মা নামেই ডাকি

তুষ্টি ভট্টাচার্য

মা বললেই যে ছবিটা মনে ভেসে আসে, তা বোধহয় বাঙালিদের চোখে কমবেশি একইরকম। ঘোমটা দিয়ে তাঁতের শড়ি পরা, কপালে লাল টিপ, সিঁথিতে সিঁদুর, হাতে শাঁখা পলা নোওয়া- মুখে তার মৃদু হাসি, চোখে তার মায়ার দেশ। এমন মায়া ভরা মা আর কোন দেশে আছে নাকি! সেই মা নিজের মুখেরটা সন্তানকে খাওয়াবে, জ্বরজ্বালা হলে রাত জেগে জলপট্টি দেবে কপালে, কারেন্ট না থাকলে সারারাত হাতপাখা নেড়ে যাবে, সন্তান দূরে গেলে তার জন্য আকুল হয়ে প্রার্থনা করবে, জীবনে যত রকম ত্যাগ করা যেতে পারে সব কিছুই সেই মা হাসিমুখে করে যাবে।
হ্যাঁ, এখনও এমন মায়ের সংখ্যাই বেশি আমাদের সমাজে। হয়ত তার বেশভূষায় কিছুটা বদল এসেছে, এই যা। মায়ার খনি রয়ে গেছে এখনও মায়েদের মনে। সেই খনি খুঁড়লেই মাটি মাখা সোনা উঠে আসে, না-কাটা হীরে উঠে আসে। তাই তার ঔজ্জ্বল্যে আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে যায় না, আমরা যেন দেখেও দেখি না এই মায়েদের মুখটা ঠিক করে। মা তো অমনই হবে, এ আর বেশি কী! এর জন্য অতিরিক্ত প্রশংসা করা বা মুখ ফুটে কিছু বলা যেন এক বাতুলতা মাত্র!। মা রাত জাগবে, মা মনের মত রান্না করে দেবে, জামাকাপড়ের দেখভাল করবে, ওষুধ খাইয়ে দেবে, পড়া ধরে দেবে, পড়া মুখস্থ করিয়ে দেবে, পড়ার মাঝে ঘুম পেলে কফি করে দেবে মাঝরাতে, স্কুলে যাওয়ার জন্য ডেকে দেবে ভোরে, টিফিন করে দেবে, ব্যাগ গুছিয়ে দেবে, জুতো পালিশ করে দেবে... মাই তো দেবে। কী আশ্চর্য! এ আর নতুন কী কথা বললাম আমি! না না, মায়েদের কষ্ট হয় না, হতে নেই। মায়েদের অসুখ করে না কখনও। মায়েদের খিদেও পায় না, এমন কী!
আবার দেখ, বাবার হাজারটা বায়নাক্কা সামলাচ্ছে কেমন! হাজার হাজার অভিযোগ সহ্য করে যাচ্ছে, আবার বাবার কোন সমস্যা শুনলে সেই মা যেন বাবারও মা হয়ে যাচ্ছে অবলীলায়! তবুও মায়েদের কোন প্রতিভা নেই, বুঝেছ? প্রতিভা-টতিভা মায়েদের থাকলে সংসারে খুব সমস্যা। আরও একটা ‘অভিমান’ সিনেমা আর তৈরি হবে না এর জন্য। প্রতিভা যদিও থাকে সেসব গুলে খেয়ে নেয় প্রায় প্রত্যেকটি মা। প্রতিভাকে চোখের জলে গুলে মুছে ফেলে। আর তাতেও যদি প্রতিভাকে মোছা না যায়, অবাঞ্ছিত এক ফোঁড়ার মত ফুঁড়ে ওঠে, তাহলে আর কী! সেই মায়ের সংসার গোল্লায় যায়! তখন তার নিজস্বতা, তার প্রতিভার সাক্ষর থাকে যেখানে, সেখানে তার নিজের মনন আর কর্তব্যের যে অন্তর্ঘাত, যা পেরোতে গিয়ে তাকে কতগুলো হার্ডল টপকাতে হয়েছে, সেই ইতিহাস লেখা থাকে না। এই ইতিহাস প্রতিটি সফল মা যেমন জানে, তেমনই মাতৃত্বের বাইরেও যাদের আলাদা পরিচয় আছে, তারাও জানে।
আধুনিক মায়েদের সাজগোজ বেড়েছে বলে কি তাদের ‘মা’ ‘মা’ ভাবটা একটু কমে যাচ্ছে? এই যে দেখ, যে মা’টি কেমন জিন্স আর টপ পরে বুকের সামনে ক্যাঙারুর মত একটা থলে আটকিয়ে বাচ্চা নিয়ে চলেছে, তাকে কি সেই ধ্যাবড়ানো সিঁদুর পরা, ঘোমটা দেওয়া বাঙালি মায়ের মত লাগছে? থলেধারী এই মায়ের মুখটা যেন অত কোমল না, যেন কি একটা নেই নেই ভাব...... এক কাজ করা যাক্‌ বরং। চোখের লেন্সটা একটু জুম করে মায়ের মুখের দিকে রাখি। এই তো বেশ দেখতে পাচ্ছি ওকে। দ্রুত পা চালাচ্ছে, চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টি, সাবওয়েতে নেমে গেল... কী যেন চিন্তা করছে, একটু যেন টেনশন মনে হচ্ছে... মাঝেমাঝেই অভ্যেস বশে বাচ্চাটাকে দেখে নিচ্ছে ঠিক আছে কিনা, হয়ত বাড়িতে কিছু হয়েছে কারও। ও হরি এ যে অফিস পাড়ায় এলো। বাচ্চাকে একটা ক্রেশ-এ রেখে চলে গেল। আবার ফেরার সময়ে নিয়ে যাবে বুকে করে। এ মায়েরও দেখি ঘর-বার সামলাতে সামলাতে ক্লান্তি আসে না! নাকি ক্লান্তি দেখানোর কোন সময় নেই?
এবার ভাবা যাক সেই ঘোমটা দেওয়া মায়ের কথা। যার দুনিয়া বলতে ছিল শুধুই অন্দরমহল। তার থেকে এই থলেধারী মায়ের দায়িত্ব অনেক বেশি। বাইরের জগতে তাকে প্রতি মুহূর্তে শুনতে হয়, এই মেয়েদের কোন আক্কেল নেই, খামোখা মাতৃত্বের ছুটি ভোগ করে, পরে জয়েন করেও সেই হ্যানত্যান বাহানা লেগেই থাকে লেট করে আসার। আর কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা... কিচ্ছু বোঝে না।
মায়েদের কাছে সন্তান সেই ছোটটিই থাকে। প্রতিটি বাঙালি মাই নাকি চায়, তার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে। সত্যিই কি তাই? এখনকার মায়েরা কিন্তু বেশ বুঝে গেছে তার সন্তান যদি দুধে ভাতে থাকে, তাহলে তাকে আর এই জগতে টিঁকে থাকতে হবে না! আর ছোটটি থাকলে তো চলবেই না একেবারে। প্রত্যেক মায়েরই একটি থেকে বড় জোর দুটি সন্তান। ওই যে মাকে দেখা যাচ্ছে বাচ্চার হাত ধরে টানতে টানতে স্কুলে পুরে দিয়ে আসতে, গানের ক্লাসে, আঁকার ক্লাসে, নাচের ক্লাসে, সাঁতারে... সব শিখে নিতে হবে এখনকার ছেলেমেয়েদের। নইলেই পিছিয়ে যাবে যে! আর হ্যাঁ অবশ্যই তাকে ফার্স্ট হতে হবে। হি/শি উড বি দ্য টপ, দ্য টপ... হাত দিয়ে টেবিল চাপড়ানোর আওয়াজ আসছে প্রতি মুহূর্তে, এক একটা প্রতিজ্ঞায় প্রতিটি মায়ের মুখ শক্ত হয়ে যাচ্ছে। মাও ছুটছে সন্তানের সাথে পাল্লা দিয়ে। এরপর একে একে আশা হারানোর গল্প। হয়েছে হয়ত কেউ কিছুটা বড়, কেউ কিছুমিছু, কেউ কিচ্ছুটি হয় নি। তাদের নিয়ে আবার স্বপ্ন গড়া শুরু করার আছে। একবার পারে নি বলে কী বারবার পারবে না! পারতেই হবে, পারতেই হবে...
সন্তানের বয়ঃসন্ধি এলে আগের মায়েরাও বুঝত এখনকার মায়েরাও বোঝে। তবে বোঝা এবং বোঝানোয় ফারাক রয়েছে বিস্তর। বয়ঃসন্ধির পরিবর্তনগুলোয় শুধু সাক্ষী থাকাই না, সন্তানের মনোজগতে এবং শারীরিক প্রকাশে মা-ই বোধহয় এক এবং একমাত্র মনোবিদ হয়ে উঠতে পেরেছে যুগ যুগ ধরে। মায়ের বোঝানোটা হয়ত এখন অনেক খোলাখুলি, শরীরের পরিবর্তনটা যে একটা স্বাভাবিক ঘটনা, আজকের মায়েরা সেটা প্রকাশ্যে বলে দিতে পারে সন্তানকে। আগে একটু ঢাকঢাক গুড়গুড় ছিল, এবং সেটা হয়ত সমাজেরই চাপে। আবার এখনকার ছেলেমেয়েরা মাকে যতটা বন্ধু হিসেবে পায়, তখন তেমনটা হয়ত সবার ক্ষেত্রে ঘটত না। মাকে যেন বুড়ি না লাগে, একদম এখনকার দিনের মত প্রেজেন্টেবল হয় তাদের মা- সেটাও বর্তমান প্রজন্ম চায়। আর মাও তাই বদলে যায় মন থেকেই। অবশ্য এই বাহ্যিক দিকটার বাইরেও অন্তরেও যে তার খুশির ছোঁওয়া লাগে না, সেটা বলাও ভুল হবে।
সন্তান ক্রমশ বড় হয়, তারও ঘরসংসার হয়। মাও ক্রমশ পিছু হটতে থাকে সন্তানের জীবনের কেন্দ্র থেকে। সেই মা তখন দূর থেকে দেখে সন্তানকে আর মনে মনে প্রার্থনা করে- ভালো থাক, ভালো থাক। কর্মজীবনের চাপে বা বৈবাহিক সূত্রে ছেলেমেয়েকে বাড়ির বাইরে যেতে হয়। মা থেকে যায় একলা। ছেলেমেয়ে বছরে একবার বা দুবার এলে তখন ওইটুকু সময় তার জীবনের মরুদ্যান। তবে দূরে থাকলেই যে টান কমে এমন তো না, মায়ের টান থেকেই যায়। শুধু একলা অসুখের সময় মা চায় তার সন্তান যেন বিছানার পাশে এসে একবার বসে, একটিবার মা বলে ডাক দেয়। ছেলেমেয়ের সম্ভব হয় না সব সময়ে হয়ত সেই চাওয়াকে পাওয়ায় বদলানো, আবার কেউ কেউ হয়ত মাকে ভুলে যায় নিজের গন্ডীর মধ্যে ডুবে গিয়ে। অথবা যারা মায়ের কাছেই থেকে যায়, তারাও হয়ত পারে না সবসময়ে মায়ের খেয়াল রাখতে, সে ইচ্ছেয় হোক বা অনিচ্ছেয়। মোটের ওপর মায়ের শেষ জীবন কেটে যায় একলা একলাই। আর সেই যে প্রতিভাবতী মায়েরা, যারা জীবনের অন্য ক্ষেত্রে সাফল্য পেয়েছে, তাদের তবু কিছু রসদ থাকে বাঁচার। বাকিরা...