আলো বুনেছ অগাধ

ইশরাত তানিয়া

জলমগ্ন হিমালয় ভেসে উঠলে পাদদেশে জন্মায় বৈদিক পৃথিবী। আর সেখানে বহু বহু যুগ পর এক দ্রাবিড় রমনী পৃথা মা। হাজার চারেক বছর আগেকার বিপুলা কৃষ্ণাঙ্গী। অনার্য ভুমি-পুত্রকন্যাদের নিয়ে পাহাড়ের গুহায় বসবাস। সিন্ধুতীরে শনশন বেড়ে ওঠা ফসল। নিজেদের বোনা। সোনালী আভায় পৃথা মা বোঝে ধানের দিন আসন্ন। জঙ্গলে হরিণ-হরিণীর প্রেম। জলে চিকচিকে রূপালী মাছ। জলের রঙ চেনে সে। বাতাসের স্পর্শ মাত্র বোঝে শীতের কর্কশ ঝোড়ো হাওয়া শেষে ঋতুর পথ অদল-বদল হবে।সবার দিকে তার দৃষ্টি সজাগ। ক্ষতে প্রলেপ দিতে জানে সে। সমস্যা এড়িয়ে চলে না। যোগ্য নেত্রীর মতো সমাধান করে।

সে ভূতপূর্ব পৃথা মা। কিংবা অভুতপূর্ব এক মা। মা’র সাথে যখন প্রথম দেখা হলো তখন সবে জন্মেছি। তেমন বুঝতে পারি না কিছুই। কেন যে নামের শেষে আ-কার তার ভালো লাগত না জানি না। তাই আম্মা বলে তাকে ডাকিনি। সে আম্মু। মা ডাকি আহ্লাদের সময়, বায়না ধরি যখন। কখনও প্রবল দুঃখবোধের চাপে মা ডাকটি ছিটকে বেরিয়ে আসে। আম্মা কখনও নয়। মা কথাটিতে আবেগের প্রলেপ থাকে।তাই হয়তো ‘ম’ এর সাথে আ-কারটি মাকে পীড়া দেয় না।জন্মানোর আগে জেনেছি মা মন্ত্রে বেঁচে থাকা আর পরে মা ওথলানো পৃথিবী কী ভীষণ অন্য রকম খুশি।

কোনো আটপৌরে মা নয় তবে সে অনাড়ম্বর। এক ভিন দেশি মা। ডান হাতে হাঁড়িতে মশলা কষায় আর বাঁ হাতে খোলা বই। তা বলে দস্তয়েভস্কি নয়। সামান্য কোনো গল্প উপন্যাস। চোখ একবার বইতে আরেকবার হাঁড়ি কড়াইয়ে। ফুলকপি-ধনেপাতা আর পাঁচফোড়নের গন্ধ কত পথ পেরিয়ে মায়ের গন্ধ হয়ে ফিরে আসে। লেপের নিচে মায়ের ওমে রুশ দেশের উপকথা পড়ছি একসাথে। পড়া শেষে চুপচাপ তাকিয়ে আছে মা। আমি পাতা উল্টোতে দেই না। তখনও ওই পৃষ্ঠা পড়া শেষ হয়নি। কখনও পড়ি মানুষ কী করে বড় হলো? পাহাড়ের গুহায় মনুষ্য বসতি। কনকনে ঠাণ্ডা। শীতে কাবু কাস্পিয়ান সাগরের পাড়। তাই ভারতবর্ষে আসছে আর্যরা ঘোড়ায় চেপে। সঙ্গে তাদের রথ। যাযাবর, ফর্সা, বীরযোদ্ধার দল। পাহাড়ের পাশে সমতলে তারা আত্মগোপন করে ঘাসবনে। শুরু হবে রক্তক্ষয়ী উন্মত্ত যুদ্ধ। মায়ের গায়ে লেপ্টে থাকি। মিষ্টি গন্ধ ভাসে। কোল্ড ক্রিমের গন্ধ মিলেমিশে এমন মায়া মায়া। সাথে মধ্যবিত্ত আলমারিতে ভাঁজে ভাঁজে ফেঁসে যাওয়া জামদানির গন্ধ। একদিন পরা হবে বলে যত্নে তুলে রাখা।

সন্ধ্যে হলেই মা’র ভাসা ভাসা চোখ পরীক্ষার খাতায় তীক্ষ্ণ। হাতে লাল কালির কালো রঙের ফাউন্টেন পেন। আমার তখন পাঁচে পা। ছাত্রদের খাতার ওপর ছোট ছোট দুটি হাতের পাতা মেলে ধরতাম- ফুল এঁকে দাও! মা কখনও হাসত কখনও বিরক্ত। ফুলের সাথে থাকত পাতা আর লাল কালিতে গোলাপির আভা। কালির বদলে কলমে আলতা ভরে নিত মা। মেঘের দিনে গুঞ্জন গীতধ্বনি। মা গাইছে। সুরের আকাশে তুমি যে গো শুকতারা... আমি দিশাহারা রাতে একলা জেগে... তার গানের ডায়রি একাত্তরের যুদ্ধে হারিয়ে গেছে। হারিয়েছে অনুরোধের আসর শোনার রেডিও। না শিখেও এত ভালো গাইতে পারে মা। এ গান থেকে সে গানে মা ডানা মেলে উড়ে যায়। পাতার আড়ালে নিরালায় বসে গলা সাধে। মা তবে পাখি। না। মাকে ডাকি সানাই আর রোদেলা বেলার বিষণ্ণ সুর ভেজা ভায়োলিন। মন কেমন করা প্রাসাদে মা রাজকন্যা। গালে হাত দিয়ে আনমনা বসে। দাঁড়ের পোষা হীরামন। পরক্ষনেই গুনগুন। একটা গান লিখো আমার জন্য।

পা ফেলতেই কাচের রাশি রাশি টুকরো গেঁথে যায়। এতো সুচ বিঁধে, কাঁটা ফুটে। এত অন্ধকার শূন্যতা। মা দূর্বা ঘাসের প্রলেপ। কারা যেন জোর করে চোখে টর্চের আলো ফেলে। দেখে নিতে চায় সবটুকু। কৌতূহলের অসহনীয় আলো কয়েক মুহূর্ত। মা পেছন থেকে চোখের পাতায় হাত রাখে। সব বিকেল কী আর গোলাপি হয়! চিনে বাদামের গন্ধমাখা? কিছু থাকে ধূসর। উপত্যকার বাতাসে বিজাতীয় গন্ধের অনুভব। পৃথা মা’র ইন্দ্রিয় সজাগ। হাঁক ছেড়ে দলের সকলকে ডাকে। উদ্বিগ্ন ও সতর্ক। কিছুটা ক্রুদ্ধ। পাহাড়ি পথ বেয়ে নিচে নেমে আসে। শরীর ভারী তাই ক্ষিপ্রতা কম। থমকে দাঁড়ায় সে। শত্রুপক্ষ অদৃশ্য। তবু অনুমান করা যায় শক্তিশালী। কিছু বিচ্ছিরি সাপ আমার আঙ্গুল চেপে ধরে। গা পেঁচিয়ে বেয়ে ওঠে।এত ঘিনঘিনে কোথায় পালাব।আকাশ ভেঙে জলের বেগে ঘোড়া নামে। পঙ্খীরাজ টগবগ আরো জোরালো আরো কাছে এসে পিষে ফেলে।

বালিতে মেশা হাত পা কুড়িয়ে নিয়ে জুড়ে দেয় মা। ঘরে কোল পেতে বসে থাকে। এক ছুটে মুখ গুজি মায়ের উষ্ণতায়। না সাগরে না বন্দরে- যখন এমন এক জাহাজে ঠায় বসে থাকি তখন এত ছোট আকাশ। তখন ক্লাস্টোফোবিয়া। শ্বাস কষ্টশুধু মা-ই বোঝে। রাতের বাতাসে গাঢ় অন্ধকারে নুয়ে পড়ে মৌনতা। সময় আসন্ন পৃথা মা বুঝেছে। কোমর থেকে শুরু হয়ে তলপেট বেয়ে আসে অস্বস্তি। তার ব্যথা চিনচিনে। আসে যায় ঢেউয়ের মতো। মায়ের ব্যথা তীব্রতর। ভাবনায় জেগে ভাষা হাতড়াই। মা নেই, কথা নেই। আসলে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি। মা আছে বাস্তবিক। চায়ের কাপে চুমুক দিলেই অন্য মা। আনমনা দৃষ্টি উধাও অচিন দেশের বিজন মাঠেপ্রান্তরে। ওই দৃষ্টি ধরে হেঁটে হেঁটে কিছু দূর গিয়ে আর থই-কূল নেই। নাকে মুখে সমুদ্র ঢুকে যায়। জল আর জল মাথার ভেতরেও। সেদিন থেকে গেছে মাথার কলকব্জা। কে না জানে নোনা জলে জং ধরে। হাবুডুবু খেয়ে মাকেই আঁকড়ে ধরি। মা দৃষ্টি ফেরায়। মা ফিরেছে। তার চা ফুরোয়।

দিগন্ত কত বড় হয়ে যায় একেক দিন। ঝড়ের পর তছনছ নীল থেকে ক্রমশ সবুজের দিকে যায় ধূসর ল্যান্ডস্কেপ। ভ্যান গগের সোনালী হলুদ এলমান্ডায় মেশে। বারান্দার টবে হাসে। বাতাসে হলুদবর্ণী পরাগ মেখে মা বলে- অলকানন্দা। বারান্দার ওপাশে কৈশোর দাঁড়িয়ে।বিকেলে সাইকেল যায়।ক্রিং ক্রিং। কিশোরী বালিকার মায়াবী নীল স্কার্ট ছিল কোথাও। খুঁজে পাই না, মা! স্কার্ট কোথায়? আমার টারকোয়েজ টপ? আমি জল মুছব। এত জমেছে চোখে। সামলানো কী মুশকিল! পা হড়কে পথেই পড়ে থাকি।

বহু পরে জানা গেল এর চেয়ে ঢের সহজ নিজেকে গুটিয়ে অদৃশ্যে মিলে যাওয়া। হাওয়ায় ভেসে যাবার মতো হালকা। তবুও কোলাহলে স্তব্ধতা ছড়িয়ে নিজেকে নিজের আরো কাছাকাছি করা হয়ে ওঠে না। তাই নৈশব্দে গুরুগুরু মেঘ ডাকে। ঝড় জলের প্রলয়। মেঘ নয় আকাশ জুড়ে দৈত্যদানোর তান্ডব। নেফোফোবিয়া- পেটের জল উগরে আসতে চায়। মা কোথায়? ক্ষেত জুড়ে কই মাছ। ডাঙ্গায় হেঁটে যায়। ডাল ভেঙে যাওয়া গাছ ঝুঁকে দেখে কই-এর ঝাঁক। ধুয়ে মুছে যাওয়া ফসল ঝরা ক্ষেত। পথেঘাটে হাজারো মৃত পাখি। পায়ের নীচে প্রচুর মাটি ছিল। এখন এত নরম! পা ডুবে যায় মৃত পাখিদের স্তুপে। আজন্ম ব্যথাহত কেউ কেউ। মরে গিয়েও তারা ব্যথা পেতে জানে। মৃত পাখি মাড়িয়ে হাঁটতে পারি না। কোলে তুলে নেবে মা।

মা’র জন্য কেউ গান লিখেছিল না কি না জানা হয়নি। তবে পুরনো চিঠি আর কাগজ পত্রের সাথে একটা হাতে আঁকা কার্ড ছিল। দিয়েছিল কেউ। মা বলে- পোস্টবক্সে পাওয়া। নানাবাড়ির সবুজরঙা ডাকবাক্স। প্রেরক মায়ের অনুরাগী নিশ্চিত। আমার কাছে নামহীন অচেনা। অপূর্ব জলরঙে সূর্য ডুবু ডুবু নদীর বুকে।ম্লান মায়াময় লাল- কমলা গোধূলির আকাশে পাখিরা। নীড়ের পথে ফিরে উড়ছে। তীরে নরম ঘাসের সবুজাভ ছাট। ভেতরে বাংলা হরফে ক্যালিগ্রাফি- “শীতের ‘দুপুড়ে’ শূন্য বলাকায় ঈদ মুবারাক পাঠিয়ে দিলাম।” কার্ড দেখিয়ে মা বলেছিল- এমন আঁকতে পারবে? ‘না!’ আমার মতো অকম্মার উত্তর আর কী হতে পারত? তবে খুব ভালো লেগেছিল দৃশ্যটি। গেঁথে আছে। মৃদু হেসে স্বগোতোক্তি করেছিল মা- ‘দুপুড়ে’ লিখেছে। মিষ্টি হাসিটুকু কি বানান ভুলের জন্য না সুখস্মৃতি জানতে চাইনি। থাকুক। একমাত্র মানুষই যা পারে। কল্পনা করার সেই অসামান্য ক্ষমতা সামান্য কাজে লাগুক।

বাঘিনীর মতো সে শাবক আগলায়। আর আমাকেও। আমি তার ভেতরেই ছিলাম। বাকিরা বাইরে জড়ো হয় পিপ্পল গাছের নীচে। নদী থেকে সামান্য দূরে। হাতে তীর ধনুক। আকাশ অন্ধকার। অশুভ তীর ঝাঁক ঝাঁক উড়ে গাঁথে। এক অসম যুদ্ধ। বীর যোদ্ধা বায়ু শর-বিদ্ধ। বিপদ পৃথা মা’র। বট গাছের আড়ালে সে। দশ চাঁদের দিন ধরে সে কিছু অনুভব করছে। দেজা ভ্যু। মা’র এক্সট্রা সেন্সরি পারসেপশান প্রখর। ঠিক লক্ষ্য করে বোধের এপারে ওপারে তলিয়ে যাচ্ছি। স্বচ্ছ সী গ্রীন অতল জলে দ্রুত ছুটে আসে জায়েন্ট অক্টোপাস। আমাকে ঘিরে বারবার ঘুরপাক খায় সুন্দর দাঁতের হাঙর। ফ্রি-ডাইভার নই তাই ডুবসাঁতারের কৌশল জানা নেই। অক্সিজেনের অভাব। মা হাত ধরলে ভারসাম্য। জলের ওপর মুখ ভাসা। মা নেই ভাবতেই উষ্ণআর্দ্র জল। ঘুমের ঘোরে চোখ উপচে পড়ে। আমি টারকোয়েজ টপে চোখ মুছি। আঁচল পাই না। রুমাল নেই- সে এক ফ্যান্টাসি থ্রিলার। দুদিনের বেশি টেকে না।

অবসাদ জমে জমে এক ধূসর বন। সেখানে রুমাল অবশ্যম্ভাবী হারায়।পৃথা মা উড়ন্ত রুমাল দেখে সংকেত বুঝে নেয়। তীক্ষ্ণ তীরের ফলায় রোদ পিছলে যায়। সমস্ত মনোযোগে লক্ষ্য স্থির করে। দূরে ঝোপের আড়ালে কালো বিন্দুর মতো কিছু। সবে তীর টেনে ধরেছে। উরু বেয়ে নেমে যায় উষ্ণ এ্যমনিওটিক ফ্লুইড । জল ভেঙে মাটিতে পড়ল যে সদ্যোজাত। কাঁদে না । ঘোলা ঘোলা চারপাশ। আকাশ সেদিন অদ্ভুত স্যাফেয়ার নীল। বাগদত্তার অঙ্গুরীতে ভাসে যে নীল। চোখ মেলে কাঁদতে ভুলে যায় সে। পলক ফেলতে ভুলে যায়। বর্শা বিঁধে পৃথা মা’র বুকে। শায়িত সে। মেঘমাখা দেহ ঘামে ভেজা এবং রক্তাক্ত। চোখ দুটো স্থির। চুচুক থেকে ছুটছে দুধের ফোয়ারা। সজোরে উৎক্ষিপ্ত। রক্তে মিশে মিষ্টি গোলাপির আভায় শুয়ে পৃথা পুত্রী।

সে এবার কাঁদে কিন্তু মায়ের শব জেগে ওঠে না। আমিই সে। সেই যে আমি মেঘ কেটে চাঁদে পৌঁছে যাই। কুয়াশা বেয়ে অরণ্যে নেমে আসি। হামাগুড়ি দিয়ে জলে ছায়া চিত্র দেখি। আলমারি খুলে দাঁড়িয়ে মা। দুহাতে দুই পাল্লা ধরা। কী বের করতে হবে ভুলে গেছে। দাঁড়িয়েই আছে। ভাবছে উদাস। ওই অলকানন্দা আমি দেখি আর ঈশ্বরের হাসিও। সৃষ্টিশীলতায় সুরসঙ্গীতে ঈশ্বরের বাস। মা বলেছিল। সাধনার পথ কত শিখিয়েছে যাপিত একেকটি ক্ষণে। ফোটে যে ফুল সেখানেও তাকে মেলে।যদি তুমি দেখতে চাও।মা দর্শন আর কাব্যের যুগলবন্দী। আগুনে শীতল পাটি। হিম জাগা রাতে পুড়ে পুড়ে গনগনে কয়লার ভাপ। নিগূঢ় সংযোগ রেখায় আমাদের প্রাণের শেকড়ে গভীর আনন্দ বিষাদ আসা যাওয়া করে। তুমি আছো বলেই শঙ্খচিল হয়ে যাই, মা। মাথা ভর্তি কুয়াশা নিয়ে উড়াল ডানা তোমার আকাশে।