রবীন্দ্রনাথে বাঙালির ‘মা’ আর তার বিবিধ রূপ

অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়

বাঙালি মাতৃশাসিত প্রাণী। এটা আমরা জানি! কবি সমর সেন এক জায়গায় বাঙালির স্থায়ী মাতৃক্রোড় কামনাকে নাম দিয়েছিলেন ‘uterine urge’, যা শক্তিকে পর্যন্ত অতর্কিতে বলিয়ে নিয়েছে ‘আমাকে আনলি কেন ফিরিয়ে নে’। বিভূতিভূষনের দেবযান উপন্যাসে মৃত, সুদীর্ঘকাল আকাশবাসী, পুনর্জন্মকামী যতীনের যশোর জেলার কোলা বলরামপুর গ্রামে জন্মে’ আবার মরে যাওয়ার যন্ত্রণায় মনে পড়েছিলো ‘যাত্রায় শোনা গানের দুটো লাইন/ এ নাটকের এই অঙ্কে পেয়েছি স্থান তোর অঙ্কে,/ হয়তো যাবো পর অঙ্কে পর অঙ্কে পুত্র সেজে’। এও এক ‘uterine urge’। আবার ‘মা শব্দ মমতাযুত কাঁদলে কোলে করে সুত।/ দেখি ব্রহ্মাণ্ডেরই এই রীতি মা, আমি কি ছাড়া জগত’— লিখেছিলেন সাধক কবি রামপ্রসাদ সেন, আমার মতে বাংলার মহান লোকায়ত দার্শনিক। তাহলে বাঙালি ছেলের কাছে ‘মা’ কী? এক ‘সেন্সরি রিসেপ্টর’ (‘sensory receptor’), যা কিনা সন্তানকে কাঁদতে দেখলেই কারণ-অকারণ বিচার না করেই উদ্বেল, সমবেদী প্রতিক্রিয়ায় (‘sympathetic reaction’) অশ্রুপূর্ণ হয়ে ওঠে, যেরকম কোনো সদর্থক পুনর্নিবেশ (‘positive feedback’)-তাড়িত প্রক্রিয়ায় ময়রার দোকানের বেসিনের ট্যাপ খদ্দেরের হাতে জল ঝরায়, বা আধুনিক হাসপাতালে কাঁচের দরজা খুলে যায় প্রবেশেচ্ছু সামনে এসে দাঁড়ালেই? সন্তান যার কাছে সন্দীপনের ‘খড়ের বাছুর’? মাণিকের জননী উপন্যাসের শ্যামার মতো ‘জননী’-বা প্রজননযন্ত্রের মতো তার মধ্যে নিজের সন্তানের প্রতি ঈর্ষার স্থান নেই?
প্রিয় পাঠক, কৈশোরে মাতৃহারা আমি ‘মা’-র ধারণা নিয়ে ব্যঙ্গ করছি না। সাইবারনেটিক্সে পুনর্নিবেশ প্রক্রিয়ার সরল ব্যাকরণ আবিষ্কৃত হওয়ার অনেক আগে, অব্যবহিত সমবেদী প্রতিক্রিয়ার ব্যাখ্যা করা হোতো এক পরমকারণিক তথা ‘teleological’ ধারণার মাধ্যমে, আর তার শ্রেষ্ঠ প্রকাশস্থল তথা ইমেজ তো মা, তা যত্নে হোক, হাসিতে হোক, স্থিতিতে হোক, স্মৃতিতে হোক, বা গতিতে হোক! ‘মা’-র অর্থ নিঃশর্ত, সদর্থক, সমালোচনাহীন, সমবেদী প্রতিক্রিয়া, যার উপলব্ধিতে উদ্বেল হয়ে লোকায়ত দার্শনিক রামপ্রসাদ লিখেছিলেন, ‘মা শব্দ মমতাযুত কাঁদলে কোলে করে সুত।’ রবীন্দ্রনাথের হাত ধরেই বিচার করে’ দেখি! এই মার বহু রূপ বুঝতে এবারে কেবল রবীন্দ্রনাথে ঢোকা এবং সেখানে কিছুক্ষণ থাকা যাক!
রবীন্দ্রনাথে মার দ্যোতনা একদিকে নিঃশর্ত স্নেহ, ও তার থেকে জন্ম নেওয়া উৎকণ্ঠা কখনও মানুষী ব্যক্তিজননীর, কখনও স্বদেশের, কখনও বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে পরিস্ফুট। একদিকে ওই স্নেহ শিশু কাব্যের ওই ‘বিচার’ কবিতার মতই জানিয়ে দেয়, ‘বাহির হতে তুমি তারে/ যেমনি কর দুষী/ যত তোমার খুশি/ সে বিচারে আমার কী বা হয়!/ খোকা ব’লেই ভালোবাসি ভালো বলেই নয়’। আবার যে উৎকণ্ঠার বশে, ‘জন্মকথা’ কবিতার শেষাংশে রবীন্দ্রনাথের মানুষী মা তাঁর নারীত্বের ভিত্তি জুড়ে শিশুসন্তান কামনার ফলে পাওয়া পুত্রসন্তানকে হারানোর ভয়ে ভীত, সেই উৎকণ্ঠা রবীন্দ্রনাথ বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে সমভাবে লক্ষ করেছেন। একদিকে মানুষী মা তাঁর জন্মকথা জানতে উদ্‌গ্রীব সন্তানকে বলেন —
‘হারাই হারাই ভয়ে গো তাই
বুকে চেপে রাখতে যে চাই,
কেঁদে মরি একটু সরে দাঁড়ালে ।
জানি না কোন্‌ মায়ার ফাঁদে
বিশ্বের ধন রাখব বেঁধে
আমার এ ক্ষীণ বাহু দুটির আড়ালে ।’

এই একই উৎকণ্ঠা রবীন্দ্রনাথ দেখেন বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে। সোনার তরী কাব্যগ্রন্থে ‘সমুদ্রের প্রতি’ কবিতায়, ‘পুরীতে সমুদ্র দেখিয়া কবির মনে হয়েছে —

হে আদিজননী সিন্ধু, বসুন্ধরা সন্তান তোমার,
একমাত্র কন্যা তব কোলে। তাই তন্দ্রা নাহি আর
চক্ষে তব, তাই বক্ষ জুড়ি সদা শঙ্কা, সদা আশা,
সদা আন্দোলন; তাই উঠে বেদমন্ত্রসম ভাষা
নিরন্তর প্রশান্ত অম্বরে, মহেন্দ্রমন্দির-পানে
অন্তরের অনন্ত প্রার্থনা, নিয়ত মঙ্গলগানে
ধ্বনিত করিয়া দিশি দিশি; তাই ঘুমন্ত পৃথ্বীরে
অসংখ্য চুম্বন কর সর্ব অঙ্গ ঘিরে ...
লেখাটা মাস্টারি গোছের হয়ে যাচ্ছে জেনেও বলি, ‘মা শব্দ মমতাযুত’ এই গৎ রবীন্দ্রনাথ নিজেই ভেঙেছেন বহুবার। এক চেনা স্নিগ্ধা মা কিভাবে অচেনা হিংস্রী মা হয়ে যেতে পারে, ব্যক্তিগত অথবা বিশ্বজাগতিক বা কসমিক স্তরে তার কথা তিনি বলেছেন চৈতালি-তে, ‘অজ্ঞাত বিশ্ব’, ‘ভয়ের দুরাশা’ ইত্যাকার কবিতায়। দুটি কবিতার প্রথমটিতে ঝড়ের সময় প্রকৃতির রুদ্ররূপ তার স্বাভাবিক, স্নিগ্ধ ‘মাতৃবেশ’ একটানে ছিঁড়ে ফেলে, যেন এক ‘Lutheran inscrutable god’ কে মনে করিয়ে দিয়ে, তার সন্তান মানবককে শাশ্বত প্রকৃতির মধ্যে তার ক্ষণিক অবস্থান আর সেই ক্ষণিক অবস্থানেরও অন্তহীন রহস্যময়তাকে তুলে ধরে। স্নিগ্ধা প্রকৃতির এই রূপ বদল সন্তানকে অজানা ভয়ে ও সন্দেহে আকুল করে’ দেয়। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন—

জন্মেছি তোমার মাঝে ক্ষণিকের তরে
অসীম প্রকৃতি! সরল বিশ্বাসভরে
তবু তোরে গৃহ ব\'লে মাতা ব\'লে মানি।
আজ সন্ধ্যাবেলা তোর নখদন্ত হানি
প্রচন্ড পিশাচীরূপে ছুটিয়া গর্জিয়া,
আপনার মাতৃবেশ শূন্যে বিসর্জিয়া
কুটি কুটি ছিন্ন করি বৈশাখের ঝড়ে
ধেয়ে এলি ভয়ংকরী ধূলিপক্ষ-\'পরে,
তৃণসম করিবারে প্রাণ উৎপাটন।
সভয়ে শুধাই আজি, হে মহাভীষণ,
অনন্ত আকাশপথ রুধি চারি ধারে
কে তুমি সহস্রবায়ু ঘিরেছ আমারে?
আমার ক্ষণিক প্রাণ কে এনেছে যাচি?
কোথা মোরে যেতে হবে, কেন আমি আছি?

কিন্তু মানুষী মা যেমন তার সন্তানকে ভয় দেখালে ছেলে মাকেই জড়িয়ে, আদর করে’ নিজের ভয় ভাঙায় আর মায়ের ভয়াল রূপ পাল্টানোর চেষ্টা করে’, তেমনি রবীন্দ্রনাথও রুদ্র প্রকৃতির বিভীষিকা দেখেও তার উপরেই নিজের বিশ্বাস ন্যস্ত করেছেন। সন্তান তাই বলছে—
জননী জননী ব\'লে ডাকি তোরে ত্রাসে,
যদি জননীর স্নেহ মনে তোর আসে
শুনি আর্তস্বর। যদি ব্যাঘ্রিনীর মতো
অকস্মাৎ ভুলে গিয়ে হিংসা লোভ যত
মানবপুত্রেরে কর স্নেহের লেহন।
নখর লুকায়ে ফেলি পরিপূর্ণ স্তন
যদি দাও মুখে তুলি, চিত্রাঙ্কিত বুকে
যদি ঘুমাইতে দাও মাথা রাখি সুখে।
এমনি দুরাশা! আছ তুমি লক্ষ কোটি
গ্রহতারা চন্দ্রসূর্য গগনে প্রকটি
হে মহামহিম! তুলি তব বজ্রমুঠি
তুমি যদি ধর আজি বিকট ভ্রূকুটি,
আমি ক্ষীণ ক্ষুদ্রপ্রাণ কোথা পড়ে আছি,
মা বলিয়া ভুলাইব তোমারে পিশাচী!

আবার যখন এই মা দেশমাতৃকা তখন রবীন্দ্রনাথের তাঁর একটি প্রধান রূপ দুঃখিনী নারী। তার সঙ্গে মিল মেরি তথা মারিয়ার। রোম্যান ক্যাথলিক ঐতিহ্যে আছে তাঁকে ‘Our Lady of Sorrows’ (ল্যাটিনে ‘Beata Maria Virgo Perdolens’), বা Sorrowful Mother or Mother of Sorrows (ল্যাটিনে ‘Mater Dolorosa’), হিসেবে দেখানোর, তাঁর সপ্তদুঃখের কথা শোনানোর রীতি, যা সাত তরবারি হয়ে তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ করছে, যেমন দেখা যায় স্পেনের Salamanca-য় Church of the Holy Cross-এ, প্রভুর ক্রুশবিদ্ধতার পরে শোকাতুরা মারিয়ার ছবিতে। রবীন্দ্রনাথের বহু কবিতায় গানে এই দুঃখিনী মাতার কথা ঘুরে ফিরে আসে! তিনি দুঃখিনী ঔপনিবেশিকতার যন্ত্রণাতেই কেবল নয়। কখনো তাঁর দুঃখের কারণ আত্মবিস্মৃত সন্তান, যে মাতার হৃতগৌরব ফিরিয়ে আনায় উদাসীন, যার ফলেই বঙ্কিমকে ‘মা যাহা ছিলেন, যাহা হইয়াছেন, যাহা হইবেন’ তার ত্রিমূর্তির কথা লিখতে হয়েছিলো! তরুণ বয়সে লেখা একটি গানে, রবীন্দ্রনাথ খুব মর্মন্তুদ ভাষায় লিখেছেন এই অবহেলিতা জননীর কথা:
কে এসে যায় ফিরে ফিরে আকুল নয়ননীরে ।
কে বৃথা আশাভরে চাহিছে মুখ’পরে ।
সে যে আমার জননী রে ।।
কাহার সুধাময়ী বাণী মিলায় অনাদর মানি !
কাহার ভাষা হায় ভুলিতে সবে চায় ।
সে যে আমার জননী রে ।।
ক্ষণেক স্নেহ-কোল ছাড়ি চিনিতে আর নাহি পারি ।
আপন সন্তান করিছে অপমান—
সে যে আমার জননী রে ।।
পুণ্য কুটিরে বিষণ্ণ কে বসি সাজাইয়া অন্ন ।
সে স্নেহ-উপচার রুচে না মুখে আর ।
সে যে আমার জননী রে ।।

আর এই দুঃখিনীর যন্ত্রণার ক্ষোভেই কবিকে স্বদেশকে ‘topos’ হিসেবে দেখার বিরুদ্ধে গিয়ে বলতে হয়েছে যে তুষারাবৃত হিমালয়ে কোনো বিমূর্ত ‘ভারতমাতা’ বা ‘ভারতলক্ষ্মীর’ সন্ধান করলে চলবে না, তাকে আমাদের দুর্দশাগ্রস্ত প্রাত্যহিকতার মধ্যে খুঁজতে হবে। ‘আমাদের প্রথমবয়সে ভারতমাতা, ভারতলক্ষ্মী প্রভৃতি শব্দগুলি বৃহদায়তন লাবভ করিয়া আমাদের কল্পনাকে আচ্ছন্ন করিয়াছিল। কিন্তু মাতা যে কোথায় প্রত্যক্ষ আছেন তাহা কখনো স্পষ্ট করিয়া ভাবি নাই, লক্ষ্মী দূরে থাকুন, তাঁহার পেচকটাকে পর্যন্ত কখনো চক্ষে দেখি নাই। ... আইডিয়া যত বড়োই হউক, তাহাকে উপলব্ধি কড়িতে গেলে একটা নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধ জায়গায় প্রথম হস্তক্ষেপ করিতে হইবে। তাহা ক্ষুদ্র হউক, দীন হউক, তাহাকে লঙ্ঘন করিলে চলিবে না। ... ভারতমাতা যে হিমালয়ের দুর্গম চূড়ার উপরে শিলাসনে বসিয়া কেবলই করুণ সুরে বীনা বাজাইতেছেন, এ কথা ধ্যান করা নেশামাত্র — কিন্তু, ভারতমাতা যে আমাদের পুকুরেই পঙ্কশেষ পানাপুকুরের ধারে ম্যালেরিয়াজীর্ণ প্লীহারোগীকে কোলে লইয়া তাহার পথ্যের জন্য আপন শূন্য ভাণ্ডারের দিকে হতাশ- দৃষ্টিতে চাহিয়া আছেন, ইহা দেখাই যথার্থ দেখা। (‘ছাত্রদের প্রতি সম্ভাষণ’, আত্মশক্তি )।
বস্তুতঃ এই যথার্থ দেখার পদ্ধতি ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে পেরিয়ে যে বাংলাদেশ সৃষ্টিকেও প্রভাবিত করেছিল তার প্রমাণ অনেক। সামসুর রহমানের ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’ কবিতা, কিম্বা অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রায় ঐ নামের উপন্যাসের কথা না তুলেও বলা যায়, মায়ের দুঃখ আর মাতৃভাষার দুঃখ যে এক হয়ে যেতে পারে, তার সুলুক প্রথম রবীন্দ্রনাথই দিয়েছিলেন, ‘কাহার সুধাময়ী বাণী মিলায় অনাদর মানি !/ কাহার ভাষা হায় ভুলিতে সবে চায় ।/ সে যে আমার জননী রে ।।’, এই
কথাগুলির মাধ্যমে।
এই আগ্রাসী মাতৃরূপা প্রকৃতিও কিন্তু কখনও কখনও বিশ্বজাগতিক মঞ্চ থেকে দেশিক, লোকসামাজিক, এমনকি ব্যক্তিগত
স্তরেও নেমে আসে, পুরুষকে দমিত, বিভ্রান্ত, ভীত করে’ নারীর বাৎসল্য, মাতার পুত্রপ্রেমের রূপে। চৈতালি-র ‘বঙ্গমাতা’ কবিতাটি সবার প্রায় জানা, যেখানে বঙ্গমাতা অনুরুদ্ধা হচ্ছেন তাঁর দেশিক সন্তানকে ‘পুণ্যে পাপে দুঃখে সুখে পতনে উত্থানে
মানুষ হইতে’ দিতে। ‘স্নেহার্ত বঙ্গভূমি’-কে কবি অনুনয় করছেন ‘তোমার সন্তানে ... তব গৃহক্রোড়ে/ চিরশিশু করে আর রাখিয়ো না ধরে’। কিন্তু তার ঠিক আগের ‘স্নেহগ্রাস’ কবিতাটিই হিংস্রী মার প্রতি রবীন্দ্রনাথের তীক্ষ্ণ তিরস্কারের জন্যই বোধহয় মাতৃশাসিত বাঙালির এত মনে ধরেনি। সেখানে কবির ভাষা এইরকমই দন্তুর—

অন্ধ মোহবন্ধ তব দাও মুক্ত করি—
রেখো না বসায়ে দ্বারে জাগ্রত প্রহরী
হে জননী, আপনার স্নেহ-কারাগারে
সন্তানেরে চিরজন্ম বন্দী রাখিবারে।
বেষ্টন করিয়া তারে আগ্রহ-পরশে,
জীর্ণ করি দিয়া তারে লালনের রসে,
মনুষ্যত্ব-স্বাধীনতা করিয়া শোষণ
আপন ক্ষুধিত চিত্ত করিবে পোষণ?
দীর্ঘ গর্ভবাস হতে জন্ম দিলে যার
স্নেহগর্ভে গ্রাসিয়া কি রাখিবে আবার?
চলিবে সে এ সংসারে তব পিছু-পিছু?
সে কি শুধু অংশ তব, আর নহে কিছু?
নিজের সে, বিশ্বের সে, বিশ্বদেবতার—
সন্তান নহে, গো মাতঃ, সম্পত্তি তোমার।

এই প্রাক্-ঈডিপীয় মার সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের এই বিতৃষ্ণা, ভীতি বেশ বিস্ময়কর! তিনি নিজে এক উদাসীন, নির্লিপ্ত, মার কাছে
মানুষ, যাঁর ক্ষেত্রে এমন স্নেহগ্রাস অকল্পনীয় ছিল। তাহলে তিনি কি এই আগ্রাসী মাতৃত্ব তাঁর বৌঠানের মধ্যে দেখেছিলেন? জানা যায় না! কিন্তু তবু ‘ভয়ের দুরাশা’, ‘অজ্ঞাত বিশ্ব’ নামের পূর্বোল্লিখিত কবিতাগুলির লেখকের পক্ষে কি না জানা সম্ভব ছিল যে এই সর্বগ্রাসী মাতৃনারীর নিয়ন্ত্রণে বশীভূত হওয়া যেমন সহজ, তেমনই সহজ তার থেকে ভীত হওয়া? এই শাশ্বত নারীর প্রতি ‘ambivalence’ বা ঘৃণা-প্রেমের দ্বান্দ্বিক ঐক্যের ঐতিহ্য কিভাবে হিন্দু ধর্ম ও অতিকথার পটচিত্র থেকে নেমে এসে মা ও ছেলেকে একই ভয়ের অংশীদার করে’ তোলে, কিভাবে বাইরের পৃথিবীর থেকে স্বাধীন অংশগ্রহণের ডাক এক, আশিস নন্দীর ভাষায় ‘castrating, phallic’ স্ত্রীলোকের রূপ ধরে’ মা-ছেলের ভঙ্গুর আবেগী ভারসাম্যকে, তাদের আলাদা জগৎকে তছনছ করে’ রবীন্দ্রনাথের তা ভালোই জানা ছিল। ‘জন্মকথার যে তরুণী মা ছেলের সম্পর্কে তাকে বলে ‘‘হারাই হারাই ভয়ে গো তাই/ বুকে চেপে রাখতে যে চাই,/ কেঁদে মরি একটু সরে দাঁড়ালে’, কিম্বা ‘ জানি না কোন্‌ মায়ার ফাঁদে/ বিশ্বের ধন রাখব বেঁধে’, সে যখন প্রৌঢ়ত্বে এসে সফল হয় সেই মহাপ্রবল ‘ক্ষীণ বাহুদুটির আড়ালে’ ছেলেকে বেঁধে রাখতে, তখিন তাতে কি মহা অনর্থ উপস্থিত হয় তার কথাও রবীন্দ্রনাথ লিখে গেছেন চোখের বালি উপন্যাসে ‘castrating, phallic’ বিনোদিনীর আগ্রাসনের আগে মহেন্দ্রর অবস্থার বর্ণনে, যার: ‘কাঙারু শাবকের মতো মাতৃগর্ভ হইতে ভূমিষ্ঠ হইয়াও মাতার বহির্গর্ভের থলিটির মধ্যে আবৃত থাকাই অভ্যাস হইয়া গিয়াছিল’। তার গ্রস্ত হওয়ার ভয়, স্বাধীন হওয়ার উদ্বেগ, এবং সেই ব্যাপারে মার সমস্যাই তো চোখের বালি-র মূল কথা। তাই না? কোনো ‘castrating, phallic’ স্ত্রীলোকের সাহায্যে পুত্রবধূকে প্রেমিকা রমণী হতে বাধা দিতে মায়ের চেষ্টা সম্পর্কে বিনোদিনী যখন বলে ‘আমাদের জাতের ধর্ম এইরূপ, আমরা মায়াবিনী’, তখন বুঝি মা আর পুত্রসন্তানের সম্পর্কের সমস্যা সাহিত্যে ডি.এইচ. লরেন্স ছাড়া কেউ যদি সব চেয়ে ভালো বুঝে থাকেন তবে সেটা রবীন্দ্রনাথ! বুঝেছিলেন কেননা বাঙালি রোজ বোঝে! এর স্নিগ্ধ, ভয়াল, আগ্রাসী, পরস্পরবিরোধী রূপগুলি কেবল Sara Ruddick-এর ‘maternal thinking’-এর পরিসরে ধরা পড়বে না। একে ধরার জন্যে, রবীন্দ্রনাথ, বাধাই হো!