অঞ্জলি গুপ্তর বই নিভৃতবাসিনীর কথকতা,পাঠ প্রতিক্রিয়া

স্বপন রায়


“History would be a wonderful thing – if it were only true.”Leo Tolstoy
তো এই সত্য নিয়ে বিভ্রম থেকেই গেছে,ঐতিহাসিকের কাহিনী বলার দায় নেই,কাহিনীকারের সত্য অণ্বেষনের দায় আছে,আবার সত্য ইতিহাসের পাতায় তথ্যময় হতে গিয়ে সত্যতা হারায় ঐতিহাসিকের নানা রঙের চশমার কারণে,কাহিনী যিনি লেখেন তাঁকে তো বানাতেই হয়,ফলে তিনি আর মিথ্যেয় জড়ান না!কোন একটি বিগত ঘটনা বা সামাজিক তথ্যের আধারে তিনি লিখে যান,সত্যের পাশে তার আপেক্ষিক ভাই মিথ্যেও বড় হতে থাকে!

দেখুন বিভ্রম থেকেই গেল!এটাই স্বাভাবিক।নইলে রাখী দিদিমার বুকের মধ্যে সেঁটে গিয়ে শুধু আশ্রয়ই পেলোনা,এক শারিরীক রোমাঞ্চের স্বাদও পেলো...এই গল্পটা(কিরণবালা)পড়ে আমি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম,পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল গ্রাম বাংলার চিরকালীন দুঃখী মেয়েদের কাহিনীই পড়ছি,পড়তে ভাল লাগছিল অঞ্জলি গুপ্তের ঝরঝরে গদ্যের জন্য,কিন্তু শেষে যে তিনি গল্পটিকে কলমের আশ্চর্য ব্যবহারে এমন জায়গায় নিয়ে যাবেন,ভাবতে পারিনি!সত্য আর মিথ্যের আপেক্ষিক রসায়ন চূড়ান্ত করেছেন তিনি অনায়াসে!

এই গল্পগুলি তাঁর নিভৃত চর্চার ফসল,তিনি পরিণত বয়সে প্রকাশ্যে আনলেন এই মনিমুক্তোগুলো,এমন সংযম দেখানোই একজন বড় মাপের মানুষের কাজ!আর এই সংযম এবং মিতকথন তাঁর সব গল্পেই পাঠককে টানটান করে রাখে,একটানা পড়ে যেতে হয়!’মোহর’ গল্পটির মূল চরিত্র ‘মোহর’ তার কালো রঙের জন্য আর কিছুটা সরল জিভের আল্গা স্খলনের জন্য(‘ছেলেরা খুব অসভ্য হয় আমি জানি’) স্বামী পরিত্যক্তা হয়,সামান্য কারণ,কিন্তু কি অসামান্য তার প্রতিঘাত!গল্পটি এক স্বামী পরিত্যক্তা মেয়ের যন্ত্রণার দিকে যায়না,যদি যেত আরেকটা শরতচন্দ্রিয় গল্প হয়তো আমরা পেতাম,কিন্তু লেখিকা তা করেন নি!মোহরের মানসিক অপ্রাপ্তি তাকে ঠেলে দিয়েছে একজন ফল্গুঈর্ষার বাহিকা-ব্যক্তিত্বের চরিত্রে,তার সচেতন ইগো আর যৌনতার অচেতন অবদমন তাকে অসুখসঞ্জাত অস্থিরতায় ছটফট করায়,আবার অন্যদিকে আরেক বঞ্চিতা নারী বিভা পিসী’র সান্নিধ্যে সে স্বাভাবিক নারী’র অনুসন্ধিৎসা নিয়ে গল্পগাছা করে,রেসিপিরহস্য জানতে চায়!আর অপ্রত্যক্ষ বাধা হয়ে উঠতে থাকে নতুন-বৌ-এর স্বামীসান্নিধ্যের!এ রকমই বিভিন্ন মানসিক প্রতিবিম্বে নারী আটকে থাকে,তাকে আটকে রাখা হয়!নারীর এমন অন্তরঙ্গ বিপর্যয় নিয়ে লেখা তেমন হয় না,অঞ্জলি গুপ্ত নারীমনের এমন জটিল গতিবিধিকে এতটা প্রাঞ্জল করে তুলেছেন যে,মনেই হয়না ভারাক্রান্ত হচ্ছি ভাষার অলঙ্কারে,প্রকাশভঙ্গী দুরূহপনায়!

এই বইয়ের সব গল্পই নারীকেন্দ্রিক,কিন্তু তাদের দুঃখযাপনের দলিলমাত্র নয়!’সুখদা’ গল্পের শেষদিকে লেখা হয়,’’এই তিন বাল্য বিধবা হতভাগিনী স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে কখন যে স্তব্ধ হয়ে গেছে নিজেরাও বুঝতে পারেনি।আকাশে একফালি চাঁদ বাঁশবাগানের ফাঁক দিয়ে দেখা দিয়েছে।দু একটা শেয়াল কোথাও ডেকে উঠলো।শাঁখের ফুঁ শোনা যাচ্ছে গৃহস্থবাড়িতে।নিস্তব্ ধতা ভেঙে সুখী বলে ওঠে ,চল ওঠ সব,সন্ধ্যাপ্রদীপ দেওয়ার সময় হল যে!”এই গল্পের তিন বাল্য বিধবা কিন্তু এক মাত্রায় বাঁধা নন,লেখিকা সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলানোর বিন্দুতে তাদের এক করে দিলেন।প্রদীপের নীচেই যে অন্ধকার থাকে,এই সত্য মনে করিয়ে দিলেন আরেকবার!

শ্রীলতা গল্পে সাংসারিক এবং বৈষয়িক বৈষম্য কি ভাবে নারীকে নিঃসঙ্গ করে তোলে লেখিকা দেখিয়েছেন।কিন্তু এই দেখানোটা দেখাবার জন্য তিনি কোন বাধ্যতামূলক উপাখ্যান ফাঁদেন নি!তিনি বরং শ্রীলতা আর তরু এই দুই নিঃসঙ্গ নারীর জীবনে একটি আবছা কিন্তু ক্রমপ্রকাশ্যমান সেতু গড়ে দিয়েছেন,যা হয়তো আলো জ্বলায় না কিন্তু আলো দেখায়!এই বইটির অসামান্যতা কিন্তু এখানেই যে লেখিকা তাঁর পূর্বজাদের দেখানো পথে নারী মনন এবং নারীর সমস্যাকে দেখেননি!অথচ নারীসুলভ পুঙ্খানুপুঙ্খ দেখার মজাটাও রেখে দিয়েছেন!”রূপালী” গল্পের মহিলা মজলিসের কথাই ধরা যাক,এমন জীবন্ত বর্ণনা কোন পুরুষ লেখকের পক্ষে সম্ভব হত না!পুরুষ নারীকে তার বহিরঙ্গ দিয়ে বিচার করে,এ ছাড়া তার অন্য কোন উপায়ও নেই!স্বভাবতই নারী’র ভিতরঝরানো হাসিকান্নাগুলো তার কাছে অধরা থেকে যায়!লেখিকা নিপুণ দক্ষতায় নারী মনের এই নিভৃত কিন্তু তরঙ্গবিদ্ধ অলি গলিতে নিয়ে গেছেন,পাঠকের মুগ্ধতা ছাড়া আর কিছু থাকেনা তখন!শুধু একটা কথাই বলার থাকে এরপর যে লেখিকার পরের বইতে যেন শুধু নারীই নয়,পুরুষের অন্তরঙ্গও সৃজনসিঞ্চিত হয়!

আর আমাদের যাবতীয় তথাকথিত সত্য কিন্তু এভাবেই মিথ্যের খাদ মিশিয়ে বিগঠিত হয়,যুধিষ্ঠিরও এর বাইরে ছিলেন না!মানুষ মানুষীর এই বহুমাত্রার রসায়নের প্রেক্ষিতে লেখিকা নারীর অন্তরঙ্গের সীমাহীনতায় নিয়ে গেছেন পাঠককে।প্রতিটি গল্পেই তাই এক ফোঁটা অশ্রুও দ্যুতিময় হয়ে উঠেছে ফোঁটা ফোঁটা অন্তরিক স্পর্শে,মানুষীর মণীষার!

ঐহিক প্রকাশনীকে ধন্যবাদ “নিভৃতবাসিনীর কথকতা’’কে জনসমক্ষে নিয়ে আসার জন্য!পাঠক অবশ্যই পড়ে দেখুন অঞ্জলি গুপ্ত কি অনায়াস পটুত্বে সাধারণ মানবীকে অসাধারণ করে তুলেছেন,মনে করিয়ে দিয়েছেন আরেকবার যে অসাধারণেই সাধারণ লুকিয়ে থাকে!
নিভৃত বাসিনীর কথকতা
অঞ্জলি গুপ্ত
ঐহিক প্রকাশনী
প্রথম প্রকাশ - জুন,২০১৫,বাংলা একাদেমী,কোলকাতা
মূল্য- ৮০/-ভারত
- ১০০/-বাংলাদেশ