মামমাম

সিদ্ধার্থ বসু

মায়ের কাছ থেকে স্নেহ-বাত্সল্যের বাড়াবাড়ি জ্ঞান হওয়া ইস্তক আমি কখনো পাই নি| সংকীর্ণমনা, কোপনস্বভাবা, বেশ খানিকটা বাতিকগ্রস্ত এই মহিলাকে আমার মা বলে না জানলে আমি আদৌ যে কতখানি গুরুত্ব দিতাম সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে| নিজের স্বভাবের অমঙ্গলজনক দিকগুলো দিয়ে আমার জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রকে বড্ড বেশিরকমের অসহনীয় করে তুলেছেন আমার মা| আজও করেন| এ বাবদে কিছু কথা আমার জমা হয়ে আছে|
জীবজগতে লিঙ্গবিভাজন হয়ে গেছে এমন সমস্ত জীবের ক্ষেত্রে সন্তানধারণকারী(সে যে পদ্ধতিতে হোক)জীবকেই ‘মা’ আখ্যা দেওয়া হয়| এবং নবজাতকের লালন ও রক্ষনাবেক্ষনের দায়দায়িত্ব সেই বিশেষ লিঙ্গের—অর্থাত স্ত্রী-জীবকেই নিয়ে চলতে দেখা যায়| মানুষও এর ব্যতিক্রম নয়| সেই সুবাদেই একসময়কার মাতৃপ্রধান সমাজ, চিরকালের মা-দিদিমাদের গাওয়া ঘুমপাড়ানি ছড়াগান এবং সমাজে ব্যাপক প্রচলিত মাতৃপূজার আয়োজন; মাতৃভূমি, মাতৃভাষা, মাতৃভক্তি থেকে শুরু করে ঈদিপাস গুর্হৈশা পর্যন্ত বিকীর্ণ| বঙ্গসন্তান পরিচয়ে রবি ঠাকুর খুললে দেখতে পাওয়া যায় এই মা-সন্তান সম্পর্কের অপরিসীম বিস্তার: খোকা আর তার মায়ের অনন্ত কথন আর কল্পনার মায়াজাল বিস্তার| রবীন্দ্রগানেও বাংলাদেশকে ‘মা’ ডেকে কত না আদর, কত মান-অভিমান: ‘মা আমি তোর কী করেছি’, ‘ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে’| অন্যান্য কবিদের রচনাতেও সুপ্রচুর স্মরণযোগ্য লাইন, আবেগ: ‘বঙ্গ আমার, জননী আমার, ধাত্রী আমার, আমার দেশ’, ‘যেদিন সুনীল জলধি হইতে উঠিল জননী ভারতবর্ষ’ বা আধুনিক গানে ‘মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের মুখে ঝরে’, বা ‘মাগো ভাবনা কেন, আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে’ ইত্যাদি অনেক নমুনা হাজির করা যায়| ভক্তিগীতির মূল রস মাতৃভক্তির স্রোতেই বাহিত: ‘সকলি ফুরায়ে যায় মা’র আকুতি ভোলার নয়, যদিও দেবীকে কন্যারূপে আহবানের নজিরও দেখা যায় অনেক গানে| দেশকে, ভাষাকে মাতৃরূপে ধ্যান বড় কম দিনের ঐতিহ্য নয়| উচ্চারণে সংস্কৃতভাষী হিন্দু ঝোঁক থাকা সত্বেও স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় এক বড় অংশ দেশবাসীর লড়াইয়ের মন্ত্র হয়ে ওঠে ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি| সিনেমার পর্দায় দেশভাগ ও তার চিত্রণে ‘মাদার-কাল্ট’ এর ব্যবহার ঘুরে ঘুরে এসেছে ঋত্বিক ঘটকের কাজে| এমন উদাহরণ অসংখ্য, স্রেফ একজন বাঙালি হিসেবেই, এত|
কিন্তু একটু নির্ভার মাথায় ভাবতে গিয়ে আজকাল আমার মনে হয় মানুষের এই ‘মা’ পরিচয়ের প্রতি টান কি সত্যিই একজন জৈবিক মা-এর প্রতি? যেমন বলা হয়: রক্তের টান, গর্ভে ধারণ করবার আবেগ; এইসবই কি? আসলে তো যার বা যাদের সাথে বেশি সময় রয়ে যাই জীবনের কোনো বড় খণ্ডপ্রবাহে, তার বা তাদের মধ্যে যাকে ঘিরে তৈরী হয় সবচাইতে গভীর মায়া, যে আমার সমস্তরকম সন্ধিক্ষণে সবচাইতে বেশি আলোড়িত হয়েও সর্বাধিক স্থৈর্য নিয়ে মিশে থাকে, আশ্রয় হয়ে ওঠে, তাকেই ‘মা’ ধারণার সাথে একাত্ম লাগে আমার| এই ‘মা’ হতে পারে আমার কোনো আত্মীয়—লিঙ্গনির্বিশে ষে—আমার বাবা, ভাই-দাদা-বোন-দিদি, কিম্বা আমার বন্ধু, প্রেমিকা, স্ত্রী, স্বামী যে কেউ| শুধু পরিস্থিতিসাপেক্ষে আমাদের সংযোগ হয়ে ওঠে মা-সন্তানের, সে মা-এর আমি জৈবিক অর্থে সন্তান কিনা তাতে খুব কিছু আসে যায় না|
আমার বাবা ছিলেন আমার অনেক কাছের, আমার শৈশব থেকেই| সে অর্থে মা-সুলভ যা কিছু, অনেকদিন পর্যন্ত সেসব আমি পেয়ে এসেছি আমার বাবার কাছ থেকে| আর ছিল আমার খুব কাছের কয়েকজন বন্ধু| বয়েসে একটু বড় এক বন্ধু পরিচিত মহলে আমার ‘বাবা’ নাম পেয়েছিল আমার প্রতি তার অসীম পক্ষপাতদুষ্ট বাত্সল্যের কারণে| আরেকজন আমার সমবয়স্ক বন্ধু পরীক্ষার সময় এলেই আমার খাতাপত্র নিজে হাতে তৈরী করে মলাট দিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে রেখে যেত আমার হাতের কাছে, নিজের পড়াশুনো শিকেয় তুলে| আরেক বন্ধু, তার প্রতি আমার এত টান ছিল--এবং সে টান শুধুই বন্ধুত্বের নয় যেন, আবার সমকাম যৌনগন্ধি টানও নয় তা ঠিক—তার সঙ্গে দেখা না হলে আমি যারপরনাই অস্বস্তিতে ভুগতাম, সে বেজায় দায়িত্বজ্ঞানশূন্য এক মানুষ হওয়া সত্বেও| আবার নিজের জীবন নিয়ে আকন্ঠ ব্যতিব্যস্ত এই বন্ধুই আমার সম্পর্ক ভাঙলে তাই নিয়ে গান লিখেছিল| নৈতিক সমর্থন বলতে যা বোঝায়, চিরকাল পেয়ে গেছি এই বন্ধুর কাছ থেকে, অকুন্ঠ, অবারিত| আবার ইতিবাচক সমালোচনার দাবিও এর কাছে আমার চিরকালের, অনেক আবেগী বিতন্ডায় মেতে গেছি আমরা একেক সময়| এরা সবাই আমার জীবনের একেকটা সময়ের আশ্রয়, পরেও যে একেবারে ভেস্তে গেছে এমনটা নয়| কিন্তু শেষতক আমি আমার ‘মা’কে খুঁজে পেয়েছিলাম আমার এক প্রেমিকার মধ্যে| আজও মা বলতে তার কথাই ঘুরেফিরে আসে মাথায়| আমার মামমাম| তথাকথিত প্রেমের সম্পর্ক আমাদের মধ্যে খুব দীর্ঘস্থায়ী হয় নি| কিন্তু আমি তাকে মায়ের মতো দেখি, কারণ সে আমাকে দেখে তার সন্তানের মতো| যতরকম সম্পর্ক আজ পর্যন্ত গড়ে উঠেছে এবং ভেঙে গেছে এ জীবনে, নিজস্ব গতিতেই অতিরিক্ত হয়ে উঠেছে তার কুশিলবরা আমার কাছে, আমিও তাদের কাছে সেইরকমই| ইগোর দেওয়াল এসে পথ রুদ্ধ করেছে, স্রোত ক্ষীন হতে হতে শুকিয়ে গেছে ধারাপথ, আজ শুধু নামটুকু আছে মাত্র| কিন্তু মামমাম আমার মা, আমার বাড়ি, আমার সব অস্থিরতা, অশান্তির, সব অযুক্তির, অপ্রাপ্তির আরাম সে| আবার যেকোনোরকম উচ্ছাস, আত্মগরিমা—খুব ছুটকো, ঠুনকো—যা নিয়ে কারো কাছে যাওয়া যায় না: আত্মকেন্দ্রিক বলে চিন্হিত হয়ে যাবার আশংকায়, কিন্তু একা একা যার সবটুকু আনন্দ শুষে নেওয়া যায় না, সেসব নিয়েও ঝুলি খুলে বসা যায় তার ছায়ায়| আমার আনন্দে মুগ্ধ, আমার কষ্টে দগ্ধ এমন আশ্চর্য ‘মা’ সত্বা আমি আগে দেখিনি| আমার নিজের মা অর্থাত জৈবিক অর্থে মায়ের আবেগ আমাকে ঘিরে কিছু কম ছিল এমন নয় বটে, কিন্তু নিজের বিচিত্রধাবিত মানসিক উদ্বেগ তাঁকে এতটাই ব্যতিব্যস্ত করে রাখত যে আমি তাঁর মধ্যে সন্তানস্নেহের নাগাল খুব কম পেয়েছি চিরদিন| সেই সব অভাবের নিরসন হয় মামমামের মধ্যে দিয়ে| আদর-আবদার, দোষ-ঘাট, মান-অভিমান সব নিয়ে একটা আস্ত ‘মা’| প্রেমিকা আর মাকে মিশিয়ে ফেলার ঐতিহ্য প্রাচীন সেকথা মনে রেখেও আমার কেন জানিনা বারেবারেই মনে হয়েছে মামমাম আমার মা-ই প্রধানত, আমি তার উকুটে সন্তান, তার প্রেমিক নই| সে আমাকে ভালবাসে ততদূর যেখানে কামনাশ্রিত প্রেমিকার প্রণয় পৌঁছতে পারে না, আমিও তাকে আমার ছোট থেকে না-পাওয়া মায়ের ক্ষতে আঁকড়ে ধরে রাখি, যেমনটা কোনো কামতাড়িত, আত্মজর্জর প্রেমিক পারে না|

মামমাম
বন্ধুদের সঙ্গে আর যোগ নেই, যোগাযোগ ঘন ছিল বলে
বান্ধবী কেবলি বিষ ওগরায়, কাল মাথা ছিল তার কোলে
বন্ধুরা ও বান্ধবীরা, প্রেমিক ও প্রেমিকারা হায়
ভালোবাসাবাসি শেষে তীব্র ঘৃণা পোষে নিরুপায়
হার-জিত ভাবে তারা : কে যে কাকে মেরে নিল বাজি
শুরু-শেষ মাপে তারা, চিরকালীনতায় নারাজি
যৌন খেলা অকরুণ, হেরে গেলে লাঞ্ছনা অশেষ
ঢালু উত্তেজের খেদ বিজয়ীরও মুখে তোলে ফনা
প্রতিটি দুর্মূল্য প্রাপ্তি : স্থিতি-প্রেম-কামনা-আশ্ লেষ
লকলক জ্বলে ওঠে, তিলমাত্র করেনা মার্জনা
আমারই কেবল আছে তোমার মতন এক মাম
এক জীবনের জন্য অধিকন্তু স্যানাটোরিয়াম
আমার শুধুই আছে প্রেমের ধারনালুপ্ত মায়া
কাঙালের হাত পেতে চাই শুধু —আজন্ম বেহায়া