আমার ভাষার মতোই অবিকল সেই গন্ধ

বিশ্বদীপ দে

খুব ভোরে, গাছের পাতার গায়ে কারও কান্না লেগে থাকে।
প্রথম রোদ্দুরের শরীরে পবিত্র সেই অশ্রুর প্রতিফলনে রামধনু ফোটে না। কেবল আকাশ লাল, ঠান্ডা হাওয়ার শিরশিরে একটা ঝাপট। শহরের ফ্লাইওভারের নীচে ঘুমভাঙা ভবঘুরে লোকটা পিচুটি মাখা চোখে সেই আকাশ দেখে। মফস্‌সলের আনমনা কিশোরের ঘুম ভেঙে যায় হাওয়ার ফিসফিস শব্দে। গ্রামের নরম মাটির রাস্তায় সাইকেল নিয়ে যেতে যেতে এক প্রৌঢ় হঠাৎ সাইকেল থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। আকাশের গায়ে সজল মেঘের আনাগোনা দেখে থেমে যাওয়ার মানুষ তিনি নন। তবু আজ, ঠিক এই মুহূর্তে ক্ষণিকের জন্যে একটা আশ্চর্য আলো মেঘ ভেঙে বেরিয়ে এসে তাকে দাঁড় করিয়ে দিল আচমকাই।
আমার পৃথিবীতে সেই আলো রোজ আসে। প্রতিটা ভোরে...

সেই আলো যে কোনও দিনই আসতে পারে। ধরা যাক, কুয়াশার ভেতর দিয়ে ছুটে যাওয়া ট্রেন, সেই ট্রেনের ভিতর কোনও অচেনা অসহায় ভিখারিনী... তার মুখের ভাঙাচোরা রেখা, ঝুঁকে যাওয়া শরীরের ভেতর থেকে কেমন করে এক মমত্ব এসে পাক খেয়ে যায়। সেই করুণ মুখ, সেই নরম চেয়ে থাকা কেমন আনমনা করে দেয় ভেতরটা। আমার শরীরের ভেতর কেউ নরম আঁচড়ে সেই আলো বের করে আনে।
কিংবা অনেক রাত। হেমন্তকাল। আচমকা কারেন্ট অফ হয়ে গেছে। কোনও পরিকল্পনা ছিল না ছাদে যাওয়ার। তবু চলে এসেছি। আশপাশের যে সব জোরালো আলো আকাশটাকে রোজ শুষে নেয় নিজের মধ্যে, তারা এখন নেই। আর নেই বলে তারারা ফিরে পেয়েছে হারিয়ে যাওয়া রাজ্যপাট। আকাশ জুড়ে বিন্দু বিন্দু আলো। এফ এম চ্যানেলের গান ভেসে আসে... ‘সব তারা জ্বলে ওঠে তোমারই কথায়’...।
দূর কোন থমথমে নিঃসীম শূন্যতার দেশে আলোর আড়ালে এক অন্ধকার জেগে থাকে। হ্যাঁ, অন্ধকার... যে অন্ধকার থেকে একদিন ‘অনুভবের ঘরে সারি-সারি নুনমশলার পাত্র’ জন্ম নিতে দেখেছিলাম। কবি তো দ্রষ্টা। তিনি আমার জীবনের মধ্যেও তাঁর পঙ্‌ক্তিগুলি সাজিয়ে রেখে গেছেন। রুমাল বাঁধা চোখে এক তীব্র জাদুকরের মতো তিনি আমার হাতে তুলে দিলেন তাঁর কবিতা। যতবার তাকাই সেদিকে, ঠোঁট নড়ে ওঠে। ‘আমাকে তুই আনলি কেন, ফিরিয়ে নে।’
বইটা আমার কাছে নেই। কে যেন পড়তে নিয়ে ফেরত দেয়নি। কোনওদিন দেবেও না হয়তো। তবু সেই বইয়ের হলদে মলাটের কথা কোনওদিন ভুলব না। আর যতবার মনে পড়বে ততবার ‘আমাকে তুই আনলি কেন’ কানের কাছে বলে উঠবে ঠোঁট।
অন্ধকার থেকে এসেছি আমরা। অন্ধকারেই ফিরে যাব। কিন্তু দেরি আছে। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে ভেসে আসে ট্রিগার টেপার শব্দ। হয়তো কাল, কিংবা তিরিশ-চল্লিশ বছর পরে অশক্ত শরীরে তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে শুনতে পাব কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাঁর ঈষৎ নেশার দুলুনি সমেত স্পষ্ট উচ্চারণ করছেন ওই কবিতাটা।
আসলে কোনও পঙ্‌ক্তি নয়, অস্ফুট উচ্চারণে আমার এপিটাফ বলে যাব আমি। মাত্র একটা শব্দে।
মা।

এতক্ষণে পৌঁছোতে পেরেছি ওই শব্দটায়। যেখানে পৌঁছোব বলে এতগুলো কথার মধ্যে দিয়ে এলাম। এতগুলো দৃশ্য, এতগুলো আলো-অন্ধকার-ঋতু-ভোর-সন ধে ইত্যাদি পেরিয়ে আসা। কেননা ঠিক কী লিখব তা তো আমি জানি না। আর জানি না বলেই, প্রতিটা শব্দের ঢাকনা খুলে দেখে নিচ্ছি।
কোনও একটা দৃষ্টি, কোনও কবিতার লাইন অথবা দূর থেকে ভেসে আসা কোনও নরম সুর। কিংবা সুরও নয়, কেবল নির্জন গলির মুখে আচমকা বেজে ওঠা সন্ধের গৃহস্থ শাঁখ... অচেনা হাওয়ায় কাদের বারান্দায় ভেজা শাড়ি উড়তে থাকে এলোমেলো। আটপৌড়ে শাড়ি সব। নো ম্যানস ল্যান্ডের মতো সেই গলির ভেতর ক্রমশ ভোর নেমে আসে।
একটা ফোন বাজছে। কিন্তু কেউ ধরছে না। অথচ খুব দরকারি ফোন। একটা মৃত্যু সংবাদ আছে ওই ফোনের তারে। ক্রেডল বেয়ে যে এসে নামবে ঘরের ভেতর। সেই ফোনের সঙ্গে এই গলির, এই সন্ধের কোনও সম্পর্ক নেই। কেবল আমি আছি বলে সবটা জুড়ে জুড়ে যায়। মিলেমিশে যায়।
প্রতিটা দিনের ভেতর এভাবেই মায়ের মৃত্যুদিন মিশে যায়। কখনও বুঝতে পারি। খুঁজে পাই তাকে। কখনও আনমনে হেঁটে চলে যাই দিগন্তের দিকে।
দিগন্ত আসলে একটা কানা গলি। গলি নয় দেওয়াল। দেওয়ালে ব্লো আপ একটা ছবি। আমার মুসাফির হেঁটে চলা থমকে দাঁড়ায় তোমার সামনে এসে, মা।

নাহ্‌। নিছক মৃত্যু দিয়ে এতটা জীবনকে মাপতে যাওয়ার কোনও মানে নেই। সেই দিন আসলে একটা শুরুর শেষ। কিংবা শেষের শুরু। কিংবা কিছুই নয়। কেবল একটা সংখ্যা। বর্ষাকালের একটা ভোরের গায়ে আসলে জলছাপের মতো সব কিছু লেখা হয়ে আছে। একটা পাসওয়ার্ডের মতো সেটার দিকে পাশ ফিরলেই সে আমাকে পৌঁছে দেয় আমার গন্তব্যে।
অবন ঠাকুরের ‘ভূত পতরীর দেশে’ আমি ছোটবেলাতে গিয়েছিলাম। আজও ফিরতে পারিনি। বন্ধুরা একে একে নিভে আসছে জীবন থেকে। কী এক অজ্ঞাত নিষ্ঠুরতা টের পাচ্ছি রাতদিন। অপমান আর হেরে যাওয়া ইত্যাদি ‘ব্যক্তিগত’ যা কিছু নিয়ে রাত বাড়লে বইয়ের পাতার দিকে তাকাই। কখনও হয়তো গান। সুরের পেলবতা। বেশির ভাগ সময় বই। যা কিছু। যেটা ইচ্ছে। আনমনে অক্ষরের ওপর দিয়ে চোখ চলে। সেভাবেই ‘ভূত পতরীর দেশে’।
‘...অমনি আমার মাকে মনে পড়ে গেছে, আমি খড়ি ফেলে একেবারে পাঠশালা থেকে দৌড়! এক দৌড়ে ষষ্ঠীতলায় হাজির। সেখান থেকে দেখছি---গঙ্গার ওপারে তুলসীগাছের পাতা ঝুর-ঝুর করছে, তারই তলায় মা আমার দুগ্‌গো পিদিম জ্বালছেন!’
কল্পলোকের সুদূর দেশ থেকে ছিটকে এসে এক দৌড়ে পৌঁছে যাচ্ছে সেই বালক, তার মায়ের কাছে। মায়ে জড়িয়ে ধরে গন্ধ নিচ্ছে মায়ের গায়ের। আমারও গল্পের বালকের মতো আচমকা মা-কে মনে পড়ে যায়।
কতদিন আগের লেখা... কোন যুগের একটা গল্প। আমার মায়েরও জন্ম হয়নি তখনো। মায়ের মা? তিনিও কি জন্মেছেন তখন? মনে হয় না। তবু সেই লেখার গায়ে আজও কেমন করে ম্যাজিকের মতো এতটা মায়া লেগে আছে আমার জন্য !
কবেকার এক ছেলে ভুলোনো নরম গল্প। আমি তাকে ছাড়তে পারি না। অনেক রাত অবধি সেই গল্পই শুনি অবন ঠাকুরের কাছে। আসলে তো ভাষা। তার ভেতর মাঝরাতের আনমনা হাওয়ার মতো সজল এক অনুভূতি ঘাপটি মেরে পড়ে আছে।
আমার বাংলা ভাষা। তার কাছে আমার এতকিছু বাঁধা পড়ে ছিল?
ভোরের শিশির আসলে আমাদের স্বপ্নের ভেতরের কান্না। ভোর না হতেই আমার মা চলে গেছিল। এখন গভীর রাতেও মা আমাকে ছেড়ে কোথাও যায়নি।
বইটাকে বুকে জড়াই বা না জড়াই, মায়ের গন্ধটা ঠিক পাই আমি। আমার ভাষার মতোই অবিকল সেই গন্ধ...