হাফ টাইম

আকাশ দত্ত

দীপকে মাঝেমাঝেই অফিসের কাজে বাইরে যেতে হয়। তখন একেবারেই একা। ছোটন
এমনিতে ভালো ছেলে। কোন বাজে নজর নেই। সব কাজেতেই সিদ্ধহস্ত। রান্নাবান্না
থেকে কলের মিস্ত্রী খুঁজে আনা। আর সব থেকে বড় ব্যাপার ও বিশ্বস্ত খুব।
আজকাল দিনেরাতের কাজের লোক যে কি ভীষণ দায়, তা কলকাতাবাসী বিলক্ষণ বোঝে।

বছর তিনেক বিয়ে হয়েছে ইন্দ্রাক্ষীর। অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ। এখনও
বাচ্চাকাচ্চা হয়নি। দীপ একজন আপাদমস্তক ভদ্রলোক। সুচাকুরে। ইন্দ্রাক্ষীকে
খুব ভালবাসে। কেয়ার করে। এই থ্রীরুম ডায়নিং এর ফ্ল্যাটে ছোটনকে নিয়ে ওরা
তিনজন। প্রথম প্রথম খুব অসুবিধা হতো। দীপের তো কোন সময়জ্ঞান নেই। যখন তখন
জড়িয়ে ধরতো। বুকে মুখ ঘষতো। পাশের ঘরে হয়ত তখন ছোটন কোন কাজ করছে। কিংবা টিভি দেখছে। কি যে অস্বস্তি হতো না!
- একটা কথা ছিলো বৌদি
- হুম বলো
- আসলে আমার যা ইনকাম-
- কেন দুমাস আগেই তো দাদাবাবু.....
- না না মাইনের কথা বলছি না –
- তবে কি ?
- আসলে মা বোনকে পাঠাচ্ছে। আশেপাশে কোথাও কাজে লাগিয়ে দেওয়ার জন্য। আমিও দু'তিন জায়গায় বলে রেখেছি। হয়ে যাবে।
- তো? জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় ইন্দ্রাক্ষী।
- না মানে যতদিন না একটা ভালো কাজ যোগাড় করে দিতে পারি যদি আমার কাছে....আমতা আমতা করে ছোটন।
- ওহ্! তো এখানে থাকবে কোথায়?
- আমার সাথেই থাকবে। ছোট ঘরেই। আপনি কিচ্ছু ভাববেন না বৌদি। কিছু অসুবিধা
হবে না। আপনার হাতে হাতেও......
- হুম। ঠিক আছে। তবে বেশীদিনের জন্য নয় কিন্তু। তোমার দাদাবাবু তো এখন নেই। তিনি ফিরে এসে দেখলে রাগ করতে পারেন।


- শর্মি দরজাটা বন্ধ করে দে। আর ছোটন বাজার থেকে ফিরলে বলিস এবেলা আর যেন
বিশেষ কিছু না করে। ফ্রিজে যা আছে তাই একটু গরম করে নিলেই চলবে। আমি একটু
বেরোচ্ছি।

শর্মিলা। মুখের খুব মিল দুজনের। না বললেও বোঝা যায় ছোটনের বোন। ওই কুড়ি
একুশ হবে আর কি! খুব লাজুক। কথাই বলে না। না ডাকলে সামনেও আসে না। শুুধু
টিভি অন করলে সুরসুর করে সামনে আসে। পায়ের কাছে বসে। আর চোখ বড় বড়
করে......

রাত প্রায় সাড়ে বারোটা। একটু আগেই মোবাইলে অনি'র সাথে কথা হলো। একটাই
ভাই। তবে ভাই কম, বন্ধু বেশী। সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ওর থেকে প্রায়
তিনবছরের ছোট। পড়াশোনা খেলাধূলা সবেতেই চৌকশ।

এখন ব্যাঙ্গালোরে আছে। অক্টোবরে কলকাতায় আসবে বললো। পূজোর সময়। ভাবতেই
খুশীতে মনটা একদম ভরে গ্যালো ইন্দ্রাক্ষীর।

ঘুম না আসলে এই সময়টায় ও বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। আকাশ দ্যাখে। কত এলোমেলো
কথা পড়ে ফ্যালে আকাশের দিকে তাকিয়ে। গত বছর বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে যাওয়াতে
দীপ খুব কষ্ট পেয়েছিলো। ইন্দ্রাক্ষীও। ডঃ সেন বলেছেন এবারে নিশ্চয়ই.....

ধীরে ধীরে বাথরুমের দিকে এগোয় ইন্দ্রাক্ষী। ডঃ সেন বলেছেন রেস্ট নেওয়া
খুব জরুরী। ফিরে এসেই শুয়ে পড়বে। যেভাবেই হোক দীপের কোলে এবারে একটা
ফুটফুটে শিশু তুলে দিতেই হবে।

বাথরুম থেকে ফিরে এক ঢোক জল খায়। ছোটন রেখে গ্যাছে। প্রতিদিনই রেখে যায়।
ডিভানের পাশে। পায়ের কাছে সাদা চাদরটা তুলে গায়ে দেওয়ার সময় কিরকম একটা
আওয়াজ মনে হলো!

কান খাঁড়া করে শুনতে চাইলো সে। একটু সতর্ক হয়েই। হুম। ঠিক। একটু অস্ফুট
আওয়াজ। যেন কেউ চাপা স্বরে কারও সাথে কথা বলছে। এত রাতে কে হতে পারে! চোর
টোর নয়তো! ধড়পড়িয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো ইন্দ্রাক্ষী। পা টিপে টিপে
ডায়নিংএ।

নাহ্। নীল আলোয় ভরে আছে পুরো ঘরটা। কেউ কোথ্থাও নেই। আওয়াজটা তবে কোনদিক
থেকে আসছে! গলার কাছটা কেমন যেন শুকনো শুকনো। এতক্ষণে একটু ভয় ভয় পাচ্ছে
ইন্দ্রাক্ষী। ছোটনকে ডাক দেবে কিনা ভাবতেই.....

ছোট ঘরের দরজাটা বন্ধ ভেতর থেকেই। মৃদু ফিসফাস। বাইরে থেকে দরজার সামনে
বসে পড়লো ইন্দ্রাক্ষী। তারপর কি-হোলে চোখ রাখতেই..ছোটনের পুরো শরীরটা
নগ্ন শর্মির ওপর..চাপা আওয়াজটা স্পষ্ট...মেরে ফ্যাল দাদা..জোরে..জোরে...

দৌড়ে বেডরুমে এসে ঢকঢক জল খায় সে। বারান্দা থেকে ধেয়ে আসা একটা বেওয়ারিশ
হাওয়া দেওয়ালে ঝোলা ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো পিছিয়ে দিলো কয়েক বছর। সমস্ত
বেডরুম জুড়ে মৈথুনের গন্ধ। দাপাদাপি প্রকট। বুকের ভেতর থেকে একটা
কুন্ডলীকৃত সাপ যেন ফণা তুলছে। কান জুড়ে শর্মির হিংস্র তীব্রতা।
বিষ..বিষ..বিষ!

চারপাশের রঙ নীল। কালচে নীল। শরীরটা মুচড়িয়ে দিয়ে একটা গর্ত খুঁড়ছে
অনর্গল। ম্রিয়মান কালো চিরে বের হওয়া একটা আলো। সেই আলো যা চোখ ধাঁধিয়ে
দেয়। ছায়া ছায়া ছায়াপথ জুড়ে কিভাবে যেন ছোটন-শর্মির মুখ দুটোও পাল্টে
যাচ্ছে। সামনের সাদা দেওয়ালটা পর্দার মত সমস্ত সত্ত্বা নিয়ে আঁকাবাঁকা।
ভিজে যাচ্ছে ভেতরের গরম। একটা পরিচিত তরল ক্রমশঃ নিম্নমুখী। অস্ফুট
আওয়াজটা তবে কার? বড্ড চেনা। আমারই নয় তো? "ফাক মি অনি ফাক মি
হার্ড"..........