাকার মতোই। ড্রাগ, বুঝলেন, কলেজের সময় থেকে ড্রাগের মধ্যে ঢুকে গেল। মা সেই ভাইকে নিয়েই থাকে। থাকে তো দূরে, তবু আমি ভাইকে নিয়ে এসে দুবার রিহ্যাবে চেষ্টা করেছিলাম, ওই আর কী, চলে যাবার পরে যেই আর সেই।’
‘আর আপনার মা? অনেক বয়স বলে তো মনে হয় না।’
‘না, তা না। মাকে দেখতে এখনো খুব সুন্দর। না বললে বোঝাই যাবে না যে আমাদের মতো এত বড়ো বড়ো ছেলেমেয়ে তারÑ’
মায়ের সৌন্দর্য বা কম বয়সের কথায়ও ফারিয়ার মুখে বিষণœতার ছায়া পড়ল। আমি এরও কোনো মানে খুঁজে পেলাম না। চুপ করে থাকলাম। কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা নেমে এল আমার চেম্বারের ছোট্ট কোণটিতে। ফারিয়াই নীরবতা ভাঙল। প্রয়োজনের চেয়ে অনেক নীচু স্বরে কথাটা বলল ফারিয়া।
‘জানেন, আমি না মাকে কখনো সালোয়ার-কামিজ পরতে দেইনি।’
‘মানে? কেন?’
‘বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শরীরে যে রকম মেদ জমার কথা, মায়ের তা হয়নি। এখনো শরীরটা বরতে গেলে তরুণীর মতো। যখন স্কুলে পড়তাম, একদিন স্কুল থেকে এসে দেখি মা নতুন একটা সালোয়ার-কামিজ পরে হাঁটাচলা করছে। আমি ব্যাগ মাটিতে ফেলে ভীষণ চেঁচামেচি শুরু করলাম।’
‘কেন বলুন তো? ওনাকে দেখতে ভালো লাগছিল না বুঝি?’
‘ভালো লাগছিল। আসলে খুবই সুন্দর লাগছিল। আর সেটাই ছিল আমার সমস্যা।’
‘সমস্যা মানে?’
‘আমি যখন প্রাইমারি স্কুলে, আমাদের পাড়ার এক মহিলা ছিলেন, আন্টি বলে ডাকতাম। তিনি সব সময় সালোয়ার কামিজ পরতেন। আমাকে খুব আদর করতেন। আমার সমানই দুটো ছেলেমেয়ে ছিল তার। তাদের জন্য কিছু কিনলে আমার জন্যও কিনে আনতেন। স্কুল থেকে ফিরে হোমওয়ার্ক শেষ করেই আমি আন্টির আদরের লোভে সে বাড়িতে ছুটে যেতাম।’
ফারিয়া ঢোক গিলল। মাথা নীচু করে চুপ করে থাকল কয়েক মুহূর্ত। যেন এরপরে যা বলবে তা তার বলতে ইচ্ছে করছে না। আমি ছাড়লাম না, বললাম, ‘তারপর?’
‘একদিন বিকেলের শেষে আন্টির বাসায় গিয়ে দেখি থমথমে ভাব। বাড়ির লোকজন কেউ কোনো কথা বলছে না। আমাকে উপস্থিত হতে দেখে একটু বিরক্তও হলো মনে হলো। কিছুই বুঝতে না পেরে ফিরে এলাম। পরে মায়ের কাছে জানলাম বাড়ির সবাইকে ফেলে আন্টি যেন কার সঙ্গে চলে গেছে। বলার সময়ে মা বললেন, লোকটারও দুটো বাচ্চা আছে, বুঝলি? দুটো সংসার ভাঙল নষ্টা মহিলা।’
‘আচ্ছা, তো সেই কারণে মায়ের পরনে সালোয়ার-কামিজ-’
‘হ্যাঁ, আন্টির পালিয়ে যাবার কথাটা বলার সময়ে মায়ের মুখে ঘৃণা দেখেছিলাম আমি। দশ-এগারো বছর বয়সে দেখা সেই ঘৃণা আমি এখনো ভুলিনি। অথচ আন্টির মতো কাপড়ে সেই মাকেই আমার কাছে বিপজ্জনক মনে হতো।’
‘বুঝেছি। আসলে তখন তো আমাদের চেনাজানার মধ্যে সবাই শাড়িই পরতেন। তাই হয়ত আপনার চোখে-’
‘হ্যাঁ, বাচ্চারা খুব সেনসিটিভ হয়। মাত্র পাঁচ-ছয় বছরে দেখা মায়ের অভিব্যক্তি তাদের বছরের পর বছর মনে থাকে। পরে বড়ো হলে সে নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে সেই মুখটা মিলিয়ে নিয়ে পুরো ঘটনাটা বুঝে ফেলে। আর তারপর কোনোদিন সেটা ভোলে না। ঠিক যেমন আমার আরিয়ান-’
ফারিয়া মুখে হাত চেপে ফুঁপিয়ে উঠল।
‘আপনার আরিয়ান কী, ফারিয়া?’
ফারিয়া আরেকবার ফুঁপিয়ে উঠতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিল। চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে বলল, ‘ম্যাম, আজ আসি। একটা কাজ মনে পড়ে গেছে।’
ফারিয়ার শেষ কথায় কান্নার কোনো টান ছিল না। অথচ আমি নিশ্চিত যে আরিয়ানের ব্যাপারে কিছু একটা বলতে গিয়ে সে প্রায় কেঁদেই ফেলছিল। আমি বুঝতে পারলাম যে কাজের কথা বলে হুট করে উঠে যাওয়াটা ফারিয়ার সাজানো আচরণ। যে কথা তার মুখে চলে এসেছিল তাকে থামিয়ে দিতেই ওরকম করা। কিন্তু মানা করার তো প্রশ্নই ওঠে না, আমি কিছুই বলতে পারলাম না। আর যাই হোক, রোগিকে তার রহস্য বলানোর জন্য চাপ দেয়া যেতে পারে না। ফারিয়া সময় শেষের আগেই চলে গেল বলে পরের রোগি আসার আগে আমি বেশ খানিকটা সময় পেলাম। বসে বসে ভাবতে লাগলাম, আরিয়ান কী দেখেছে? আরিয়ান কী ভুলবে না? এমন কী ঘটতে পারে যা মুখে আনার মতো সাহস ফারিয়া দেখাতে পারছে না? আর এর সঙ্গে তার সমস্যা, মানে তার গলের ব্যথারইবা কী সম্পর্ক থাকতে পারে! পর মুহূর্তে আমি নিজেকে বললাম, অনেক ধারণার ভিত্তিতে রোগিকে সেবা দিতে হলেও খামোখা ফারিয়াকে নিয়ে আমি আগ বাড়িয়ে কিছু ভাবতে যাব না। সে নিজেই বলুক, জানা যাবে কোনোদিন।
তার পরেরবার ফারিয়া এল প্রায় এক মাস পরে। চোখমুখ আগের চেয়ে বেশি শুকনো।
‘কী ব্যাপার, ফারিয়া? আপনার খবর নেই, গালের ব্যথা ভালো হয়ে গেল বুঝি?’
ফারিয়া কোনোরকমে গালে হাত রেখে বলল, ‘মারাত্মক বেড়ে গেছে। আরিয়ানকে নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিলাম। আর এই ব্যথা আর ভালো হবে বলে মনে হয় না। এর মধ্যে পেইন কিলারও খেলাম অনেক।’
‘খেলেন কেন? কোনো লাভ তো হয় না।’
ফারিয়া মাথা নীচু করে চুপচাপ বসে থাকল। ভাবলাম বলে ঠিক করিনি। সে ব্যথা সহ্য করতে পারেনি বলেই খেয়েছে নিশ্চয়। মনে হলো, আজ অন্য কথা হলে কেমন হয়, মেয়েটা এত মন খারাপ নিয়ে এসেছে।
‘আচ্ছা, ফারিয়া, বেড়াতে কেমন লাগে আপনার? বন্ধু নেই? মানে কারো সঙ্গে ঘোরাঘুরি করেন না?’
‘বেড়াব কী করে, আরিয়ান-’
‘সারাক্ষণ কেন বাচ্চার কথা ভাবেন আপনি? মাঝে মধ্যে নিজের জীবনটাকেও তো কিছু রসদ দিতে হয়। আপনার কাছে আপনার জীবনের কিছু পাওনা আছে না?’
‘কিন্তু একটা মায়ের আর কী ভাবনা থাকতে পারে বাচ্চা ছাড়া?’
‘বলেন কী, মা কি মানুষ না? মা হবার আগে এবং পরেও সে কিন্তু একটা মানুষই। আমাদের সমাজ মাকে বন্দনা করতে করতে এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে মা যেন একটা দেবী, তার কোনো ভুলভ্রান্তি থাকতে পারবে না, বাচ্চাকে জড়ানো ছাড়া তার নিজস্ব কোনো চাওয়া-পাওয়াও থাকতে পারবে না।’
‘কিন্তু সেটাই কি সত্যি নয়?’
‘কেন সেটা সত্যি হবে, ফারিয়া? মা হয়েছি বলে কি আমাদের নিজের জীবন নিয়ে আলাদা ভাবে বাঁচার অধিকার হারিয়ে ফেলেছি?’
ফারিয়া চুপ করে থাকল। কোলের উপরে রাখা সরু আঙুলগুলোর দিকে একভাবে তাকিয়ে থাকল।
‘আমি আমার কথাই যদি বলি, আমার বাচ্চা ছিল ভয়ানক হাইপারঅ্যাক্টিভ। মনে আছে বাচ্চা জন্মাবার পরে তিন বছর পর্যন্ত আমি টানা তিন ঘণ্টা ঘুমাইনি। শেষের দিকে শুধু মনে হতো কেউ ওকে নিয়ে গিয়ে একটু রাখুক, আমি ঘুমাতে চাই। কেবল একটা রাত আমি ঘুমাতে চাই। নিজের কাছেই নিজে মিনতি করতাম। কিন্তু বলতে পারতাম না কারণ বাচ্চাকে ছেড়ে মায়ের আরামের তো নিয়মই ছিল না আমাদের বাড়িতে।’
‘তারপর?’
‘চতুর্থ বছরে আমি আরেকটু বেশি সময় ঘুমাতে পারতাম। তখন বুঝতে পেরেছিলাম যে টানা না ঘুমিয়ে আমার ভেতরে অনেক কিছু এলোমেলো হয়ে গেছে, মাথায় যুক্তি ঠিকমতো কাজ করত না, এমনকি সবচেয়ে প্রিয় কোনো দিনের স্মৃতিও আমি ধারাবাহিকভাবে মনে করতে পারতাম না। মানে বিশ্রামের অভাবে আমার স্মৃতিশক্তি ঝাপসা হয়ে আসছিল।’
‘সেসব ঠিক আছে, ম্যাম। কিন্তু মাকে মানুষ হিসেবে মানে কয়জন? মানে বাচ্চা হয়ে যাবার পরে বাচ্চাটা ছাড়া একজন মায়ের অস্তিত্ব কে স্বীকার করবে? তারও যে নিজস্ব চাওয়া থাকতে পারে, কেউ মেনে নেবে?’
‘নাহ্, মাকে মানুষ সর্বংসহা ভাবতেই ভালোবাসে। তার কাছ থেকে একটাই জিনিস আশা করে সমাজ, তা হলো ত্যাগ।’
‘সেটাই, ম্যাম। নিজের জায়গা থেকে মায়ের সামান্য বিচ্যুতি মেনে নিতে কেউ রাজি নয়। কয়েকজন মিলে পিটিয়ে বাচ্চা মেরে ফেলবে, সেই দৃশ্য ভিডিও করেও লোকজন দেখবে আর তারপর দেখবেন একসময় ভুলেও যাবে। কিন্তু মায়ের ভুলের কারণে কোনো বাচ্চার কিছু হলে আজীবন মানুষ মনে রাখবে। তখন আর কেউ মানবে না যে মা কখনো বাচ্চার খারাপ চায় না।’
‘আচ্ছা আমরা এসব কথা কেন বলছি, ফারিয়া? আপনি তো কোনো ভুল করেননি, তাই না?’
ফারিয়া চুপ করে থাকল। জানি না কেন কয়েক পলকের সেই নীরবতা আমার কাছে অসহ্য লাগল। ডাক্তার হলে কী, আমারো ধৈর্যের সীমা আছে, সেখানে আমারো বাধ ভাঙে।
‘চুপ করে আছেন কেন? সারাক্ষণ বাচ্চা নিয়ে ভাবা বন্ধ করেন। নিজের জীবনকেও কিছু দেন। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে হালকা আড্ডা তো দেয়াই যায়, স্বামী থাকলে বলতাম তার সঙ্গে ঘুরুন ফিরুন, মনটা অন্যরকম হয়ে যাবে।’
‘এই শহরে তো আমার বন্ধু হয়নি। বন্ধু বলতে আমাদের সেই মফস্বল শহর থেকে ঢাকায় যারা এসেছে, তারা।’
‘তো তাদের কেউ নেই ধারেকাছে? নিজে বাচ্চা ছেড়ে না যান, তাদের বাড়িতে ডাকুন, তাহলেই তো হলো।’
ফারিয়া চমকে উঠল আমার কথায়। বুঝলাম না আমি কী অন্যায় বললাম। অন্ধকারে বসে আছি জেনেও আমি আমার বিস্ময় লুকোতে চেষ্টা করলাম। মুর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে যাওয়া ফারিয়া হঠাৎ নড়েচড়ে উঠল। স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরের চেয়ে খানিক জোরে বলা শুরু করল, ‘একবার ডেকেছিলাম এক দলকে। আমার কলেজের বন্ধুবান্ধব। সেখানেই তো হলো যত ঝামেলাÑ’
আমি আর ধৈর্য দেখাতে পারছিলাম না, ‘কী ঝামেলা ফারিয়া?’
‘এক বছরের সিনিয়র ছিল সুদীপ্ত। তাকেও বলেছিলাম। আমার উচিত হয়নি বলা। আমি জানতাম কলেজে থাকার সময়ে সে আমার প্রতি দুর্বল ছিল। তবু বললাম। হ্যাঁ, আমার নিজেরও হয়ত ইচ্ছে ছিল, সুদীপ্ত আসুক।’
‘তারপর?’
‘এসেছিল সে। আড্ডার এক ফাঁকে পানি নেবার ছলে সুদীপ্ত রান্নাঘরে এসেছিল। আমি টেবিল থেকে খাবার সরিয়ে চা বানানোতে ব্যস্ত ছিলাম। কলেজ জীবনে যে লজ্জায় সরাসরি মুখের দিকে তাকাতে পর্যন্ত পারত না, সেই ছেলে একেবারে হনহন করে এসে গা ঘেঁষে দাঁড়াল। আমারো যে কী হয়ে গেল, মানা করলাম না। তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম চুপচাপ। দেখলাম সুদীপ্তর ঠোঁট এগিয়ে আসছে আমার দিকে। খুব কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, বাসা চিনে গেলাম, একদিন একা চলে আসব। আমি কিছু বললাম না। ঠোঁট আরো এগিয়ে এল, আমার ঠোঁট তার মধ্যে হারিয়ে গেল। সেই সময়টার কথা বলতে পারব না ঠিক। একটা স্থবির সময়, এগোচ্ছিল না যেন। আমার মনে হয়নি কোনো অন্যায় হচ্ছে, কিংবা সেরকম কোনো ন্যায়-অন্যায়ের ভাবনাও আসেনি। আমার স্বামী হয়ত সেখানে বিয়ে করেছে, হয়ত কতকিছু করে বেড়াচ্ছে, এসব কথার সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে যাইনি, সে নিজে থেকে না বললে কখনো কিছু ভেবেও নেইনি। বরাবর আমি অনড় ছিলাম। অথচ সেদিন ওই মুহূর্তে মনে হলো কতদিন, কতদিন হলো কেউ স্পর্শ করেনি, করুক, খুব বেশি করে করুক।’
‘তারপর কী হলো, ফারিয়া?’
চোখ মুছে ফারিয়া আবার শুরু করল।
‘চোখ বুজে ছিলাম। কিছু একটা শব্দে চোখ খুলেছি, দেখি দরজার দিকে থেকে আরিয়ানের বল রান্নাঘরের ভেতরের দিকে গড়াচ্ছে। আর দরজায়Ñ’
‘দরজায় কী, ফারিয়া?’
ফারিয়ার কান্না থামার জন্য আমাকে সময় দিতে হলো। একসময় লাল চোখমুখ মুছে বারবার যা বলতে চেয়েও শেষ করতে পারেনি সেই কথা গড়গড় করে বলে দিল।
‘দরজায় আমার ছোট্ট আরিয়ান... তার উজ্জ্বল চোখগুলো যেন বেরিয়ে আসবে, পাতলা গোলাপি ঠোঁটগুলো থরথর করে কাঁপছে, ধীরে ধীরে সে আমার দিকে এগিয়ে এল। কপালে চুমু খাব বলে নীচে ঝুঁকতেই আরিয়ান তার ছোট্ট হাতটা দিয়ে আমার গালে বসিয়ে দিল এক চড়। এই যে এখানে-’
ফারিয়া তার বাম গালে নিজের হাত চেপে ধরল, ‘অতটুকু বাচ্চা কতই আর জোরে মারতে পারে বলেন, ওইটুকু নরম হাতে কতই আর জোর থাকতে পারে, কিন্তু আমার গালে, আমার গালে হলো কী-’
‘তারপর থেকে আপনার গালের সেই ব্যথা আর গেল না, তাই না?’
‘গেল না। এত অষুধ খেলাম, তবু কিছুতেই গেল না।’
আমি ফারিয়াকে ধাতস্ত হতে সময় দিলাম। তাকে তার পরের ঘটনা জিজ্ঞাসা করা অবান্তর মনে হলো। তারপর তার জীবনেইবা কী হলো, কী হলো তার স্বামীর কিংবা সুদীপ্ত নামের সেই বন্ধুর, কী লাভ জেনে? আমার মন বলল ফারিয়া কোনো অবস্থাতেই মাতৃত্বের বন্ধন থেকে একচুল নড়তে শেখেনি। যাবার সময়ে শুধু দৃঢ় গলায় তাকে বললাম, ‘আপনি যে কতো বড়ো মা, ফারিয়া, আপনি হয়ত জানেন না।’
আমার ধারণা, ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃত, যাই হোক না কেন, আমাকে সবটা বলে ফেলার পরে ফারিয়া হালকা হতে পেরেছে। হতে পারে তার গালের ব্যথাটাও সেরে গেছে। হতেই পারে। কারণ সেদিনের পর থেকে ফারিয়া আমার কাছে আর কখনো আসেনি।