একটি নির্মীয়মান সত্ত্বা

শতাব্দী দাশ

ছেঁড়া আঁচল আর আঁচলে হলুদের গন্ধ আমাকে টানেনি কখনও। অবিসংবাদিত নিরূপা রায়ের চোখের জলে ভেজেনি কোনো চিড়ে। দুঃখিনী মায়ের দাস্তান শুনলেই হাই উঠেছে। এত দুঃখ কেন পেতে হয় মহৎ হতে গেলে? ‘মহৎ’ হয়েই বা কী অর্জন হয়?
আমাদের সে ছিল এক সন্ধিক্ষণের দশক। মায়েদের অন্দরে সিঁধ কেটেছিল অন্যতর পৃথিবীরা। বাংলা দূরদর্শনে সুসজ্জিতা – সুভাষিণী ঘোষিকারা তখন একাধারে-রাঁধা-চুলবাঁধ র রোল মডেল। প্রিয়া তেন্ডুলকার ‘রজনী’ অবতারে ঘর-বার সামলে পাড়া মাত করছেন। বিজ্ঞাপন-বিরতিতে রেণুকা সাহানে আনতনেত্রে বলছেন – ‘একটা কথা বলার ছিল, কিন্তু কী করে বলি!’ আমরা হাঁ-মুখ ব্যাপার ঠাহর করার চেষ্টা করছি, আর আরক্ত হচ্ছেন মায়েরা। দিনরাত তাঁরা পাখি-পড়া করাচ্ছেন – ‘তোমাকে কিন্তু ছেলের মতোই মানুষ করছি’। অর্থাৎ ‘বিদ্যেতে বুদ্ধিতে তুমি ছেলেদের সাথে টক্করে নেমে পড়’। বেশ কথা। তবে কি ওদের মতোই মাঠে হট্টগোল করব? ক্রিকেট-ফুটবল ঘুড়ি-ওড়ানো? ছিঃ! এসব কি তোমায় মানায়? রাত জেগে ফিষ্টি? পাগল, না মাথা খারাপ? মাধ্যমিকের পর ওদের মতো স্বাধীন ট্যুর? মায়েদের মুখে আর কথা সরে না!
বাবা-মা মাত্রেই সন্তানের মধ্যে নিজের প্রতিরূপ খোঁজেন। আমি হলাম ছাঁচ, আর তুমি আদুরে, পেলব মোমI আমার অবয়বই তোমার অস্তিত্বকে আকার দেবে – এই হলো জলবৎ প্রত্যাশা। তবে মায়ের মেয়েকে ছাঁচে ফেলার উদ্যোগ বোধ করি শুধু অহমের পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঝোঁক না। ছাঁচে না আঁটলে মেয়েটা আমার একঘরে অলক্ষী হয়ে থাকবে – এ’ ভয় চারিয়ে গেছে পুরুষানুক্রমে। পুরুষ-অনুক্রমে, মানে জেনারেশনের পর জেনারেশন। কার সে জেনারেশন? সময়, কাল, ইতিহাস – কার অধিকার তার ’পরে? পুরুষের একার? নাকি ‘নারী-অনুক্রমে’ বলব? প্রমাতামহী যে আদলে গড়েছিলেন মাতামহীকে, সামান্য যুগোপযোগী রদবদল করে তাকেই তো মান্যতা দিয়েছিলেন মাতামহী, এবং অতঃপর মা-ও। কিন্তু এ-ও তো ঘটনা যে, সে আদল পুরুষের ভারি মনোহর লাগে! কোন্‌ পুরুষের? আহা, ‘পুরুষ’....জাতিবাচক। তাহলে তো ঘুরে-ফিরে তা সেই ‘পুরুষানুক্রমিক’ আদলই হল। তাই বুঝি অবাধ্য মেয়েদের সে ছাঁচে পড়তে এত আপত্তি?
তা কেমন সে আদল মায়ের? যেভাবে তাকে দেখতে চায় ছেলে? যেভাবে মা গড়ে তোলেন ভাবী মা-কে? সে হল এক মায়া মায়া চোখের রূপকথা। ছায়া ছায়া শরীর। স্পর্শে শীতলপাটি-আরাম। বাক্যিতে আকাশ ফর্সা হয়ে রোদ ঝরে। এত কোমল, যেন কুন্ডলী পাকিয়ে শরীরে মিশে যাওয়া যাবে ফের। এতটাই তরু, যেন ঝাঁকালেই ইচ্ছেপূরণ। এতটাই মাটি, যেন গা এলিয়ে দিলেই হল, সয়ে নেবে সব ভার। এতটাই আকাশ, যেন ডানা মেলে ওড়া যায় ইচ্ছেমতো। এতটাই বাসা, যেন কিচির মিচির করতে করতে ফেরা যায় নিত্যদিন। আবার এতটাই অসহায়, যে ‘বীরপুরুষ’ হয়ে ওঠার প্রাথমিক মক্‌শোর স্পেসিমেনও তিনি। মা যতটা না ব্যক্তি, তার চেয়ে অনেক বেশি একটা কনসেপ্ট। অসহায়তা আর পরিপূর্ণতাকে সমানুপাতে মিশিয়ে তাতে কয়েক ফোঁটা আকাশ-কুসুমের আরক ফেলে এ’ কনসেপ্টের জন্ম। আর তার লালন কালে কালে। প্রেমিকাকেও তাই হতে হবে ‘মায়ের মতো ভাল’। হতে হবে গাছ, হতে হবে ঘরে ফেরার গান, বা মাধবীলতা।
* * *
এই অবধি পড়ে পাঠক বুঝি ভারি অস্থির হয়ে ভাবতে লাগলেন, সবেতেই এদের নারীবাদী বুকনি! এই বুঝি ব্যুভোরের বুলি আওড়াবে – মাতৃত্ব বিশেষ কিছু সীমিত ভূমিকার সাথে নারী-অস্তিত্বকে ঝালাই করে জুড়ে দেয় অচ্ছেদ্যভাবে....ইত্যাদ । কোথায় এট্টু মাকে নিয়ে স্বপ্নের ফানুস ওড়াবো, আকাশের সুদূর নীলে মিলিয়ে দেব তাঁর মহানতা.......বিশ্বাস করুন, সেসব হয়েছে অনেক। মায়েরা তাঁদের ত্যাগ, তিতিক্ষা, মমত্ব, লড়াই নিয়ে কাব্যে উপেক্ষিতা তো থাকেননি কোনোকালেই। বিন্দু ‘ছেলে বড় হচ্ছে’ ভেবে বাহারি খোঁপা বাঁধেনি, যোগমায়া আনন্দময়ীরা ঐশী আলোয় চোখ ধাঁধিয়েছেন, বিপ্লবের স্বপ্নে চোখ ধুয়েছেন গোর্কির মা। কিন্তু এ’ সবই তো সন্তানের কলমের আঁচড়ে মায়ের মানসমূর্তি। তাঁদের নিজ জবানি আমরা শুনলাম কই? এই যে তাঁর নীরবতা, সে কি তাঁর নির্বাচন? না কি অসহায়তা? তাঁর সহন কি তাঁর প্রতিবাদ, না কি প্রতিবাদে ব্যর্থতা? যোগমায়া বা আনন্দময়ী মাতৃত্বের সংজ্ঞাকেই মান্যতা দিয়েছেন আগে, তারপর তাকে দিয়েছেন ব্যাপ্তি। তাকে অতিক্রম করেননি, ভাঙচুর তো প্রশ্নাতীত। ঠিক একই কারণে ‘ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল’-এর মাপা প্রগতিশীলতার সাথে সরলাদেবীর খাপ খাইয়ে ওঠা হয় না। গোরা আনন্দময়ীতে ভারতবর্ষ দর্শন করেছে, ম্যাক্সিম গোর্কির দুঃখিনী মায়ের সাথে মিলে মিশে গেছে দেশ – কেননা এই মায়েরা তাদের সব মানবিক ও অতিমানবিক মহত্ব নিয়ে, চলনে, বলনে, এমনকি লড়াইয়েও বেঁধে দেওয়া গন্ডিতেই খেলে যান, আধিপত্যের সমীকরণে অন্তর্ঘাত না ঘটিয়ে। ব্যক্তি-মা থেকে বিমূর্ত মাতৃ-রূপকে তাই তাঁদের উত্তরণ।
* * *
বঙ্কিমি নব্য হিন্দু জাতীয়তাবাদ মাতৃপূজার কাল্টকে রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা দিয়েছিল। দেশ – যে মায়েরই মতো অন্নদা, ধাত্রী, আশ্রয়দাত্রী – ম্লেচ্ছের হাত থেকে তোকে রক্ষা করা বীর্যবান সন্তানমাত্রেরই কর্তব্য - এই ছিল ডিসকোর্স। শিভ্যালরির সাথে জাতীয়তাবাদের গাঁটছড়া বাঁধা হয়ে গেলে, ‘আনন্দমঠ’-এর ‘সন্তানদল’ নির্বিচারে লুঠ করে মুসলমান প্রজাদের। অরবিন্দ থেকে বিবেকানন্দ সকলেই রাজনীতির এ’ হেন ধর্মীয়করণে ভূমিকা নিয়েছেন। ‘মা’ নামক কনসেপ্টটির কূটনৈতিক ব্যবহারে কিছু বিপদের বীজ কিন্তু সুপ্ত থেকেই যায়। কারণ ‘মা’-এর ধারণাকে এখানে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘অপরের’ প্রতি ঘৃণা উদ্রেক করতে। সে ‘অপর’ নিপীড়নকারী শাসক না হয়ে কোণঠাসা নিপীড়িতও তো হতে পারে, তাই না? প্রসঙ্গত, সম্প্রতি ছাত্রনেতা কানহাইয়াকে গ্রেপ্তার-পূর্ব বক্তৃতায় বলতে শোনা গেছে – আমার মোবাইলটি যদি দেখেন, আমার মা-বোনের প্রতি সঙ্ঘীদের অশ্রাব্য গালিগালাজের বার্তায় তা ভরা। কোন ভারত-মায়ের অবমাননার কথা বলেন এঁরা? তাঁর মধ্যে কি আমার অঙ্গনওয়াড়ি সেবিকা মা বিলীন নেই?
আদতে, ব্যক্তি-মায়ের প্রতি হোক বা দেশ-মায়ের প্রতি – নিঃশর্ত ভক্তি বা পূজার ঠিক উল্টোপিঠেই যা থাকে, তা হলো যুক্তিহীন ঘৃণা। মহত্তর ‘আত্ম’-র রূপরেখা আঁকতে যেমন হীনতর ‘অপর’-এর প্রয়োজন পড়ে, তেমনি ‘মা’-এর অলৌকিক আলোকবর্তিকা উজ্জ্বল হয় যত অ-মাতাকে কলুষিত করে। যে নারী বাঁধনছেড়া, যে মেয়ে স্বেচ্ছায় বেছেছে সন্তানহীনতা, যে মা হয়েও গোল্লাছুটের গোল্লা ভেঙে ছুট দিয়েছে, তাদের অস্বীকার করেই কাল্ট বেঁচে থাকে। যে দেশ আমার নয়, যে ভাষা, যে সংস্কৃতি, যে যাপন, যে দর্শন আমার নয় – কত সহজে তাকে ‘মাতৃবিরোধী’ বলে দাগিয়ে দেওয়া যায়।
বরকত-জব্বর-রফিকরা মায়ের ভাষার মান রাখতে বুক পেতে দিয়েছিলেন গুলির মুহূর্মুহূ ধারায়। ঠিক। আরও কিছু লোক কিন্তু গায়ের জোরে, গুলির জোরে তাদের ‘মায়ের ভাষা’-কেই চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল অনিচ্ছুক দুর্বলের উপর। এভাবেও ভাবা যায় হয়তো। যায় কি?
* * *
‘খেয়ে নাও মা’, ‘পড়তে বোসো’, ‘চুল বেঁধে দিই আয়’। পুতুলের সংসারে ছোট্ট মেয়ের আধোস্বরে মাতৃত্ব ফলানো চলে। বাধা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। লালন, পরিচর্যা, প্রতিপালন – অর্জিত হোক বা স্বতঃস্ফূর্ত – এসব তো গুণই বটে। লড়াইটা ছিল কিছু নির্দিষ্ট ভূমিকায় নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে বেঁধে ফেলার বিরুদ্ধে, ভূমিকাগুলির বিরুদ্ধে না। কত পুরুষকেও তো মনে হয়েছে ভারি মায়াময়, মমতাময়, তাদের তো নির্ধারিত ছাঁচে পড়তে হয়নি সেজন্য! অন্যের সাথে নিজের লালন যে জরুরী – তা তো তাদের ভুলে যেতে হয়নি। লালন প্রয়োজন নিজের মননের। দরকার নিজের ইচ্ছার, আকাঙ্ক্ষার স্পষ্ট উচ্চারণ। তা না হলে, আরও একটা আগামীর হাতে নৈঃশব্দের ব্যাটন তুলে দেওয়া হবে। আমার আমিকে যে প্রবলভাবে বাঁচিয়ে রাখতে হবে – এ’ও এক জরুরি শিক্ষা। আপন ও অপরকে সমভাবে লালন করার ব্যালেন্সের চেষ্টাটা শুরু হয়েছে। তাতে মায়েরা না হয় হলেন বড় সবাক, বড় প্রকট এবং আমাদের অ্ভ্যাসের আরামের তুলনায় খানিক বেশি আত্মকেন্দ্রিক। আর ব্যালেন্সের খেলায় নাম লেখাতে চান না যাঁরা, তাঁরা না হয় না-মা হয়েই থাকলেন। কী এল গেল? বরং বলিষ্ঠতর মায়েদের সাথে সাথেই এক ঋজু, দ্রোহাভ্যাসী অথচ সমমর্মী প্রজন্মও গড়ে উঠবে, হয়তো। মাতৃপূজার প্রয়োজন হয়তো সেদিন ফুরোবে। কারণ মা তখন হবেন এক চির-নির্মীয়মান সত্ত্বা – যার ভাঙাগড়া চলবে, চলতে থাকবে। লিঙ্গহীন, জাত্যাভিমানহীন এক মরমী-দরদী কনসেপ্ট হিসেবে ‘মা’ দীর্ঘজীবী হবে, হয়তো।

_____________________