মা- দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কয়েকটি গল্প-উপন্যাসে

প্রবুদ্ধ ঘোষ

“তোমাদের অভাব কী? তোমার পার্টি আছে, অজুর যুববাহিনী আছে, বিজুর চেয়ারম্যান আছে। আমার? আমার কী আছে?” [শোকমিছিল, ১৯৭৩]
১৯৭০-র দশকে এক মা-য়ের উপলব্ধি। এক মায়ের প্রশ্ন তাঁর সন্তানদের বাবাকে। কম্যিউনিস্ট আদর্শ, সমাজবদলের মূল্যবোধে বিশ্বাসী এবং সংসারযুদ্ধে একনিষ্ঠ এক স্ত্রীর প্রশ্ন তাঁর পার্টি-হোল্‌টাইমার স্বামীকে। কমিউনিস্ট পার্টির ভাঙ্গনকালে সেই মা উদ্বিগ্ন হন সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। কারণ, এ যে তাঁর নিজেরও অস্তিত্বের প্রশ্ন। এই লড়াই তাঁর সত্তার। তাঁর ব্যক্তিগত এবং সামাজিক যুদ্ধ একাধারে। আদর্শগত মূল্যবোধের শোকমিছিলে হার না-মানা মায়ের দ্বিধাহীন উচ্চারণ।

“হ্যাঁ, ক্রোধ, তবে তা তোমার বিরুদ্ধে, তোমাদের বিরুদ্ধে। এই তো সেদিনই বলছিল- ৫০ বছরে কেমন রাজনীতি করলে তোমরা যাতে আজ ছেলে তার বাপকে দাদাকে মনে করে পুলিশের লোক আর দলত্যাগী ছেলেকে তার বাপ-দাদার পার্টি ভাবে সমাজবিরোধী, সি.আই.এ-র এজেন্ট?... আমি অজয়ের মা, আমি বিজয়ের মা, আমি তোমাদের অভিযুক্ত করছি।”
এই মা তাঁর সমস্ত সত্তা দিয়ে আগলে রাখেন দুই সন্তানকে, আঁকড়ে থাকতে চান কম্যিউনিস্ট রাজনীতির মূল্যবোধকে। অথচ, তিনিই ভাঙ্গনের অসহায় সাক্ষী, নীরব দর্শক। পারুল জেলে থাকাকালীন বড় সন্তান অজয়ের জন্ম। ’৪৮-’৪৯ এর কম্যিউনিস্ট আন্দোলনের সময়, যখন বেশ কিছু মুক্তাঞ্চল গড়ে তুলেছে কম্যিউনিস্টরা, তখন জেলে যান বিনয়ভূষণ-পারুল। পারুল তখন গর্ভবতী। প্রত্যক্ষ সংগ্রামের অভিজ্ঞতায় ঋজু এক ‘মা’। যিনি নিজেও পার্টিকর্মী এবং এক পার্টিকর্মীর দায়িত্ব হিসেবেই কম্যিউনিস্ট আদর্শে মানুষ করেছেন ছেলেদের। বিনয়ভূষণ পার্টির হোল্‌টাইমার, ’৬৪ এর বিভাজনের পরে সিপিআইএম। বহু সময়েই বাড়ির বাইরে বাইরে কাটানো বা শাসকের চোখরাঙ্গানিতে লুকিয়ে কাটানো, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। তখন পারুল দৃঢ়তা ও মমতার যুগলবন্ধনে বাঁচিয়ে রেখেছেন সাংসারিক চলমানতা। অজয়ের জন্মের বেশ কয়েকবছর পর অবধি বিনয়ভূষণ জেলে ছিলেন, সেই ‘অপরিচিত’ বাবার সাথে শিশুর যোগাযোগের একমাত্র সাঁকো মা পারুল। অথবা, ছোট ছেলে বিজয়ের মুখে আদরের ‘কমরেড বাবা’, ‘কমরেড মা’ সম্বোধনের সংস্কৃতি গড়ে তোলেন সেই মা, পারুল। সাংসারিক অভিঘাতে নিয়ত যুঝে চলা, অজয়-বিজয়ের স্কুল-ছেলেবেলা সামলানো সেই মা কখনো রুদ্রমূর্তি; মাঝরাতে বাড়িতে শাসকপুলিশের হানা থেকে সযত্নে রক্ষা করেন লালঝাণ্ডা এবং ইশ্তেহার। এই মা প্রত্যক্ষ সংগ্রামে থাকেন আবার, গৃহকর্ত্রী হয়ে প্রতিটি সূক্ষ্ণ আবেগ বাঁচিয়ে রাখেন, চারিয়ে দেন তাঁর সন্তানদের মধ্যে।
সেই মাতৃসত্তা এক অমোঘ যন্ত্রণায় ছিন্নভিন্ন হয়। বড় ছেলে অজয় সিপিআইএম যুববাহিনীর অ্যাকশন কমিটির সক্রিয় সদস্য। আর, ছোট ছেলে বিজয় বাপ-দাদার পার্টি থেকে বেরিয়ে এসে নকশাল রাজনীতির সক্রিয় কর্মী। সেই পারুল এর আগে দেখেছেন সিপিআই-সিপিআইএম বিভাজন; সেই বিভাজনের স্মৃতিতে ভারাক্রান্ত হতে হতে, বন্ধু ইদ্রিসকে ‘দালাল’ অভিহিত করার অনুতাপে পুড়তে পুড়তে তিনি যেন কখন ভারতের কম্যিউনিস্ট ইতিহাসের সত্তা হয়ে ওঠেন। অসহায় ভাবে শুধু ভাঙ্গন আর দ্বেষ দেখে যান, বুকের পাঁজর আলগা হয়ে যায় কম্যিউনিস্টদের পারস্পরিক দোষারোপ-সন্দেহে; কিন্তু, নিরুপায়। ভারতের কম্যিউনিস্ট পার্টির অখণ্ড সত্তা হয়েই যেন পারুল বলেন, ‘পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতেই হবে। পার্টি ভাঙ্গার পাপ’। নকশাল বিজয়কে তার বাবা এবং দাদা ‘সিপিএম পার্টির শত্রু’ বলে দাগিয়ে দিচ্ছে প্রতিমুহূর্তে, অথচ পারুল তাঁর মাতৃসত্তা দিয়ে আঁকড়ে থাকছেন ছোট ছেলেকে। বরং, বিজয়ের যুক্তির মধ্যে, সিপিএমের ভোটসর্বস্ব রাজনীতিকে নাকচ করার মধ্যে দিয়েই যেন নিজের এতদিনের না-বলা কথাগুলোর যুক্তি শানাচ্ছেন। নিছক তত্ত্বের কচকচি নয়। মা তাঁর বিদ্রোহী ছেলের মধ্যে দিয়েই নিজের বিদ্রোহের পথ খুঁজছেন।
আর, সেই মা সবচেয়ে বেশি আহত হচ্ছেন যখন পার্টিনিষ্ঠ বড়ছেলে বাবাকে অভিযোগ করছে, ‘মা ক্রমেই পার্টিবিরোধী কথাবার্তা বলা শুরু করেছে। একে তো বিজু। তার ওপর মা।’ দ্রোহী ছোটছেলে বলছে, ‘কমরেড মা, তুমি আমায় তাড়িয়ে দিও না। আমি নিজেই চলে যাব।’ এক অসম্ভব ভাঙ্গনমুহূর্ত, এক আকাশভাঙ্গা ব্যথা। আর, সেই ব্যথা শেষ হয় মৃত্যুসংবাদে। দাদা যুববাহিনীর সঙ্গে যায় ‘পার্টিশত্রু’ ভাইকে খতম করতে। বড় ছেলে মারা যায় ছোট ছেলের ছোড়া বোমার আঘাতে আর, বড় ছেলের যুবদলের সাথীরা ছুরি গেঁথে দেয় ছোটছেলের পেটে। অসহায় সাক্ষী বিনয়ভূষণ, সেই মৃত্যুদৃশ্যের। অজয় সিপিএম কর্মী বলে, তার সাথে শ্মশানে যায় হোল্‌টাইমার বিনয়ভূষণ। কিন্তু, সিপিএমবিরোধী নকশাল বিজয়ের সাথে শ্মশানে যায় তার ‘কমরেড মা’, পারুল জানেন এজন্যে তাঁর পার্টি তাঁকে এক্সপেল্‌ করবে, তবু যান। মা হয়ে ছেলেকে একা ছেড়ে দেওয়া যায়না যে। আর, এক অশান্ত সময়, এক দ্রোহের সময় যে বলিদান চায়, সেই সময়যজ্ঞে বলি হওয়া বিজয়ের সাথে তার ‘মা’ যান, ছেলের মৃতদেহে রাখেন লেনিনের মুখাঙ্কিত মেডেলিয়ান। পার্টির নির্দেশ এবং ব্যক্তিগত স্নেহানুভূতির চিরন্তন দ্বন্দ্বের টানাপড়েনে মা আঁকড়ে থাকেন আদর্শ; মায়ের আদর্শ। শেষ নয়, হয়তো সেই শুরু মায়ের যন্ত্রণার।

‘উৎসর্গ (১৯৬২)’ গল্পে এক মা ভয় পান তাঁর আসন্নসন্তানের কথা ভেবে। প্রতিমুহূর্তে জড়িয়ে থাকে ভয়, তেজস্ক্রিয়তার। হিরোশিমা-নাগাসাকির পরে ক্ষমতাশালী দেশেরা ব্যস্ত পরমাণু বোমার পরীক্ষা নিয়ে। নিয়ত খবর আসে পৃথিবীজুড়ে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার। খবর পাওয়া যায় পরবর্তী প্রজন্মের বিকলাঙ্গ, অ-মানুষিক শিশুরা জন্মাচ্ছে। ইন্দিরা মাতৃত্বের স্বাদ নিতে ভয় পায়। আগত সন্তানের ভবিষ্যৎ ভেবে ভয় পায়। “ভারতের মাটিতে প্রধানত বর্ষার সময়ে, নানা ধরণের তেজস্ক্রিয় পদার্থ নেমে আসবে। তাদের কিছুটা মিশবে পানীয় জলের সঙ্গে, কিছুটা উদ্ভিদে এবং উদ্ভিদ থেকে দুধে।” সেই এক আণবিক সময়, ৫০-র দশক। ধনতান্ত্রিক ক্ষমতাশালী দেশগুলো পরমাণু অস্ত্রপরীক্ষা করছে, তাদের বাধা দেওয়ার অজুহাতে সমাজতান্ত্রিক দেশও পাল্টা পরীক্ষা করছে। প্রকৃতিতে মিশছে ভয়ানক বিষ। অনিমেষ-ইন্দিরা আধুনিকমনস্ক, তারা নিয়মিত দেশী-বিদেশী জার্নাল পড়ে। তারা চারপাশের আলোচনায় সক্রিয় মতামত বিনিময়ে দুনিয়াদারির খবরাখবর জানে। তাই ইন্দিরা ভয় পায় রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্ট পড়ে, হলডেনের দেওয়া তথ্যে। তার সন্তানও যদি অস্বাভাবিক হয়, যদি তেজস্ক্রিয় বিষের প্রভাব তারই রক্তে রক্তে বংশধারায় প্রবাহিত হয়? নিশ্চয়তা নেই যে কিছুই, অশান্তিই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের প্রধান উপপাদ্য। একজন মা হিসেবে, ইন্দিরা কীভাবে জন্ম দেবেন তাঁর সন্তানকে এই অসুস্থ পৃথিবীতে। ভবিষ্যতকে রক্ষার দায়বদ্ধতাও যে একজন মায়ের। ইন্দিরা গর্ভাবস্থাতেও আতঙ্কে কাটান, স্বীকারোক্তি করেন স্বামীর কাছে, “সব সময় মনে হয় যে-ষড়যন্ত্র চলছে, তা আমার গর্ভকে গ্রাস করবে। সে আমার কত বড় পরাজয় ভাবতে পারো? জন্মের দায় কী কঠিন! বাতাস, মাটি, জল, খাদ্য, শরীর- বেঁচে থাকার জন্যে যা কিছু অপ্রিহার্য, তাতে আমার ভয়। আমি একা এ সবের বিরুদ্ধে লড়াই করছি। আমি যে মা হতে চলেছি।” কিম্‌-ক্যি-দুক এর ‘স্টপ্‌ (২০১৫)’ চলচ্চিত্রেও এক মায়ের আতঙ্ক তার আসন্নসন্তানের জন্যে। সেও তেজস্ক্রিয়তার আতঙ্ক। জাপানে পরমাণুচুল্লী ক্ষতিগ্রস্থ হ’লে, তার বিকিরণের রেশ এসে পড়ে গর্ভবতী মিকির ওপরে। সেই হয়তো-বিকলাঙ্গ শিশুকে পৃথিবীতে আনবে নাকি, রাষ্ট্রীয় অনুরোধ মেনে নিয়ে গর্ভপাত করাবে, এই দোলাচলে ভুগতে থাকে হবু বাবা-মা সাবু-মিকি। কিন্তু, দায় বেশি মায়ের, কারণ ভবিষ্যতের বিপন্নতার দায়, রাষ্ট্রের ‘বোঝা’ শিশুটির দায় যে তাঁকেই বহন করতে হচ্ছে শরীরে! কোন সময় দেখাবে, কোন তেজস্ক্রিয় সংস্কৃতি দেখাবে ভবিষ্যৎকে? ’৫০র দশক হোক, বা ২০১৫; ভারত হোক বা জাপান কোথাওই যে ভ্রুণ নিরাপদ নয়, তাই উদ্বিগ্নতা ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত মায়েদের মধ্যেই। আর, ক্রমশঃ সেই মা এক বিপন্ন সভ্যতার প্রতীক হয়ে ওঠেন। সেই বিপন্নতার প্রতীক নিয়ে দীপেন্দ্রনাথ লেখেন, “বৃহত্তম প্রতিনিধি দল আমেরিকার এক জননী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি মানুষের পক্ষে, আমার দেশবাসীর পক্ষে, পৃথিবীর পক্ষে ধিক্কার দিই আমার সরকারকে। আমি জননী, ধিক্কার দিই।”

‘বিবাহবার্ষিকী (১৯৭৭)’ উপন্যাসে এক অন্য মা। কনক ইস্কুলে চাকরি করেন, তার স্বামী মণিমোহন সিপিআই-এর হোল্‌টাইমার, বছর চোদ্দোর মিতু আর বছর ছয়েকের বাবুয়া- সংসার আবর্তিত হয়। এই কনক একদিকে মণিমোহনের রাজনীতিজনিত সমস্ত শোক-তাপ-দুঃখ-সুখের অংশীদার, অন্যদিকে বাবুয়া-মিতুর মা। কম্যিউনিস্ট আবহে বিষাদহর্ষ মাখা সংসারে সেই ‘মা’ প্রতিমুহূর্তে হিমসিম খান সন্তানদের লালনপালনে। কারণ, মণিমোহনের ঋজু এবং একনিষ্ঠ আদর্শে সংসারে ছায়া পড়তে দেবেন না সামান্য আদর্শ-বিচ্যুতির। আবার, দ্রুত আর্থ-সামাজিক পালাবদল হয়ে চলা সমাজে ‘নেহরুয়ান সমাজতন্ত্র’ থেকে বিকৃত-পুঁজিবাদে ঢলে পড়া দেশে আদর্শ-বিচ্যুতি আসছে সময়ের অভিঘাতে। কম্যিউনিস্ট নারী, চাকুরীজীবি, হোল্‌টাইমারের স্ত্রী এবং দু’ই বাড়ন্ত সন্তানের মা- এই প্রত্যেকটি পরিচয়ে সুষম ভারসাম্য রেখে চলেন কনক, প্রতিনিয়ত। কিন্তু, সে ভারসাম্য ধাক্কা খায় কখনো। মণিমোহনের কাছে যে জিনিস মনে হয় বুর্জোয়া সংস্কৃতি, কম্যিউনিস্ট সংস্কৃতির পরিপন্থী, তা-ই তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। এমনকি, নিজের সন্তানদেরও সেইভাবেই বড় করে তোলেন। কনক নিজেও সেই আদর্শেই পরিপূর্ণ বিশ্বাস করেন। কিন্তু, একইসাথে তিনি তাঁদের অস্বচ্ছল সংসারে হাসি ফোটাতে চান ছেলেমেয়ের মুখে। তাই, কঠিন-কঠোর আদর্শের যান্ত্রিক প্রয়োগ এবং আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত চাওয়া-পাওয়ায় ঠোকাঠুকি লাগে, সাঙ্ঘাতিক। বাবুয়া আনন্দমেলায় ক্যাপ্টেন হ্যাডকের মদ খাওয়ায় অনুপ্রাণিত হ’লে আতঙ্কিত হন মণিমোহন। বাবুয়া-মিতু কারোর থেকে দামি ক্যাডবেরি উপহার পেলে সন্ত্রস্ত হন মণিমোহন। তাঁর মনে ঝড় ওঠে, কম্যিউনিস্ট সাদাসিধে জীবনযাপন আগলে রাখতে চেয়ে তাঁর মনে হয়, “ভোগ্যপণ্যসর্বস্ব জীবন। বাচ্চাদেরও সেই ছাঁচে ঢালা হচ্ছে। আগুন একেবারে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেছে।” সন্তানদের যথাসম্ভব সাধারণ যাপনে রাখার, গরিবিয়ানায় অভ্যস্ত করানোর প্রায়-অসম্ভব এই চেষ্টাতেই আপত্তি মা কনকের। সমস্ত মূল্যবোধ অক্ষুণ্ণ রেখেও দৃঢ় স্বরে মা বলে ওঠেন, “দোহাই তোমার, দারিদ্র নিয়ে ওদের অহঙ্কার করতে শিখিও না... আমি চাই ওরা যোগ্যভাবে বাঁচতে শিখুক, হেরে না যাক।”
ভারতের কম্যিউনিস্ট আন্দোলন কখনোই বোধহয় যথার্থতা রক্ষা করতে পারেনি লিঙ্গনির্বিশেষে ‘কমরেড’ শব্দের। তাই, পার্টিতে, গণসংগঠনে বারবার পুরুষ এবং মহিলা বিভাজন হয়েছে। কৌশলে তো বটেই, এমনকি, নীতিতেও। বহু উদাহরণ আছে, যেখানে একই কৃষক সংগঠন করেন চাষী এবং চাষী-বৌ। কিন্তু, চাষী-বৌকে মিটিং শেষে ঘরে ফিরে একজন নিষ্ঠ স্ত্রীর দায়িত্ব একজন দায়িত্বশীলা মা-এর কর্তব্যপালন করতে হয়। সেখানে সমান দায়িত্বভাগ হয়না পুরুষ ও মহিলার। বহু উদাহরণ এমন আছে, যেখানে পার্টি-মিটিঙ্গে পুরুষকেন্দ্রিক দায়িত্বভাগ হয়েছে; মহিলাদের সমস্যা ‘ব্যক্তিগত, পার্টির কিছু করার নেই’ বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে; আলোচনায় আসেনি মহিলাদের সংসার এবং পার্টি এই দুই জগৎকে মিলিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা। আর, সেখানেই পারুল, কনকদের স্বাতন্ত্র। পার্টির যান্ত্রিক নির্দেশ, আদর্শের হৃদয়হীন প্রয়োগের সমান্তরালে মাতৃসত্তার পরিপূর্ণতায়, সাংসারিক বিবেচনার ধী-মননে তাঁরা উজ্জ্বল। মূল্যবোধকে বুকে আগলে রেখেও যে প্রতিমুহূর্তের বিচ্যুতি, শাসকসংস্কৃতির চাপিয়ে দেওয়া অবক্ষয়ের সাথে যুঝে চলা যায়- তার তীব্র উদাহরণ। বহির্জফত এবং অন্তর্জগতের প্রবল টানাহ্যাঁচড়ায় ক্ষতবিক্ষত হতে হতেই তাঁরা আগলে থাকেন সংস্কৃতি, আগলে রাখেন সন্তানদের। হয়তো সবসময় সফল হন না, তবু প্রাণপণে লড়াই করে চলেন। কনক তাই কম্যিউনিস্ট মূল্যবোধ এবং যাপনকে স্বীকার করেও মণিমোহনকে বলেন, “তোমার দেশ আছে, পৃথিবী আছে, মানবসভ্যতা আছে। রাগ কোরো না গো। এই ছেলেমেয়ে দুটো আর তুমি ছাড়া আমার যে কিছু নেই।” মণিমোহন মনে করিয়ে দেন বৃহত্তর আদর্শ, সমাজবদলের কর্তব্য- “তোমার দেশ নেই? পৃথিবী নেই? মানবসভ্যতার দায়ভাগ নেই? শুধু এই সংসার?” আর, অমোঘ উচ্চারণ করেন তখন কনক, “একে কেন্দ্র করে সব, একে বাদ দিয়ে কিছু নয়।” আর, কনক, পারুল, ইন্দিরা প্রত্যেকে মিশে যান এই সরলরেখায়। সব মা সমস্ত মায়ের মন মিশে যায় এই বিশ্বাসে, আদর্শে। রবীন্দ্রনাথ যেমন কাবুলিওয়ালা আর মিনির বাবার মধ্যে সমস্ত পিতৃহৃদয়ের কেন্দ্রাতিগ অভিমুখ দেখেছিলেন। তেমনি, পারুল-কনকদের মধ্যেও সব মাতৃহৃদয় প্রকাশ পায়।

দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় ‘মা’-রা কখনো হেরে যান না। বিপন্ন সময়ে ঘনিষ্ঠদের সাহস যোগান, দ্বান্দ্বিকতায় নিজে পুড়েও আগলে রাখেন সন্তানদের এবং এক তীব্র বাস্তব জীবনবোধে বিশ্বাস রেখে জীবনকে এগিয়ে নিয়ে চলেন। আর, আবহে বদলে যেতে থাকে সমাজ-অর্থনীতি, আবহে বদলে যায় কম্যিউনিস্ট মূল্যবোধ।