বিপন্ন নার্সিসাস

অমিতাভ মৈত্র


The desert is not only around the corner
The desert is squeezed in the tube train next to you,
The desert is in the heart of your brother’’.
Choruses from ‘The Rock ‘-T.S.Eliot

আমাদের চারপাশে , আমাদের গা ঘেঁষে, আমাদের ভেতরে এই মরুভুমিকে দুরারোগ্য কোনো অসুখের মতো বা অসুখের সম্ভাবনার মতো সারজীবনবহন করে চলি আমরা। এই এক ভূখণ্ড যাকে সহ্য করা যায় না, সরিয়ে রাখাও যায়না।কেননা কখনও স্বেচ্ছায়, নিজের মুদ্রাদোষে,আবার কখনও আমাদেরই অসহায় নিরুপায়াতায় ,সমস্ত সেতু ভেঙে দিয়ে,সমস্ত নৌকায় আগুন লাগিয়ে এই মরুভুমিতে একসময় পা রাখতে হয় আমাদের।এই ‘নো-ম্যান্স-ল্যান্ড’ এ নিজের মধ্যে ডুবে থাকার জায়গাটুকু ছাড়া আর কিছু নেই।আর সবার জন্য এই জায়গাটুকু নিষেধের দেশ , ‘আউট অফ বাউন্ডস’।সে তখন হয়ে ওঠে স্থির কোনো মূর্তি যার অনেক ভেতরে রয়ে গেছে হৃদস্পন্দনের শব্দ,রক্তের গমনন্ধনি।জীবনের চিহ্ন বলতে এতুকুই।অথবা সে যেন কোনো ঘর,যার জানলা দরজায় কুলুপ আঁটা।যোগাযোগহীন এক দূরত্বে নিজেকে নির্বাসন দিয়েছে যে। দুর্গম করে নিয়েছে নিজেকে।যেন কোনো কাচের দেয়ালের ওপারে সে যার সান্নিধ্য পাওয়া যায় না,অ-স্পশের এক বলয় ঘিরে আছে থাকে। যেমন ছিলেন কাফকা।
কাফকা যখন
“আমরা তাকে পছন্দ করতাম,প্রশংসাও করতাম।কিন্ত কখনও ঘনিষঠ হতে পারতাম না।এক কাচের দেওয়ালে সব সময় নিজেকে ঘিরে রাখতে সে। নিজের প্রয়োজনে শুধু সে মাঝে মাঝে খুলত সেই ঘর-শান্ত মদু হাসি দিয়ে।কিন্তূ নিজেই তা বন্দ করে দিত।তাকে আরো বেশি করে বুঝতে চেয়ে কেউ যদি সেই দেওয়াল সরিয়ে দেবার চেষ্টা করত,সে শুধু তাদের থেকে সরিয়ে নিত নিজেকে মদু হাসির সঙ্গে।‘’ এমিল উলিজ,কাফকার কাছাকাছি ছিলেন যিনি,এভাবেই বননা করেছেন কাফকাকে।তাঁর পরিচিতদের মধ্যে অনেকেই বলেছেন যে তাঁর আবেগের অভিব্যক্তি ছিল বিভান্তিকর।প্রবল শোকেরা মুহরতে হেসে উঠতেন তিনি।হাহাকারে ভেঙে পড়তেন যখন তিনি সুখী, আনন্দিত।
“my headaches seem to have washed away with the flow of blood’’- গলা থেকে গমকে গমকে ছিটকে বেরিয়ে আসা রক্ত প্রথমবার দেখে কাফকার মনে হয়েছিল এ এক ধরনের পাপস্থলন এবং এই রক্তপাত তাঁকে পরিশুদ্ধই করেছে।যক্ষ্মা – রোগকে তিনি মিলিয়ে দিলেন বলি-দেওয়া পশুদের গলা থেকে ঝরে পড়া পবিত্র রক্তের ধারনার সাথে এবং এভাবেই নিজেকে তিনি করে তুললেন তাঁর লেখার কোনো চরিতের মতো অস্বাভাবিক এক মেটাফর।তিনি চাইছিলেন তাঁর অসুখের একটা মেধাবী অর্থ থাকুক তাঁর লেখার মতোই।নিজের যক্ষ্মা নিয়ে তাঁর পাথমিক আশ্চর্যবোধ তাঁকে নিয়ে গেল ৈশশবের স্তরে।অসুখটা তাঁর কাছে হয়ে উঠল মায়ের মতোন যে মা তাঁর প্রিয় পালক,প্রিয় ধাত্রী আর প্রিয়তম নিভরতার ভূমি।বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে তিনি লিখলেনঃ
In any case my attitude towards the tuberculosis today resembles that of a child clinging to the pleats of his mother’s skirts. if the disease came from my mother the image fits even better, and my mother in her infinite solitude, which far surpasses her understanding of the matter, has done me this service also.I am constantly selling an explanation for this disease,for I did not seek it.Sometimes,it seems to me that my brains and iungs came to an agreement without my knowledge.”Things can’t go on this way”, said he brain and after five years the lungs said they were ready to help.
নিজের অসুখ নিয়ে তিনি শুরু করলেন এক ধরনের বিশ্লেষণ এবং সত্যাণষেণ।মোটামুটি একটা সিধান্তেও এসে পৌঁছলেন;the infection in your lungs in only a symbol and whose depth is its deep justification; if this is so then the medical advice(light, air, sun, rest)is also a symbol . যদিও অসুখটা ছিল বাস্তবিক,কিন্তু কাফকার দরকার হলো তাকে একটা প্রতীকে পরিবর্তিত করা,যেন এই প্রতীকের মধ্যেই রয়েছে তাঁর রোগমুক্তি,তাঁর শক্তি।অসংখ্য চিঠিতে,ব্যক্তিগত ডায়েরির পাতায় পাতায় বারবার তিনি বলেছেন যে রোগাক্রান্ত হবার আশঙ্কা তাঁর ছিল অনেকদিন থেকেই,কিন্তু অসুখ যে এমন চেহারার আসবে তাঁর ধারনায় ছিল না।তাঁর বান্ধবী মিলেনা সেনস্কাকাকে ১৯২০ সালের নভেম্বরে তিনি লিখলেন:All these alleged diseases, sad as they may seem ,are matters of faith, anchorages in some maternal ground for souls in distress.
ফেলিস বাউয়ার-যার সাথে কাফকার প্রথম দেখা হয় বন্ধু ম্যাক্স ব্রড- এর বাড়িতে এবং যার বিষয়ে ডায়েরিতে তিনি লিখেছিলেন-‘Bony,empty face that wore its emptiness openly’ সেই ফেলিসের সাথে তীব্ব আবেগঘন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লেন কাফকা।১৯১৪ সালে বাবা-মা এবং বোনের উপস্থিতিতে ফেলিসের সাথে এনগেজমেণ্ট হয়ে যাবার কয়েক সপ্তাহ পরেই তা ভেঙে দিলেন কাফকা।১৯১৭ সালে আবার এনগেজমেণ্ট এবং আবার ভেঙে দেওয়া।একদিকে শারীরিক সম্পর্কে তাঁর পবিএ ভয়,নিজেকে্ অপবিত্র র ছাপ লাগিয়ে দেওয়া(“I am dirty, Milena, infinitely dirty, this is why I scream so much about purity.”)এবং ফেলিসকে যক্ষ্মা রোগের দিকে ঠেলে দেবার ভয় থেকেই এই বিচ্ছিনতার সিধান্ত।এবং তাঁর নিজের উদ্ভাবিত ভ্যানপ্যইয়ারের মেটাফর,যা থেকে তাঁর মনে হছে তাঁর অসুস্থতা,তাঁর গলা থেকে রক্ত পড়ার কারনে ফেলিস,যিনি তাঁর শারীরিক শক্তি এবং লেখার জগং থেকে তাঁকে সরিয়ে দিচ্ছেন।আবার, তিনিই দায়ি করছেন অনুভুতিহীন বাবাকে-যার চাপে অল্প বয়সে তাঁকে থাকতে হয়েছিল বাড়ির বাইরে স্যাঁতস্যাঁতে একটা ঘরে এবং এই অসুখটিকে গ্রহন করতে হয়েছিল।কিন্তু এসবের ভেতরে প্রবাহিত ছিল তাঁর মুক্তিহীন হীনণ্ণণ্যতা।নিজেকে তিনি চিহিত করেছিলেন-কিছুটা তাঁর অসুখের ধরনের জন্য হয়তো-একজন কুৎসিত মানুষ হিসেবে,কখনো সুন্দর হবে না জে,সুস্থ হবে না।এ কারনেই সুন্দর কোনকিছু তিনি অরজন করতে পারেন না।
কাফকার অসুখ নিয়েই একটানা এতো কথা বলার একটা ব্যাখ্যা আমার নিজের মতো করে দেবার চেষ্টা করি? অজস্র চিঠিপত্র,ডায়েরি ঘেঁটে দিনের শেষে যে কাফকাকে আমরা পাই সেখানে নিজেই তিনি তাঁর ভাবনা,অনুভুতি,প্রেম,ঘী না,অপমানের কেন্দ্রে রেখেছেন নিজেকে।তাঁর অসুখ,তার প্রেম,বন্ধুতা,তাঁর পরিচিত মানুষজন-সবকিছহুতেই তিনি নিজের ধরনে বিস্লেসন করে বুঝে নেবেন এবং তাঁর অনড় বিশ্বাসের সিলমোহর লাগিয়ে দেবেন।অসুখ নয়,তাঁর ধারনা,প্রেম নয়, তাঁর ধারনা;জীবন নয়,তাঁর ধারনাই শুধু বুঝবেন তিনি।যা তাঁর লেখার বিষয় হবে না,তাঁর কোনো আগহ থাকবে না সেই বিষয়ে।তিনি বিশ্লেষণ করবেন নিজের অনড় অবস্থান থেকে,এবং শেষ পনযন্ত সার্বিকভাবে প্রত্যাখ্যান করবেন,গ্রহণ করবেন না।তাঁর বিপুল সংখ্যক চিঠি এবং ডায়েরির পাতায় এমন কিচ্ছু নেই যা আত্ম সংশোধনের মতো ,নিজের ভুল স্বীকার করার মতো।এক বিপন্ন নার্সিসাস যে নিজে বাঁচতে চায় না এবং অন্যের বাঁচায় যার কোণো আগহ নেই।কঠিন,অনতিকম্য এক কাঁটাতারের বেড়ার ভিতরে নিজেকে রেখেছিলেন কাফকা।সারাজীবন সেই বেড়া আরো দুর্গম হয়েছে,আরো দুষ্প্রবেশ্য হয়েছে।যারা কাছে ছিলেন অথবা কাছে এসেছিলেন তাঁর,যারা স্পর্শ করতে চেয়েছেন তাঁকে,শক্ত কাচের দেওয়ালে তাঁদের হাত ধাক্কা খেয়েছে,রক্তাক্ত হয়েছে।তিনি লক্ষও করেননি কিছু, কেননা সম্পর্ক ও রক্তমাংসের মানুষজনে আস্থা ছিল না তাঁর। সবকিচ্ছুই তাঁর কাছে ছিল বিশুদ্ধ সাহিত্যিক উপাদান মাত্র।সাবিকভাবে অভিশপ্ত একজন মানুষ ,যার অভিশাপ উঠে এসেছে তাঁর নিজের ভেতর থেকে।তার নিজের মুদ্রাদোষে জীবন থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছেন তিনি।যেমন হয়েছিলেন নার্সিসাস।যে দুর্গম নেআ-মান্স ল্যান্ড নিজেকে ঘিরে তৈরি করেছিলেন কাফকা,তা ছিল তাঁর মেধার খাবার।তাঁর লক্ষ্য ও উদেদশো ছিল যন্ত্রণাঋদ্ধ এক মেধার উওরণ।সম্পূর্ণ নির্মোহ হয়ে নিজেকেই তিনি করেছিলেন তাঁর সাহিত্য রচণার উপাডাণ।কিনতু নার্সিসাস ঠিক এর বিপরিত।আত্মমুগ্ধতাই ছিল তাঁর অপরাধ ও শাস্ত্রির কারন।
এবার নার্সিসাস
বনের মধ্যে শান্ত এক সরোবরের নিস্পদ জলের ওপর ঝুঁকে আছে এক অপরূপ রুপবান তরুন।এলাকার অসংখ্য নারীপুরুষ তার প্রেমে দিশেহারা,কিন্তু এক নির্বিকার অবজায় সেই তরুন প্রতিহত করে সবাইকে।তার কাছে আসতে পারে না কেউই। তার স্পর্শসিমার বাইরে জলের ওপর তার প্রতিবিম্ব।দুরতিক্রম ্য ব্যবধান তাঁদের মধে।কিন্তু সেই প্রতিবিম্ব সেই ছায়ামূর্তি ছাড়া আর কোনো জাগতিক অন্বেষণে সে নেই।এই তার মোহাবরন,তার প্রেম।
সেপিসাস নামের নদ অস্পারা লিরিওপকে সোতের ঘূরনির মধ্যে হরন করে যা থেকে নার্সিসাসের জন্ম।তিরসিয়াসের কাছে সন্তানের ভবিষ্যাত জানতে চাইলে তিরেসিয়াস রহস্যময়ভাবে বলেন,সে দীর্ঘজীবী হবে যদি নিজের সে সম্পর্কে সে জানতে না পারে।
গ্রিস এবং রোমের মিথে নার্সিসাসের কাহিনি আছে।গ্রিসের কবি বলেছেন,তরুন আ্যমিনিয়াস নার্সিসাসের কাছে প্রেমের প্রস্তাব দিলে তার স্বভাবমতো নাসিসাস সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আর একটি তরবারি বাড়িয়ে আ্যনিমিয়াসকে।নার্সিস াসের দরজার সামনেই সেই অস্তে আত্মহত্যা করে আনিমিয়াস।মৃত্যর আগে সে দেবতাদের কাছে প্রাথনা করে নার্সিসাসের শাস্তির জন্য।
রোমের কবি ওভিদের হাতে এই কাহিনি অবশ্য বদলে যায় একটু।যখন ষোল বছর,নার্সিসাস একদিন বনে গেছে হরিণ শিকার করতে,তখন ইকো,পর্বতবাসী অপ্সরা,তার প্রেমে পড়ে এবং অনুসরন করে তাকে।ব্যাপারটা বুঝতে পেরে নার্সিসাস বলে ওঠে-‘কে ওখানে?’ নিজে কথা বলতে পারতো না ইকো, শুধু কারো কথায় প্রতিধ্বনি করতে পারতো। নার্সিসাস সেটাই শুনতে পায়।এরপর,অন্তরাল থেকে বেরিয়ে আসে ইক।নিজের পরিচয় দেয়।একটি ঘন মুহূর্তে আলিঈন করতে যায় নার্সসাসকে।নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ধমকে তাকে দূরে সরিয়ে দেয় নার্সিসাস।অপমানিত লাঞ্ছিত ইকো সবকিচ্ছু ছেড়ে এক বিজন উপত্যকায় ছলে যায়।জীবনের সবকিচ্ছু পরিত্যাগ করে একসময় সে বাতাসে মিলিয়ে যায়।থেকে যায় শুধু প্রতিধ্বনি আর তার পাথর হয়ে যাওয়া হাড়।
নার্সিসাসের এই প্রত্যাখানের শাস্তি দিলেন প্রতিহিংসার দেবী নেমেসিস।বনের মধ্যে শান্ত সরোবরে নিজের প্রতিবিম্বের অমোঘ আকর্ষণে সে জলের প্রান্তে নিনিমেষ অপেক্ষা করে।জল ছুয়ে সে প্রতিবিম্বকে স্পর্শ করতে গেলে জলের কম্পনে হারিয়ে যায় সেই মুখ।নিজের বক্ষবরন ছিন্ন করে সে হাহাকার করে।সে বুঝতে পারে
কোনোদিনই সে মিলিত হতে পারবে না জলের নিচের সেই মুখটির সাথে।কিন্তু কোন উদ্ধার নেই তার।নার্সিসাসের সৌন্দর্য ছেড়ে গেল নসিসাস্কে।সে হয়ে উঠল বিপযস্ত দীপ্তিহীন একটি ক্ষীণ ছায়া।মৃতু্র মুহূর্তে সে বলে উঠল ‘বিদায়’।ইকো প্রতিধ্বনি করল-‘বিদায়’।মৃতুর পড় তার শরীর হয়ে উঠল সেই সরোবরের ধারে একটি চমৎকার হলুদ –সাদা ফুলের গাচ-তার নামে যে ফুলের নাম,নার্সিসাস।মৃতুর পরেও সে ফুল হয়ে জলে মুখ দেখে যায় নিজের।প্রতিবিম্বের জীবন থেকে আর মুক্তি হল না তার।

ইয়েরেমিয়া স্মিথ :
আগের নাম দুটির মতো সর্বাত্মক পরিচিতি নেই ওপরের নামটির। ফিওদর দস্তয়েভস্কির ‘অপমানিত ও লাঞ্ছিত’ উপন্যাসটির শুরুতে একটি সন্ধ্যায় আমরা তাকে কুকুর নিয়ে এবং অভিব্যক্তিশূন্য মুখের একজন জরাগ্রস্ত বুড়ো হিসেবে একটি সাদামাটা মদের দোকানে ঢুকে পড়তে দেখি। উপন্যাসের এই অংশটি আমরা সরাসরি পড়ে নিতে ননী ভৌমিকের ভাশান্তরেঃ
দোকানে বুড়োটার আচরণ হত অদ্ভুত রকমের অনাহুত এই অতিথিটিকে দেখলেই ইদানিং কাউন্টারে মিলার মুখ ব্যাজার করতে শুরু করেছিল। প্রথমত, এই বিচিত্র আগন্তুকটি কখনো কিছু চাইত না। সোজা কোণের দিকে গিয়ে চুল্লির পাশে বসত একটা চেয়ার নিয়ে। চুল্লির পাশে তার জায়গাটা যদি আগেই কারোর দখলে গিয়ে থাকত, তাহলে ভদ্রলোকটির সামনে হতভম্ব শূন্য দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বুড়োটা বিব্রতভাবে উঠে যেত জানলার পাশের অন্য কোণটিতে। সেখানে একটা চেয়ার বেছে বুড়ো ধীরে সুস্থে বসত, টুপিটা খুলে রাখত কাছেই মেঝের ওপর, ছড়িটি রাখত টুপির পাশে, তারপর চেয়ারে হেলান দিয়ে নিশ্চল হয়ে বসে থাকত তিন-চার ঘন্টা। কখনো একটা খবরের কাগজও সে তুলে দেখত না, একটা কোথাও বলত না, একটা শব্দ পর্যন্ত করত না। শুধুই বসে থাকত, সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে থাকত বড়ো বড়ো চোখ মেলে , কিন্তু তাতে এমন ভোঁতা নিষ্প্রাণ দৃষ্টি যে বাজি রাখতে পারি,চারপাশে যা হত কিছুই সে না দেখত , না শুনত। বার দুই-তিন একই জায়গায় পাক খেয়ে কুকুরটাও গোমড়া মুখে বসে পড়ত তার পায়ের কছে বুটদুটর মধ্যে নাকটা গুঁজে, তারপর মস্ত একটা শ্বাস ফেলে শুয়ে পড়ত সটান হয়ে; সারা সন্ধে কুকুরটাও এতটুকু নড়ত না, যেন মরে থাকত ওই সময়টুকু। মনে হত যেন এই দুটি প্রাণী সারা দিন মরে পড়ে ছিল, সূর্য ডুবতেই হঠাৎ যেন প্রাণ পেত শুধু মিলারের দোকান পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে সেখানে কি একটা রহস্যময় কর্তব্য সাধনের জন্য যা কেউ জানে না।এইভাবে তিন চার ঘণ্টা বসে থাকার পর বুড়ো অবশেষে উঠে দাঁড়াত, টুপিটি তুলে নিয়ে রওনা দিত বাড়ির দিকে, কে জানে কোথায় সে বাড়ি! কুকুরটাও উঠত, ঠিক আগের মতোই ঝোলা লেজ আর নোয়ানো মাথায় যন্ত্রের মতো পিছু পিছু চলত যথারীতি ধীর পদক্ষেপে। শেষের দিকে দোকানের খরিদ্দাররা সর্বোপায়ে এড়াতে চাইত বুড়োটাকে। তার পাশেও বস্তে চাইত না, বুঝি কেমন একটা ঘেন্না লাগত তাকে দেখে। এসব কিছুই কিন্তু নজর করতনা বুড়োটা।
সেই বিশেষ সন্ধ্যাটিতে বুড়ো মানুষটি তার কুকুর এবং শূন্য দৃষ্টি নিয়ে দোকানটিতে এসে বসে। তারপর সময় শেষ হলে সে কোনক্রমে ওঠার সময় দেখে কুকুরটা নিশ্চল পড়ে আছে মেঝের উপর।তখন
কাঁপা কাঁপা বুড়োটা জড়িত গলায় লোকটা ডাকলে
‘আজর্কা, আজর্কা।’
আজর্কা নড়ল না।
‘আজর্কা, আজর্কা ’ বুড়ো করুণস্বরে ডাকলে আবার, ছড়িটা দিয়ে নাড়া দিলে। কিন্তু কুকুরটা যেমন ছিল তেমনই পড়েই রইল। ছড়িটা পড়ে গেল বুড়োর হাত থেকে। নিচু হয়ে হাঁটু গেঁড়ে বসে বুড়ো আজর্কার মাথাটা তুলে নিলে দুই হাতের মধ্যে। বেচারা আজর্কা। মারা গেছে কুকুরটা। মনিবের পায়ের কাছে মারা গেছে নিঃশব্দে- হয়তো বার্ধক্যে, অথবা না খেতে পেয়ে হয়ত। বজ্রাহতের মতো বুড়ো তাকিয়ে রইল এক মিনিট, যেন আজর্কা যে সত্যিই মারা গেছে সেটা মাথায় ঢুকছে না। তারপর আস্তে করে সে তার পুরনো সেবক আর বন্ধুর ওপর ঝুঁকে পড়ে নিজের বিবর্ণ গালখানা ঠেকালে কুকুরের মরা মুখের ওপরে। নীরবে কাটল এক মিনিট। আমরা সকলেই ভারি বিচলিত হয়ে উঠেছিলাম... অবশেষে উঠে দারালবেচারা বুড়ো। ভারি বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল সে। কাঁপছিল জ্বরগ্রস্তের মতো।
এরপর লেখক তাকে অনুসরণ করলেন। দেখলেন কাঠের ফুটপাথের ধারে অন্ধকার লোকটি বসে আছে, হাঁটুর ওপর কনুই ভর দিয়ে। দুই হাতে মাথাটা ধরে আছে সে। আরো একটু পড়া যাক মূল লেখাটি :
কি থেকে শুরু করব বুঝে পাচ্ছিলাম না। বললাম ‘শুনুন, আজর্কার জন্য শোক করবেন না। চলুন, আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিই। শান্ত হন, এক্ষুনি একটা গাড়ি ডেকে আঞ্ছি। কোথায় থাকেন? ’
বুড়ো কোনো জবাব দিলে না ভেবে পাচ্ছিলাম না কি করব। পথচারীও কেউ নেই। হঠাৎ বুড়োটা আমার হাত আঁকড়ে ধরতে লাগল।
‘দম!’ প্রায় শোনা যায় না এমন একটা ঘড়ঘড়ে গলায় সে বললে, ‘দম পাচ্ছি না !’
‘চলুন, আপনাকে বাড়ি নিয়ে যাই!’ চিৎকার করে উঠে দাঁড়ালাম আমি। বুড়োকে জোর করে তুলতে চেষ্টা করলাম। ‘একটু চা খেয়ে শুয়ে পড়বেন...এক্ষুনি গাড়ি ডেকে আনছি। ডাক্তারও ডাকব...আমার একজন চেনা ডাক্তার আছে...’
আর কী কী বলেছিলাম মনে নেই। ওঠার চেষ্টা করছিল ও, কিন্তু খানিক্টা উঠেই মাটির ওপর ফের পড়ে গিয়ে ঐ ভাঙা ভাঙা দম আটকানো গলায় কী বিড়বিড় করতে লাগল। আরো নিচু হয়ে শোনার চেষ্টা করলাম আমি।
ঘড়ঘড়ে গলায় বুড়ো বলল, ‘ভাসিলিয়েভস্কি দ্বীপে ...ছয় নম্বর লাইন... ছয় ন-ম্ব-র...’ তারপর চুপ করে গেল।
‘ভাসিলিয়েভস্কি দ্বীপে আপনি থাকেন? কিন্তু ভুল পথে এসেছেন। ওটা হোবে বাঁ দিকে, ডান দিকে নয়। এক্ষুনি আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি...’
বুড়ো নড়াচড়া করছিল না। আমি ওর হাতটা নিলাম। হাতটা ঝুলে পড়ল মরার মতো। মুখের দিকে তাকালাম ওর, ছুঁয়ে দেখলাম- মরে গেছে লোকটা। মনে হল সব কিছুই যেন ঘটছে স্বপ্নে।
মৃত্যুর পরে বহু কষ্টে খুঁজে বের করা হয় তাঁর নাম, তাঁর ঠিকানা। জীবন থেকে সর্বতোভাবে সরে আসা ইয়েরেমিয়া স্মিথের সর্বগ্রাস ছিল শুধু আজর্কার জন্য। এই কুকুরটিই ছিল তাঁর সর্বস্ব। কুকুরটির মৃত্যুর সাথে সাথে সে নিজেও সরে যায় জীবন থেকে। নিজেকে জনশূন্য দেশের বাসিন্দা করে নিয়েছিল সে, কাউকে প্রশ্ন করেনি, উত্তরও দেয়নি কাউকে। দেয়াল ঘেরা এক ‘নো- ম্যান্স- ল্যান্ড’। রাত্রির ঠাণ্ডা আকাশের নিচে এক মৃতপ্রায় বুড়ো, এক মুমূর্ষু কুকুরকে জড়িয়ে বসে আছে স্তব্ধতায়, পরস্পরকে ছুঁয়ে।
কাউকে ছুঁয়ে, কিছু একটাকে আশ্রয় করে, নিজের ভেতরে এবং বাইরে এক শূন্যতা এক মরুভূমি নিয়ে আমাদের বাঁচতে হয়, বাঁচা শিখতে হয়। সারাজীবন জুড়ে এই এক বেদনাময় অর্জন করে চলি আমরা। আমার পাশের মানুষটির মধ্যেও সে আছে, আমার ভেতরের মরুভূমিতে সে-ও দেখছে, বুঝছে, মেনে নিচ্ছে।
কিন্তু ডাকছে না। স্পর্শ করছে না।