মেঘ অদিতির বই সময় শূন্যতার বায়োস্কোপ,পাঠ প্রতিক্রিয়া- মেঘে মেঘের মন

বারীন ঘোষাল


যে কোন লেখকের একটা লেখা পড়ার সময় পূর্ব অভিজ্ঞতাবশে পাঠকের মনে আশা জাগে লেখাটি কেমন লাগবে সেই ব্যাপারে। পাঠক সম্পর্কে লেখকের আশার কথা জানা যায়না। কিছু পাঠক আছেন সুবোধ গোপাল। তারা যা পান তাই খান। তবে লেখক অপেক্ষা করে অচেনা বুদ্ধিমান পাঠকের। অভিজ্ঞ পাঠক সাহিত্যের ইতিহাস জানেন, নানারকম ফরমুলা, বাঁকবদল, নতুন পদ্ধতির কথা জানেন। গল্প রচনায় কয়েকটি বিভাজন আছে এরকম ... ফ্ল্যাট, ক্লাইম্যাক্স, এপিফেনি, ওয়েভি। ইওরোপে এই বিভাজন হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে। মাঝামাঝি সময়ে বাখতিন ন্যারেশন ভেঙে দেবার কথা বলেন। দেখা যায় কুশিলবরা পুতুলের মতো কথা বলছে, আবেগ প্রকাশ করছে, কাজ করছে লেখকের ইচ্ছা অনুযায়ী। লেখক আগে থেকেই সব জানেন। বাখতিন সেটা ভেঙ্গে অ্যান্টিন্যারেটিভ লেখার কথা বলেন। একটা ছকহীন গল্পের মধ্যে চরিত্রদের ছেড়ে দিলে তারা নিজেদের মতো সিচুয়েশন অনুযায়ী চলনে বলনে বেড়ে উঠবে। এদিকে বাংলায় ষাট দশকের শেষের দিকে শাস্ত্রবিরোধীরাও গল্পধারার মুক্তির কথা বললেন। তারপর এলো পোস্ট মডার্ন সময়ের হাওয়া। এবার একজন নবীন লেখক, প্রান্তিক লেখক কি করবেন ? তার সমস্যা ঘুচবে কিভাবে ? ইংরেজদের কাছে আমাদের প্রাথমিক গদ্য, গল্প শিক্ষা হয়েছিল। ভার্স থেকে স্টোরি বেরিয়ে গিয়ে পোয়েম থেকে যাওয়ার মতো বাংলায় পদ্য থেকে গল্প, নাটক, সংবাদ, দর্শন, লেকচার মুক্ত হয়ে নিজেদের পন্থা নেবার পর বাকিটাকেই কবিতা বলা হয়েছে। তাই ধরে নেয়া যেতে পারে গল্পও কাব্যমুক্ত হয়েছে। তার ভাষা ঋজু অকপট হয়েছে। সমস্ত বিভাগেই শুদ্ধতাবাদীদের দাবী আছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এখনো কবিতার মধ্যে গল্প আর গল্পের মধ্যে কবিতা মিলিয়ে রাখা হয়। কমলকুমারের গল্পও পাঠক পছন্দ করে, আবার রবীন্দ্রনাথের, বিভূতিভূষণেরও। এই পাঠকরা আলাদা। নবীন লেখক তাহলে কার জন্য লিখবে ?
নবীন গল্পকার মেঘ অদিতিও গল্প লেখার সময় এইসব কথা ভেবে আতান্তরে পড়েছিলেন বৈকি। মেঘ অদিতি একজন সৎ লেখক। ওসবে কান না দিয়ে তিনি নিজে যেমন ভেবেছেন সেভাবেই লিখেছেন। তার গল্পবই ‘সময় শূন্যতার বায়োস্কোপ’ পড়ে আমি তো হয়রান। গল্পরচনার প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস ভুগোল ফরমুলা ব্যকরণে দৃষ্টিপাত না করে যেমন খুশি লিখে গেছেন। আমি তার ব্যাকগ্রাউন্ড জানি বলেই অবাক হইনি। যে কোন পাঠক ভাববে – এ কিরে বাবা, লেখক কবি না গদ্যকার ? কি পড়ছে সে ? আমার তো মনে হয়েছে কোথাও সে কবিতা লিখেছে, কখনো গল্প, কখনো উপন্যাস, কখনো মেঘ ছবি আঁকছে, রঙ চড়াচ্ছে ক্যানভাসে, কখনো মনে হয়েছে সিনেমার সিনারিওর পরে সিনারিও দেখছি। আবার এর মধ্যেই মিলেমিশে থাকার আশ্চর্য স্বাদ পেলাম, তৃপ্তি পেলাম ‘সময় শূন্যতার বায়োস্কোপ’ পড়ে। সংলাপ ব্যবহার নেই বললেই চলে। পৃথিবীকে, সংসারকে ফেমিনিন চোখে দেখা, কিন্তু নারীবাদী নয়। অন্য চোখে দেখার মধ্যে অনর্থক পরিকল্পিত স্মার্টনেস আসে যা একেবারেই অনভিপ্রেত।
‘সময় শূন্যতার বায়োস্কোপ’-এর গল্পগুলো তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে। অনুগল্প, গল্প, এবং মুক্তগদ্য। ছোট বড় মোট ২৮ টি গল্প আর ৯ টি মুক্তগদ্য। একটু নেড়েচেড়ে দেখা যাক।
প্রথম গল্পটি, ‘পরের বসন্ত’ শুরু হচ্ছে এভাবে --- --- তখন সন্ধ্যা গুটিগুটি সন্ধ্যাতারাকে সাথে নিয়ে নেমে আসছে শহরের বুকে। শহর সাজছে আলোকমালায়। মেয়েটা, তার শরীরে তখন একুয়ামেরিন ছোঁয়া, যেন সমুদ্র হাসছে। পুরুষ শোভিত আর্মি-গ্রিন-এ। বাতাসে ছড়াচ্ছে দার্জিলিং চা সৌরভ। ... দোলের রঙ চলকে উঠে ছলকে গেল মোহন ভঙ্গিতে। ... আর্মি গ্রিন রঙ এখন ইজিপশিয়ান ব্লু-তে এসে থমকেছে। ... চুলে ঠিকরে পড়ছে গ্রীষ্মকালীন আলো। ... মেয়েটা সেই উত্তরগুলোকেই লূফে নিয়ে একটা উলের বল বানাচ্ছে শূন্যে ...। ... সন্ধ্যা নেমে আসার ছায়া তার ঘরে... এক অহঙ্কারি ছুরি। ... মোভ রঙা লঙ স্কার্ট, লাইম ইয়েলো টপে আদুরে মায়া। ... হঠাৎ ডোরবেল টুং টাং। তার ভ্রূ দুটো খানিক জ্যামিতিক ঢঙে কুঁচকে ফের সোজা হল... কৃস্টাল ডিওর মাতাল সৌরভ আর অপার শূন্যতা। ... মেয়েটা হঠাৎ তার মোভ আর লাইম ইয়োলোর সন্ধিস্থলে ... অন্ধকারের চোখ থেকে নেমে আসা রূপালি রেখায় এবার সন্ধ্যাতারা নামুক না নামুক ... ... এভাবে রঙ তুলি দিয়ে ছবি এঁকে গেছেন মেঘ অদিতি, বিভিন্ন কোণ আর সময় প্রেক্ষিতের আলোয় ফেলে দেখে গেছেন আর একটু একটু করে ভরে উঠছে ক্যানভাসের সাদা পাতা। এটিকে মেঘ বলেছেন অনুগল্প। বলতে বাধ্য হচ্ছি এই প্রথম কোন গল্পচ্ছবি পড়লাম আমি। মুগ্ধ হলাম। নতুন অভিজ্ঞতা হল আমার। তুলি আলো বর্ণ গন্ধ দিয়ে একটা অনুগল্পই লিখেছেন মেঘ। ঠিক গল্পটা বলা নেই, আভাস আছে শুধু। তাই অনুগল্প। বাঃ !
‘টারক্যুইজ ব্লু সূর্যাস্তে’ গল্পটাতে দেখি --- ... আহীর ভৈরোঁ অবরোহনে মিশে যায় রোদ, কোমল নিষাদের গায়ে ধৈবত। ... জংলি ফুলের রঙ হালকা থেকে গাঢ় বেগুনি হতে হতে সকালের রোদ সামনে এগোয়। ... ... সব ক্রিমসনে নয় মাঝে মাঝে ইয়োলো লাইম, কার্নিশে টারক্যুইজ ব্লু’র একটা সূর্যাস্ত --, ... শুধু তার রিক্ততাটুকু আঁকিস রঙে। ... এভাবে দৃশ্যে রঙের সাথে সুর ওঠে পড়ে --- অবাক হই যে এরকমও গল্প হতে পারে, আরো অবাক হই একে গল্প হিসেবে গ্রহণ করাতে। বলতেই হয় সাবাশ মেঘ। সময় শূন্যতার বায়োস্কোপ না পড়লে এই অন্যতর গল্পকলা আমার জানাই হতো না। ‘রঙ পালকের ডাকে’ গল্পে স্বপ্নে পাওয়া ভাষায় আলো আর সুর দিয়েই আঁকা হল এক স্বর্গীয় আত্মহত্যার ছবি যেখানে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়াকে পুষ্পরথে চড়া মনে হয়। অপূর্ব। কোথাও মনে হয়নি আমাদের চেনা গল্পের ছাপ নেই কেন, বা মনে হয়নি অ্যাকাডেমি এসব মেনে নেবে কিভাবে। খান্ডব দাহন, উড়ে যাওয়া ছবিদের দুপুর, ভ্রমণ অলীক নয়, ইত্যাদি আরো অনেক মনোমুগ্ধকর গল্প লিখেছেন মেঘ। যেমন ‘ওহ দেবদূত’ গল্পে স্বপ্ন থেকে এক দেবদূত এসে পরপর সিন সিনারিও বদলে দিতে থাকে ম্যাজিক রিয়ালিজমের মতো একের পর এক। যেখানে দাঁড়াই দেখি ভুল দাঁড়িয়েছি ... সিনেমা চলতে চলতে এই বোধোদয় কষ্টকর হলেও পাঠকালে সাবলীল লাগে। ভাল লাগে ‘সময় শূন্যতার বায়োস্কোপ’ মুক্তগদ্যটা।
মেঘের গল্প আর ভাষায় হিউমারের অভাব আছে, যৌনতার অভাব আছে, কখনো শালীনতার বেড়া পেরোয়নি তা, যা এযুগের ট্রেন্ড। চরিত্র হিসেবে সাব-অল্টার্ন অবস্থান নেই তার গল্পে। পেইন্টিং, গান, রঙ, আলো, কবিতা, সিনেমা ... এইসব উপকরণ দিয়ে গল্প লিখেছেন মেঘ অদিতি। প্রতিষ্ঠিত চলমান গল্পরীতি অমান্য করেছন। তার সাহসের তুলনা নেই। ‘সময় শূন্যতার বায়োস্কোপ’ পাঠকের কাছে আদৃত হলে খুশি হবো।

বাংলাদেশের মেয়ে মেঘ অদিতির প্রথম গল্পবই সময় শূন্যতার বায়োস্কোপ প্রকাশক ঃ কলকাতার ঐহিক প্রকাশনী, জুন ২০১৫।

সময় শূন্যতার বায়োস্কোপ
মেঘ অদিতি
ঐহিক প্রকাশনী
প্রথম প্রকাশ -জুন,২০১৫, বাংলা একাডেমী,কোলকাতা
মূল্য- ১৮০/- -ভারত
-২২০/-বাংলাদেশ