মা ডাকছে

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

গলির মুখে দাঁড়িয়ে। হাফভলি পড়েছিল। বলটা ফাইন লেগের কাছে নরেন মিত্তির লেনের গলিতে পড়ল। কাছাকাছি আমিই। অতএব ...
এমনিতে যাই না। জায়গাটা ভালো না। আমের আঁটি। ভুসি। রকেট, মিসাইলের ছেঁড়া ভেজা দেহাংশ। জাপানী বোমার টুকরো। নীচু কার্নিশে মাথা ছুঁয়ে যায়। এঁদো গলির এঁদো বেড়াল। মিনি। ঘাড় আর লেজের কাছে দুটো প্রমান সাইজের ক্ষত। পরানের শালী ওকে ‘কলি’ ব’লে ডাকে। খেতে দেয়। গলায় মায়া। বাচ্চাগুলোকে খুঁজছে। বাচ্চা। একদিন বড় হয়। গলির একপাশে জটাবুড়ি। লোকে বলে কানাইয়ের মা, বড়টা নিমাই, ওর নামে কেন ডাকে না কে জানে। চার অক্ষর। পাঁচ অক্ষর। আদিরস। বলটা কোথায়? পালাব। তবু বাঁচোয়া আমায় কিছু বলেনি। বেড়ালটাকে। কানাই ব্ল্যাক করে। লস্কর বাড়ির শীলাকে নিয়ে পালাল। শীলার যৌবন। ওভারিতে ধরা পড়ল। টাকা দরকার। অনেক। বাড়ছিল। কানাই সারাতে পারেনি। ওদের বাড়িতেও দরজা বন্ধ। খুব ভোরের দিকে একদিন। লাথি। বচ্চন সায়েবের ‘কুলি’, আম্বুলেন্স। শীলা মরেনি। এখনও জটাবুড়ির উকুন বাছতে আসে হপ্তায় হপ্তায়। কে এক বড়লোকের বাবু কিনে নিল ওকে। কানাই কোথায় পালিয়েছে। সব শোনা কথা। শীলার আর মা হওয়া হয়নি। তবে অন্যের ছেলেকে দেখে। রাঁধে। লোকের বাড়ি। রান্না। রন্ধনপ্রনালী। মশলা। চোখে জল। হরির মাকে দেখছি ঈশান কোণের বাড়িটায় ঢুকল। চওড়া উঠোন। নকশিকাঁটা রেলিং। ভেনেশিয়ান জানলা। চালচিত্র। জানলায় মুখ বাড়ায়। বেশ দেখতে। অতসী বৌদি। হরির মা হিংসে করে। একদিন বাচ্চাটাকে খুব মারল। বৌদি, ওরম মেরোনা। বলতেই বৌদি তাকাল। চোখে জল। বুকে ছ্যাঁক ক’রে ওঠে। হরির মা সরে আসে। কেন যে এসব ভাবছি? আমার সঙ্গে কি কথা হয়েছে হরির মা’র? আমি কি দেখেছি ছোট্ট পিকলুকে কিরকম মা শঙ্খচিলের মতো আকাশ পেতে কোলে রাখে অতসীমামী। খেলতে খেলতে পড়ে যায়, গলগল ক’রে রক্ত, সারারাত বসে থাকে ছেলের গায়ের ওম নিয়ে। দেখেছি? কোনোমতে পেঁয়াজ লঙ্কা দিয়ে একমুঠো ভাত। ভাত। অন্ন। মা। ‘আমি ভীষণ ভালোবাসতাম আমার মাকে। কখনো মুখ ফুটে বলিনি’। কেন বলিসনি পিকলু? এত কাজ, মা পারে সবকিছু বুঝে নিতে? ঝাপসা লাগছে। বলটা যে কোথায় গেল। একদিকে উঁচু হয়ে আছে কিছু একটা। ছাই ছাই। দেখতে গেলাম। ‘কলি’র মেজ বাচ্চাটা। দাঁতগুলো বাইরে বেরিয়ে আছে। চোখ খোলা। গন্ধ তো নেই! এক্ষুনি গেছে হয়তো। সরে এলাম। পাশেই লাগোয়া ঘোষাল বাড়ি। পুরুষেরা সঙ্গীতচর্চা করে। পিতামহ নামী কালোয়াতি গায়ক। নারীরা হেঁশেলে। মুখ বুজে। অতনুদার বৌটা মিথ ভাংতে গেছিল। পারেনি। বাচ্চা হল। মেয়ে। নিজে খেল। বিষ। মরল না। মেয়েটাকেও। সেও মরল না। মিষ্টি চার বছরে পড়ল। ঠাম্মির কাছে লক্ষীর পাঁচালী শিখছে। এই বয়সেই। মা’র কথা মনে নেই। দুলে দুলে পড়ে। ‘কখনো আমার মা’কে কোনো গান গাইতে শুনিনি’। মিষ্টির মা এখন গোবরার কাছে কোন একটা হোমে আছে। একদিন গেছিলাম অতনুদার সঙ্গে। কেউ হাসছে, আঙ্গুল গুনছে। কেউ চুপ। চোখ পড়েছিল দৃশ্যটা। বৌদি ঠোঁট নাড়ছে। ঠোঁট। প্রকাশদা চুমু খেত। তেরঙ্গায়। ওর বাবা ৭০-এ ছিল। বিয়ে করল। বলল, দুটো ছেলে। বলল, ওদের বলব দেশকে ভালবাসতে। নিজে ফ্ল্যাগ নিয়ে মাঠে যেত। মুখে রঙ। টিউশনি। দল করত না। ছেলেগুলোকে স্কুলে দিতে গেছিল। তোলা তোলার দল। গাড়ির রেষারেষি। একটা বাচ্চা রেলিং-এর ম্যাটেরিয়াল হয়ে গেল। অন্যটা গাড়িতে। প্রকাশদা মাথায় লাগে। আর কিছু হয়নি। চাকরি দিতে গেল। নিল না। ক্ষতিপূরণ। বিষমদ। প্রকাশদা খেতে শুরু করল। ‘কোনদিন দেখবি, মরে যাচ্ছি’- বলেছিল। বছরখানেক ধরে আর ফিরছিল না রেগুলার। নর্থে গেল। চা বাগান। দল করল। একদিন এনকাউণ্টার। খবরে বলল দেশবিরোধী। লাশ। দেশ। পতাকা। মা। প্রকাশদার বউ ডাকছে। কী যেন বলছে ... সরে আসি। বলটা দেখা যাচ্ছে। মিলিদের বারান্দায়। একতলায়। মিলি হাসছে। দিচ্ছে না। ওর দাদা ডিপ্রেশন না কি যেন বলে, ওটায় মরে গেছে গেল বছর। ওর বাবা মা’কে মারত। মা-টা প্যারালাইজড। নামী কোম্পানির ওষুধ আসে। বাবা সভা বসান ঘোরে। নাচগান। সংস্কৃতি। ‘আমাদের মা-কে আমরা বলতাম তুমি, বাবাকে আপনি’। ওপাশ থেকে ডাক পড়েছে। ‘বল পেলি না?’ - ‘না’। - ‘বাদ দে, অল্টারনেট আছে। চালিয়ে যাব’। - ‘তোরা যা’। - ‘তুই খেলবি না?’ - ‘না। - ‘কেন?’ – ‘মা ডাকছে’। মিলি একা। মিলিকে পড়াতাম। জটাবুড়ির বড় ছেলে নিমাই জন্মের এক মাস পরেই মরে যায়। যাক, তবু তো প্রথম। তবু তো বড়। কেন নিমাইয়ের মা নয়? কেন শুধু কানাইয়ের মা? বেড়ালটার বড় আর ছোটটা একসাথে মরল। ওপাড়ায়। প্লাস্টিক ক’রে ফেলে দেওয়া হল। ‘কলি’ জানে না। এখনও খুঁজছে ওদের। মিলিকে পড়াতাম। একদিন ঝড়। বৃষ্টি। বাবা ঘরে নেই। মা ঘুমিয়ে। নাকি কোমায়। কে জানে। আদর। অতনুদার সামনে সেদিন মিষ্টির মা বসেছিল। ঠোঁটে গান। মিষ্টির মা গান গাইছিল। অতনুদা শুনছিল। গানের কথা অদ্দুর থেকে বুঝিনি। মিলি এরপর একদিন ভয় পেয়ে গেল। বলল, ওটা বন্ধ হয়ে গেছে। প্রকাশদার বউ খেতে ডাকছে। বাচ্চাগুলোকে। বাচ্চাগুলো আসছে না। আমি বলেছিলাম - ‘নষ্ট করব না দেখিস’। মিলি একা। মিলি ‘মা’। আমি মিলির কাছে যাই। ‘মা ডাকছে’।