তোর বুঝি মা নেই রে

সরোজ দরবার

ফ্যানরঙা ঘোলাটে জোছনার রাতে একাকী বিড়ালছানা কি মেঘের আড়ালে দেখেছিল চাঁদের মুখ? মাঝরাতে তার বিষণ্ন কান্না শুনে চমকে উঠি আমি। প্রৌঢ়া কে একজন, পাশের বাড়ির বোধহয়, ঘুমজড়ানো গলায় বলে উঠলেন, দূর দূর, দূর হ’ অনামুখো। উনি তো জানেন না, এই অবসন্ন জোৎস্নায় ছানাটি তার মায়ের কথা মনে পড়েছে কি না! বিড়ালছানাটিও তো জানে না, কতদিন ওই প্রৌঢ়া দেখেনি তার বিদেশে চলে যাওয়া ব্রাইট খোকার মুখ। কারও ভাষা কেউ জানে না। জানলে নিশ্চিতই এ রাত বাস্তব থেকে দূরত্ব রেখে শিল্পসম্মত হয়ে উঠতে পারত।
অবশ্য হবেই বা কী করে! গোড়াতেই যে গণ্ডগোল। চাঁদের মুখ দেখে বিড়ালছানার মায়ের মুখ কী করে মনে পড়বে? বিড়াল তো বাংলাভাষা জানে না। বিড়াল তো জানে না, সুধীরলাল চক্রবর্তীর কন্ঠে সেই ঝুঁঝকো আঁধার নামা মফসসলি সন্ধের অনুরোধের আসরে কতখানি দরদ ঝরে পড়ত। বিড়াল তো দেখেনি, কুটনো কুটতে বসা মায়ের কপালে জমে ওঠা দু’বিন্দু ঘাম, হ্যারিকেনের লালচে হলুদ আলোর আভা পড়ে যেন সোনা ধোয়া জল, আত অদূরে, দাওয়ার নীচে ছায়ার ওপারে আদুরে বিড়ালের মতো অপেক্ষা করে আছে জ্যোৎস্না। এই কুটনো কাটা শেষ হলে বেড়ে ওঠা রাতের প্রশ্রয় পেলেই সে উঠে আসবে মায়ের কোলে পিঠে। বিড়াল তো সত্যিই এসব জানে না। ঘোলাটে জ্যোৎস্নায় তার তাই মা’কে মনে পড়তেই পারে, তবে আমার ভাবনার সঙ্গে তার ভাবনা না মেলারই কথা। ওই বিড়ালছানাটা, ঠিক কী ভেবে এই মাঝরাতে কুঁকিয়ে কেঁদে উঠেছে, তা কি আমি জানি? আমি তো জানি না ওর জগৎ, ওর ভাষা। মিথ্যে আন্দাজ করতে পারি শুধু।
ওর হয়ত মনে পড়ছে ওর সেই মরে যাওয়া দাদাটার কথা। মায়ের জন্যই মরেছিল দাদাটা। ওরা তখন অনেক ছোট। একটা ঝোপের আড়ালে ওদের রেখে বেরিয়ে যেত মা। ফেরার সময় মায়ের ডাক শুনে ওরা পুচকেদুটো কচি কচি পায়ে বেরিয়ে আসত। একদিন ওরকমই ডাক শুনে বেরিয়ে এসেছিল ওর দাদা। আরা তার মাথায় বাড়ি মেরেছিল মানুষের বাচ্চা। চিৎ হয়ে ছিটকে দাদাকে পড়ে যেতে দেখে ও আর বেরোয়নি। শুধু সেই ঝোপের ভিতর থেকে দেখেছিল ছোট মানুষের চোখে রি রি করছে হিংসা। ওদের মা বলেছিল, মানুষ তাদেরকে ভালোবাসে। বলেছিল, এমন মানুষ আছে, যে নাকি ডেকে নিয়মিত খাবার দেয়। দাদাকে চোখের সামনে মরতে দেখেও, ভয়ে বেরোতে না পারার সেই যন্ত্রণাদীর্ণ মুহূর্তে ও বুঝেছিল পৃথিবী ঠিক কী। মায়ের উপর বিশ্বাস রেখে সন্তানের মৃত্যু দেখে সেই বিড়াল মা কি সমগ্র মানুষজাতির উপর প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার শিক্ষা দিয়েছিল তার আর এক সন্তানকে? বোধহয় না। কেননা এ ভাবনা তো আমার। আমিও তো ওই মানুষের বাচ্চা, যার অতীত মহাকাব্যের গোড়ায় কুমারী মা ভাসিয়ে দেয় তার সন্তানকে, যার বর্তমান সমাজে মা’ও অর্থ আর প্রতিপত্তির জেরে সন্তানের হন্তারকও হয়ে উঠতে পারে। আমি কী করে বুঝব ওই বিড়ালমায়ের কথা!
আসলে মাঝে মধ্যে মনে হয়, কোনও মায়ের কথাই আমরা বুঝি না। ধরা যাক সেই উটমাতার কথা, যার অব্যক্ত যন্ত্রণার কথা বলেছেন কবি। বেদুইন সেই উটমাতার চারটের মধ্যে দুটো বাঁটে কালো রঙ করে দিয়েছে। উটশিশু জানে তার দুটোই বাঁট। কিন্তু উটমাতা তো জানে, তার শিশু প্রতারিত হচ্ছে। তাই, ‘ যখন বেদুইন থাকে না,/ তখন উটমাতা প্রাণপণে উটশিশুকে বোঝাতে চেষ্টা করে যে তার কালো/ বাঁটদুটিতেও অনেক দুধ-মুখ লাগিয়ে খেতে পারিস, বাছা! কিন্তু উটমাতার সেই/ বোবা, দুঃখী ভাষা বুঝতে পারে না উটশিশু।’ কবি জানেন ‘উটেরা এ কারণে খুব বিষণ্ন হয়, এবং ওদের কোনো জলতেষ্টা পায় না।’ কবি, অলৌকিকের দ্রষ্টা, টের পান উটমাতার এ বেদনা। সে বেদনার, মনে হয় মাঝে মাঝে, আরও তো রূপ থাকতে পারে। উটমাতার ভাষা তো একদিন না একদিন তার শিশুটি আয়ত্ত করে ফেলত, তাহলেই কি উটমাতার এই যন্ত্রণার অবসান হত? হত না, কেননা বৈষ্যম আজও বাস্তবিক। ফলত ওই উটমাতার চোখে বোঝাতে না পারার বেদনা ছাপিয়ে হয়ত বোঝাতে না চাওয়ার যন্ত্রণাও আছে। যেদিন শিশু ওই দুটো বাঁটের কথা জানবে, সেদিনই অধিকার বোধে সে দখল নিতে চাইবে। সেদিন বেদুইনের সঙ্গে সংঘাত অনিবার্য হত। বলের জোরে বেদুইন শিশুটিকে মেরে ফেলতে পারত, বেচে দিতে পারত। ক্ষতি হত শিশুটিরই। মা হয়ে কি সে কাজ করতে পারে উটমাতা। তাই বোবা চোখে দেখত তার শিশুর প্রতিদিন প্রতারিত হওয়া। আর হয়ত ভাবত, শিশু নিজে যখন মা হবে, তার দুটো বাঁট কালো রঙ করে যখন দখল নেবে অন্য কোনও বেদুইন, সেদিন বাস্তবিক না হোক, অলক্ষেই মিলন হবে মায়ে-পোয়ে। মা তো সহনশীলা, কত কী যে সয়ে যেতে হয়, কে জানে!
কে জানে, নির্জন দুপুরে দলবৃত্তের বাইরে থাকা যে কাকছানা ডাকতে ডাকতে এসে বসল কার্নিশে, সে তার মাকেই খুঁজছিল কি না! হয়ত তার মা সকালে বেরিয়ে গিয়েছে। এখনও ফেরেনি। আমি ভাবি, কী আশ্চর্য সেই কাকমাতার ক্ষমতা, যিনি ফিরে এসে ঠিক চিনতে পারবেন তাঁর সন্তানকে। যে কোন পক্ষীমাতারই এই ক্ষমতা আছে। আমাদের চোখে তো সকলই সমান, দুটো টিয়া বা তিনটে শালিখের প্রভেদ আমরা টের পাই না, কিন্তু পাখী মা নিশ্চয়ই খুঁজে নিতে পারেন কোনটা তাঁর সন্তান। আবার নাও তো খুঁজে পেতে পারেন। হইহই স্কুলছুটির বেলায় এক ইউনিফর্মে বাচ্চাদের ঢেউ যখন গেট ছাপিয়ে বাইরে আসে, তখন কোনও মা যেমন কয়েক পলের জন্য থমকে যান, খুঁজে পান না নিজের সন্তানটিকে। সকলকেই তাঁর যেন একইরকম লাগে। এরকম কি হয় কাকামাতার ক্ষেত্রেও? যে কাকের ছানা উড়ে এল, তার মা তাকে কীভাবে খুঁজে পাবে? হয়ত কোনওদিন আর পাবেই না। হয়ত অন্য কাউকেই তার সন্তানের মতো ভেবে বাকি দিন কাটিয়ে দেবে। আর এই দলছুট কাক কী করে তার মা’য়ের অভাব পূরণ করবে? তা তো পূরণ হওয়ার নয়। তবু প্রতিদিন মাকে ডাকতে ডাকতে কার্নিশে বসে থাকতে থাকতে একদিন হয়ত কার্নিশের ওই ছোট্ট জায়গাটিকেই তার মনে হবে মায়ের মতো।

জগজিৎ সিংজি এক টিভি অনুষ্ঠানে একবার একটি লোকসঙ্গীত গেয়েছিলেন। সে গানে ছিল এক না হতে পারা মায়ের বেদনা। এক নারী, যিনি মা হতে পারেননি, তিনি একটি মাটির মূর্তি তৈরি করে তাকেই নিজের সন্তান হিসেবে দেখছেন। এই নারীর যন্ত্রণা ছিল সে গানের সুরে, যে সুর গিয়ে মিশেছিল, হোঁটোসে ছুঁলো তুম-এর সুরে। কী জানি যন্ত্রণা শুধু সেই সুরে ছিল নাকি জগজিৎজির অমন কণ্ঠে, আমি শুধু দেখি সেই ধূ ধূ শূন্যতার ভিতর মা আমারও হাত ছেড়ে চলে গিয়েছে। ওই নারী যেমন মূর্তিকেই সন্তান হিসেবে দেখছেন, তেমনই যে সন্তান মা হারিয়েছে, সে বিরাট এ পৃথিবীতে শুধু খুঁজতে থাকে একটা আশ্রয়, একটা অবলম্বন। এই যে প্রতিদিন লেখার কাছে যাওয়া, কখনও লেখা হয়ে ওঠার আনন্দ, না হয়ে ওঠার হতাশা-এই আসা যাওয়ায় থাকতে থাকতে, সমস্ত ব্যক্তিগত ছাপিয়ে, সমস্ত বন্ধু বন্ধু হাওয়া পেরিয়ে, লেখাকেই এক একদিন মনে হত মায়ের মতো। দুপুরের গহিন অরণ্যে হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে কাকছানার যেমন কার্নিশ আশ্রয়। হারানোর ভয় তো সত্যিই কম নেই! মায়ের পরে, নিজের লেখার থেকে বড় আশ্রয় আর কোথায়! লেখা তাই মায়ের মতো সন্দেহ নেই, আর দেখি অবাক হয়ে, আমাদের কবিও সে কথাই যেন মনে করিয়ে দিয়ে বলছেন, ‘কবিতা আমাদের মাতৃভাষা’।
ভাষাই পরিচয়পত্র। সে পরিচয়ে মানুষের দুনিয়ায় কত না ভাগ। আবার মানুষের ভাষা বোঝে না পাখিরা, বিড়ালেরা। তবু মা শব্দ উচ্চারণে সব দূরত্ব কী করে যেন ঘুচে যায়। তাবৎ দুনিয়ায় সব মায়েরই ভাষা বুঝি এক। আমি দেখি, ঘুম ঘুম ঘোলাটে রাত্তির পারেনি, কিন্তু ফুটফুটে বসন্ত বিকেল চিনে নিয়েছে সেই মা-ভাষা। দেখি পাশের বাড়ির সেই প্রৌঢ়াকে, যিনি হয়ত রাত্তিরে বিড়ালের কান্না শুনে ছেলের অমঙ্গল ভেবে দূর দূর করেছিলেন, তিনিই কাছে টেনে নিয়েছেন একরত্তি বিড়ালছানাটিকে।আদরে গুটিশুটি হয়ে সে যেন খুঁজে পেয়েছে তার মাকেই। কি জানি এই মনভালো বিকেলে প্রবাসী ছেলের জন্য মহিলার খুব মনখারাপ হয়েছিল কি না! বিড়ালছানার গায়ে সন্তানস্নেহ বুলিয়ে দিতে দিতে তিনি শুধু বলতে থাকেন, তোর বুঝি মা নেই রে...উঁউঁউঁ

ঋণ-রনজিৎ দাশ