ইনজুরি টাইম

রীনা ভৌমিক

মেঘ মাখা চশমা । সিলিং ফ্যানের হাওয়ায় ডায়েরীর ফড়ফড় । গম্ভীর কলমের পাশে শুয়ে আছে স্পীডপোষ্টে আসা রহস্যময় খামটি । জানালার বাইরের আলো আঁধারিতে চোখ রেখে চিত্রার্পিত মৃদুলা ।

ফ্রকবেলার বার্বি-খেলনাবাটি টিন-এজ আসতেই কাঁচের সেলফ্ বন্দী "স্মৃতিটুকু থাক" ! সেই কবে ভুলভুলাইয়ায় ফেলে এসেছিল স্বপ্নের পুঁজ-রক্ত সুড়সুড়ি ! তারপর নির্মমভাবে এক অদৃশ্য দেওয়াল তুলে তাতে খোদাই করেছিল 'পেছনে ফিরে তাকানো পাপ ' !

স্বতঃ স্ফূর্ততা যদি বাঁচার মাপদন্ড হয়, মৃদুলা কনফিউজনে । নিজেকে চিমটি কেটে ঠাহর করতে চেষ্টা করে, সে বেঁচে আছে কি না ! মাঝে মাঝে নস্ট্যালজিক হাওয়ারা তবুও.....। তখন পায়ে পায়ে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায় । বিম্বের চোখের টলটলে নিঃসঙ্গ হাত রাখে সংগোপনে ।

মানুষটা কোমায় শুনেই ব্লটিং পেপারে জলবিন্দুর মত ভ্যানিশ পরিযায়ী আপনতুতো-রা ।সেও প্রায় বছরখানেক হলো । তারপর মৃদুলার সম্পত্তি হয়ে দাঁড়ালো অসাড় সেই দেহটি । তার সমস্ত নিঃসঙ্গতা গলে গলে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল হয়ে গেল !

তথাপি জীবন কী ম্যাজিক্যাল ! হঠাৎ একদিন মানুষটি ব্যাখ্যাহীন ভাবে দীর্ঘ ঘুম থেকে জেগে উঠলো । তারপর মৃদুলার হাত ধরে হাঁটি হাঁটি জীবনের দিকে আবার.....। আশ্চর্য্য , আত্মীয়দের কথা একবার ও জিজ্ঞাসা করলো না । হাহুতাশ ও নয় ! সুস্থতার দিকে এগোনোর প্রতিটি স্টেপেই সে বাঁচার বর্ণমালাকে শুষে নিতে চাইছিলো আনন্দে । মৃদুলার রস কসহীন শুকনো গাছটা বৃষ্টির সোঁদা রসে রসস্থ হচ্ছিল অলক্ষ্যে.......

রিলিজ হবার পর রোগী কিছু বিষন্ন গল্প রেখে যায় নার্সের সফেদ ভ্যানিটিব্যাগে ! কিন্তু নিয়মভেঙে অরুনাংশুর চিঠি মৃদুলার টেবিলে
। উত্তেজনায় কাঁপা হাতে চিঠিটা চোখের সামনে মেলে ধরে সে........

সুচরিতাসু ,

' Sometimes the heart sees , what is invisible to the eyes'---
হ্যালো...বাড়ী ফেরার আগে তোমার বুকে কিছু শিউলি রেখেছিলাম...এখনো তারা গন্ধ ছড়ায়...?
সোমনাথদা....ফর্চুন টেলর...বাবাকে বলেছিলেন , তোর ছেলে স্বল্পায়ু...চল্লিশের বেশী একটা দিনও বাঁচবে না রে...
যেদিন শুনলাম আমার প্লেগ্রাউন্ডের নির্দ্দিষ্ট দূরত্বে যমরাজের অন্ধকার পতাকার পতপত্...প্রতিটি মুহুর্ত বাঁচার জন্য হৃদয়ের কী আকুতি...সবাই থাকবে শুধু আমাকেই চলে যেতে হবে খেলা ভেঙে...
ভবিষ্যতবক্তার বাণী খর্ব করে আমার ঊনচল্লিশতম জন্মদিনের সন্ধ্যায়ই হঠাৎ ঘুমে চোখ ঢুলে এলো...তারপর তো তুমি জানোই...
শুনেছি প্রকৃতি নাকি ঋণ রাখেনা । আমার বাঁচার তীব্র আকাঙ্খাই হয়তো জীবনের খেলার ইনজুরি টাইমটুকু ফেরৎ আনলো আশ্চর্য্যভাবে...
এদিকে আমার জীবন দমকা বাতাসের মুখে ক্ষীণ দীপশিখা...যাবার আগে আমারো কতো কিছু বলার ছিলো...দরকার ছিলো একজন সহমর্মীর যে আমার নৈঃশব্দের ভাষাও বোঝে...।শেষ বেলাটুকু অনেকটা ভালো থাকার জন্য তোমাকে যে আমার খুব প্রয়োজন....তুমি থাকবে আমার পাশে...??
তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে কাঠ গো...প্লীজ, শেকড়ে জল দাও.......

অরুনাংশু