অনন্ত আনন্দধারা

সুমী সিকানদার

অফিস শেষ করে রেডিওতে ছুটলেন মা। উদ্দেশ্য চেক তোলা । চেক ভাঙ্গিয়ে টাকা তুলে কেক নিয়ে তবে বাড়ি ফিরতে হবে। তার রুমঝুমের আজ জন্মদিন। পাঁচ বছরের রুমঝুম সারা বাড়ি ঝুমঝুম নেচে বেড়াচ্ছে সে দেখতে পাচ্ছে। চেকটা আজ ভাঙ্গাতে না পারলে অলিম্পিয়া থেকে কেকটা কিভাবে নেবেন সেই চিন্তায় মা ভাড়া দিতে ভুলে গেছেন। হেল্পার এসে টাকা চাইতেই হাতব্যাগ খুলে খুচরা পয়সা গুনতে লাগলেন তিনি।

গ্রীন লাইন হসপিটালে, অপারেশন থিয়েটারের সামনে দমবন্ধ বসে আছে রুমঝুম। তার হাতে কিছুক্ষণ আগে মায়ের খুলে রাখা শাড়ি রেখে গেছে নার্স।মায়ের কাপড় হাতে চুপচাপ বসে আছে সে। চোখ ভরা জলের ওপর ভাসছে সেই দিনটা। মা যখন ছুটতে ছুটতে হাতে চারকোনা প্যাকেট নিয়ে ঘরে ঢূকলো। আর রুমঝুম লাফাতে লাফাতে খাবার টেবিলের সামনে চলে এলো তখন রাত ন\'টা প্রায়। উড়ন্ত ঘুড়ির ডানা মেলা খুশী ছিলো তার কন্ঠে। সে চিৎকার করেছিলো কেক দেখে ।আর সেই খুশী মিশ্রিত চিৎকার শুনে মায়ের দ্রাবিড় চোখ আরো আদ্র হয়ে ওঠে। মাত্র এক পাউন্ডের কেক মেয়েকে এত আনন্দিত করতে পারে তা ভেবে মায়ের কান্নাগুলো গুলো উড়ে উড়ে শুকিয়ে যাচ্ছিলো।পানির দাগ ছিলো গাল জুড়ে।

রুমঝুম তার মায়ের এক জীবনের অনেক উপেক্ষা ভুলে গেছে সেই জন্মদিনটা ভেবে , যন্ত্রণাগুলো মিলিয়ে গেছে সেই দিনটার মলমল কমলে। দুরের হাতছানির টানে মা একসময় তাকেও হারায়। এত বড় ভুলের পর মেয়ের মুখের সামনে কোন দিন আবার আসবেন তা ভাবতে পারেন নি। মেয়েই নিয়ে এসেছে সব ভুলে। রুমঝুম ভুলে যেতে শিখেছে মায়ের সেই সমস্ত সময়গুলো যখন মা এবং মেয়ে দুজনেই দুজনার জন্য অবিরাম কষ্ট পেয়েছেন।

শাড়িটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে আছে রুমঝুম । মায়ের জ্ঞান ফেরার সংবাদ এখনো আসেনি। সে উঠে চোখে মুখে পানি দেয়, নিজেরও কিছু খাওয়া দরকার । বক্স খুলে ঘর থেকে আনা স্যন্ডউইচ মুখে দেয় সে। ক্ষিদে সহ্য করার ধাত নেই তার। তার ওপ্র পাঁচ মাস হলো সে এক্সপেক্টিং । মা হবে রুমঝুম। বোতলের মুখ খুলে গলায় অনেক্টুকু পানি ঢেলে দিলো সে।

সন্তানের কথা ভেবে মন ভালো হয়ে যায় রুমঝুমের। বিপদে অপার সাহস পায় শরীরে ধারণ করেছে যাকে তার কথা ভেবেই। যখনই আসুক বুকে করে বড় করবে তাকে। সন্তান কিভাবে বেড়ে ওঠে তা প্রতিপলে অনুভব করতে চায় ।রুমঝুমের ছেলেবেলাটা বড় একলা কেটেছে। মায়ের যাকিছু সীমাবদ্ধতা সে মেনে নিয়েছে। কিন্তু রুমঝুমের কোন সীমাবদ্ধতা নেই। সে তার আয়তআকাশ জুড়ে তাকে কান পেতে শুনতে থাকে। বাজতে থাকে আরেক ঝুমঝুম শব্দ ,আরেক রুমঝুম নৃতাঞ্চল। ঢিমালয়ে কাছে আসতে থাকে শুদ্ধস্বরে \'মা\' বলে ডাকতে থাকা অনন্ত আনন্দধারা।