মা, ছেলে, বাংলাদেশ

পলাশ দে

নিজে থেকেই বেজে উঠছে হাওয়া
শব্দগান, নিঝুম একা লেগে আছে
লেগে আছে দেশের বাড়ি, ছিঁড়ে যাওয়া বর্ষাকাল

আবদার ফুরিয়ে গেছে আমাদের…অস্ত্র
মা ছেলের সংসার, কাক চড়ুই আর-
নতুন গজিয়ে ওঠা মোবাইল টাওয়ার

ফুল শুকিয়ে যাচ্ছে কথা ও ইচ্ছে
প্রসব হচ্ছে ভুয়ো ফল গাছে গাছে



এখন এই মুহূর্তে এসব বলছ কেন মা তুমি?
দ্যাখ, কীরকম চুপ হয়ে যাচ্ছে সবকিছুর ঘর সংসার – তুই তুই খেয়েছিস তো?
হ্যাঁ । তুমি চোখ বন্ধ করো না, ঘুমোও
বন্ধ হলেই তো চোখ ফিরে যাচ্ছে
সুপুরি বাগান …আমজামরুলপেয়ারা…কত রকমের ফুলগাছ আর পুকুর!
ছিপ-ফাতনা-জাল…তোর বাবু ছুটির দিনে…সারাক্ষণ ছুটি ছুটি
খালি পেটের ওষুধটা খেয়েছ?
শীতে, খালি পেটে সেই ভোরবেলা খেজুর রসের হাঁড়ি পেড়ে আমাকে,
তোর বাবু…তুই তখনও হোসনি
- এসব এখন আমার একদম ভালোলাগছে না
- ভালো লাগায় কী থাকে বল, সব কিছুই তো লেগে আছে
ইলিশ গন্ধের মতোন…


এসেছি মাটির কাছে বৃক্ষসমেত এসেছি
রোপণে তুলসিমঞ্চ গঙ্গাজল ধূপকাঠি
এ পর্যন্ত ভেঙ্গে গেছে যা কিছু ফসল ও জোনাকি
শহরে হাঁটছে শিবির বহিরাগত আমিও যাচ্ছি

যানজট জেব্রাক্রসিং পেরিয়ে যাচ্ছি সিগনালে
যদি যাই হারানোর ভয় সাবধানে খুব সাবধানে
না জেনে তোমার মতো পাশ দিয়ে যাই ডাক দিয়ে
জন্মসূত্রে আকাশ আমার আয়ু আমার লক্ষ্মীসোনা

এখানে এসে তোর বাবুর সে কি ছটফটানি, পুকুরের
বদলে মিউনিসিপ্যালিটির জলে স্নান, মাঠগুলো সব পার্ক নাম
নিয়ে হাঁফাচ্ছে
তোমার মনে আছে মা, প্রথম মাইনার টাকায় আমরা
ঘুরতে গেছিলাম দু-জনে?
হ্যাঁ, বাওপুর স্টেশনে নেমে সেদিন তোর মামাবাড়ি নিয়ে গেছিল,
বাবু, সঙ্গে এক হাঁড়ি মদনকাকার মিষ্টি দই
আরে? তুমি তো বাংলাদেশের কথা বলছ!
থানা : বেগমগঞ্জ, গ্রাম : সুলতানপুর, নোয়াখালি জিলা
মা, মা, শোনো না, আমি আজ রান্না করেছি জানো ?
চারাপোনার হালকা ঝোল…ডাক্তারবাবু বলেছেন
পাকা কই আর কাঁচাকলা দিয়ে ঝোল,জিরে বেটে,
পাতলা…খুব ভালো খেতো রে তোর বাবু

কীভাবে উতরোল রোদ্দুর এক বয়সে
সারাদিনের চুঁইয়ে পড়া…শরীর ভিজে যায়
আমাকে একলা পেয়ে, মা
মাকে একা পেয়ে, আমি/ কীরকম পরস্পর গুছিয়ে নিচ্ছি কথার মিছিল


সেই গানটা দুলে ওঠে পতাকায়
দুধ লেগে যায় সমস্ত দৃশ্যে


তুমিও জানো না, এই মেহফিলে তুমি, বেমানান


চৈত্রে জন্মেছিলি তুই, ঘোর রাত্তিরে, তাও আবার ১৩ তারিখ!
সবাই বলল মন্দকপাল ছেলে, অপয়া
আজ বাবুর এক বছর হল, মা, পুজোয় বসবে না?
চৈত্র মানে তো বসন্ত কাল, তোর বাবু নাম রাখল, পলাশ,
রজনীগন্ধার মালা আর পাকা গুড়ের সন্দেশ নিয়ে এসেছি সকালে,
তুইও কেমন হতে থাকলি সেই ছোট্টবেলা থেকে
এত নিজের সঙ্গে থাকিস কী করে! নোয়াখালি ছেড়ে এসে, তোকে নতুন পেয়ে, আমরা সারাক্ষণ তোকেই আঁকড়ে থাকতাম রে
-এই তো, আমি তোমাকে জাপটে আছি -
-ছাড় ছাড়, আচ্ছা আমাদের গ্রামের সেই নদীটার নাম কী ছিল যেন, তোর্সা?
- ধুর, সে তো উত্তরবঙ্গের…মাসির বাড়ির নদী/ #

ঘুম ভাঁজ করে থাকি দুজনে
জানালায় আলো আসে, তেরছা
চাঁদ অথবা লাইটপোস্টের…
ছায়া গড়ায় বারান্দা ভেদ করে লেবুগাছ অবধি


কবচকুন্ডল খুলে রাখি দুজনে
শরীরে নুন জমে ওঠে, নুনের পাড়া
এক লাইন পিঁপড়ে…দুলাইন অন্ধকার

মেরুদন্ড খুঁড়ে পাওয়া মা ছেলে সভ্যতা



রাত যখন রাত্তির হয়ে উঠত, তোর বাবু, জানালা ধরে দাঁড়িয়ে
থাকত, কখনও ছাদে, হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখতাম,
- পাসপোর্ট তো হয়ে গেছে মা, আর একটু গুছিয়ে নি’
অন্তত একবার ফিরে যাওয়ার কথা খুব বলত তোর বাবু, আমিও সে কি খলবল
নাও, এবার একটু খাও, আমি খাইয়ে দেব?

আমরা কতদিন বাঙাল ভাষায় কথা কই না, না রে!
আরে, এই তো কইতাছি, চারা মাছ দিয়া ভাত মাইখ্যা দি?
ও মা, মা গো, আমি আইজ খাওয়াইয়া দিমু তো