কল্পমায়া,ষষ্ঠ পর্ব

নীলাদ্রী বাগচী

বৃষ্টি সুইস রোল এনেছে আজ। রোলের সাথে প্লাস্টিকের ছুরি ফ্রি। স্বচ্ছ প্লাস্টিকের ছুরি। কিন্তু তার গঠন আমার খুব চেনা। এই ছুরি আমার ছোটবেলাতেও ছিল, তবে তা স্টিলের। সোসাইটি বা নিরালায় বাবা মা-র সাথে মোগলাই পরোটা খেতে গেলে স্টিলের ছুরি আর তেমাথা কাঁটা দিত। ব্যাবহারের নিয়ম হল ডান হাতে ছুরি, মোগলাই টুকরো হবে, বাঁ হাতের কাঁটায় উঠে আসবে মুখে। হিডেন হ্যান্ডেল মেথডে কেবল কাঁটার মাথার দিকটা দেখা যাবে, বাকি লুকোনো থাকবে তালুর আড়ালে। কাঁটা ছুরির আওয়াজও না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু আমার হাতে আজও, অন্য কোনও বাদ্যযন্ত্র না বাজলেও, কাঁটা ছুরি বাজবেই। প্লেটের সাথে তাদের সংঘাতে যে সুর মূর্ছনা, চরম শ্রুতিকটু ও বাজে, তাকে আমি এড়াতে পারি না। শৈশবে মাফ ছিল এইসব শব্দ অসভ্যতা। ভয়ঙ্কর কসরত করে এক কি দু টুকরো কাঁটা দিয়ে খেতাম। মোগলাইয়ের মুচমুচে অংশের খানিক আমার পোশাকে যেই না ভেঙে পড়ত আমার কাঁটা চামচ ব্যাবহারে ইতি পড়ে যেত। তারপর আলু পেঁয়াজের গা মাখা একধরনের ঝোলে ( যে ঝোলে মাংসের স্বাদ ও গন্ধ দুটোই পেতাম ) মোগলাই ডুবিয়ে ডুবিয়ে হাত দিয়ে খেয়ে রেস্তোরাঁর বেসিনে মুখ ধুয়ে, সামনের ঝাপসা আয়নায় নিজের মুখ তো দূরে থাক চুলও দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়ে বাবা মার সাথে বেরিয়ে পড়তাম রাস্তায়। গন্তব্য কোনও ছোটো ওষুধের দোকান বা রেডিমেড কাপড় জামার দোকান কিম্বা বইয়ের দোকান। মানে নানানরকম মফস্বলি সান্ধ্য বাজার করা আর কি।

আর এইসব মোগলাই সন্ধ্যার বাজারের প্রস্তুতি শুরু হত দিনের বেলায়। “শিল পাটা ধার করাবেন, শিল পাটা” দুপুরে আমি বারান্দায় গল্পের বই কোলে বসে থাকতাম। দেব সাহিত্য কুটির শারদীয়াই যদি না হয় তো জিম করবেট অমনিবাস। রান্নাঘর থেকে পোস্ত ভাজার গন্ধ আসত, আলু পোস্ত ও পোস্তর বড়া তার মানে নিশ্চিত। ভেতরে আনন্দ পাক দিত, প্রিয় খাবারের আনন্দ- বিউলির ডাল, পোস্তর বড়া আর আলু পোস্ত। এর সাথে আর কিছু থাক বা না থাক দুপুরে দারুণ খাওয়া হবে, এই ভেবে আমি চোখ তুলে এক বিঘৎ উঠোনের বাসক পাতার গাছকে দেখতাম, গন্ধ ভেদাল লতাকে দেখতাম, শিশু গোলাপের চারাকে দেখতাম।

মা রান্না চাপিয়ে ভেতরের ঘরে এসে বাবাকে বলত বিকেলে বেরোনোর কথা। কাঠের খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে আমি সেই কথা শুনতে পেতাম। বাবা রাজি হয়ে উঠে পড়ত বই পড়া থেকে। মা রান্নাঘরে ফিরে যেত। বাবা আলমারি খুলে আমাদের জাগতিক সম্পদের মধ্যে যেটা আমার কাছে সবচেয়ে দুর্মূল্য মনে হত সেই রেকর্ড প্লেয়ার বার করত। রেকর্ড প্লেয়ারের ঢাকনা খোলার শব্দে আমি আমার বইকে হাতে বন্ধ করে, যে পৃষ্ঠা পড়ছিলাম সেইখানে আঙুল গুঁজে, শোবার ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াতাম। কোন গান বাজবে তা নিয়ে আমার তেমন কৌতূহল ছিল না। আমি দেখতে যেতাম গান যে ভাবে বাজবে সেইটা। প্রথমে ঢাকনা (যেটা আসলে স্পিকার) জোড়া হবে মুল যন্ত্রের সাথে, তারপর অ্যাডপ্টার লাগিয়ে সুইচ অন করলে কালো চাকা পাক দিয়ে উঠবে। কালোয় কালো মিলিয়ে রেকর্ড বসানো হবে, তার ওপর চাপান হবে পিন। একটু মৃদু ঘ্যাস ঘ্যাস আওয়াজের পর গান বেজে উঠবে। আমি অপেক্ষা করে থাকতাম গান বেজে ওঠা পর্যন্ত। গান শুরু হলে ফিরে যেতাম খুঁটিতে হেলান দিয়ে বই পড়তে। আলকাতরা রঙ করা ওই খুঁটি আমার খুব প্রিয় ছিল। খুঁটির সমস্ত ভাঁজ, পোকায় কাটা গর্ত আমার চেনা ছিল। এক এক গর্তে আঙুল ছোঁয়ালে আমার এক এক বয়সের নানান গল্পকে ছোঁয়া যাবে। বেশীর ভাগই কল্পনা, নিজের সীমিত শব্দ মামুলি অনুভুতির তালমিলে গড়ে ওঠা সাধারন কল্পনা। তবুও আহা কল্পনা! আমার কাছে আজও তারা অসীম মূল্যবান। যেন তাদের ঠিক মতো লিখে ফেলতে পারলে বাংলাভাষায় কোনোদিন না পড়া আশ্চর্য কথামালা সব লেখা হয়ে যাবে। এমনই এক হাস্যকর ধারণা মনের গহীনে, আমি জানি, আজও লালিত হচ্ছে যত্নে, অসীম যত্নে।

আসলে, গ্রীষ্ম দুপুরের মেঘ রোদ্দুর ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা আকাশের নীচে বাসক ও গাঁদালের মিশ্র মিষ্টি- কটু ঝাঁঝালো গন্ধের সাথে রান্নাঘরে হলুদ বাটা আর বাইরে গলিতে হওয়া “মা ভিক্ষা দিবেন মা, মা, মাগো” শব্দাবলী একাকারে যে পরিবেশ এসে আছড়ে পড়ত কালো খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসা শীর্ণ বালক ও তার আশপাশের চটা ওঠা মেঝেতে সেই পরিবেশকে আরও নিবিষ্ট করে তুলতে থাকত জিম করবেটের উত্তরাঞ্চল হিমালয়ের উপল বিকীর্ণ নদী, মাইল মাইল বনভুমি, ধূর্ত শ্বাপদ, নিরীহ গ্রামবাসী। আর এ সমস্ত খণ্ড অনুভূতিকে এক সুত্রে কল্পনাতীত এক কণ্ঠস্বরে ‘নীরব নয়ন ধারে আমি ভাসি গো’ দিয়ে গেঁথে এক অসামান্য উচ্চতা দিতেন তিনি। সেই উচ্চতাতে আরোহণ করে বালক তার কল্পনার পোশাক বুনতে আরম্ভ করত। বই খোলা কিন্তু চোখ মেঘ রোদ্দুরের ছোঁয়াছুঁয়ি ছুঁয়ে আছে; সামনের অন্য একটা আলকাতরা রঙা কাঠের খুঁটিতে সার দিয়ে উঠে যাচ্ছে সুড়সুড়ি পিঁপড়েরা, দু একটা নামছেও বা, সেই দৃশ্যে চোখ কখনো কখনো ফিরে আসত, স্থির হত, পুনরায় ফিরে যেত মেঘ ও রৌদ্রে। আর তিনি অনায়াস কান ও চেতন আছন্ন করে দিতেন, ‘বঁধুর মনে মন চায় মিশিতে’, ‘জীবনে সবই যেন ভুলে ভরান/ সে প্রিয় হল কেন পরবাসী গো/ বাজে না বাঁশি গো’।

বঁধু, প্রিয়, পরবাসী আর অবশ্যই ভুল এই সব শব্দে কি ছবি তৈরি হত? আর কার ছবি? প্রতিবার নানা গানে আমি এই ছবি বা মূর্তির কথা এলে কেমন থম মেরে যাই। ক্রমশঃ গানের আড়ে নিজের নানান বয়সকে দেখে নেওয়ার মজা এক বেদনাদায়ক স্মৃতি হাতড়ানো প্রতিযোগিতায় পরিণত হচ্ছে। কেননা মনে করতে পারছি না কি বা কে সেই কল্পনা। কিন্তু কল্পনা তো ছিল। প্রবল কল্পনা। যে কল্পনা জিম করবেটের বনাঞ্চলকে হারিয়ে যেতে না দিয়ে তাকে দোসর করেই চরাচরকে সাক্ষী করে মেঘে রৌদ্রে তার নিশান ওড়াত। সে নিশান কতক আজকের হনুমানজির নিশানের মতোই দেখতে হয়ত, তবে তার রঙ ছিল সাদা। অপরূপ সাদা। সাদা সেই তখন থেকেই আমায় টানে। সাদা মহার্ঘ্য। সাদা পৃথক। সাদা শুরুর ইঙ্গিত। সাদা সমাপ্তিও। আজও আমি সাদা পোশাকে অস্বস্তিতে থাকি এই বুঝি অপরিচ্ছন্ন করে ফেললাম। কিন্তু সে বাহ্য, আসলে সাদার আকর্ষণ প্রবল আমার কাছে। ঘন সাদা, যে যে কোনও কলঙ্ক রেখা গ্রাস করতে পারে তারই নিশান উড়ত সেই সব দুপুরে; বাজে না বাঁশি গোর দুপুরে। এক দুপুরে এক গানই যথেষ্ট কিন্তু তিনি শচীন দেববর্মণ, রাজপুত্র তিনি, বাস্তবিকেই; ফলে তাঁর গান কখনো একা হয়ে আসে নি আমার কাছে। সে বাল্যর রেকর্ড প্লেয়ার দিনেই হোক বা এখনকার বারানসি ইউ টিউব রাতেই হোক। তিনি আসেন সম্ভার নিয়ে, রাজপুত্রের যেমন আসা উচিত। তারপর ছড়িয়ে দেন তাঁর উপঢৌকন, একের পর এক আর কানে, মনে সে ঐশ্বর্য কুড়োতে কুড়োতে সেলাম বাজাতে থাকি আমি।