শ্রীচরণেষু মা

অলোকপর্ণা

যেসব আওয়াজ আর গন্ধের কোনো নাম হয় না, সেইসব আওয়াজে বা গন্ধে আমার ঘোর লেগে যায়। সেফটি পিনের আওয়াজের নাম কি? শাখা থেকে ঝুলে থাকা দোহারা দুটো সেফটি পিন, দেখো, কেমন সারা বাড়িময় আওয়াজ করে চলেছে! সেফটি পিনেরা জন্মেছে তোমার জন্যই। আর এর সাথে সাথে একতলায় ছড়িয়ে যাচ্ছে গন্ধটা, আমার আর দাদাভাইয়ের চেনা সবচেয়ে পুরোনো গন্ধটা,- তোমার গন্ধ। মা, তোমার এই আওয়াজ আর গন্ধের একটা নাম দরকার।
এই যে বাড়ির গন্ধ, বাড়ি ফেরার গন্ধ, ‘বালিশ, তোষক, কাঁথা, পুরোনো চাদর’- এর গন্ধ, তুমি ওদেরও মা। ওদের যেহেতু বড় হয়ে যাওয়া নেই, তাই ওরা মা ন্যাওটা হয়ে থেকে গেছে। তুমি সারাটাদিন এঘর ওঘর যতরাজ্যের আকাজগুলো বেছে বেছে সেরে রাখো আর ওরা তোমার পিছু পিছু ঘুরে সারাবাড়িটা তুমিময় করে দেয়। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে এলেই আমি বুঝি, দোতলায় তুমি আসোনা বলে, দোতলার গন্ধটা অন্য রকম। তোমার এই আওয়াজ আর গন্ধের থেকে এগারোশো মাইল দূরে মাঝে মাঝে আমার ঘুম ভাঙে তোমার ডাকে। চোখ খুলে ভাবি ঠিক শুনলাম কি না। দেখি,- অভ্যাস, আমার পিছু পিছু এগারোশো মাইল হেঁটে এসে আমার মাথার পাশে ঠিক বসে আছে।
মানুষ সবচেয়ে বেশি আশ্বাস পায় ছোঁয়াচ পেলে, নামানুষেরাও। এই যে আশ্বাসে আশ্বাসে আলো হয়ে আছে আমাদের বাড়ি ঘর, তোমার ছোঁয়াচ লেগে। তোমার ছোঁয়াচ দেবো বলে আমি আমার ঘরের এদিক ওদিক একটা দুটো সেফটি পিন ফেলে রাখি। যদি কখনও তারা কোনোভাবে বেজে ওঠে! তোমার ছোঁয়াচ দেবো বলে রান্না ঘরে ঢুকে এমনি এমনি গেয়ে উঠি, ‘পাশরিব ভাবনা, পাশরিব যাতনা’। গেয়ে উঠেই থেমে যাই, বোঝার চেষ্টা করি, গানটা কতখানি তুমি হয়ে উঠল। রান্না করতে করতে ইচ্ছে করেই একটু বেশি খুন্তির আওয়াজ করি, আসলে এসব তোমার ছোঁয়াচ এনে ফেলার চেষ্টা।
এখন যখন বাড়ি যাই, তোমার পাশে শুই। তোমার পাশে শুলে দেখেছি ঘুম টুপ করে নেমে আসে। পৃথিবীর যেকোনো মায়ের দিকে তাকালেই আমার ঘুম পেয়ে যায়। যে কোনো মা, মানুষ মা, কুকুর মা, বিড়াল মা, গরু ছাগল, গাছ মা,- যেকোনো মা’ই যেন ঘুমের ওষুধ। এক আশ্চর্য লালাবাই গেয়ে সব দুস্বপ্নদের মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে। অবাক হতে হতে আমি তোমার পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। আমার মাথার পাশে আমার যুদ্ধরাও একে একে ঘুমিয়ে পড়তে থাকে।