মায়ের ভাষায়

রঞ্জন মৈত্র

সেইসব ভোরগুলো ভেসে আসে মাঝে মাঝে । যখন সূর্য ওঠেনি । বাবাও ওঠেনি । আলো ফুটছে আমার আর মা-এর জন্য , ফুটছে জলও । বিনা-অনুমতির চা তৈরি হচ্ছে চুপিচুপি । বাবা তৈরি হওয়ার আগেই । সকালকে মা মনে হয় আমার । আর মা-কে সকাল । \" এ নতুন জন্ম, নতুন জন্ম, নতুন জন্ম আমার \\\" কেন লিখেছিলেন কবি , টের পাই । ভাষাকে আমার , মা মনে হয় না । কারন কিছু সংকেত আর শ্বাসধ্বনি পেরিয়ে ভাষায় পৌঁছতে অনেকটা পথ হেঁটেছে মানুষ । কিন্তু মাতৃভাষা শব্দটি বড় আপন লাগে । যে ভাষায় ভর করে বেড়ে উঠেছি তা তো প্রথম মার মুখ থেকেই পাওয়া । মা-কে ভাষার উৎস ভেবে ভালো লাগে ।

মায়েরও এক মা থাকে । পিছোতে পিছোতে মহামাতৃকা । সব আলো , সকল ঋতু , গাছপালা স্রোত ও ঊর্মি , কখন তারা বাড়ি ফেরে আর কখন দেশান্তরী হয় । আর , এক মা অপেক্ষায় জেগে থাকে সেই গর্ভগৃহে যেখানে আমাদের নজর পৌছোয় না । নজর পেরিয়ে গেলে জেগে ওঠে চেতনা । চেতনা হাত পা ছড়াতে ছড়াতে হঠাৎ স্পর্শ পায় , টের পায় , বাধা পায় আঁকড়ে ধরতে গিয়ে । নিত্যের কার্যকারণ আর বিধির বাধা । অতিক্রম করতে পারলে আনন্দ আর অশ্রুর গোধূলিতে শাঁখ বেজে ওঠে , প্রদীপ জ্বলে , ঝিরঝির করে বইতে থাকে মাতৃভাষা ।
ট্রাক্টরের শব্দে , বোরিং আর মিক্সিং মেশিনের চিৎকারে , রোডরোলারের মন্দ্রসপ্তকে চার পাশ শস্যশ্যামল , জলভরা ও জনবহুল হয়ে ওঠে । গতির জন্ম হয় । চেনা যাওয়া আর চেনা আসার ফাঁকফোকরে একটু রডোডেন্ড্রন আধটু লেগুন । কখনও প্রতিধ্বনিই মা , যখন চারপাশে ঘেরাও , সুন্দর বা অসুন্দর । যন্ত্র আমাদের বৃদ্ধ প্রপিতামহ । উপকার দেয় সঙ্গে একটি করে মাগনা শিকল । যন্ত্রের ভাষাই হয়ে ওঠে শাসকের ভাষা । আর সব লুপ্ত হয়ে যেতে চায় । মা লোপ পেতে থাকে । চেতনা ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে খুশিখুশি আত্মসমর্পণ । শূন্যময় ঘুড়ির বদলে মান্থলি টিকিট । আর মনে হয় ---
মা ক্রমে অনুমোদিত কাউন্টার হয়ে উঠলেন
সকাল সকাল ওঠো লাইনে দাঁড়াও
অথবা ফুটো করো পলিপ্যাকড মা-কে

সৃষ্টির আদি থেকে ইতিহাস্ থেকে মনীষী- বাণী থেকে কাব্যমঞ্জুষা থেকে পথ ছিটকে বেরোয় অনাবিষ্কৃত দিগন্তের দিকে । তখন ভোর হয় হয় , আলো আসে আসে । জল ফোটে । চা-এর পাতারা ভাসে ডোবে । মা কোথায় ! জড়ভরত হয়ে শুয়ে থাকা একটা শরীর আর দিনরাত্রির তফাৎ করতে পারে না । ঘুম-জাগার মধ্যে তার কোন ঘড়ি নেই আর । যতদূর তাকাই শুধু ভাষাহীন মাটি । পিচের আড়ালে , বেসমেন্টেরও নিচে , মিলনী টকিজের পিছনে আর খোলা জানলার শূন্যে ছড়িয়ে থাকা মহামৃত্তিকা । নিজেরই সাথে বিনিময় করি অনন্তকালের বিস্ময় , রহস্যময় ভাষামাটি -----
ক্লাস সিক্সের বই থেকে শিখে
তুমি মাটিকে প্রণাম করেছিলে
কিন্তু যেদিন খোঁড়াখুঁড়ি করল নগরপালিকার লোক
যেদিন বিদ্যুৎ পর্ষদ যেদিন দূরভাষ নিগম
জানিনা কি করে বুঝলে জলের পাইপ তারের বান্ডিল
সমস্ত চাপাচুপি দেওয়ার পর কিভাবে অস্ফুটে মা ব\'লে উঠলে
আমার সন্দেহ তুমি জ্যোৎস্না বুঝতে পারো
পড়তে পারো চৈত্রের সিংভূম

হাওয়া আসে । চা পাতার গন্ধে মিশে নিয়ে যেতে চায় অন্য কোথাও । জানলার দিকে তাকিয়ে বলি , জাগো মা,জেগে ওঠো , তুমি না জাগলে আমারও জাগা হয় না যে !