এবং ব্ল্যাক হোলের প্রতিধ্বনি

ফেরদৌস নাহার

পথ খুঁজতে সেই পথের মাঝে অনেক বছর। চেনা পথ, তারপরও কত অচেনাই থেকে গেল। নদীর একই জলে যেমন দুবার পা ভেজানো যায় না। তেমনই ভাগ হয়ে যাওয়া এক একটি দৃশ্য-অদৃশ্যমান অখণ্ড ভূমি কত শত হাজার হাজার টুকরো হয়ে গেল! কেউ আর দ্বিতীয়বারের মতো ফিরে পেলাম না পুরাতনীকে। কী করে বদলে গেল সবকিছু, সব চাওয়া-পাওয়ার হিসেব। এত অন্তরাল, এত কাঁটাতার, ওপারে কী ঘটে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত জানি না। আসলে কোনোদিন কি জানতাম!

‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ কেমন? কী তার চেহারা? কী কী ঘটানো যায় সেখানে? এসব প্রশ্ন মাথায় ঘুরতে ঘুরতে সমস্ত পৃথিবী, না না পুরো সৌর জগতটাই আমার কাছে মুহূর্তে নো ম্যানস ল্যান্ড হয়ে যায়। কেড়ে নেয়া বেঁচে থাকা, নিঃশ্বাস নেবার নিঃশর্ত অধিকার, যাবতীয় উচ্চারণ যেখানে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছে, ডানা মেলতে পারছে না ভাবনা-পাখি। সবকিছু ঠিকানাহীন। কোথায় সে? পলে পলে কি তারই সন্ধান।
ক.
সংসারে ঝড় উঠেছে। কবির সংসারও তা থেকে বাদ যায় না। শূন্যে বাঁধা দোলনায় দোল খেতে খেতে দড়ি ছিঁড়ে মাটিতে ভূমিসাৎ, সিলভিয়া প্লাথ। বিয়ে, সংসার এবং তার ভিতরে যা কিছু ঘটে, তার আসল সত্য কেবল বিবাহিত দুজন ছাড়া আর কেউ কখনই জানতে পারে না। সিলভিয়া প্লাথের কাছে কি তবে তাঁর সংসারটি নো ম্যানস ল্যান্ড? ক্রমান্বয়ে যা এখন তাঁর কাছে সম্পূর্ণ অচেনা অজানা এক মানচিত্র হয়ে যাচ্ছে। সেখানে তিনি হাঁটেন, চলেন, কথা বলেন, কবিতা লেখেন; কিন্তু কী এক অচেনা ডাক তাঁকে পিছু ডেকেই চলে! ছাড়ে না। কবির হৃদয় বুঝি এভাবেই মাথায় এসে ভর করে। আর তা মাথায় আসার পর গ্যাস চুল্লির উত্তাপ তাঁকে ডেকে নিয়ে যায় খুব কাছে! অস্থির আবেগী মেয়েটি তাঁর বিদগ্ধ মাথাটি ঢুকিয়ে দিলেন চুল্লির গহ্বরে। পায়ের নিচে টলে যাওয়া মাটি কেবলই সরে সরে যায়। সব পরিচয় মূল্যহীন বেচে-কেনার বাজারে, ঠিকানা হারা অস্তিত্বে দাঁড় করিয়ে দেয়। অবশেষে যা বাকি থাকে তা কেবলই হা হা ধ্বনি! জীবন-মরণ সীমান্তের দুপারে একজন সিলভিয়া প্লাথ গ্যাসচুল্লির কাছে তুচ্ছ করে দিয়ে যান যে কোনো মৃত্তিকা বা যে কোনো পরিচয়। পড়ে থাকে নড়ে যাওয়া জীবনের পুঁথিপত্র।

কে যেন কবে বলেছে, এক পৃথিবী সমান বেদনা নিয়ে পথ চলছি! মাথার ভেতরে একটি অদেখা পৃথিবী। অথচ বড্ড ভার ভার লাগে। বুকের ভেতর হু হু অন্ধকার, শ্বাস ও দীর্ঘশ্বাস পরস্পর পরস্পরকে বলছে এমন অনেক কিছু, যা শুনতে কান নয় মন পাতলেই যথেষ্ট। পৃথিবীর প্রায় শ’দুয়েকের মতো দেশের প্রত্যেকটিতে কি অতগুলোই সীমান্তের মধ্যবর্তী অঞ্চল রয়েছে, যার ইংরেজি নাম ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’? আর এই ‘কারো নয়’ অঞ্চলটুকু নিয়ে কত না দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগছে জগৎ। বারবার প্রশ্ন জাগে- এই ল্যান্ড আসলে থাকে কোথায়? এ কি আদৌ রয়েছে? মাঝে মাঝে মগজ কেঁপে ওঠে! মগজ বলে, এ সেই মনোভূমি, যেখানে কেউ নেই, কিছু নেই, কখনো থাকে না। আর কোত্থাও নয়, যা কেবল জেগে থাকে মাথায়, মগজে, মননে। অথচ এই জগৎ ঘুরে ঘুরে কোথাও তো পেলাম না এমন একটি স্থান, যা নির্দিষ্ট কারো নয়- সবার। স্বার্থের কারসাজিতে প্রতিদিন চারদিক সাজানো হচ্ছে অগ্নিদাহের অলংকারে, ক্রোধান্ধ হুংকারে!

খ.
অ্যালবেয়ার কামু’র ‘দ্য আউটসাইডার’-এর নায়ক মারসোকে চলে যেতে দেখি পরম উদাসীনতায়। এ পৃথিবীর কোনো কিছুতেই তার যেন কিছু যায় আসে না। কী নির্লিপ্ত। সে যেন সবখানে একজন আউটসাইডার। থেকেও কোথাও নেই। কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারে না। কোথায় যাবে মারসো, জানে না। ঠিকানা নেই, গন্তব্য নেই, অর্থহীন অসহায় একজন। পেছনে ফেলে আসা সবকিছুকে যেমন উপেক্ষা করতে পারে, তেমনি নিজেকে এবং প্রতিটি মৃত্যুকেও উপেক্ষা করতে পারে অনায়াসে। তার পাশাপাশি হেঁটে চলি। জিজ্ঞেস করি, তোমার মায়ের মৃত্যুর কথা মনে পড়ে মারসো? সে ঠোঁট উলটায়। বাজারি দুনিয়ার কঠিন চাবুক তাকে অন্য এক নিষ্ঠুরতা শিখিয়েছে। আর সেই চাবুক এখন সে সমানে চালিয়ে যাচ্ছে তার চারদিকে। স্বভাবে লেগে আছে নির্মম কঠিন এক ধূসরতা। এভাবেই আলজেরিয়ান মারসো নিজেই একজন নো ম্যানস ল্যান্ড। সে কি তবে অ্যালবেয়ার কামু’র ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার গোপন অক্ষে জন্ম নেয়া একটি দুর্লভ স্বপ্নের বাহক? ‘মুক্ত-স্বদেশ’ যার নাম। মারসোর মতো একজন ঘোরতর আউটসাইডারকে তুমুল নির্বিকারে পুরোপুরি নো ম্যানস ল্যান্ড হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি।

যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখান থেকে কিছু দূরেই পাথরে বুক ছিঁড়ে ছিঁড়ে জল ঝরার বেসামাল শব্দ শুনতে পাচ্ছি। ভেসে আসছে সে-শব্দ বাতাসে ভর করে, বিজ্ঞান তো তাই বলে। বেশ অনেককাল হয়ে গেছে এখানে এসেছি, ভেসে ভেসে। কিন্তু আসলে কোথায়? না স্বদেশে, না বিদেশে! মনে হয় দাঁড়িয়ে আছি এমন কোথাও যাকে স্বদেশ বিদেশ কোনো নামেই ডাকতে পারি না। কোন ভূ-খণ্ডকে নিজের ভাববো? ভাবনায় স্বদেশের ছবি মানে যা যা ছিল তা কি সব এতদিনে মুছে গেছে! এখন যে নতুন ছবি, নতুন আখ্যান তার সঙ্গে অনেক কিছুই মিলাতে পারি না। তারপরও তারই সঙ্গে মিশে যেতে থাকি দিনে দিনে। মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে গেলে তাকিয়ে থাকি বোকা বোকা চোখে। বোকা চোখ বলছি, কারণ এখনো হয়তো সে পরিমাণ চালাক হতে পারিনি। যা হলে নিজে অবাক না হয়ে, চারপাশের সবকিছুকে অবাক করে দেয়া যায়- তেমন। এ জন্যে বোধহয় বাজিকর হতে হয়। কিন্তু এসবের কিছুই হতে পারি না। পৌঁছে যাই উত্তরে, অন্য কোথাও। এই যাপিত জীবন মাঝে মাঝে ফিস ফিস করে জিজ্ঞেস করে, এ কোথায়? চারপাশে চোখ বুলাই। নিজের ঘর বিছানা-বালিশ, চেয়ার-টেবিল, বইপত্র সবকিছু পরিচিত। শুধু এই পরিচয়ের ঘ্রাণ মিরপুরের বাড়ির সঙ্গে মেলে না। না মেলারই কথা। এটা অন্য কোথাও, এটা পূর্ব চেনা-জানা থেকে আলাদা। ঘাট বদল হয়েছে যে, দৃশ্য বদলাবে না! তাই কি হয়? এখন অবশ্য এসবও চিনতে পারছি। পুরোপুরি না হলেও, ভূমিহীন কৃষকের চোখে তো বটেই।

গ.
‘মানুষ পরাজিত হতে জন্মায় না, সে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে কিন্তু পরাজিত নয়’- এমন কথা যে মানুষের কলম থেকে বের হয়, সে-ই কিনা মাত্র একটি গুলিতে রুদ্ধ করে দেয় জীবনের দরজা! দমকা হাওয়ায় উড়ে যায় সব প্রবহমানতা। কিসের সেই বেদনা, কেন এই কষ্টের দাবা খেলা! আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, নোবেল বিজয়ী উপন্যাস ‘দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি’ জুড়ে জীবন জয়ের কথা বলেছেন। ক্যারাবিয়ান সাগরে অপরাজেয় সংগ্রামী জেলে সান্তিয়াগোর চরিত্র গড়েছেন প্রগাঢ় মমতায়। অথচ সেই মানুষটি নিজে জীবনভর কোনো মাটিতেই থিতু হতে পারেননি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপ, আফ্রিকা কত মাটিতেই না ঘুরলেন, কোথাও মন বসে না। অবশেষে চলে গেলেন কিউবায়। শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থাকে সমর্থন করতে। কিউবা তখন বাতিস্তা সরকার ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পর, শোষণমুক্ত অর্থনীতি গড়ে তোলায় মন দিয়েছে। ফিদেল ক্যাস্ত্রো এবং বিপ্লবীদের সংস্পর্শে থাকার উদ্দেশ্য নিয়ে হেমিংওয়ের কিউবায় গেলেন। কত স্বপ্ন দুচোখে! কিন্তু সেখানেও টিকলেন না। সাম্রাজ্যবাদের বিপরীতে অবস্থান নেয়াটা মার্কিন সরকারের পছন্দ হয়নি। তাঁকে সমাজতন্ত্রের চর বলে প্রচার করে হল। হেমিংওয়ে ফিরে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রে। কিছু দিন কাটল অস্থিরতায়, কিছু দিন ডিপ্রেশনে। তারপর শুধু একটি গুলিতে আতসবাজির মতো উড়িয়ে দিলেন নিজেকে। এভাবেই বুঝি কারো কারো কাছে পৃথিবী হেরে যায়। এভাবেই বুঝি কারো কারো হৃদয় চিরকাল নো ম্যানস ল্যান্ড হয়ে থাকে।
কঠিন আঘাতের ধ্বনি উঠে আসে। দেশান্তরী মানুষের না আছে ঠাঁই, না আছে ঠিকানা। তার জন্য কেবলই অপেক্ষা, নয় প্রবঞ্চনা। কে গড়েছে এই জনবাস, ঘন আঠার মতো লেগে থাকা মানুষ-প্রকৃতি! রক্তে বাজে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। কোথায় ভেসে যায় পুঁথি-পত্রের ভাষা, গুমরে মরতে থাকে পাথর চাপা কান্না। হেঁটে হেঁটে, দৌড়ে দৌড়ে কোথাও কি পৌঁছানো হয়! অথচ পৃথিবী জোরা মগের মুল্লুকে কেবলই একা থেকে একাকী হতে থাকা। হাঁটতে হাঁটতে পথ হারিয়ে ফেলা। ভাসতে ভাসতে ডুবে যাওয়া। নিজের ভেতরে নিজস্ব এক ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ বহন করে বয়ে চলা। ব্যথিত সময়ের সাক্ষী হয়ে বেঁচে থাকা।
প্রায় প্রতিদিন খবর আসে, নৌকো ডুবছে ভূমধ্যসাগর, আন্দামান বা অন্য কোনো সাগরে। বেঁচে থাকার জন্য কত সহস্র অসহায় মানুষ পরদেশে যেতে চেয়ে কেমন ডুবে যাচ্ছে সাগরে, উপকূলে, জলে, স্থলে। বেঁচে থাকার সামান্যতম উপায় খুঁজতে কতজন যে হারিয়ে গেল! সমুদ্র উপকূলের কোস্ট গার্ডদের চোখে ঘুম নেই, তারা ছুটছে উদ্ধারের হাত বাড়িয়ে। আবার মনে মনে উৎকণ্ঠা- কারা না জানি কখন নৌকায় চেপে অথবা জাহাজের খোলে লুকিয়ে ঢুকে পড়ে তাদের দেশের সীমানায়! উথাল-পাথাল সময়ের কারসাজিতে ঝরে যাচ্ছে কত না প্রাণ। জীবনের পাটাতনে সেই আশ্রয়হীনতা, দীর্ঘ দিবস ও রাত্রির মাঝে কত না উলট-পালট, কত না উদ্দেশ্য অথবা উদ্দেশ্যহীনতা। নতুন অভিবাসনের ভয়ংকর চেষ্টায় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু সংবাদ শিরোনাম হয়ে যায় নিমেষে। অনির্দিষ্ট এই বাজি খেলায় কেউ হারে কেউ জিতে। পুরোপুরি জিতে যাওয়া তো সেই কবে কোথায় গা ঢাকা দিয়েছে! নিখোঁজেরা তো তা জানে না, জানবেও না।

ঘ.
তাঁর ওভারকোটের দু-পকেটে অসংখ্য ভারী পাথর। পাথরের ওজনে খুব সহজেই তলিয়ে যাওয়া যাবে। তিনি নেমে যাচ্ছেন বাড়ির কাছের ওউজ নদীর গভীরতার দিকে। এক সময় তলিয়েও গেলেন। ‘এ রুম ওয়ানস ওন’ নিজের জন্য একটি ঘর, সেই কবে এ কথা যিনি শুনিয়েছেন। বলেছেন, একজন নারী যদি নিজের স্বাধীন ইচ্ছে অনুযায়ী সাহিত্য রচনা করতে চান, তাহলে অবশ্যই তাঁর একটি নিজস্ব ঘর ও অর্থ থাকতে হবে। সেই ভার্জিনিয়া উলফ সাসেক্সের ওউজ নদীর গভীরে কোন ছায়া দেখেছিলেন? কেউ কি জানে কেন এই মাটির পৃথিবীর চেয়ে জল-পৃথিবী তাঁর আপন হয়েছিল? কত কিছুই তো কতজন জানে, বলে। হয়তো সেসব আধা সত্য-মিথ্যার লেবাসে লুকোচুরি খেলে। সব তার ধোঁয়া হয়ে উড়তে থাকে ওউজ নদীর জলে, কিংবা তারো বেশি অতলান্তে। মংক হাউজের এলম গাছের নিচে যে বাতাস আজো বয়ে যায় তাঁর সমাধি ছুঁয়ে, সে কি জানে পৃথিবীর মায়া কাটাতে ভার্জিনিয়া উলফ কেন ওভারকোটের পকেট ভরে নেন অসংখ্য পাথর, তারপর ডুব দেন জলের গভীরে!

আলো এসে পড়ে রাস্তার পাশে শুয়ে থাকা মানুষের উপর। তাদের এই গৃহহীনতা, পায়ের নিচে মাটি না থাকা কষ্টকে পরিচয় করিয়ে দেয়- আসলে ভূমি বলে কিছু নেই। আছে বলাৎকার, আছে উদ্দেশ্যহীনতা, আছে ভূমিদস্যুর ষড়যন্ত্র! সে ষড়যন্ত্র বেশিভাগ সময় মানুষই করে, আবার কখনো প্রকৃতির হয়ে নদীরাও করে। এইসব ভূমিদস্যুরাই হাজার বছর ধরে কেড়ে নিচ্ছে ঠিকানা। এভাবেই প্রতিবার নো ম্যানস ল্যান্ডে পৌঁছে যাওয়া। ঝিঁ ঝিঁ ডাকা সময়ের ঝাঁকঝাঁক জোনাকি অন্ধকার সাঁতরে ঘুরে বেড়ায়। আলো পেলে পালিয়ে যায়। কারা আসে সেই আলোর নামে যে, তাদেরকে দেখা মাত্রই পালিয়ে বাঁচে জোনাকি? জানি তার কাছে আরো খবর আছে।
ঙ.
হাজার বছরের ধরে জিপসিরা ঘুরে ঘুরে কোন মাটির সন্ধান করছে? আদৌ কি জিপসিদের নির্দিষ্ট কোনো মাটির প্রয়োজন আছে? সেই যে ছেলেবেলায় শুনেছি- আফগানিস্থান, ইরান থেকে আখরোট, পেশতা, চিনার, গরম শাল, আতর, চোখ পরীক্ষার বালাই ছাড়াই গোল গোল কালো ফ্রেমের চশমাসহ আরো কত কী নিয়ে যারা ঘুরে বেড়াত অবিভক্ত ভারতবর্ষে, কলকাতা বা বিশাল বাংলার হাটে ঘাটে। গাদাগাদি করে থাকত সস্তা দামের ডেরা বা সরাইখানায়। স্ত্রী-সন্তান-পরিজন সব ফেলে শুধুমাত্র বেঁচে থাকার কারণে দেশান্তরী তারা। তাদেরকে কোন মাটি ধরে রাখে! এক-একটি মানুষ এভাবেই এক-একটি অন্তর্গত স্বয়ংসম্পূর্ণ ভূখণ্ড হয়ে যায়। সময় প্রত্যেককেই আলাদা আলাদা করে ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ বানিয়ে দেয়। কে তখন আর ধার ধারে চিহ্ন দেয়া ওইসব তথাকথিত সীমানা রেখার! নিজস্ব অস্তিত্বই একমাত্র সেই ভূখণ্ড। যাকে বহন করে ফেরি করে ফিরছি পৃথিবী এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত, সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডে। বিচিত্র এই খণ্ড-বিখণ্ড বিদ্যমানতা। যা আপন ভুবন হয়ে বাঁচায়, হাসায়, কাঁদায় আবার মৃত্যুকেও চেনায়। কী বহুমুখী তার শক্তি!
ফ্রাঞ্জ কাফকা তাঁর ‘দ্য মেটামরফোসিস’ নভেলার প্রথম পাতাতেই জানিয়ে দিলেন, আরেকটি অন্যরকম নো ম্যানস ল্যান্ডের খবর। জীবন কত ভাবে, কত না পরিসরে ফিরে ফিরে আসতে পারে। গল্পের মূল চরিত্র গ্রেগর সামসা, একদিন সকালে ঘুম ভেঙে নিজেকে বিছানায় আবিষ্কার করল, বিশাল এক পতঙ্গে রূপান্তরিত অবস্থায়। কাফকার মেটামরফোসিস সেই অর্থে হয়ে ওঠে মানুষ হিসাবে অবস্থানহীন একজন মানুষের অগ্নি-পরীক্ষার প্রতিচ্ছবি। গ্রেগর এই বাজারি বিশ্বের একজন সেলস ম্যান। সেই-ই কিনা রূপান্তরের ধাক্কায় হয়ে যায় কীট-পতঙ্গ! ধীরে ধীরে মা বাবা বোন এবং পরিচিত জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয় পড়ে। এক সময় মৃত্যুর বিকল্প ছাড়া আর কোনো পথ তার জন্য খোলা থাকে না। হয়তো প্রত্যকেই এক-একজন গ্রেগর সামসা। প্রতিদিন নানা রূপান্তরের মাঝ দিয়ে যেতে যেতে একসময় নিজেকেই নিজে চিনতে পারি না। অসহায় এই দীর্ঘযাত্রা দীর্ঘশ্বাস হয়ে গলায় আটকে থাকে। পায়ের নিচের ক্ষয়িষ্ণু মাটি কাউকে দাঁড়াতে দেয় না। অস্তিত্বের ভয়াবহ পরিণতি সব পরিচয়কে ধূলিসাৎ করে দেয়। শুধু বেঁচে থাকে এক একটি অদৃশ্য নো ম্যানস ল্যান্ড।
চ.
পাখিদের জন্য সমস্ত আকাশ উন্মুক্ত প্রান্তর। কোনোদিন যদি সেই আকাশকে রুদ্ধ করে দেয়া হয়! যদি লোহার খাঁচা নেমে আসে, তা দিয়ে মুড়িয়ে দেয়া হল সম্পূর্ণ আকাশ, তখন পাখিরা কোথায় যাবে? কিংবা পাখি-মন কিছু মানুষ, কোথায় মেলে দেবে তাদের ডানা। আবার এমন যদি হয়, পৃথিবীর সবগুলো সাগর অ্যাকুরিয়াম হয়ে গেল। পুরু কাচের আবরণের ভেতরে টলমল করতে থাকা নীলজলকে আর ছুঁতে পারি না। পা ডুবিয়ে বসে থাকতে পারি না, তাহলে! না রইল আকাশ, না রইল সাগর! মাটি তো অনেক আগেই ছিল না।

চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি। কার যেন আসার কথা। হাতে করে নিয়ে আসবে সে হারানো ঠিকানা। কে সে, আজও জানি না তার নাম। যেখানে এখন কুঁকড়ে আসা শীতের কথা ছিল, সেখানে এখন গ্রীষ্ম এসেছে। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি শব্দহীন শব্দ-বন্ধনে। আকাশ ভার হয়ে বৃষ্টিও নামতে পারে। দাঁড়িয়ে থাকি একটি ধু ধু প্রান্তরে। সারারাত যেখানে তুমুল বচসা করেছে কতিপয় ফেরারি আগন্তুক। আজ সেসব ফলাফল বাতাসে ঝুলিয়ে দেয়া হবে। নগর কাঁপানো বৃষ্টি মাঝরাতে সমস্ত শহর ভাসিয়ে নিয়ে যেতে যেতে হাঁক দিচ্ছে- নাই নাই তোর কোনো ভূমি নাই। দূর নক্ষত্র থেকে ছিটকে বেরিয়ে যাওয়া মানুষ, তোর আবার কীসের মুলুক! তুই নো ম্যানস ল্যান্ড হয়েই দাঁড়িয়ে থাক! অনন্ত কাল!

এভাবে কতকাল? এখনই বা কোথায় আছি? এতকালই বা কোথায় ছিলাম? স্মৃতি-বিস্মৃতির মাঝে এই যে সাঁতরে চলা, এর কোনো নাম আদৌ আছে কিনা জানি না। তবু সাঁতার শিখে নিয়ে, সাঁতরে যেতে থাকি। মাটি আমাকে চায় না। ভূমি থেকে দূরে নই, তবু ভূমিহারা ছন্নছাড়া বাতাসে উড়াই কিছু হারিয়ে যাওয়া প্রাগৈতিহাসিক কাহিনি। যে কাহিনিরা প্রচণ্ড রেগে ওঠে কখনো অভিযানে, কখনো অভিমানে! পৃথিবীর পায়ের নিচের পাটাতন থেকে পিছলে পড়তে পড়তে ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকি ঘনঘোর ব্ল্যাক হোলে।