কবির মৃত্যু

তমাল রায়

তুমি নিজেকে যতই ভাবো একা,আসলে তুমি তা নও। আর সে কথা তুমি বৌদির মৃত্যুর সময়ও জানতে,তবু…
-তবু কি?
-তবু একাকীত্বের অভিনয় করে চলেছিলে,একজন দক্ষ অভিনেতার মতই। তুমি কি ভাবো এসব কেউ জানেনা,মধুজা জানে না?
-কি জানে মধুজা?
-যা বাকি সবাই ও জানে।
নিরুত্তর রইলেন অনিমেষ।
-জানি তোমার তেমন কোনো উত্তর নেই,আর। থাকার কথাও না।
অনিমেষ উঠে দাঁড়ালেন। দুটো হাত মুঠো করে রাখলেন শরীরের পেছনে। এবার হাঁটতে লাগলেন,খুব স্থির ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত একজন মানুষ যেমন হাঁটে।
যদি বলি তুমিই বৌদিকে খুন করেছ? অস্বীকার করতে পারো?
অনিমেষ উত্তর করলো না আবার ও। ঠোঁটের কোণে কেবল ঝুলে রইল,হাল্কা তীর্ষক একটা হাসি। খুব স্থির নিষ্কম্প কন্ঠে বললেন- সব বুঝলাম,কিন্তু এটা বুঝলাম না,বৌদিকি তোমায় এডভোকেসির দায়িত্ব দিয়ে গেছিলেন?
বাহ,বাহ তুমি যে এমন বলবে জানতাম।লোক তোমায় শ্রদ্ধা করে,ভালো মানুষ ভাবে,কিন্তু তোমার ভালোমানুষীর আড়ালে যে নোংরা শঠ প্রবঞ্চক ইতর মানুষটা রয়ে গেছে,তাকেও লোক চিনুক। জানুক সাহিত্যিক অনিমেষ মজুমদার আসলে জাতির বিবেক হলেও নিজে আদ্যন্ত এক শয়তান।
আর দাঁড়ায়নি সুমিতেশ। হন হন করে বেরিয়ে গেল,দরজা দিয়ে। বাইরে তখন শীতের বিকেল শেষ হয়ে আসছে। অসময়ে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি,অনিমেষ চেয়েছিলো তার থেকে বছর দশেকের ছোট ভাই সুমিতেশের চলে যাওয়ার দিকে। মাথায়,আকাশ আরও কালো হয়ে উঠছে,হয়ত জোর বৃষ্টি নামবে। অথচ মধুজা এখনো ফিরলো না। কি যে করে মেয়েটা,পাগল হয়েছে পুরো,অবশ্য এরা এমনই। পথে ঘাটে যেভাবে যখন এদের দেখেছে,এরা আসলে একটা ঘোরের মধ্যেই থাকে।
তুমি কি ভাবো,তুমি তোমরা সবজান্তা,আর বাকি সব হাঁদাভোঁদা? আমাদের জেনারেশন নিয়ে তোমাদের এত মাথাব্যথা কেন বাপি? তোমরাও কি কম ছিলে? যখন আমাদের বয়সে ছিলে?
মধুজার কথা মন দিয়েই শুনছিলো অনিমেষ। ভালো লাগছে ওর এই যুক্তি দিয়ে সাজানো কথা। মেয়েটা বড় হয়ে গেল ফাইনালি।
-তুমি নিজের মুখে না বললেও ত্রিদিব কাকু,অমিত কাকু,আর সুবিমল কাকুতো লিখেছেন,তোমাদের হল্লাবোল নিয়ে। কি কি করতে তোমরা সে সময়,সারারাত জুড়ে বেলেল্লাপনা।
মধুজার মুখ রাগে লাল। চোখ বড় করে হাত পা নেড়ে সে জানাচ্ছে তার অসন্তোষের কথা। অনিমেষ দেখছে স্তব্ধ হয়ে। মুখে স্মিত হাসি।
-খালাসিটোলা যেতে না? সোনাগাছি যেতে না? আয়াম সরি। বাট বলতে বাধ্য হচ্ছি। কি যুক্তি দেবে? লিখতে গেলে এই সব করে বেড়াতে হত? কে বলেছিলো তোমাদের? তুমি বড় কবি, তাই সাতখুন মাফ? লিসন বাপি আজ কিন্তু এমনটা করলে তা নিয়ে প্রচূর লেখালিখি হত। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা নিয়ে তো কেউ আলোচনাই করে না,যা করে তার মদ্যপান,আর রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া নিয়ে,একটা লোক পাড়ার দোকান থেকে জিনিশ কিনতে বেরিয়ে ভূটান চলে গেল,কি বোধবুদ্ধি বল! তিনি কবি তাই বোহেমিয়ান হতেই পারেন! এ যেন এডভেঞ্চার করছেন আর স্ত্রী মীনাক্ষী ঘরে অপেক্ষা করছেন,খবর না জানতে পেরে ছটফট করছেন,তোমার মনে হয়না,এগুমো ক্রাইম?
অনিমেষ টেবিলের ওপর রাখা কমলকুমারের গদ্য সমগ্রের ওপর হাত বোলাচ্ছেন। টেবিলে আঙুল দিয়ে আঁকছেন কিসের যেন ছবি। আদতে কিছুই ফুটে উঠছে না। অস্থির হয়তবা তিনিও। কেবল বললেন- যাও চেঞ্জ করে,খেয়ে নাও। রাত হল অনেক।
মধুজার কথা ছিল স্পষ্ট। যদিও খুব রেগে আছে। কেউ কিছু বলেছে হয়ত। হয়ত তার সাথে বাপির হয়েই লড়েছে। এখন এসে বাপির ওপর রাগ উগড়ে দিলো। অনিমেষ ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালো। রাত হল অনেক। এ দিকটা এমনিতে শান্ত। রাস্তা থেকে একটু ভেতরে হওয়ায় এ বাড়িতে তেমন গাড়ি ঘোঁড়া বা মানুষের কোলাহল পৌঁছয় না। অনিমেষ দেখছিলো সামনের কদম গাছটা। পাতা ঝরে ঝরে কেমন যেন রুগ্ন। মনটা ভালো নেই। রাইটিং টেবিলে একবার বসতে হবে যদি লেখা আসে। কি যেন মাথায় ঘুরছে আজ সারাদিনই।
মধুজা শুতে গিয়েও শোয়নি। ল্যাপটপ নিয়ে বসেছে। এখন চ্যাট করছে,কিন্তু মাথায় ঘুরছে অন্যকিছু। ভালো লাগছে না কিছুই। গত কদিন ধরেই ও ভাবছিলো বাপিকে কিছু প্রশ্ন করবে,সেতো করা হলইনা। ফাইনালি রেগে মেগে একসা। এখন মাথাটা ফাঁকা,রাগ আর অতটা নেই,কিন্তু প্রশ্নগুলো তো মাথা থেকে যায় না। বাপির ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলো ঘর ফাঁকা। গেল কই? বাথরুমে? না’তো বাইরে থেকেই বন্ধ বাথরুম। তাহলে? বেরিয়ে গেল না’তো? নীচে নামতে যাচ্ছিল,দরজা খোলা কিনা দেখিতো। পরে মনে হল একটু ব্যালকনিটা দেখিতো,ওই তো বসে। হাতে হুইস্কির গ্লাস। কিছু ভাবছে হয়ত। মাথায় লেখা আসছে। খেয়াল করেছে ঠিক। এসো এখানে। কিছু প্রশ্ন করবেতো আমাকে। এসো,এখানে বসো। কি করে যে মনের কথাগুলো বাপি বুঝে যায়! সব কবিই কি এমন বোঝে? জিজ্ঞেস করতে হবে উল্কা কে,ত্রিদিব কাকুর মেয়ে।
-খেলে?
মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল মধুজা
-নাও,কর তোমার প্রশ্ন
-তোমার তো এখন লেখার সময়,আমি বিরক্ত করছি না’তো?
-বল কি জানতে চাও
একটু চুপ করে থাকল মধুজা। কিঞ্চিৎ ইতস্ততার পর জানতে চাইলো,তুমি কি মাকে সত্যি ভালোবেসেছো কখনো?
-আর? তোমার মাকে আমিই মেরেছি কি’না এই তো?
-না,সেটা কাকাই বলে। আমি না।
-তোমার মাতো কেবল আমার স্ত্রী ছিলেন না,ছিলেন আমার সহপাঠীও। সে কত দিনের পরিচয়। বিয়ের আগেও তো প্রায় ১০ বছরের বন্ধুত্ব। ভালো না বাসলে বিয়ে করতে রাজিই বা হব কেন?
-আউট অব সিমপ্যাথি,মার মা হঠাৎ মারা গেলেন,মা তখন এ শহরে একা। মার বাবা জুতের লোক ছিলোনা মার মুখেই শুনেছি। প্রবল একাকীত্ব। তুমি দয়া করেছিলে মাকে বিয়ে করে। যেভাবে বিপদে পড়া মানুষকে দানশীল মানুষ সাহায্য করে।
-যাক,তবু আমার একটা গুণ তোমার চোখে পড়েছে,দানশীলতা। না বোধহয় তুমি যেমন বলছ। বিয়েটা দুজনে করেছিলাম। সহমত হয়েই। আর ভালোবাসাহীন বিবাহতে আমার কখনোই মত ছিল না।
-তখনতো তোমার সাতাশ,মা বোধহয় ছাব্বিশ। কি এমন ঘটনা ঘটে,ভালোবাসার বিয়ে একবছর পেরুতে না পেরুতে দূরত্ব তৈরী হল?
অনিমেষ একটু চুপ থাকলেন। বললেন- দুঁদে সাংবাদিকের মতই প্রশ্ন করছ। তা তোমার আর কদিন যেন পরীক্ষা বাকি? এরপর কি তুমি শুধু সাংবাদিকতাই করবে?
মধুজা উত্তর করেনা।
অনিমেষ বলতে থাকেন -আমার জানা নেই তেমন কিছু ঘটনার কথা। সেটা সাতাত্তর-আটাত্তর হবে। রণজিৎ এর বেরুলো -আমাদের লাজুক কবিতা,গৌতমের কলম্বাসের জাহাজ,আমার অরুণোদয়। রণজিৎ সব থেকে সাইনিং ছিলো আমাদের মধ্যে। তবু আমারও তো কিছু ফ্যান ফলোয়িং তৈরী হয়ে গেছে এর মধ্যে। কোন সেই কুচবিহারের প্রত্যন্ত মফস্বল থেকে এসে এই শহরে ঠাঁই করে নেওয়া খুব সহজ ছিলো ভেবোনা। কারণ সাহিত্য শিল্প একচেটিয়া কোলকাতারই,তখন এমন ভাবনাই ছিলো,সে ভাবনার আজও তেমন কোনো বদল ঘটেছে বলে মনে হয় না। তোমাদের বয়সী যে ছেলেটি এখন বেশ ভালো লিখছে,ওই যে রুদ্র কিংশুক। ওকে জিজ্ঞেস করলে বুঝে যাবে,এ স্ট্রাগলটা ঠিক কেমন। ফলে এই যে সফলতা এলো,প্রথম বই,তায় আবার বড় পাবলিশার করছে,এতো একটা সাকশেশ। হ্যাঁ,কিছু মহিলা ভক্ত ও জুটেছিলো। দোষের মধ্যে হলদিয়ার কবিতা সভা শেষে সমীরণ মদের আসরও এরেঞ্জ করেছিল। একটু বেশী মদ খেয়েওছিলাম আমি,হয়ত আনন্দের মাত্রা ছিলো বেশী। এক মহিলা আমায় চুমু খেলো প্রকাশ্যে। সুন্দরী মহিলা। কবিতার আসর বসলেই তখন তাকে দেখা যেত। কবিতা লিখতেনও অল্প বিস্তর। অপ্রত্যাশিত সে চুমু ছিলো প্রকাশ্যে,আর পর পর বেশ কটা। আমার ঘোর কাটতেই অপরাধবোধে আচ্ছন্ন হই। কিন্তু সে রাতে যারা ছিলো উপস্থিত তাদের জিজ্ঞেস করলে জানতে পারবে,আমি কিছুই করিনি। হ্যাঁ,মহিলাকে ঠেলে সরিয়েও দিইনি। কুৎসার কথা বঙ্গ সমাজে চাপা থাকে কম। বাড়ি ঢুকলাম পরদিন। তোমার মার মুখ থম থমে। চিৎকার করে বলে উঠলেন - ওখানেই থাকা গেলো না? এসব গুণ তোমার আছেতো জানতাম না,তুমি লয়াল নও। ইনফ্যাক্ট কোনো পুরুষই বোধহয় লয়াল হয় না…
আমি বোঝাতে গেছিলাম। শুনলোই না কোনোকথা। আমি কি করতে পারি! বাড়ীতে মা,বাবা উপস্থিত। তারা জানলে আরও লজ্জ্বার সম্মুখীন হতে হবে। তাই বেরিয়ে পড়েছিলাম ব্যাগ রেখে। সোজা খালাসিটোলা। ফিরি অনেক রাতে। তোমার মা এলেন,দরজা খুলে দিলেন। আমি শুলাম বিছানায়,উনি মেঝেতে।
- কি নাম যেন মহিলার?
-কেন তুমি কি আমার ওপর বই লিখছ?
-অসুবিধে আছে?
- না,কিসের অসুবিধে? তিলোত্তমা। তিলোত্তমা সেনশর্মা।
-ইনি তো সেরাতের পর যে যোগাযোগ ছেড়ে দিলেন,তাতো নয়?
-মানে? কি বলতে চাও? হ্যাঁ,সভা সমিতিতে গেলে দেখা হয়েছে। তার বেশী কিছু না।
-তাহলে তিনি কে যার সাথে তুমি টরন্টো গেছিলে,সুনীল গাঙ্গুলী ও ছিলো সেই ট্রিপে।
-কেন? তোমায় এসব এত তথ্য কে দিলো? বলতো?
-অসুবিধে আছে বলায়?
-তিনি তো মিলি দে। উত্তরবঙ্গের কবি। যথেষ্ট ভালো লিখতেন,আজও ভালোই লেখেন। বলতে দ্বিধা নেই,দেবারতি দি,মল্লিকা ছাড়া উনিই একমাত্র,যিনি কবিতায় ধারাবাহিক ভালো লিখে গেছেন,ও হ্যাঁ,গীতা দির নাম না বলাটা অন্যায় হবে।
-ওনার সাথে টরন্টো গিয়ে তোমরা দুজন হারিয়ে গেলে,তাই তো?
-আচ্ছা,একটা জিনিশ বলতো,ধর মিলি আমার বন্ধু,বন্ধুত্ব কি খারাপ কিছু? কই এমন তো কিছু করিনি,যাতে ছি ছিক্কার পড়ে যাবে,তোমার বাপি বাংলাভাষার এক উল্লেখযোগ্য কবি। তেমন কিছু হলে মিডিয়া ছেড়ে দিতো বলছ,এই সর্বস্বগ্রাসী মিডিয়া যুগে? কই পাশ্চাত্যের কবি সাহিত্যিকদের তো এমন শুনতে হয় না?
আর হারিয়ে কোথায় যাবো? আর কদিনের জন্যই বা যাওয়া। হ্যাঁ,এ কথা ঠিক আমাদের দুজনের রুম ছিলো হোটেলের একই ফ্লোরে। আড্ডা বা কথাবার্তা একটু বেশীই হত।
সরি বাপি,আই ডেফার। দস্তয়েভস্কি যে সমকামী ছিলেন, সে কথা তিনি চাপা দিয়ে রাখেন নি। এ দেশে তো ঘোমটার নীচে খেম...সরি, সতীপনা দেখানোতেই মাহাত্ম্য। আচ্ছা,এনাকে নিয়েই কি মার হতাশা আপসেটনেস ছিলো সব চেয়ে বেশী?
- তা হবেও বা। তোমার মা আমার সাথে কথা বলতেন খুব অল্প। আর,সে কথাটুকুও তোমাকে নিয়েই। এর বেশী কিছু না। ফলে উনি কেন আপসেট,কাকে নিয়ে তা আমি জানিনা এগজ্যাক্টলি।
-তুমি এত লোকের কথা বোঝো। এখনও রাস্তায় ঘাটে,তোমার কবিতার কথাই আলোচনা হয়,বিশেষত মেয়েরা বলে তাদের মনের কথা না’কি তুমি টের পাও যেমন,আর কেউ পায় না। তুমি নিজের স্ত্রী,বন্ধু কি ভাবছে টের পেতে না?
- দেখো মাম,তুমি ঠিক কি চাও কিন্তু আমি বুঝছিনা।
-মাম ডাকটা আমার খুব প্রিয় বাপি। মা ডাকতেন,আমার একটা মিষ্টি বাপি ছিলো আমার শৈশবে তিনি ডাকতেন। এ নামে তুমি ডাকোনা,প্রায় অনেকদিন। ইনফ্যাক্ট তুমি নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। তোমার ডাকার সময়ই বা কই!
-ওকে উইথড্র করলাম। ডাকবো না। হ্যাঁ,টের পেতাম। কিন্তু কি করতে পারি আমি বল? আমি সব ছেড়ে তোমার মাকে সঙ্গ দেবো? আমি তো একজন স্রষ্টা শেষ অবধি। আমার সৃষ্টিরা হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে,তাদের নাম ডাক হচ্ছে,এ আমার ভালো লাগাও তো। আমি তার সাথে যাবো না। বসে থাকবো তোমার মার মিছে অভিমান নিয়ে?
-মিছে অভিমান বলতে হোয়াট ডু ইউ মিন? বাপি? দাদাই আমার থেকে প্রায় ৭ বছরের বড়,তোমার বড় সন্তান,সে মারা গেল,মা শোকে শয্যা নিয়েছে। আমার মনে আছে তিন দিনে কাজ হল,অপঘাতে মৃত্যু। তুমি ওই তিনদিন কেবল ঘরে ছিলে। চতুর্থ দিন বেরুতে গেলে,মা অনুরোধ করেছিল,থাকতে। থাকোনি।
-ভুল। তোমার মা বাবানের মারা যাওয়াও আমার ঘাড়ে চাপাতে চেয়েছিলো,যেমন তোমার মার এই মৃত্যু তুমি আর সুমিত আমার ঘাড়ে চাপাতে চাইছো। উনি কেবল ঠেস মেরে কথা বলতেন। সেই সন্ধ্যেতে বলেছিলেন,আজও কি ওই মাগীর মুখ না দেখলেই নয়? সাহিত্য একাডেমীর সভায় যাচ্ছিলাম আমি। কোনো মাগীর মুখ দেখতে না। একটা জরুরী সভা ছিলো।
- তুমি মাকে বলেছিলে সে কথা?
- শোনো,আসল কথাটা হল তোমার মার বিয়ে হওয়া উচিৎ ছিলো একদম সাধারণ দশটা পাঁচটার অফিসবাবুর সাথে। সকালে বেরুবে -আসছিগো জয় মা বলে,সন্ধ্যেতে ফিরবে কলাটা মূলোটা নয়ত পমেটম,সেন্ট,ফেসপাউডার নিয়ে। এ আমার দ্বারা সম্ভব ছিলো না কখনোই। আমার ঠাকুর্দা ছিলো হেড মাস্টার সুনীতিবালা বুনিয়াদী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। তাকে দেখে বাঘে হরিণে এক ঘাটে জল খেতো। ঠাকুমা তিনবার সারাদিনে চার বার প্রণাম করতেন তাকে।
- বাপি খেয়াল করে দেখো,তিনি লয়াল ছিলেন,তার স্ত্রী সন্তানের প্রতি। তার স্বতঃস্ফুর্ত ছিলো সে প্রণাম। বাট হোয়াট একচুয়ালি ইউ ডিড ফর হার,প্লিজ টেল মি.
অনিমেষ উঠে দাঁড়ালেন। মাথাটা কেমন ঘুরে গেল হঠাৎ। চোখে অন্ধকার।
মধুজা সুমিতেশকেই ডেকেছিলো আর তার প্রেমিক অক্ষর কে। ডাক্তার এসেছিলেন। মাইল্ড সিডেটিভ ইঞ্জেক্ট করে গেলেন। নাথিং টু বি ওরিড। ইফ ইউ ফিল এনি প্রবলেম,যত রাতই হোক আমায় জানাবেন। তেমন বুঝলে হসপিটালাইজড করতে হবে। আর আমি ওনার কবিতার প্রবল ভক্ত। হেজিটেট করবেন না প্লিজ।
অনিমেষ দেখছিলো নিম্নবুনিয়াদী বিদ্যালয়ের সামনে ঠাকুর্দা আশুতোষ মজুমদার দাঁড়িয়ে। পরণে ফতুয়া আর ধুতি।ধুতি একটু উঁচু করে বাঁধা। ছেলেরা প্রার্থনা সঙ্গীত গাইছেন,অনিমেষের হাতটা শক্ত করে ধরা। প্রার্থনা শেষ হলে শুরু হল প্রকৃতি পড়ুয়ার পাঠ। আশুতোষ একটা করে গাছ দেখান আর বলেন -বল তো এটা কি? আর ছেলেরা হই হই করে বলে,এটা পিপল গাছ স্যার। ওটা ডালিম। উনি বোঝান ডালিম আর বেদানার ঠিক কি কি তফাৎ। পেছন থেকে হরি আসে,ঠাকুর্দার সর্বক্ষণের সঙ্গী। উনি অনিমেষ কে ছেড়ে দিয়ে বলেন,বৌঠান কে বলবি একে মুসমুসে করে তেল মাখাতে,তারপর নদীতে নিয়ে যাবি।জলে নামাবি,সাঁতার শেখাতে হবে ব্যাটাকে। আমি ততক্ষণে আসছি।
অনিমেষ হাবুডুবু খাচ্ছে জলে,নাক দিয়ে জল ঢুকছে,কান দিয়ে,আর ঠাকুর্দা হাসছেন খুব। আরে ব্যাটা জল না খেলে সাঁতার শেখা যায়…
পাশের ঘরে বসে মধুজা মাথা নীচু করে। মা মারা গেছে তিন দিন হল। সুমিতেশের দিকে তাকালো মধুজা। কাকাই -তোমার মনে হল বাপিই মাকে খুন করেছে,তাই না?
কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো সুমিতেশ। থামিয়ে দিলো মধুজাই। যদি বলি অনিমেষ মজুমদার তোমার দাদা,এ পরিচয় কে কাজে লাগিয়ে তুমি কত বিপদে উদ্ধার পেয়েছো,ভুল বলা হবে? বাট অনিমেষ কে কেবল ঈর্ষাই করে গেছ,বাঙালী তো কাঁকড়ার জাত। বাপি এতটাই পারফেক্ট ছিলো তার কাজে ও কথায়,তাকে বাগে পাওনি কখনোই। মা ছিলো নিতান্তই সাধারণ, তাই যা কিছু ফুসমন্তর দিতে এসে তার কানে। আর মা সরল মনে তা বিশ্বাসও করত। একবারও খতিয়ে দেখতে যান নি,তুমি ভুল বলছ কিনা,মিথ্যে বলছ কি’না। মা একবারের জন্যও ফোন করেন নি,স্বাতী জেঠিমাকে। করলে জানতে পারতো বাপি তেমন কিছুই না ওদের কাছে,বরং নিজেকে পৃথক রেখেছেন চিরটাকাল। না রাজনৈতিক আনুগত্য দেখিয়ে ফায়দা লোটা,না তেমন বড় কবি সাহিত্যিকদের তেল মেরে ওপরে ওঠার চেষ্টা। যা করেছেন নিজের কলমের জোরে। আর কিছুতেই তেমন ভরসা রাখেননি। আমার খুব মনে পড়ে,বাপি যেদিন একাডেমী পাবে বলে ঘোষণা হল,কত আনন্দের দিন,সেদিন রাতেও তুমি এসেছিলে মিলি দে আর বাপির নামে কুৎসা রটাতে। আমি ছোট,কিন্তু ততটা ছোট ছিলাম না যে বুঝবো না কিছুই…
অনিমেষ এখন ঠাকুর্দা আশুতোষের সাথে খোলা ছাদে। আশুতোষ তাকে রাতের আকাশ চেনাচ্ছেন আর বলছেন-বেটা আকাশ দেখ,মন উদার হবে। ওই যে সাতটা তারা ওরা সপ্তর্ষিমণ্ডল।সাত ঋষির নামে ওদের নাম। আর ওই যে ওটা কালপুরুষ। পায়ের কাছের ছোট্ট তারাটা ওটা হল ওর কুকুর লুব্ধক। আর কোথা থেকে অনেক গুলো কুকুর এলো। তারা ঝাউ ঝাউ করছে,আর অনিমেষ একা হেঁটে যাচ্ছে,কোথায় যেতে হবে তা ঠিক জানেন না,কিন্তু যাচ্ছেন...কুকুরের ডাক বাড়ছে ক্রমশ।
সুমিতেশ চলে গেছে অনেকক্ষণ। অক্ষরও। মধুজা কখন ঘুমিয়ে গেছে। ভোর হচ্ছে। উঠে দ্রুত এগিয়ে এলো পাশের ঘরে। বাপি নেই। কোথায় গেল,বাথরুমে? না নেই তো। তাহলে? নীচে এলো,না নেই। হাঁপাতে হাঁপাতে ব্যালকনিতে,নেই। বাপির চশমাটা রাখা আছে টেবিলে। কোথায় গেল? অক্ষর কে ফোন করলো,রিং হচ্ছে,ধরছে না,ঘুমাচ্ছে হয়ত। ও উদভ্রান্তের মত বেরিয়ে পড়ল,তার বাপিকে খুঁজতে। চায়ের দোকান গুলো খুলতে শুরু করেছে,কুয়াশা খুব,তেমন কিছুই দেখা যায় না। ছোটোবেলায় মর্নিং স্কুলে যখন পড়ত,তারপর এমন ভোর দেখার আর অভ্যেস নেই। হাঁটতে হাঁটতে লেকের ধারে চলে এলো,ও। তেমন কেউ নেই কোথাও,নিউজপেপারের গাড়ি এসে দাঁড়ালো। কাগজ ডিস্ট্রিবিউশন হবে এবার। দূরে অনেকটা দূরে কে যেন হেঁটে যাচ্ছে,কুয়াশায়,ট্রেন লাইনে উঠলো,লোকটা বাপি নয়তো? ও ডাকলো পেছন থেকে,মানুষটা কিন্তু লাইন বরাবরই হেঁটে যাচ্ছেন,কুয়াশায় মিলিয়ে গেল…
বাড়ি ফিরেছিলো মধুজা পুলিশ স্টেশন ঘুরে,খবর টা জানাজানি হয়ে গেছে এতক্ষণে,ফোন আসছে একাধিক,মধুজা অক্লান্ত উত্তর দিয়ে যাচ্ছে। এবার ফোন বন্ধ হয়ে গেল,চার্জ নেই তো...অক্ষর এসে গেছে,আর দু একজন বন্ধু একে একে আসছে…
অক্ষরের চোখেই পড়ল,নীচের দালানের কোণে...পড়ে আছে...লম্বা শরীরটা দুমড়ে মুচড়ে।
ল্যান্ডফোন বেজেই যাচ্ছে ক্রমশ,বিরক্ত হয়ে রিসিভার নামাতে এসে সেখানেই কাগজটা পেলো মধুজা,
-মাম ভালো থাকিস। আমার নিজের স্বপক্ষে কখনোই তেমন কিছুই বলিনি আমি। সকলকে কি সব কিছু মানায়? আমার শেষ প্রকাশিতব্য বই ‘উৎসারিত আলো’,আপাতত যন্ত্রস্থ। বই এর উৎসর্গ পত্রে,লিখেছি,-আমার ছোট্ট মামকে। তুই যে কবে এত বড় হয়ে গেছিস বুঝিইনি। মানুষের আর সমস্ত অনুভূতিকেই মান্যতা দিই,কেবল ঘৃণা ছাড়া। কাল তোর চোখ দিয়ে কি ঘৃণা ঝড়ে পড়ছিলো? আজ যে বারবার তোর হাতদুটি ধরতেই ইচ্ছে করছে,আর
মনে পড়ছে-
উড়ে গেল কুয়াশায়,-কুয়াশার থেকে দূর-কুয়াশায় আরো।
তাহারি পাখার হাওয়া প্রদীপ নিভায়ে গেল বুঝি?
অন্ধকার হাৎড়ায়ে ধীরে ধীরে দেশলাই খুঁজি;
যখন জ্বালিব আলো কার মুখ দেখা যাবে বলিতে কি পারো?