প্রতিনিধি

বিদ্যুৎলেখা ঘোষ

১.
এখানে হিমেল ভোর জলের উপর সবুজ আস্তরণে। এখানে নিম কুহেলি অবোধ্য ইশারায়। এখানে নিঝুম আঁধার ডেকে আনে নবারুণ। এ আমাদের শৈশবপুর, অপূর্ব আনন্দ নিকেতন। চলাচলে জড়িয়ে থাকে মত্ততা। জানলার কাছে ডালপালা নুয়ে আসা ওই যে মাদার গাছ, আজও বুঝি তার শিরা উপশিরায় ধরা পড়ে আছে তোমার আমার শিশব উড়ান। বয়সের খুব ফারাক তো নেই আমাদের মধ্যে। বুঝিনি তো কিছুই। কখন সরে গেলো মাথার উপর থেকে ঘরের ছাউনি, যার নাম ছিল বাবা। ৪৭ সালের দেশ ভাগ, এক বিতর্কিত গণভোটে আমাদের শৈশবপুর শ্রীহট্ট অন্তর্ভুক্ত হল পূর্ব পাকিস্তানে। সাত চাপা ফুল আমরা ভাইবোন। খানসেনাদের হাত থেকে বাঁচতে মা আমাদের নিয়ে দৌড়...দৌড়...দৌড়...। কোথায় যাবো! কে বাঁচাবে আমাদের! শ্রীহট্ট থেকে কাছাড়ের শিলচরে এসে আশ্রয় পেলাম শরণার্থী শিবিরে। পেটে খাবারের দানা নেই, পরনের জামা ছিন্ন মলিন। তবুও আমাদের ভরসা, মা তো আছে! আমরা ভাইবোন সবাই আছি একসাথে। মায়ের আঁচলে বাঁধা সিকি পয়সার মতো। তারপর স্কুলরোডের ভাড়াবাড়িতে আবছা আলোআঁধারি স্বর-ব্যাঞ্জনে কেটেও যাচ্ছিল দিন। মা তোমার বিনুনি বাঁধছে পরিপাটি করে। হ্যারিকেনের আলো পড়ে তোমার মুখের উপর লিখে দিয়ে যাচ্ছে দিনরাত্রির সহজপাঠ “ আলো হয় / গেলো ভয় / চারিদিক/ ঝিকমিক...। ব্যাস্ত থাকতো মা। আমাদের জন্য। কিন্তু সবসময় আমি তোমাকে পেয়েছি মায়ের মতো শাসনে আতিশজ্যে আদরে। প্রতিভা, আমাদের মেজদিদি, ইস্কুলে পড়াতে যেতো যখন পরনে পাট পাট শাড়ি ঝোলানো ব্যাগ কাঁধে, তুমি অপার বিস্ময়মাখা চোখে চেয়ে দেখতে দেবী সরস্বতীর হেঁটে যাওয়া। এতগুলি মুখে সেই তো অন্ন যোগাতো।

২.
পৃথিবী নাকি ঘোরে অবিরত! হ্যাঁ ঘোরেই তো! কেবল ঘুরতে চাইতো না আমাদের পীড়িত ফ্যাকাশে বিকেলের মতো দিন মাস বছর। রোদ ঘাম বরফবাতাস ফুলেল গন্ধে উত্তাপে ছায়ায় ঘুরে ঘুরে অতিথি ছয় ঋতু এসে শিখিয়ে যেতো সুনৃত অভিযোজন। নার্সিং ট্রেনিং শেষে বেনুদিদি, যে আমাদের সবার বড়, শিমুলগুড়ি থেকে ফিরে এলে তাকে বলেছিলে একটা অভিধান কিনে দিতে। তখন জোর করে অসমিয়া ভাষায় পড়াশোনা করতে বাধ্য করেছিল অসমিয়া সরকার। বড়দিদি পারেনি কিনে দিতে। প্রবল উৎসাহ বাড়িয়ে দিলো এই না পারা। বন্ধুদের থেকে বই চেয়ে নিয়ে নিজের খাতায় বিষয়বস্তু লিখে নিয়ে পড়াশোনা করে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলে। কী যেন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে তোমায় আর তুমি ছুটছো আর ছুটছো কিশোরী হরিনী...। ম্যাট্রিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরের দিন শিলচর রেলস্টেশনে মাতৃভাষায় প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার দাবীতে অবস্থান সমাবেশে বন্ধুরা নিতে আসে। সকালবেলায় স্নান করে মেজদিদির রেখে যাওয়া শাড়িটা পরে নিতে গেলে বায়না শুরু করলাম আমি মঙ্গলা। তোমার ছোটো বোন, তোমার সঙ্গে যাওয়ার জন্য। উদ্বিগ্ন মা ঘর থেকে বেরনোর আগে হাতে দিয়েছিলেন এক টুকরো কাপড়, যাতে কাঁদানে গ্যাস থেকে বাঁচতে পারি। নিশ্চিন্তে ঘরে থাকতে না পেরে দুপুরবেলাতেও রেলস্টেশনে এসেছিলেন মা। চোখে পড়তেই ছুটে গিয়ে মাকে এক জায়গায় বসিয়ে তার ধুলোমাখা পা দুটো যখন ধুয়ে দিচ্ছিলে যেন আর এক মা তার ভীরু মেয়েকে আশ্বস্ত করছে কত যত্নে। হ্যাঁ একেবারে মায়ের মতোই তো... রক্ষা করতে এসেছো আজন্ম পরিচিত স্বর-সুর আমাদের মায়ের ভাষা... বাংলাভাষা।
৩.
সকাল কখনো কখনো দিনের সত্যিটা জানতে দেয় না। যেমন দেয় নি ১৯৬১-র ১৯ মে’র সকাল। দুপুর পর্যন্ত রেল অবরোধ শান্তিপূর্ণভাবেই হয়েছিলো। দুপুরের পর থেকেই আসাম রাইফেলসের জওয়ানরা জায়গাটা ঘিরে ফেললো ধীরে ধীরে। তারপর অতর্কিতে অবস্থানরত ছাত্রছাত্রীদের উপর নির্বিচারে লাঠিচার্জ ও বন্দুকের কুঁদো দিয়ে মারতে আরম্ভ করলো। এলোপাথাড়ি লাঠির ঘায়ে দিশেহারা জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে যে যেদিকে পারে ছুটতে শুরু করলো। আমি পড়ে গেলাম লাঠির আঘাতে। আর্ত চিৎকারে ডাকলাম তোমাকে। ততক্ষনে গুলিবৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। আমাকে বাঁচাতে এলে একটা গুলি তোমার চোখ ভেদ করে মাথা ফুঁড়ে বেরিয়ে গেল...রক্ত রক্ত রক্ত...সারা দেহ রক্তে ভিজে লুটিয়ে পড়লে তুমি...লুটিয়ে পড়লো এই বরাক উপত্যকায় এগারোজন ভাষাশহীদ কানাইলাল নিয়োগী, চন্ডীচরণ সূত্রধর, হিতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্র দেব, কুমুদরঞ্জন দাস, সুনীল সরকার, তরনী দেবনাথ, শচীন্দ্র চন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সুকমল পুরকায়স্থ আর তুমি কমলা ভট্টাচার্য... পৃথিবীর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ‘ পারুল বোন’ , প্রথম একমাত্র নারী ভাষা শহীদ...। বাংলাভাষা আসলে আমারই মতো। আগ্রাসনের আঘাতে কেঁদে ওঠে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। যখনই ভাষা অসহিষ্ণুতার তীব্র দহন দিন আসে, তার আর্তি শোনা যায় হিমঝরা রাতে, জ্যোৎস্না নদীতে একলা নৌকো ভাষায়, অস্ফুটে গোঙাতে থাকে তারা হীন আকাশের নীচে। সেই করুণ সুর শুনে প্রানপনে বাঁচাতে আসে...যে প্রতিনিধি......।