ভেসে যাই জলে

অপরাহ্ণ সুসমিতো

বাবা মারা গেলে আমরা খুব অসহায় হয়ে পড়ি । তিন ভাই বোন নিয়ে মা মহা সংকটে । জমি জিরোত খারাপ না । মা সারাদিন কান্না । কি হবে তার সামনের অদৃষ্ট । আমি তখন ১৭ । গৌরনদী কলেজে ভর্তি হই আর তখনই রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়ি । বড় ভাইরা আমাকে লাল মলাটের বই দেন,পড়ি । শ্রেনীশত্রু চিনতে শেখান । নকশাল বাড়ি নিয়ে পড়তে পড়তে ডুবে যাই অনাগত বিপ্লবে ।

কলেজ থেকে বাড়ি ফিরলে মা’র অসহায় মুখ দেখি । মধ্যরাতে আচমকা শব্দে ঘুম ভাঙ্গলে দেখি মা একাকী ফুঁপিয়ে কাঁদছেন । অসহায় হয়ে জড়োসড়ো হয়ে কানে বালিশ চেপে ঘুমাতে চেষ্টা করি । ভোররাতে যখন সবাই ঘুমায়,আমি জেগে থাকি সেনাপতির মতো । মুখ গুজে সিরাজ সিকদার পড়ি,মেহনতী মানুষের স্বপ্ন দেখি ..

আমাদের গ্রামের বাড়ি বাটাজোর । সকালে কখনো ঘুম চোখে বাটাজোর বাজারে পোদ্দার কাকু’র দোকানে রসগোল্লার সিরা দিয়ে গরম পরোটা খাই । কাকু কেন যেন মাঝে মাঝে আমার কাছে পয়সা নিতে চাইতেন না । কাকুর মেয়ে শর্বরী মাঝে মাঝে আমার কাছে অংক করতে আসতো । দুনিয়ার লাবণ্য স্নান করা যেন শর্বরী ।

শর্বরী সারাক্ষণ মন খারাপ করে থাকতো,ওরা ওপার বাংলা চলে যাবে । পোদ্দার কাকু নাকি ভেতরে ভেতরে ব্যবস্থা করছেন,ওপারে চলে যাবার । কলেজে বড় ভাইদের সাথে আলাপ করতে গেলে বলেন : হিন্দু মুসলমান বিষয় না । বিষয় হলো : ভূমিপ্রথা । সামন্তবাদ আর শ্রেনীশত্রু ।

একদিন কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে এসে দেখি বোনেরা হুলুস্থুল কান্নাকাটি করছে । মা ধামুড়া গ্রামের সরফরাজ ইমাদুল নেহাল হাওলাদার কাকার সাথে পালিয়েছেন ,আমাদের সবাইকে ফেলে । তার পেছনের সমস্ত ঘর বাটি,মায়াবী ধূলোর সংসার,আত্মজ,আত্মজা ফেলে রেখে ।

সরফরাজ ইমাদুল নেহাল হাওলাদার কাকুকে আমরা আগে থেকে চিনতাম । অবস্থা সম্পন্ন জোতদার । ধানী জমি,বাটাজোরে ব্যবসা,বরিশাল-ভুরঘাটা লাইনে ৪টা বাস পরিবহন,সুদের ব্যবসা কি নাই তার । আমাদের বিপদ আপদে পারিবারিক বন্ধু ।

আশেপাশের লোকজনের টিটকারী,হাসাহাসি,কপট সান্ত্বনা নিয়ে সন্ধ্যা নামে । আমি শান্ত দিঘির মতো একলা পুকুর পাড়ে বসে থাকি । কালো ওড়না পরে ঝুপ করে সন্ধ্যা আমাকে নিরিবিলি ছুঁয়ে যায় । কি রকম আজ শান্ত লাগে । আচমকা মনে হলো,আহ আজ রাতে আরাম করে ঘুমানো যাবে,গভীর নিশি পাওয়া আমার নরোম মা’টার আর কান্না শোনা যাবে না । পুকুর পাড়ে কালো কালির মতো,আফ্রিকার সরল মানুষের গতরের মতো নিকষ অন্ধকার নামে । শর্বরীকে দেখতে ইচ্ছে করে খুব । ইচ্ছে করে ওর কলাবেনী চুলে নাক ডুবাই,নারকেল তেলে আমতলা জামতলা সাজাই ।

শর্বরীর ঘ্রাণ নাকে থাকতে থাকতে উঠে পড়ি । হাঁটতে হাঁটতে বাটাজোর বাজারে এলে কেমন যেন প্রাণ আসে ১৭ শরীরে । ভ্যান ভাড়া করি ।

দাদা,কোম্মে যাবেন ?
ধামুড়া ।
এই সন্ধ্যা ওয়াক্ত ?
কাম আছে ।

সেই রাতেই আমার মায়ের ভাতার হাওলাদার কাকুকে আমি রামদা দিয়ে জবাই করি ।
ফিনকি রক্তে জোতদার খতম । জামা ভিজে গেলে খুলে ফেলে দেই । আহ,শ্রেনী শত্রু নিপাতিত ।
বাটাজোর বাজারে এসে পোদ্দার কাকুর দোকানে বড় ২ টা পরোটা আর ৪টা রসগোল্লা দিয়ে পেট ভরে খাই । সবার সামনে এক গ্লাস পানি খেয়ে শব্দ করে ঢেকুর তুলি । আমার যে খালি গা,ভ্রুক্ষেপ করি না ।

রাত বাড়লে বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করি । ঘুটঘুট ছিনালী অন্ধকার । আমার প্রবল ঘুম পাচ্ছে । পা চলে না । ঘুম তাড়ানোর জন্য গান শুরু করি :

ও মন হরি বলো মন রে সোনা
মানব দেহের গৈরব কইরো না
মানব দেহ মাটির ভান্ড
ভাঙ্গলে হবে লন্ডভন্ড
ও মন জোড়া দিলে তো লাগে না
ও হরি বলো মন রে সোনা...

আমাদের পুকুর পাড়ে এসে দাঁড়ালে আচানাক মনে হয় আমার সারা গায়ে জমাট কুচকুচ রক্ত । বমি বমি লাগে । প্যান্টটা খুলে ঝাঁপ দেই জলে..আহা কী ঠান্ডা ..

হাত পা ছড়িয়ে ভাসিয়ে রাখি জলে..ধুয়ে যাচ্ছে জমাট রক্ত বুঝি..ঘুম পায়..ঘুম লাগে আদুল শরীরে..মনে হচ্ছে আমার নরোম মা’র বুকে মুখ গুঁজে ঘুমাচ্ছি ।

মা রে । ও মা .. মাগো..