নো ম্যানস্ ল্যাণ্ডের বিষণ্ণতা ও শোপেনহাওয়ার

সীমা চৌধুরী

You are in no man’s land; Which never moves, which never changes, which never grows older, but remains forever, icy and silent”
-Harold Pinter, No Man’s Land: Pinter: Plays
"
১৮৬০সালের ২১ শে সেপ্টেম্বর একাকী প্রাতঃরাশ করতে বসেছিলেন তিনি। কিছুক্ষণ পর বাড়িওয়ালী এসে দেখলেন চেয়ারে বসা হিমশীতল তাঁর শরীর। তিনি আশ্রয় নিয়েছেন চিরনিদ্রার দেশে। পাশে বসে তাঁর বেড়াল। জীবনের শেষ ত্রিশ বছর তিনি বাস করেছিলেন ভাড়া বাড়ীর দুটি ঘরে। নিঃসঙ্গ, একাকী। সঙ্গে শুধু ছিল তাঁর কুকুর আত্মা।
তিনি কাউকে বিশ্বাস করতে পারেন না। সবই যেন মৃত্যুর রক্তদীপময় অন্ধকারে আচ্ছন্ন। দাড়ি কাটতেও তিনি ভয় পান, যদি ক্ষৌরকার তাঁর গলায় শাণিত ক্ষুর বসিয়ে দেয়। বাঁচার জন্য শ্বাসবায়ুর অনুসন্ধান করে চলেছেন তিনি নৈঃশব্দের নির্জনতায়। শব্দহীন পৃথিবীর সঙ্গলাভের লিপ্সায় মানুষের সংস্পর্শ ত্যাগ করতেও তিনি কুণ্ঠাহীন। তাঁর বন্ধু নেই , মা নেই, স্ত্রী নেই, পরিবার পরিজন নেই। আছে শুধু বিষণ্ণতা। যেন নো ম্যানস্ ল্যাণ্ড(No man’s land)- এর চিরবিষাদসিন্ধুর তটভূমিতে নক্ষত্রহীন অমানিশার মধ্যে তিনি অনুভব করতে চেয়েছেন জীবনের শুদ্ধতম রূপকল্পকে। তিনি আর কেউ নন- তিনি চির বিষণ্ণতার দার্শনিক আর্থার শোপেনহাওয়ার।
১৭৮৮ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারী পোল্যাণ্ডের ডানজিগে তাঁর জন্ম। পিতা ছিলেন ব্যবসায়ী। তাই স্বাভাবিকভাবেই টাকা পয়সার লেনদেনের মধ্যে বেড়ে ওঠা, মানুষের ধরন ধারণ সম্পর্কে বেশ সন্দিহান ও বাস্তববাদী করে তুলতে চাইল তাঁকে। বাবা আত্মহত্যা করেন। ঠাকুমা উন্মাদিনী হয়ে মারা যান। মা মুক্তপ্রেমে বিশ্বাস করে ভাইমার চলে যান। মা’র সঙ্গে নিরন্তর বিরোধ ও মতপার্থক্য নারীদের সম্পর্কে অদ্ভুত কিছু সাধারণীকৃত ধারনা সৃষ্টি করে তাঁর মানসলোকে। যেমনটা করেছিলেন শেক্সপিয়ারের হ্যামলেট, “Frailty! Thy name is woman.”।মা’র স্নেহ ভালোবাসার রসে যিনি সিক্ত হননি, তিনি যে নিখিল বিশ্বকে প্রেমহীন মনে করবেন তাই তো স্বাভাবিক। নারীর ক্ষণিক ভালোবাসায় শান্তি আসেনি তাঁর বিষণ্ণতার কুয়াশা মোড়া হৃদয়ে।
কান্ট আর ভারতীয় দর্শন বাদ দিয়ে বাকি সমস্ত কিছু নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন তিনি। ভাবনার নিজস্বতায় রচনা করেছেন দার্শনিকতার নতুন পাঠঃ ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাজ উইল অ্যান্ড আইডিয়া’। পাশ্চাত্য দর্শনের এক মহাগ্রন্থ। যে শোপেনহাওয়ারের ‘will’ এ আচ্ছন্ন হয়ে পড়বেন নিৎসে। ভাবশিষ্য নিৎসে তাঁকে ছাড়া আর কোনও দার্শনিককে স্বীকারই করেননি। নিৎসের ‘সুপারম্যান’ (বা উবেরমেন) এর পথদ্রষ্টা তিনি। ভাগনার স্বীকার করে নেবেন তাঁর ওপর শোপেনহাওয়ারের সীমাহীন প্রভাব। শোপেনহাওয়ারের আধ্যাত্মিকতার সুখে সমাহিত হয়ে পড়বেন তলস্তয়।
অথচ বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে আর তাঁর বইকে অস্বীকার করেছিল। তাঁর মহাগ্রন্থটি সম্পর্কে কেউ বা বলেছিল, বাজে কাগজের ঝুড়িতে নিক্ষিপ্ত হয়েছে বই। শোপেনহাওয়ারের উত্তর, গর্দভ যদি আয়নার দৃষ্টিপাত করে, সেকি দেবদূতের প্রতিবিম্ব দেখতে পাবে? নিৎসে লিখলেন, জার্মান পণ্ডিতেরা তাঁদের সঙ্গে শোপেনহাওয়ারের অমিল দেখে রাগে অন্ধ হয়ে ওঠেন।
শোপেনহাওয়ার কিন্তু বিশ্বাস করতেন, দর্শনের নবদিগন্ত আবিষ্কৃত হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডির বাইরে। ব্যক্তির ইচ্ছাকে একান্ত আন্তরিকভাবে অনুধ্যান করতে চেয়েছিলেন তিনি। যুক্তিহীন, অর্থহীন আকাঙ্ক্ষাই পৃথিবীতে মানবকর্মের প্রধান প্রেরণাশক্তি।শোপেনহা ওয়ারের ‘will’ বস্তুত ক্ষতিকর ও অশুভ এক ‘অস্তিত্ব’ যাকে এক যৌনতামুক্ত শুদ্ধতা ছাড়া কোনোভাবেই প্রতিরোধ করা যাবে না। আকাঙ্ক্ষা শুধু যন্ত্রণাই দিয়ে থাকে। তাঁর চেতনা যেন অনেকাংশে মিলে যায় প্রাচীন ভারতীয় বেদান্ত ও বৌদ্ধিক দর্শনের সেই শাশ্বত সত্যের কাছে আকাঙ্ক্ষাই সমস্ত দুঃখের মূল।
যুক্তিকে কখনোই স্বীকার করতে চাননি শোপেনহাওয়ার। অনুভূতিগ্রাহ্য অন্তর্দৃষ্টিই(Intuition)মান ষের অন্তরের শাশ্বত ও চিরন্তন সত্য। তাই হেগেলের সমাজ নিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিচেতনাকেও অস্বীকার করেছেন তিনি।
সঙ্গীতই হল তাঁর কাছে শিল্পের পরিশুদ্ধতম রূপ। চিরন্তন, অবিনশ্বর, সার্বজনীন। তাঁর ভাবনা, ধ্যান ধারনা , উপস্থাপনা ছিল পৃথিবীকে ঘিরে। পৃথিবীই শেষ বিচার। করুণাই পারে একমাত্র স্বার্থচিন্তা, ক্রোধ ও মাৎসর্যকে অতিক্রম করতে; নৈতিকতার পথে চালিত করতে।
যৌনতাকে কখনই অস্বীকার করতে চাননি শোপেনহাওয়ার। বরং তিনি বিস্মিত হয়েছেন দার্শনিকরা কেন কখনও যৌনতার মত অপরিহার্য উপাদানকে ব্যাখা করবার প্রয়াস করেননি। মানুষের অভ্যন্তরে এই প্রবল প্রবৃত্তি যুক্তির আগে ক্রিয়াশীল। যাকে তাৎক্ষণিক মনে করলে ভুল হবে। তা গভীর ও অতলান্ত; তা সৃষ্টি করে নতুন প্রজন্মের। ফ্রয়েডেরও অনেক আগে যৌনতাকে নিয়ে এমন যুক্তিশীল ভাবনা প্রকাশ করেছেন শোপেনহাওয়ার।
নিজস্বতা ছিল তাঁর মজ্জাগত। পশুদের প্রতি ছিল আন্তরিক সহমর্মিতা। এক যৌথ অস্তিত্বে মানুষ ও পশুর প্রকৃতির মেলবন্ধন দেখতে চেয়েছিলেন তিনি।
বিষণ্ণতার তমসায় সদাচ্ছন্ন তাঁর ভাবনা। তিনি পৃথিবীর বিষন্নতম দার্শনিক। হতাশা থেকেই উৎসারিত তাঁর অন্তর্দৃষ্টি। আমি শুনতে পাচ্ছি, নো ম্যানস্ ল্যাণ্ডের নীল নির্জনতায়, স্নায়ুসুষুম্না আচ্ছন্ন করা অপার বিষণ্ণতায় দাঁড়িয়ে আছেন একাকী এক পুরুষ। স্থির , অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে নিষ্পলক তাকিয়ে আছেন শোপেনহাওয়ার।
ছোটবেলায় ইংরেজির পাঠ নেবার সময় টেন্স(tense)পড়েছিলাম – পাস্ট(Past), প্রেজেন্ট(Present) আর ফিউচার (Future)টেন্স(tense)। তখন ইংরেজি গ্রামার টুকুই শিখেছিলাম পরীক্ষা বৈতরণী পার হবার জন্য। ‘ক্রিয়া কালে’র গুরুত্ব উপলব্ধি করবার মত জীবনবোধ তৈরি হয়নি। আজ ‘নো ম্যান্স ল্যাণ্ড’ নিয়ে লিখতে বসে মনে হচ্ছে, সে তো শুধু দুটি বিবদমান দেশের মাঝখানে হিংসা জর্জরিত স্থানটুকু নয়; সে আমার কাছে অতীত আর ভবিষ্যৎ এই দুই বিবদমান কালের মধ্যেকার খণ্ডসময় – বর্তমান কাল। যাকে নিয়েই আমাদের বেঁচে থাকা।
অতীত আর ভবিষ্যতের মহাসময় যদি না থাকত তবে যে বর্তমানের এই খণ্ডসময়টুকুও মূল্যহীন।বর্তমান যেন সেতুর মত বেঁধে রেখেছে অতীত আর ভবিষ্যতকে।
ধ্যানসিদ্ধ যোগী বলেছেন, অতীতের স্মৃতিকে বিস্মৃত হয়ে আর অনাগত আশা আকাঙ্ক্ষাকে দূরে সরিয়ে রেখে শুধু ইদানীং-এর স্বাদটুকু নিয়ে বেঁচে থাকতে।তাতেই আসে জীবনের পূর্ণতা। কিন্তু বর্তমানের রসাস্বাদন করে বেঁচে থাকা তো কেবল ধ্যানসিদ্ধ মুক্ত যোগীর পক্ষেই সম্ভব। সংসারজীবনে হাজারো দায়বদ্ধতার যান্ত্রিক জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে কি সম্ভব অর্ধবিস্মৃত অতীত আর অনাগত আগামীর ভাবনাকে অস্বীকার করে শুধু বর্তমানের খণ্ডসময়ে বেঁচে থাকা? আমি তা মনে করি না।
অতীতকে শ্রদ্ধা করে, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে, স্মৃতির ওপর নির্ভর করেই তো গড়ে ওঠে আমাদের অনুমান, প্রত্যক্ষ, শব্দপ্রমাণ। বর্তমানে বাস করেও অতীতকে ধরে রেখেই তো তাকিয়ে থাকি অনাগত ভবিষ্যতের দিকে। পূর্বকৃত কোনও কৃতকর্মের আত্মগ্লানি থেকে যখন অনুতপ্ত হয়ে বলে উঠি, “আর কক্ষনো করব না”; তখন তো স্বীকার করে নিই অতীতের করা কাজটাকে। অনুতাপ থেকে জন্মানো এই সজাগ প্রতিশ্রুতি ত ভবিষ্যতমুখী। কখনো বা যন্ত্রণা বেদনার অব্যক্ত স্মৃতি ভুলে আদেশ অনুরোধ দিয়ে প্রিয়জনকে বলি, “অতীত ভুলে যাও।” সে সময় তো স্বীকার করতে বাধ্য হই অতীত আর ভবিষ্যৎ- এই দুই কালকেই।‘নো ম্যান্স ল্যাণ্ড’ যেমন মাঝখানে দাঁড়িয়ে শত যন্ত্রনাতেও দুপাশে ধরে থাকে বিবদমান দুটি দেশকে; তেমনি সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনা নিয়ে আমাদের বর্তমানে বেঁচে থাকাটাও অনেকটা অর্ধবিস্মৃত অতীত আর অনাগত আগামীর মাঝখানে অনেকটা স্যান্ডউইচের পুরের মত। আগামী সময়ে আমরা কেমন সমাজ গড়ব, তার দিশা নির্দেশিকা পেতে হলে আমাদের তো ফিরে যেতে হবে অতীতেরই কাছে। বলতে হবে, “অতীত, তুমি কথা বল। পথ দেখাও ভবিষ্যতের।” আজকের এই খণ্ড সময় যে অতীত ও আগামী- ক্রিয়ার এই দুই কাল ব্যতিরেকে অসম্পূর্ণ। অনেকটা সেই ‘নো ম্যান্স ল্যাণ্ডে’র মত- দুটি যুদ্ধরত দেশ ছাড়া তার কোনও অস্তিত্বই নেই।শোপেন হাওয়ার থেকে আমি – এ অন্তর্মুখী পর্যটনে আসলে আমরা সেই না মানুষী ভূখণ্ডে আজও।