ক্যালাইডোস্কোপ

সাগুফতা শারমীন তানিয়া

আমার আম্মা চাইতো মা নিয়ে আমার অনুভূতি হরলাল রায়ের বইয়ের রচনা ‘মাতাপিতার প্রতি কর্তব্য’র মতো একরৈখিক হোক। স্নেহের প্রতিদান প্রশ্নাতীত শ্রদ্ধা এবং কর্তব্যজ্ঞান। সেটা সম্ভব ছিল না, কাছের মানুষ হলেও এই দাবী মানতে আমি প্রাকৃতিক প্রবৃত্তিগতভাবেই সক্ষম ছিলাম না। আমার তো দেখবার ইচ্ছা। আমার মন দিদৃক্ষু। তাই মা এবং আমার মা নিয়ে অনুভূতিসকল যক্ষারোগীর শ্বাসবায়ূর মতন অনেকগুলি শব্দের অর্কেস্ট্রা, আঁশে ভরা।
আমি বিশ্বাস করতাম, মাকে শ্বাসের অম্লজানের মতন সহজে নেয়াটা আমাদের শিখিয়ে দেয়া হচ্ছে যাতে দৃশ্যমান কর্তব্যগুলির পেছনের মানুষটাকে ঝাপসা করে দেয়া যায়, তাতে সমাজের সুবিধা। যত্রতত্র শ্রদ্ধা- বিনয় ইত্যাদির দেয়াল তুলে দিয়ে মনকে কুটি-কুটি করে টুকরো করে রাখলে সমাজের ঢের সুবিধা হয়। কিন্তু আমার এবং আমাদের সকল সুবিধার পেছনে যার স্বয়ংক্রিয় অবদান, সে তো যন্ত্র নয়, তার মন আছে, সে মনের বিকলন আছে, সে মনের আছে/ছিল বিচিত্র বর্ণিল বেপথুমতিত্ব। সেই মা কে? যে পুরুষ হন্তা এবং গ্রহীতা, তার প্রতি সেই নারীর মনোভাব কেমন? যৌনতা নিয়ে তার ব্যাখ্যাগুলি কেমন? তার জীবনের আখ্যান তার দৃষ্টিতেই বা কেমন করে ধরা দেয়, সেটা কি বিনষ্ট সম্ভাবনা বা সম্ভাবনার প্রতি অবিচার হিসেবে দেখে আমার মা নাকি দেখতেই চায়না কোনোভাবে, শুধু যাপন করতে চায়? জানতাম তাজা মাছের কানকোর তলা তুলতে গেলেই দেখবো রক্তের ছোপ, তবু এইসব জিজ্ঞাসা ফুরাতে চাইতো না।
আমি যখন জন্মেছি আমার মায়ের বয়েস তখন কুড়ি। অর্থাৎ আমাকে এবং ভাইকে নিয়ে তার যে যাপিত জীবন আমি দেখেছি, সেখানে তার যৌবনের পুরোভাগ কেটেছে, কেটেছে মধ্যবয়স এবং প্রৌঢ়ত্বের দিকে প্রক্ষেপণ। অথচ আম্মা তার টোয়েন্টিজ বা থার্টিজ তখন কাটাচ্ছে এটা সেকালে একেবারেই বুঝিনি। এখন বুঝি। এখন বুঝে অবাক লাগে। ব্যথা লাগে। আমার মা গুনগুন করে গান গাইতো, কিন্তু ক্যাসেটপ্লেয়ারে কখনো আমি তাকে ক্যাসেট বাজিয়ে গান শুনতে দেখিনি। কখনো ছুটির দিনে কোথাও যাবে এই প্ল্যান করতে দেখিনি, ছুটির বাঁশী বেজে ওঠা রৌদ্রের দিনে শুধু বাপের বাড়ি রওনা দিত মা, কিন্তু রাত্রিযাপন করতো না। অনায়াসে বাবার জুতো মুছতো মা, কিন্তু উল্টোটা ভাববার কথা বল্লেও শিউরে উঠতো। বিয়ের আগে বাবাকে আদৌ চিনতো না সে, বিয়ের পরপর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরবার পর আত্মীয়স্বজনপরিমন্ডিত ঘরে তোলা শাদাকালো ছবিতে তার কাঁধ জড়িয়ে আছে বাবার হাত- সেটা কি তার অস্বস্তির কারণ হয়েছিল না হয়নি?
‘হাউজওয়াইফ’রা তখনো ‘হোমমেকার’ খেতাব পায়নি, সারা বছর টিফিন গছিয়ে দিয়ে ইস্কুল- অফিস- ব্যবসায় পাঠানো মেয়েদের, ফিরিওয়ালাকে ডেকে পুরনো কাপড়ের বদলে এলুমিনিয়মের হাঁড়ি কেনা মেয়েদের, ছাদে আচার রোদে দেয়া মেয়েদের, কাঁচের মতন চকচকে জ্যাম বানানো মেয়েদের, আস্ত ফুলকপিতে কিমা ঠেসে বে’ক করে ঘরের লোককে তাক লাগিয়ে দেয়া মেয়েদের কেবল গৃহবধূ- গৃহমা এইসব হিসেবেই দেখা হতো। গৃহস্থালির সাথে তাদের যোগ ছিল, গৃহে তাদের রাজত্ব ছিল না- “বাইশ বছর এক চাকাতে বাঁধা” ছিল তারা। আমার মা সেইরকম গৃহবধূ ছিল, কিছু কিছু খুচরো সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা তার ছিল, কিছু আধুনিকতাকে আত্তিকরণ করবার ইচ্ছায় মা নিত্য দেশী-বিদেশী নাস্তা বানাতো- মনের জানালা খুলবার চেষ্টা আর কি। আম্মার রান্না ছিল ‘মায়ের হাতের রান্না’ই, খেয়ে সুখ্যাতি করতো লোকে আর ঘরের লোকে পেত তাকে আরো আরো রান্নাঘরে জুতে দেবার ওজর।
তরুনী বয়সে মায়ের গড়ন ছিল খুব সুঠাম- কাঁধ আর পিঠের সুগঠিত হাড় দেখানো হল্টার বা মাগ্যা হাতার ব্লাউজ পরতো, খাটো আঁচলের শাড়ি। আশির দশক আসতে আসতে ব্লাউজের কাট হয়ে গেল ববিতার মতো, কনুই অব্দি হাতা, তারপর পিঠের গড়ন ঢাকতে লাগলো, এরপর মাথা এবং সিঁথি। মা আমার ফ্রক এবং কামিজ নিজহাতে সেলাই করতো এবং হল্টারনেকের কন্যা পরতে পেতো বিশপস্লিভ কিংবা বেলহাতা কিংবা ঘটিহাতা এইসব। অল্পবয়েসে তার বাপের বাড়িতে ফিটফাট থাকবার রীতি ছিল, ধোয়া মুখে ঋতু অনুসারে স্নো বা পাউডার, চুলে কলাবেনী বা আড়াবেনী, চোখে কাজল আর বাইরে গেলে লিপস্টিক, নখে শখের নেইলপলিশ। কট্টর মুসলিম পরিবারে বিয়ে হবার পর নেলপলিশ দেয়ার অভ্যাস একেবারে বিলোপ পেয়ে গেল, কি না অজু হয় না। টিপ পরবার অভ্যাস ছিল, সেটা বাবা ভালবাসতো বলে, নৈলে সেটাও যেত সন্দেহ নেই। এইসব অভিযোজন তাকে ব্যথিত করেছিল কি না, বিচলিত করেছিল কি না তা জানবার আমি অনেক চেষ্টা করেছি, মা যথাসাধ্য প্রতিরোধ করেছে, প্রতিহত করেছে। সুখ তার গন্তব্য ছিল না, তার গন্তব্য ছিল স্বস্তি, ঠিক যেই সোপানের পর গেলেই আপনের চেয়ে পর ভাল হয়ে ওঠে। আমার নানার মতোই আমার মা আসলে চিরতরে হারানো কোনো এক যূগের কোনো এককালের ডাকটিকেটমাত্র। কয়েকটি শব্দকে বিশ্বাস করে, কয়েকটি মূল্যবোধকে জীবনের চেয়ে বেশি মূল্য দিয়ে এঁরা অকাতরে জীবন কাটিয়ে গেলেন। বেশি তলিয়ে ভাবলেনও না, তাতে দৈনন্দিন জীবনের উপরিতলে যদি ঢেউ ওঠে? যদি পালে লাগে হাওয়া। বৈরী হাওয়ার দিনে এইসব মানুষ বরং পাল গুটিয়ে রাখবেন, নোঙর করে থাকবেন চেনা উপকূলে। যে সময়ে এসে ‘কন্ট্রোভার্সি’ একটা পজিটিভ টার্ম হবে, যে সময়ে এসে মানুষ আর সুন্দর হস্তাক্ষর দিয়ে অন্তর্গত-মানুষকে যাচাই করবে না- আমার মা সেই সময়টাকে চেনেই নাই, মা চেনে সেই জগতকে এবং সেই যূগকে যেখানে ‘খোলামেলা’ বা ‘সাহসী’ এই জাতীয় শব্দ নেগেটিভ টার্ম।

‘আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে’- আল মাহমুদের কবিতার লাইন। আমার মা নোলকবেঁধা মা ছিল না, নোলক-বেশর-নাকফুলের অবকাশই ছিল না, নাক ফুটো করেনি কখনো। কানফুল পরবার জন্যে কান ফুঁড়িয়েছিল, শখ করে পরতো এটা সেটা। গলায় একটা সরু হার, একটা ধুকধুকি তাতে। আর হাতে একসময় আংটি পরতো, ফিলিগ্রির কাজ করা একটা আংটি। মোটের উপর তার অলংকার বলতে ছিল এইই, আর পরিধেয় ছিল তার পোখরাজের মতন বিদ্ধ করার মতন তীব্র স্বচ্ছ দৃষ্টি, সেটা তার মুখ উজ্জ্বল করে রাখত। পরতো বলছি, কারণ এখন সেই তীব্রতা বা স্বচ্ছতা আর নেই, সেই গামা রে-মার্কা দৃষ্টি যা দিয়ে আমার মা নিঃশব্দে বলতো- “বাড়ি নিয়ে নিই, আজকে হবে!” সেই দৃষ্টি প্রতিস্থাপিত হয়েছে একরকমের ভেজা পাঁউরুটি মার্কা চাহনি দিয়ে, এই সুসমতল চাউনি আমার মায়ের না, আমার চিরচেনা মায়ের না। তার চিবুক ছিল দৃঢ়, সেদ্ধ ফুলকপির মতন না।

আচ্ছা, আমার মা তো আমার বিচার্য-বিশ্লেষ্য বিষয় নন, নেহাতই আমার মা, একান্ত আমার রক্ত-মাংস-নাড়ি-আদর-সোহ গ-শাসনের মা। তার একটা সহজিয়া অস্তিত্ব আছে। সেখান থেকে শুরু করি, সেটাই তো দস্তুর। যদিও সেখান থেকে শুরু করাই আমার জন্য সবচেয়ে দুরূহ।

কোচিং ক্লাসে আম্মাদেরকে দেখতাম একদিকে জড়ো হয়ে কত কী আলাপ করছে, এর ভিতরে এক মা আরেক মায়ের চোখের পেয়ালায় ঠোকাঠুকি করে জানান দিচ্ছে- ‘বলেছিলাম না!’ কিংবা- ‘এইসব এদের সামনে নয়!’ কে কাকে নোট নিয়ে মিছে বলেছে, কার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে এসে বলেছে- অফিসের লোকে শরবত খাইয়ে বেহুশ করে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল...এইসব তারা খুব ভাল জানতো। সেই জমানায়, আমার সবচেয়ে বিরক্ত লাগতো- ‘আমার মা’ বা ‘মাতা-পিতার প্রতি কর্তব্য’ জাতীয় রচনা লিখতে। একে তো কর্তব্য শব্দটার সাথেই আমার বনিবনা হতো না সেটা শুরুতেই বলেছি, যা মন থেকে আসবে তাই তো ক্রিয়া, তাই কর্ম, এখানে কর্তব্য কিসের? আর, মা বিষয়ে লিখতে গেলেই আমার গভীর বিদ্বেষের সাথে মনে পড়তো, আমার বন্ধুর মায়েরা কেমন সজল স্নেহে জড়িয়ে ধরে, কেমন করে সর্বসমক্ষে আদর করে তাদের ছানাপোনাদের। কই আমার মা তো করে না? এইসব অনুযোগের কথাই আমার রচনাতে লিখতে ইচ্ছে হতো, কিন্তু হরলাল রায় সেই পথ দেখাননি। যে পথ দিয়ে কেউ হাঁটে না, সেপথ দিয়ে আমাদের ছোটবেলা থেকেই হাঁটতে বারণ। আমার এই অসন্তোষের কথা আমার মা কোনোভাবে টের পেয়েছিল, অসম্ভব বুদ্ধিমতী এই মহিলা আমাকে একদিন ডেকে বলে- “জানো, অমুক না মায়ের নামে পচা কথা লিখেছে রচনায়, যে মা আসলে ছোটভাইকে বেশি ভালবাসে, আমাকে না। এইসব কথা কখনও রচনায় স্যারের কাছে মিসের কাছে লিখতে হয় না”, অতএব আমি আর সেই রচনা লিখবার ধার দিয়ে গেলাম না। মনে গেঁথে গেল, সর্বজনসকাশে অনুযোগ করতে নেই, মা-বাপের নামে তো নয়ই। (অনেক পরে মনে হয়েছিল, এই প্র্যাকটিসটার একটা বিশাল দোষ আছে, এটা পরবর্তী জীবনে দোষ দেখলেও চুপ করে থাকার মনোবৃত্তি গড়ে দেয়। সেই মনোবৃত্তিতে আমার মায়ের সায় ছিল।)

কিন্তু রচনা না লিখলে কি হয়, আমার মনের ব্যথা তো কোথাও সম্প্রচার করা চাই। জুটে গেল সঙ্গী, শ্রাবন্তী ঘোষ (এখন দত্ত), শ্রাবন্তী অক্লেশে স্বীকার করলো- দ্যাখো, আমাদের মায়েদের কেমন গভর্নেস-গভর্নেস ভাব!” তিরিক্ষি শাসন-যথার্থ ব্যবহার শেখানোর অবিরাম চেষ্টা এইসবকে অনায়াসে সে এই টার্মটা দিয়ে দিল, আমারও খুব মনে ধরলো। একদিন মায়ের কাছে ধরাও পড়ে গেলাম (সেকালে আমার মনে হতো, স্বপ্ন দেখলেও আম্মা বুঝে ফেলবে কি দেখলাম) আম্মা এইবার খুব ব্যথিত হলো, প্রিয়জনের জন্যে নিজের জীবন বিকিয়ে দেয়া কাকে বলে- তা তার দিকে তাকালে বোঝা যায় না? কাকে বলে সাধনা? (স্নেহ কেন আলিঙ্গনে জানাতে হবে, কেন মুখে তুলে খাইয়ে দেবার আদিখ্যেতা করতে হবে, মন দেখতে পাও না তুমি, দেখতে পাও না কাজ?) আমিও বুঝতে চেষ্টা করলাম- এই যে আম্মার শ্রমশোষণ করে আমাদের ক্ষয়পূরণ ও বৃদ্ধিসাধন হচ্ছে এর মূলে ভালবাসা আছে, কর্তব্য নয় শুধু। মনে মনে ‘গভর্নেস’ শব্দটাকে তুলে রাখলাম, শার্লট ব্রন্টির তাকে।

স্কুল থেকে ফিরে মোজা জুতা খাটের তলের গহীনে ফেলে দেয়া থেকে শুরু হতো আম্মার অসন্তোষ। কোনো ক্লাসটেস্টে খারাপ করলে মুখ ‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবস’; আমি তখন প্রতিবছর ক্লাসে ফার্স্ট হতাম (প্রয়াসের এই অসম্ভব অপচয়ের জন্যে আমি জীবনের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী), ক্লাস সেভেনে থাকতে আমি যুগ্মভাবে ফার্স্ট হলাম আমার চিরপ্রতিদ্বন্দিনীর সাথে। আম্মার মেজাজ দেখে কে। পরদিন ক্লাসে গিয়ে দেখি, আমাদের এক বন্ধু কোনোমতে পাশ করেছে বলে ওর বাবা ওকে চায়নীজ খাইয়ে এনেছে গতকাল। সেদিন আমার হঠাৎ মনে হলো- আমি কখনোই আম্মার কাছে যথেষ্ট ভাল হতে পারব না, এই অসম্ভব উচ্চাভিলাসের ক্ষুন্নিবৃত্তি করবার মতন সন্তান আমি হয়তো নই।

এখন মনে হয়, হয়তো এটি তার অমীমাংসিত জীবনকর্ম পূরণের চেষ্টা, অত্যন্ত মেধাবী এই মানুষটাকে এত অল্প বয়েসে বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়েছিল, শিক্ষাজীবনে ফিরে যাবার জন্যে তেমন কোনো প্রনোদনা দেয়া হয়নি- মেয়েটি সেই জিয়ল ক্ষুধার উপশম চেয়েছিল আমার জীবন থেকে। এটা যখন মনে হয়, তখন আমি আর আমার মাকে দেখি না, কোঁকড়া চুলে ভরা মাথার একটি অনতিযুবতীকে দেখি, গণিতের ধাঁধা সলভ করছে একমনে, নৈলে বিলিতি নকশাদার জামা একবার উল্টেপাল্টে নিজেই বানিয়ে ফেলছে এর চেয়ে ভাল কিছু, সকল সুকুমারবৃত্তির প্রতি তার গভীর সংরাগ, সকল সামাজিক অনুচিত-এ তার তীব্র ঘৃণা, সৌজন্যবোধ তাকে এমন প্রতিবন্ধী করে রেখেছে যে সে একটি খিস্তি করতে পারেনা- সুস্বাস্থ্যে-সহজাত বুদ্ধিতে ঝলমল একটি মিষ্টি মেয়ে।

আম্মার অসন্তোষের খাতায় আরো ছিল, আমি যথেষ্ট গৃহকর্মনিপুনা মেয়েও নই, আমার বন্ধুরা তদ্দিনে লুচি বেলতে পারে, খাট টানটান করে বিছানার চাদর পাততে পারে, বাইরের লোক এলে দু’টো মনরাখা কথা বলতে পারে ইত্যাদি। আমি শুধু বাইরের বই পড়ে সময় নষ্ট করি (এই অনুযোগের সাথে পূজাবার্ষিকী উড়ে চলেছে আকাশে, আম্মা ছুঁড়ে দিচ্ছে রাগে আর গরগর করে বলছে, ভারতেশ্বরী হোমসে দিয়ে দিলে আর এই দিন দেখতে হতো না…) আমাকে চৌকষ করতে আম্মা সাধ্যাতীত করছে, গানের স্কুল, আর্ট কম্পিটিশন, নিজের শরীর-মন-স্বাস্থ্য কোনোদিকে না তাকিয়ে। ভর্ৎসনা কাহাকে বলে, তা জানে আমার স্কুল আর জানে আমার মা। জীবনভর মনে থাকবে। আমিও তখন শিখেছি বই থেকে, এর নাম অন্তরটিপুনি, আগের কালে শাশুড়িরা পুত্রবধুকে দিতেন।

আমাকে নিয়ে তার দুর্ভাবনাগুলিতে আমি সহিংস উস্কানি দিতাম, বলতাম- “আমি একটা চিলেকোঠায় থাকব, শাদা ইঁদুর পালবো, প্যাকিং বাক্সে ঘুমাব আর বই পড়বো। তোমার আমাকে মেয়ে হিসেবে পছন্দ হবে না। তুমি অন্য মেয়ে নাও।” আম্মা কখনো তাঁর গামা-রে দিয়ে আমাকে দেখত, সত্যি হয়তো দেখত আমি মিস হ্যাভিশাম হয়ে পরিত্যক্ত বাড়িতে বসে আছি, একটু চুপ করে থেকে হেসে ফেলত- বলতো, “তুমি কোনোদিন বড় হবে না। নেহাত পোলাপান থেকে যাবে।”

আগেই বলেছি, তার বুদ্ধি ছিল ক্ষুরধার, কিন্তু তার বিশ্বাসপ্রবণতা ছিল এই বুদ্ধির শত্রু। বেশিক্ষণ প্রিয়মানুষকে অবিশ্বাস করতে পারতো না, এখনও পারে না, এতে তার ভীষণ কষ্ট হয়। শিশুর মতো তার বিস্ময়, পরিণতবুদ্ধি তার বিবেচনাবোধ, দুইয়েতে মিলে টানাপোড়েন সাংঘাতিক। শেষ অবধি জিততো অবশ্য তার হিতাহিতবোধ। কাছের মানুষ, আত্মজ এইসব ছাড় দিত না আমাদের, শাস্তি পেতে হতো পূর্নমাত্রায়।

আচ্ছা, আবার ফিরে যাই স্কুলজীবনে, আমার সঙ্গে ঠিক বন্ধুত্ব বলতে যা বোঝায় তা তখন নেই মোটেই, কিন্তু বন্ধুর সাথে যা আমি শেয়ার করতে পারি তা জানতে আম্মার প্রবল আগ্রহ। আমি আম্মাকে ধরে এনেছি নতুন কি লিখেছি তা পড়ে শোনাব, আম্মা অত্যন্ত উৎসুক গলায় বলতো- “কয় পাতা? আমি ডাল রেখে এসেছি চুলায়।” কিংবা আমি যখন সত্যি তার সাথে শেয়ার করতে বসতাম, ধরা যাক মনোজ বসুর ‘খেলাঘর’, আম্মা সহাস্যমুখে শুনছে, কিন্তু তার উৎকর্ণ মন ভাবছে- আমার মেয়ের বাল্যবিবাহের গল্প এত ভাল লাগছে কেন? এই বিটুইন দ্য লাইনস পড়বার বা ভাববার মন নিয়ে ধরাও পড়ে যেত, এবং এরপর আর কিছু এগুতো না। আমার যা কিছু বিশুদ্ধ স্বাস্থ্যের, তা নিয়ে সে কিছুমাত্র উদ্বিগ্ন হতো না, তার আগ্রহ ছিল আমার ভিতরে অন্তর্গত রক্তক্ষরণে এবং হয়তো অন্তর্গত খেলায়, যা মানুষকে ক্লান্ত- ক্লান্ত করে।

আম্মা যা যা গেঁথে দিয়েছিল আমার মনে আর মাথায়, তার অনেককিছুই অসার, অনেককিছুই তামাদি (শুদ্ধ উচ্চারণ-সুন্দর হাতের লেখা), অনেককিছুই কালের ধোপে টেকেনি (বিকেলে হাতমুখ ধুয়ে চুল আঁচড়ানো-কাপড় পালটানো ও সাজগোজ) আর অনেককিছু আমি ইমপ্রোভাইজ করেছি। গুরুজনকে প্রশ্নাতীত ভক্তি শিখিয়েছে আম্মা, (আমি তো গান শুনছি ‘বাড়লে বয়েস/ সবাই মানুষ হয় কি?’) বয়েসের সম্মান দেয়ার অভ্যাস আমার এখনো বহাল আছে, কিন্তু যিনি বয়েসের সাথে সাথে চিন্তায়-কর্মে-আচরণে সত্যিকার উদার/গুরু/বড়/বিকাশমান হতে পারেন নি, তাঁর জন্যে নিঃশব্দ অবহেলাও আমার আছে।

আম্মা বড়বড় শিল্পীর চারিত্রিক গ্লানি নিয়ে অত্যন্ত বিরূপ ছিল, আমি তাঁদের যা শ্রেয় তা নেবার পক্ষে, আম্মাকে সরস্বতীর বাহন কেন রাজহাঁস (জল মেশানো দুধ থেকে সে দুধ টেনে নেয়) এইসব বলেটলেও লাভ হয়নি। আম্মা হেলতে নারাজ। আম্মার কিছু শব্দ আছে, সেইসব শব্দের সাথে কিছু শব্দকল্প এবং কিছু মূল্যবোধ, এর বাইরে আম্মা জন্মান্ধ, কিছু দেখতে পায় না। যেমন আম্মা জানে, মাকে প্রশ্নাতীতভাবে ভালবাসতে হয়, মা সত্যবাদী-সত্যকামী, গজেন্দ্র মিত্রের শ্যামা বা মানিক বন্দোপাধ্যায়ের শ্যামাকে ‘জননী’ হিসেবে আম্মা মানতে পারেনি।

মা আমাদের অনেক বড় বয়েস অব্দি পাটিগণিত করিয়েছে -সরল অংকের বডমাস থেকে শুরু করে সূদ কষা, আমি কমিশন বুঝতাম না, মুনাফা বুঝতাম বলে আম্মা খুব হাসতো। আম্মা শিখিয়েছিল- নকল করা অসম্ভব অন্যায়। এমনকি আম্মা কোনোদিন আমাদের হোমওয়ার্কের খাতায় ছবি এঁকে বা লিখে সাহায্য করতো না। আমাকে ছবি ছাপ দিয়ে আঁকতে দিত না, দেখে দেখে আঁকতে হবে। নকল করবার প্রবণতার প্রতি এই মনোভাব আমি সাদরে বজায় রেখেছি, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছি তখন এই অনড় মনোভাবের জন্যে অনেক নিগ্রহের স্বীকার হয়েছি, তবু জায়গা ছাড়িনি। ঐটা আমার মায়ের স্মারকচিহ্ন। ছাড়ব কি করে?

আমি যা কিছু তার কাছে পাইনি, তা আমি জোর করে নিতে গিয়েছি অনেক সময়। কিন্তু যা পেয়েছি, তা কতভাবে স্বীকার করবো জানি না। আমার স্থান-অকুলান মুঠিতে আমি তাদের ধরে রাখতে গিয়ে খাবি খাই। তারা সকলি নবীন-সকলি বিমল। ঐ যে পুনর্নবা শাকের মতন প্রতিবার নবীকৃত হয় মানুষের প্রতি আমার বিশ্বাস, কদর্যকে দেখেও মনে করি- ‘তাই কি হয়’, ঐ চিরনবীন মন আমার মায়ের দান।

মায়ের সাথে যথাসময়ে যাদের বন্ধুত্ব নিবিড় হয়, তারা বড় ভাগ্যবান। আমার সাথে আমার মায়ের বন্ধুত্ব স্থাপিত হয়েছে যতদিনে, ততদিনে আমি অনেক কিছু মুসানবীর অঙ্গার ধরে প্রবাল চিনবার মতন করে চিনেছি, মানুষের চোখের ভাষা-মুখের ভাষা-মনের ভাষা-কাজের ভাষা এই চারটি যে চাররকমের হতে পারে এই অসম্ভব বেদনাদায়ক সত্যকে হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করছি, আমার অসম্ভব বুদ্ধিমতী মাকে তখন আর আমি তরিয়ে দেয়া তারা হিসেবে পাইনি, তার দরকারও ছিল না আর, আমি পেয়েছি সমব্যথী, সখী, সচিব, আরেক নারী হিসেবে, আরেক তীর্থযাত্রী হিসেবে, আমার মাকে। আস্তে আস্তে তখন টের পেয়েছি, আমার না জড়িয়ে ধরা-না মুখে তুলে খাইয়ে দেয়া মায়ের কতটুকু জুড়ে আমি আছি। আমার প্রতি একটি অনাদর তার ভূবন জুড়ে কতখানি বাজে। দেখেছি আমার বুদ্ধিতে তার আস্থা, আমার সিদ্ধান্তে তার শ্রদ্ধা, আমার যৎসামান্য কীর্তিতে তার প্রাপ্তি। আমার জীবনের বৃত্তচাপ তখন সদবৃত্ত হয়েছে। তখন অনায়াসে জিজ্ঞেস করেছি, “বাবার সত্যিকার চেহারাটা তুমি যেমন করে এখন চেনো তখন চিনলে কি বিয়ে করতে?” মা হাসতে হাসতে নির্ভয়ে জবাব দিয়েছে, “কখনো না।”
-চিনে ফেললে যখন তখন কেন বদলালে না?” বলেই আমার মনে পড়তো হাইন্ডসাইটে ছাড়া জীবনের ভুল-ঠিক আর কোনোভাবে দেখা যায় না।
-বদলে কোথায় যাব, লোক হাসাবো?”
মানে, বদলের সবচেয়ে বড় ভয় লোকলাজ? ভাগ্যিস সে-কাল কিছুটা হলেও গেছে। ভেবে বড় হাঁপ ছেড়ে বাঁচতাম আমি।

মাকে আরেকভাবে চিনতে শুরু করেছি সম্ভবতঃ গর্ভধারণের সময় থেকে। যে অসম্ভব স্পৃহা মায়ের মনে অতন্দ্র জেগে থাকে- যে, আমার সন্তানকে যে কোনো অনিষ্ট থেকে বাঁচাবো, সেটা যে আমি এর আগে চিনতামই না তা জেনেছি গর্ভে শিশুর আনাগোনার সময় থেকে। অনাগত শিশুর সাথে যে কথোপকথনের শুরু হয় মায়ের, যে হাসিকান্না- শোক- বিহ্বলতার আদানপ্রদান শুরু হয়, যেভাবে বাঁচিয়ে রাখবার অলিখিত চুক্তিতে মা রক্তের স্বাক্ষর দান করে, যে মা হয়নি সে তা কোনোদিন জানবে না; এই অনুভূতি স্থানান্তরযোগ্য নয়, ছোঁয়াচে নয়। সংবেদনশীল মন দিয়েও এর নাগাল পাওয়া যায় না, এটা এমনি ব্যক্তিগত। শুধুমাত্র তখন জেনেছি, আমার শত্রুকে আমি ক্ষমা করে দিতে পারি বা ভুলেও যেতে পারি শত্রুতা, মা পারে না।

আমার মা সিংহরাশির জাতিকা, সিংহীর মতন দাপটে একদিন আমাদের অপরাপর পশুদের থেকে রক্ষা করবার চেষ্টা করেছে, যুযুধান হয়েছে সকল বন্যবরাহের সাথে। এই শ্বাপদসংকুল পৃথিবী তার প্রতি সদয় হোক। তাকে দেবো এমন কিছুই আমার নেই, মা মুখাপেক্ষীও নয়। মোবাইল ফোনে ইংরেজিতে আম্মার ফোন নাম্বার সেইভ করবার সময় আমি সবসময় দুইটা A দিয়ে আম্মা লিখি- যেন কারো নাম আম্মার উপরে না থাকে। ঐ বাড়তি A অক্ষরটা তোমার জন্যে আম্মা, ভেবে নাও আমার বর্ণমালার শুরু তোমাকে দিয়ে।