গোধূলি সাগরের দ্বীপ

জয়দীপ চ্যাটার্জী

তুলোর মত, নাকি ন্যাকড়ার মত… মানে তুলোর ন্যাকড়া পড়েছিল রাস্তায়। ইস্কুলের বুট পায়ে এটা সেটা লাথি মারতে মারতে রাস্তা দিয়ে হাঁটা স্বভাব। সেই ন্যাকড়ার কাছে এসে লাথি মারতে যেতেই মা চেঁচিয়ে উঠল, “ইশ! নোংরা… সরে আয় এদিকে!” জিজ্ঞেস করলাম, “কি ওটা?” মা বলল, “ইঁদুর মড়া... পা দিস না। অসুখ করবে।” আমি অবাক হয়ে বললাম, “ইঁদুর মরে গেলে... এরকম হয়ে যায় নাকি? কোথায় ইঁদুর?” বলে, সেই দিকে আবার এগিয়ে গেলাম ইঁদুরের মৃতদেহর কি অ্যামন অবস্থা হ’ল যে তাকে ইঁদুর বলেই চেনার উপায় নেই... তা বোঝার জন্য। হাতে হ্যাঁচকা টান মেরে নিয়ে গেল মা। পেছন ফিরে দেখলাম... রাস্তার মাঝে পড়ে থাকা সাদা ন্যাকড়াটার ওপর দিয়ে সাইকেল চালিয়ে চলে গেল এক কাকু। তারপর একটা কাক এসে টেনে নিয়ে যেতে চেষ্টা করছিল... যেমন মড়া ইঁদুর টেনে নিয়ে যেতে চেষ্টা করে। এরপর মায়ের সঙ্গে স্কুল থেকে ফিরতে ফিরতে যেখানে এমন সাদা ন্যাকড়া আবার চোখে পড়েছিল... মাকে বলেছিলাম, “ওই দ্যাখো, ইঁদুর মড়া।” মা কি ভেবেছিল কে জানে। হয়ত ভেবেছিল ইচ্ছে করে শয়তানি করছে... কিংবা বিরক্তিকর অহেতুক কৌতূহলটা এখনও যায়নি। তবে জিনিসটা কি, তা কোনওদিনই বলে নি। ওই ভাবে গম্ভীর ভাবে ‘হুম’ বলে গতি বাড়িয়ে দিতো। আমাকেও সেই মত তাল রেখে এগিয়ে যেতে হ’ত কৌতূহলকে পেছনে ফেলে। না... ওই মড়া ইঁদুরের আসল পরিচয় পেতে আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। অপেক্ষা করতে হয়েছিল এরকম আরও কিছু কৌতূহলের উত্তর খুঁজতে। এসেছিল এক এক করে, এক এক উৎস থেকে... সুস্থ ভাবে, বিকৃত ভাবে। হয়ত অভিভাবকদের কাছ থেকে উত্তরগুলো এলে কেবল সুস্থ উত্তরগুলোর সঙ্গেই পরিচয় হ’ত, আলাদা আলাদা রঙগুলো এভাবে চেনা হ’ত না নিজের মত করে।

... ... ... ...

শিশু মনে কৌতূহলের বীজ যে ঠিক কোন মুহূর্তে অঙ্কুরিত হয়, তা ঠিকঠাক বলা কিন্তু খুব কঠিন কাজ। একটি সরল শিশুসুলভ ‘এটা কি?’ যে কত কিছু দেখে মনের মধ্যে জন্মাতে থাকে... ঢেউয়ের মত একের পর এক এসে পড়ে... আবার মনের অবচেতনে ফিরে যায়। তা অভিভাবকেরা বুঝতেই পারেন না সব সময়। হ্যাঁ, অভিভাবকরাই বুঝতে পারেন না (কেউ কেউ চেষ্টা করেন হয়ত)... বাকিদের কথা বাদই দিলাম। এই প্রশ্নগুলো জমতে নিজের মত করেই একটা আলাদা দ্বীপ বানিয়ে ফেলে। স্বতন্ত্র। বড়দের থেকে, প্রাপ্ত বয়স্কদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। সে এক অন্য রবিনসন ক্রুসোর অভিজ্ঞতা। একা একা খোঁজা... প্রশ্নগুলোকে কুরিয়ে কুরিয়ে জমিয়ে রাখা। রাতে কাঠ-কুটো জড়ো করা আগুন জ্বেলে সেই আগুনে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখা। সেই দ্বীপ, অবচেতন আর সচেতনের খানিকটা জায়গা নিয়ে স্থাপত্য পেয়ে যায়, ওই শিশু মনেই। তারপর ধীরে ধীরে অস্তিত্ব পায় তার ইতিহাস। একটা কাক, একটা বেড়াল... আর কাজ করতে আসা আলুথালু কাজের মাসি। রাশি রাশি কৌতূহল। বেড়ালের ল্যাজ, ল্যাজটা মাঝে মাঝে অমন সোজা হয় কেন? কাকগুলোর কারও কারও হাঁড়ি মাথা কেন? কাজের মাসির শাড়ীর নিচে... সবুজ রঙের কী উঁকি দেয়? ভেতরে আর একটা শাড়ী? যে বড় মানুষটা গাল টিপে আদর করে দিয়ে চলে গেল... বা যে বলল ‘বেউ বেউ নিয়ে যাবে’... তার ধারে কাছেও না আসতে পেরে ‘কি’ বা ‘কেন’ গুলো ওই দ্বীপে জল-বাতাস পেয়ে বড় হয়ে একটু একটু করে। ক্রমে সময় যায়, খোলের ভেতর সেই দ্বীপে একের পর এক ঋতুপরিবর্তন। বাইরে, একের পর এক পরিচিত-অপরিচিত চেহারার আশা-যাওয়া... ঘনিষ্ঠতা... স্পর্শ। এক স্পর্শ থেকে আর এক স্পর্শের দিকে ভেসে যেতে যেতে একসময় স্পর্শের রঙগুলোকে আলাদা আলাদা করে চিনতে শেখা।

তারপর একটা নৌকো... ডিঙ্গি নৌকা আর একটা বৈঠা। একদিকে নিঃসঙ্গ দ্বীপ আর একদিকে জনবহুল ভূখণ্ডের মাঝে গোধূলী আলোর সাগর। ভূমধ্য সাগরের মত। তাতে আকাশের গোধূলী আলোর রঙ ছড়িয়ে থাকে সবসময়। নাহ্‌... ঠিক সব সময় নয়। মাঝে মাঝে ঝড় ওঠে, ঢেউ আছড়ে পড়ে দ্বীপে। তখন আকাশের রঙ পালটে যায়। জলের রঙও। মানে সাগর জোড়া আকাশের আর এক আমি। দ্বীপের কাছে গভীরতা এক বুড়ো আঙুল। বালিতে দাগ কাটতে কাটতে... পরিচিত ছবিগুলো ফুটে ওঠে। স্বপ্নে দেখা ঝাপসা দৃশ্যগুলোর মত। তারপর ঘুম ভাঙা ঢেউ এসে ঠিক সেরকমই সরিয়ে নিয়ে যায়। জলের দিকে এগোতে এগোতে... হাঁটু, কোমর, বুক... পেছন ফিরে একলা দ্বীপ... সামনে শুধুই সন্ধিকাল। সামনে সেই জনবহুল দেশ, যার নাগরিকত্ব আছে... অথচ তার থেকে দূরে এইখানেই এখন একা। ওই দেশের কেউ এখানে আসে না... তবে অনেকটা ওপরে উঠলে... মেঘেদের মাঝে, কিংবা সব থেকে উঁচু নারকোল গাছটায় উঠলে হয়ত দেখা যাবে... আশেপাশে এমন ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আরও অনেক দ্বীপ, গোধূলি সাগরের বুকে। তারা প্রত্যেকে নিজে নিজে একা। মাঝে নিজের মতই ভাসে গোধূলি জলে, একটা করে ডিঙ্গি নৌকো আর বৈঠা সম্বল করে। রাত বাড়লে জোয়ার আসে... কখনও ঢেউয়ের রঙ লাল, কখনও বালির ওপর জমে থাকা খই-সাদা ফ্যানা। ফুটফুটে আলো নিজের মত করে রাখে। আচ্ছন্ন হয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে প্রশ্ন আবার... এই উষ্ণতা কেন? এই শীত কেন? আলোদের যাওয়া আসা কেন? অন্ধকার রাতে সেই দ্বীপের সব থেকে উঁচু নারকোল গাছটা দেখতে পায় - সাদা ইঁদুর মড়া... চাপ চাপ রক্ত নিয়ে, ভিজে যাওয়া হাফ প্যান্ট, বাথরুমের কলের তলায় ছপছপ শব্দের মত ভিজে পায় ঢেউ থেকে ঢেউয়ে। এক দ্বীপ থেকে আর এক দ্বীপ, একলা মনগুলো ছুঁয়ে যেতে যেতে বাতাস যা পায়, তা ঠিক বিষাদ নয়, আনন্দও নয়... এক প্রথম অনুভূতি, যা ছাই তাকেও মন খুলে বলা গেল না... প্রাণ খুলে দেওয়া গেল না... যাকে বলতে পারলে সব থেকে বেশি তৃপ্তি পাওয়া যেতো। নিজের কানে কানে ফিসফিস করে সব কথা বলে,খোলা আকাশের নিচে চোখ বুঁজে আচ্ছন্ন ঘুম। বাতাস সেই আচ্ছন্নতা মেখে গোধূলি সাগরে ছুটে বেড়ায়, অথচ জনবহুল সেই দেশ অবধি কিছুতেই পৌঁছতে পারে না।সেখানে শুধুই সামুদ্রিক ঝঞ্ঝাদের ডাকনামে আনাগোনা। আবার ফিরে দেখা গোধূলি আলোয় দুলে দুলে ডিঙ্গি নৌকো। একটা... দু’টো... তিনটে... নিজের মত একা একা বৈঠা টান দিতে শেখা। একা একা ভেসে থাকা সাগরের বুকে। গোধূলী জলের আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে মনে হয়... গালে হাত দিই, ঠোঁটে হাত দিই,চিবুক, বুক... কোমর। আমিই তো? আমি তো বেশ... দিব্যি! আমি ছুঁতে যায় আমিকে, আঙুল বাড়িয়ে। আমি ছুঁতে চায় আমি। জলে তরঙ্গ উঠলে বোঝা যায় এখানেই আমি... একটাই। আমার একলা দ্বীপ জুড়ে।

ডাকনাম শুনে জিভ বার করে হাসা মেয়েটা... হঠাৎ করেই পা বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে দেখে খাটের পেছনে সেই যে লুকিয়ে পড়ল... তারপর কতদিন আর খেলতেই যেতে পারল না। ব্যথাটা কিসের আর কেন, বুঝতে বুঝতে ব্যথা সহ্য করার জন্মসূত্রে পাওয়া অভ্যেসটাই শিখে নিল। বোধহয় মা-ই মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, “ব্যথা সহ্য করতে হয়” তারপর থেকে সেই পরিচিত ব্যথার টান, আর দিন গোণা। পাথরের ওপর একটা একটা করে চারটে আঁচড়, আর পাঁচ বারের বার কেটে দেওয়া। এই ভাবেই এক একটা পাথর যাপনের শিলালিপি রেখে দিয়েছে সেই দ্বীপে। ছড়িয়ে রয়েছে এখানে সেখানে পাশ-বালিস আর তার কোনও না কোনও ফাঁক থেকে ফাঁকি দিয়ে ভেসে যাওয়া পেঁজা তুলো। তুলোগুলোর মধ্যে যে কত স্বপ্ন ভরা আছে, তার কথা জানলে সভ্যতা অবহেলায় তার সাথে জুড়ে দেবে ‘দোষ’। স্বপ্নগুলো বেঁচে থাকুক বিচার করা চোখগুলো থেকে অনেকটা দূরে... সেইখানেই, যেখানে একা একা বেড়ে ওঠার গন্ধ লেগে আছে। এখন এই জনবহুল মহানগরে বসে ভাবে প্রাপ্ত বয়স্ক আমি… সেই দ্বীপ, আর গোধূলি সাগরের কথা ভাবি। তারা ঠিক একইরকম আছে। ও’টাই বেড়ে ওঠার সাথে সাথে সব থেকে বড় প্রাপ্তি।নিজেকে চেনার ছড়া, কবিতা, গীতিকাব্য… সামান্যই, কিন্তু নিজের। যেমন প্রত্যেকটা ‘আমি’-র থেকে যাওয়া কোনও না কোনও দ্বীপে। সেখানে সে একা, শৈশবের সখ্য মেলে না… প্রাপ্তবয়স্কদের সহানুভূতিও মেলে না। সেখানে ‘আমি’ও একাই। আমার নির্বাসনের দিন… নির্বাসনের রাত। খুব কাছের চেনা মুখগুলো কেউ কিছু জানতে চায়নি বলেই, তারা কোনওদিনও টেরই পেলো না গোধূলি সাগরে আমার একা একা বৈঠা জড়ানো রাত। হাফ প্যান্ট থেকে ফুল প্যান্ট, জাঙ্গিয়া পরার অভ্যেস… আর মাসে বাড়তি খরচ দাড়ি কামানোর। এই তো… বড় হয়ে গেছি আমি। প্রতিষ্ঠানিক পাঠ আর নিজের ভবিষ্যৎ তৈরী করার বাস্তবমুখী সংগ্রাম। এর বাইরে আর কিচ্ছু নেই! কিছুই নেই এর বাইরে… তাই না? এখন বোধহয় সেই প্রশ্নগুলোর আর ততটা গুরত্ব নেই... যতটা সেদিন ছিল। কিন্তু মুহূর্তরা কেউ গুরুত্ব হারায় না। ধাপে ধাপে নেমে যাওয়া সিঁড়িগুলোর বেশির ভাগেরই আশ্রয় সেই জলের নীচেই, যা আমরা ওপর থেকে দেখতেই পাই না। বুঝতে পারি তখন, যখন ধাপে ধাপে নামতে হয় গভীরে।

‘বেটা দেখেছিস?... না, বড়দের... ধুস! কে বলছে তোকে বড়দের?!’
‘করিশমার ওই গানটা শুনেছিস?... সুপারহিট মুকাবলায়... হ্যাঁ! কিন্তু রবিনা উফ্‌ফ্‌!!’
‘পামেলা অ্যাণ্ডারসন তো ছিলই বে ওয়াচে... এই নতুন মালটা কে?... কারমেন কি যেন? সার্চ লাগা, সার্চ লাগা!’
এখনও এইভাবে কৌতূহলের সেই সাদা ন্যাকড়া কোনও হতভাগ্য ইঁদুরের মৃতদেহ হয়ে আছে। টিভিতে কি একটা ওষুধের বিজ্ঞাপন চলতে চলতে সেই যে আওয়াজটা বিগরে গেল, তারপর আর ঠিকই হ’ল না। ভাল লাগা, ভাল না-লাগা... ইচ্ছে, অনিচ্ছে... পাওয়া, না-পাওয়া... সব কিছুর জন্য কথা হঠাৎ করেই যেন আর কেউ ভাবে না আগের মত। যেন এই গোটা সংসারে উদ্বাস্তু জীবন একটা, যাকে সেই সংসারের নিয়ম মেনে চলতে হবে। যেমন এক দেশের নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য থাকে শরনার্থীরা। শরনার্থী থাকতে থাকতেই এক সময় বেরিয়ে যাওয়া... নিজের একটুকরো জমির খোঁজে। সেই দ্বীপে। যেখানে আমি কারও নই, আমারও কেউ নয়। না পাওয়া প্রশ্নের উত্তরগুলো, একেবারেই প্রত্যাশার বাইরে থাকা আঘাৎ গুলো, আর প্রতিশ্রুতি ভাঙা টুকরোগুলোকে পুটলি বেঁধে বেরিয়ে পড়া, সেই যে নির্বাসন। সেই নির্বাসনের যাত্রীই নিশ্চিৎ চিনেছে জীবনের এই “নো ম্যান’স ল্যান্ড” কে। “ম্যান” শব্দেও ভীষণ আপত্তি রয়ে গেল, প্রচলিত এই উপমাকেও সেই দ্বীপই আমাকে অস্বীকার করতে শিখিয়েছে। আমি এখন বললাম “নো পারসন’স ল্যান্ড”। আবার এটাও যদি কখনও ভাল না লাগে, অন্য কিছু বলব। যেটা আমার তখন আরও সংগত মনে হবে, পক্ষপাতহীন মনে হবে। এখন এই দেশ আমার, নাগরিকত্ব আমার, সমাজে মিশে যাওয়া শরীর আর ছায়াটাও আমার... যার একটা আধার সংখ্যা, একটা পাসপোর্ট সংখ্যা, একটা ভোটার কার্ড সংখ্যা... এসব দিয়ে সনাক্ত করণ হয়ে যাবে ঠিক। কিন্তু সেই গোধূলি সাগরের মাঝে দ্বীপ, তা সেখানেই থাকবে, যেখানে সযত্নে রেখে আসা... সেখানে যাওয়ার ডিঙি নৌকোটা অন্যের অগোচরেই থেকে যাবে চিরকাল।