আত্মহত্যা

সিদ্ধার্থ বসু

আমার এক বাল্যবন্ধুর কাছে শুনেছিলাম তার কোনো এক সহকর্মীর পরিচিতজনের আত্মহননের কাহিনী | ছেলেটার বাবা মারা গিয়েছিলেন বেশ কম বয়সে—সেও এক আত্মহত্যাই | আর এই ছেলে—বছর উনিশেক বয়স হবে—রাজ্যের বাইরে কোথাও অনুজীববিদ্যা নিয়ে পড়াশুনো করতে গিয়েছিল | সেখানেই একটা হোটেলের ঘরে , তার মৃতদেহ পাওয়া যায় এবং বিভিন্ন তথ্য-প্রমান সাপেক্ষে নিশ্চিত হয় আত্মহত্যার ঘটনা | সে নিজের শরীরে ইনজেক্ট করেছিল বেশ উঁচু মাত্রার ইনসুলিন , যা মানুষের পক্ষে মারাত্মক বা লিথাল ডোজের খানিকটা ওপরেই | এই ইনসুলিনের মাত্রা সম্পর্কিত জ্ঞান ও বিনা ব্যবস্থাপত্রে ওষুধের দোকান থেকে তা সংগ্রহ করার সুবিধার জন্য সে তার ডাক্তার বন্ধুদের সাহায্য নিয়েছিল এবং তারপর এতটুকু সময় নষ্ট না করে সে কাগজ-কলম নিয়ে বসে গিয়েছিল তার শারীরিক ও মানসিক উপলব্ধির—যা সেই অন্তিম মুহুর্তগুলোয় মুহূর্মুহু গিলে ফেলছিল তার অস্তিত্বকে—অনুপুন্গ্ খ বিবরণ লিখে রাখতে , যার এক জায়গায় পাওয়া গিয়েছিল যে তার প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেন একে অন্যের থেকে আলাদা হয়ে ছিঁড়ে-ফেটে ছত্রখান হয়ে যেতে চাইছে | দ্রুতই অবশ্য ফুরোয় তার এই অত্যাশ্চর্য রিপোর্তাজ | অচিরেই থেমে যায় আঙ্গুল , জীবনপণ এই সৃজনশীলতায় ইতি টানে পরম বাঞ্ছিত মৃত্যু |
‘লোকটা কি সত্যিই মরতে চেয়েছিল?
কেউ কি কখনো তা-ই চায়?
আর পাঁচজন তাকে প্রতিদিন একটু একটু করে
নিহত করেছে—সে তখন ভদ্রতাবশত
কোনো বাধা দিতে চায় নি |’
(আত্মহত্যা : প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত)

মরতে চাওয়া | সত্যিই কী অবান্তর আর অচেনা লাগে এই চাওয়াকে—আমাদের—তথাকথ িত স্বাভাবিক মানুষজনের কাছে | কোনকিছু চাওয়া , খুব নিবিড় করে , উদগ্র উচাটন হয়ে চাওয়া কোনো সাহচর্য , কোনো অধিকার , কোনো সুখ , কোনো তৃপ্তি , কোনো শান্তি , বা আরো অন্যরকমভাবে—কোনো আদর্শ , কোনো অভিজ্ঞান—সবই তো আসলে জীবনের কাছে চাওয়া , জীবনের দিকে যেতে চাওয়া : রবীন্দ্রনাথের গানে ‘মোরে আরো আরো আরো দাও প্রাণ’ যেমন | তবে এমন কী করে হয় যে , চাহিদা আর জীবন দুই বিপরীত অভিমুখে সরতে শুরু করলো? এমনকি সরতে সরতে পৌঁছে গেল এমন এক সংকট দূরত্বে যে ‘চাহিদা’ মেটানোর অর্থ দাঁড়ালো জীবনকে শেষ করে দেওয়া? সত্যিই আত্মহত্যার রোমাঞ্চকর আত্মধ্বংসী মুহুর্তের প্রত্যক্ষ অংশীদার ছাড়া আর কারো পক্ষেই কখনো অনুমান করা সম্ভব নয় এই উদ্ভট আর বিরল অনুভবকে |
সমস্ত আত্মহত্যার ঘটনাকে, একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য দিয়ে বোধহয় চিন্হিত করা যায় : অসহায়তা : বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম যা চায় একজন মানুষ, নিজের জীবনের পরিসরে তার অভাববোধ | যে কিশোরী প্রেমাস্পদকে টলাতে না পেরে গলায় দড়ি দেয় , ওই মুহুর্তে তার কাছে অসহনীয় হয়েছিল ওই প্রত্যাখ্যান | এই দহন তার বেঁচে থাকার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল | তার আর কোনো উপায় ছিল না | পরীক্ষার ফল বেরুনোর আগের রাতে বিষ খেল যে ছেলেটা , তথাকথিত ভালো ফল করতে না পারার আশংকা তার বাঁচাকে মানেহীন করে দিয়েছিল | রুখা মরশুমে কর্পোরেট চক্রান্তের নিরুপায় শিকার যে চাষী গলায় কীটনাশক ঢালল , সে খিদে সহ্য করতে পারছিল না , অনাহারে মরার আগেই ছুটি চাইছিল তার দুর্বহ জীবনের থেকে| অনেকটা তেমনভাবেই বন্ধ জুটমিলের যে শ্রমিক রেলে গলা দিল তার চালায় চুলা জ্বলছিল না দিনের পর দিন | শ্রমিক-মহল্লার দিশির ঝুপড়িতে বহুরাত ধরে চাপা ছিল তার নিঃশব্দ মরে যাওয়া , ভেতরে ভেতরে |
কেন মরতে চায় মানুষ? মৃত্যুর পর কি হৃদয় থাকে? কী যে থাকে তা কি মানুষ জানে আদৌ? শুধু জানে অনুপস্থিতিটুকু | তাকে ঘিরে যে পৃথিবী , যে অনন্ত চরাচর, তার কেন্দ্র—সে নিজে—থাকবে না আর কোত্থাও | আমি থাকব না, অথচ এই জগতসংসার থাকবে: এই ঘর, বালিশ-বিছানা, চায়ের কাপ-প্লেট, ইনহেলার আর অম্বলের ওষুধ, চিরকলহপ্রবণ মা, নাচার বাবা, এতগুলো বছর ধরে মিশে থাকা এই মফস্বল পাড়া, বন্ধুরা, প্রেমিকারা, যাদের কখনো-কাছে-পাই নি থেকে শুরু করে পেলে-একবার-‘দেখে নিতাম’ বলে ভাবা সব লোকগুলো, আর তারই সঙ্গে এই আকাশ-মেঘ-বৃষ্টি-হাওয়া, পাহাড় আর সমুদ্রে ঘুরে বেড়ানোর দিন, আড্ডায়-বিরলে হেসে ওঠার আর গালি খেয়ে মাথা নিচু করার দিন, ক্লান্ত দিন, শরতের দিন, উত্সব আর অশান্তির দিন, বিচ্ছিন্নতা আর ভালবাসার দিন, সব স-অ-ব রয়ে যাবে যেমন ছিল তেমন : ‘কাটবে গো দিন আজও যেমন দিন কাটে’-র এই অত্যাশ্চর্য অনুভব, আমাকে স্পৃষ্ট করে, স্তব্ধ, বিমুড় করে—আমি কোনো থৈ পাই না| অনাহারের মানুষ, বন্দিশালার গরাদের পিছনে অনির্দিষ্ট নির্বাসনপ্রাপ্ত মানুষ, অপমানিত অসম্মানিত মানুষ, লজ্জায় মাটির মধ্যে মিশে যাওয়া মানুষ, এরা সবাই কোনো এক অজানা বাঁশির জাদুতে বেঁচে থাকবার ডাক পায়| আর তাই শুনে একটু একটু করে বেঁচে ওঠে| ‘ছোট্ট একটা তুক করে বাইরেটা পাল্টে দাও’, লিখেছিলেন প্রনবেন্দু দাশগুপ্ত ; ঠিক তেমনটা না হলেও ‘যেভাবে প্রকৃতি পারে’ যেন সেইভাবে একটু একটু করে উঠে দাঁড়ায় পৃথিবীর সব জানু-ভেঙে-পড়ে-যাওয়া লোকগুলো| কেবল একজন শোনে না সে বাঁশি| শুধু একজনের কানে পৌঁছয় না তার সুর: চটিজোড়া খুলে রেখে মেট্রোর লাইনে নেমে যায় সে, কিম্বা কেরোসিন গায়ে ঢেলে দেশলাই ঠোকে, গলায় জড়িয়ে নেয় রেশমি ওড়নার ফাঁস, লোকালের হুইসিলে লাইনের দিকে দ্রুত হাঁটে, নিঃশেষে গিলে নেয় পোকামারা বিষ অথবা দু-তিনশ ঘুমের দাওয়াই | এক অতিলৌকিক মুহুর্তে জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে পৌঁছে সে টাল খায় : অংশভাক হতে চায়না সে এই ব্রম্হান্ডকাণ্ডের কোনো লেশমাত্র খন্ডেও : কুশীলব হিসেবে তো নয়ই | সাক্ষী হিসেবে? সে ইচ্ছেটা হয়ত বা খানিক থেকে যায় তবু , এই নঞর্থক চাহিদার মধ্যে : আমি উপস্থিত নেই , কিন্তু আমার অস্তিত্বের সঙ্গে নানাভাবে বিজড়িত , সংশ্লিষ্ট ও আনুষঙ্গিক সব কিছুই রয়ে গিয়েছে—কেমনভাবে প্রভাবিত হয়েছে সেসব , আমার এই সুনির্দিষ্ট অনুপস্থিতি দিয়ে? কী উতরোল উঠেছে এই অনন্ত জীবনসমুদ্রে? কেউ কি কষ্ট পেয়েছে খুব? মেনে নিতেই পারছে না এই অনুপস্থিতি , এমন কেউ আছে নাকি? নাকি যাকে , যাদেরকে ভালোবেসে মরেও যাওয়া যায় ভেবেছিলাম , তাদেরই কেউ ‘বলছে ভাই ভালই হলো , বালাই গেল , হাড় জুড়ালো এতকালে’? জাগতিক সবকিছু ছেড়ে এসেছে যে, যে চায় নিজেরই অনুপস্থিতি, সে কি তবে আর এই বহমান জীবনের কেউ নয়? আর যা বহমান নয়? শাশ্বত? সেই মৃত্যুর প্রতিই কি সে চলে যাবে এবার? সত্যিই কি কেউ যেতে চায়? কোন নগরে, কোন গাঁয়ে তার বাস এখন? এই নিভে যাওয়ার প্রাকমুহূর্তে তার যে সবকিছু ঝাপসা লাগছে: ছেড়ে আসা পৃথিবীটার এক প্রবল টান, আর তাকেও হারিয়ে দেওয়া এক দুর্দম দুনো বলের উদ্বেজনা নিয়ে সে পাগল জলের মত ঘুরপাক খাচ্ছে: অভিমান, তলহীন অভিমানের এক ইতিহাস তাকে ভাসিয়ে নিচ্ছে, বোবা আর ফাঁকা একটা মুন্ডু নিয়ে সে শুধু অস্বীকার করতে চাইছে তার দীর্ণ, খিন্ন বাঁচাকে: একটা আগাপাশতলা জীবিত মানুষ এই মুহুর্তে আমাদের চেনা জ্যান্ত জগতের সীমানা পেরিয়ে গেছে| অথচ সে মৃত নয় এখনো, এমনকি এখুনি মরবেই যে, এমন কথাও বলা যাচ্ছে না নিশ্চিত করে| শিরা কাটার পর যথেষ্ট রক্তক্ষরণের আগেই হয়ত খোঁজ পেয়ে যাবে কেউ তার, কম্বল গায়ে চাপা দিয়ে আগুনটা হয়ত নিবিয়ে ফেলবে, কিম্বা থার্ডরেল স্পর্শ করার আগেই বন্ধ করে দেওয়া হবে মেট্রোর বিদ্যুতসংযোগ, অথবা নিকটতম হাসপাতালে স্টমাক-ওয়াশ| আর তারপর?লাঞ্ছনা? অসম্মান? কিছুই জানা নেই| তারপরের জীবন তার কাছে অস্তিত্বহীন, অলীক, অতিবাস্তবিক : শুধু এক ক্রান্তির সময় : জীবিত যখন অস্বীকার করতে চাইছে তার যাবতীয় জীবন-সম্ভাবনাকে| শুধু শুনশান লাইনধারের বৈদ্যুতিক পোস্টগুলো এ সময়ের সাক্ষী থাকবে, এস্প্ল্যানেড মেট্রোর ডাউন প্ল্যাটফর্মের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা দু-চারজন লোক সন্ধান পাবে এই দেশের, দক্ষিনেশ্বর স্টেশনের আধবুড়ো চা-দোকানি এরকম আরো কয়েকজন চাঁদে-পাওয়া লোককে এই নেই-রাজ্য পার হয়ে চলে যেতে দেখবে, ওষুধের দোকানদার মনে করে রাখবে সেই মেয়েটার মুখ যে কদিন ধরে অনিদ্রার ওষুধ চেয়ে যেত তার কাছে, সুমন্ত্র ভুলতে পারবেনা তার জ্যাঠাইমা--কেরোসিনে চুপচুপে-ভেজা জ্যাঠাইমা--দেশলাই কাঠি হাতে থরথর করে কাঁপছিলেন, মেজদাদু ঝাপসা চোখে তাতাই-এর দু-আঙ্গুলে ধরা ব্লেড ঠাওর করতে না পারার জন্য সারাজীবন নিজেকেই দোষ দেবেন, কিন্তু আসলে তো তিনিও দেখে ফেলেছিলেন এই দেশ-কাল-পরিচয়্গ্রাসী অভিমানী-কয়েক-মুহূর্তে -বাসিন্দা তাতাইকে| আর পোকা-মারা বিষ গলায় ঢেলেছিল যে ভারতিদি, ডেনড্রাইট-মুখে তার ছেলে টলোমলো মাথায় বুঁদ হয়ে ভেবে যাবে সাদাটে কৌটোর ঢাকনা খোলার সময় কী আশ্চর্য এক দৃষ্টিতে তাকে দেখছিল তার মা।