কোথাও পঙ্খী নাওয়ে চইড়্যা

বিদ্যুৎলেখা ঘোষ


ও গানঅলা আরেকটা গান গাও...
সেল্ফি বদলে যাচ্ছে ঘন ঘন। কখনো সি.সি.ডি.-তে বা সিটি সেন্টারের তানিস্কের শোরুমে দামী জুয়েলারি পরে কখনো বা রিসর্টের ফ্লুরোসেন্ট সবুজ ঘাসের উপর বসে নানান পোজে ছবি তুলছেন রূপসা। পেশায় ফ্যাশন ডিজাইনার। সাজগোজ সম্পর্কে সেন্সটাও বেশ আলাদা রকম আকর্ষণীয়। তবু জেল্লাটা কম লাগছে যেন প্রোফাইল পিকচারে। মেনোপজ এগিয়ে আসছে বলেই হয়তো। বাইরের জগতের সঙ্গে মেলামেশা বলতে পেশাগত যোগাযোগ আর ফেসবুক। মন ভরে না যেন কিছুতেই । সাচ্ছন্দ্যের কোথাও কোনো অভাব নেই। সাউথ সিটির ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটে ফিরে এলে বিশাল বেডরুম,ডাইনিং,কিচেন,জা কুজি সব মিলিয়ে তো আরামেই থাকার কথা। কিন্তু রাতের আলো নিভে গেলে ড্রয়িঙের বিরাট পেইন্টিং, ঘোড়া, মুখোশ ড্রিম লাইটের আবছা আলোয় প্রথম দুটো পেগের মৌতাতে ভালোলাগলেও একটু পরেই মনে হতে থাকে ওই ঘোড়ার গায়ে হাত রেখে রায়ান দাঁড়িয়ে কেঁদে কেঁদে বলছে, ইউ আর টু ব্যাড মম...টু ব্যাড...মিসিং ইউ...। সমস্ত শরীর গরম হয়ে উঠে থর থর করে কাঁপে রূপসার। এইদিকের সোফার বাঁ দিকে দেওয়ালের কাছে মনে হয় ইমন পেগ হাতে আঙুল তুলে বলছে, জানো কীভাবে আছি ? দাঁড়াতে চায় না এখন। সুখী করতে পারিনি তাকেও। ওয়ার্কপ্রেশারের থেকেও বড় শাস্তি ইউ ইউ ব্লাডি বিচ রুইন্ড মাই লাইফ ! বিকট চিৎকারের রাত ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে । কড়া কড়া ঘুমের ওষুধ আর অগুন্তি পেগের সাথে গল্প জুড়ে দেন যতক্ষণ না সোফায় আপনি ঢলে পড়ে এই আধিভৌতিক পরিস্থিতির থেকে নিস্তার পান রূপসা।
বছরখানেক হল তার হাব্বি ক্যালিফোর্নিয়াতেই পাকাপাকিভাবে আরেকজন লাইফ পার্টনার নিয়ে সেটল করে গেছেন। অনেক ডাকা সত্বেও রূপসা যাননি সেখানে। কথা ছিল ফিরে আসবেন ইমন,একমাত্র ছেলে রায়ানের পড়াশোনা কমপ্লিট করিয়ে। ওরা কথা রাখেনি। রূপসার একরকম বয়েই গেলো। ইচ্ছে করলেই পারতেন পছন্দমতো দ্বিতীয় সঙ্গি বেছে নিতে কিন্তু করেননি। আশা করেছিলেন ওদের ফিরে আসার। ইমন মোস্ট হ্যান্ডসম জলি একটু কিপ্টে তাহলেও ভীষণ ভীষণ ভালবাসতেন দুজনে দুজনকে। কী যে ঘটে গেলো ইমনের ভেতরে ভাবতে অবাক লাগে মধ্যচল্লিশের রূপসার। ফ্ল্যাটে কাজ করে মেড কানন, ওর বর রিফিল ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে করতে পয়সাওয়ালি এক মহিলাকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পর রূপসা ওকে বলেছিলো ফ্ল্যাটে থাকতে। কিন্তু কানন রাজি হয়নি। ওর কাছে মাঝে মাঝে কেউ আসে। বর নয়। কানন চায় না কেউ সেটা জানুক। বর এসে মারপিট করে টাকা নিয়ে যায়। সেই সম্পন্ন মহিলা ওকে তাড়িয়ে দিয়েছে। কানন ও আর ঘরে ঢুকতে দেয় না।
সৈয়দ মুজতবা আলির গল্পে আফগানিস্থানের এক কয়েদী বেশ খানিকটা সময় কারাবাসে কাটিয়ে দিতে দিতে তার সবকিছু ভুলে গিয়েছিলো । তার মুখে তখন ছিল কেবল একটাই বুলি ‘ মা খুল চিহম পঞ্জম হস্তম ’ মানে ‘ আমি পঁয়তাল্লিশ নম্বরের কয়েদী ’। রূপসা, ইমন, কাননের বর, কানন তাদের প্রেক্ষিতে একে অপরকে একই কথা বলছে..‘ তুই আমার জীবনটা নষ্ট করেছিস ’...
আমার আর কোথাও যাবার নেই...
প্রথমে দুধ, দুধ থেকে সেমিসলিড, সেমিসলিড থেকে শক্ত খাবার। সঙ্গে সঙ্গে জল- কোল্ডড্রিঙ্কস- বাংলা, ইংরেজি। আলজিব বড় হয়- লকলকে জিবে প্রেমের কবিতা অথবা খিস্তি। এই ক্রমগতিতে কখনো গড়িয়ে দেওয়া চাকামানুষ জীবনের মুচকি হাসির পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা খুইয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে মাঝরাস্তার পাশে এক ধারে । তারপর ওই লাওয়ারিস পরিসর কুকুরের হিসি, কফ, থুতু, মল, স্যানিটারি প্যাড, বুনোঘাসের মতো মধ্যজীবনে ৪০ থেকে ৬০ এই ২০বছরের মধ্যে যত অপ্রাপ্তি, অসম্মান, অপূর্ণ লক্ষ্য, সম্পর্কে অতৃপ্তি, শারীরিক পরিবর্তন, অক্ষমতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব আরও নানান অ-সুখে ভরে উঠে পরিণত হয় একটা গোটা ডাম্পিং গ্রাউন্ডে । প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুযুধান দুই দেশের মধ্যবর্তী প্রান্তসীমা হয়ে উঠেছিল যুদ্ধে পরিত্যক্ত জিনিসপত্রের ডাম্পিং গ্রাউন্ড বা ‘নোম্যানস ল্যান্ড’। যাকে আরও বলা হয় ‘ল্যান্ড অফ মাইনস’, ‘এরিয়া অফ অ্যাগ্রেশান’। আবার বিরাট একটা জাহাজের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম ব্যবহৃত একটি খুপরি যাতে জমা করা থাকে জাহাজকে সচল রাখার যাবতীয় জিনিসপত্র, তাকেও বলা হয় ‘নোম্যানস ল্যান্ড’। চাকা মানুষের মধ্যে অ-সুখ বারুদ জমে জমে সমস্ত জৈবিক বৈশিষ্ট্য থাকলেও উল্টে গিয়ে পাল্টে সে হয়ে যায় বিস্ফোরক বায়ো মাইন।
চাকামানুষের প্রায় ১০% -র ২০ বছর বিস্তৃত মধ্যজীবন হয়ে ওঠে ল্যান্ড অফ মাইনস- এরিয়া অফ অ্যাগ্রেশান। মনোবিজ্ঞানী এলিয়ট জ্যাকুইসের নিরিখে এই নোম্যানস ল্যান্ডের নাম Midlife Crisis । পুরুষদের মধ্যে এর স্থিতিকাল ৩ – ১০বছর, মহিলাদের মধ্যে ২ – ৫বছর। রূপসা, ইমন, কাননের বর, কানন এরা ভিন্ন আর্থসামাজিক অবস্থানের হলেও এদের ইদ, ইগো, ঘুমন্ত সুপারইগো-র অসাবধান চলনে কেউ কাউকে অতিক্রম করতে গেলে সেই একই ফ্যাটাল এক্সপ্লোশানের সম্ভাবনা সবসময়। এতোগুলো মানুষের একই সময়ে কাঁটাময় কার্পেটে একইসঙ্গে একক বিচ্ছিন্ন উড়াল।
আর রায়ান ? সেও তো খানিকটা চলে মুখ থুবড়ে পথের ধারে পড়ে থাকা চাকামানুষ। ঝকঝকে তারুণ্যে ভরা জীবনের পরিবর্তে পায়ের তলার মাটিই ধ্বসে গেছে যেন ভূমিকম্পে। কোথায় দাঁড়াবে সে ? তার আগামী জীবনেও কি অপেক্ষা করছে এই বিভীষিকা! তীব্র ঘৃণা বিরক্তির বিষে নীলকণ্ঠ হয়ে উঠছে ক্রমশ। হটর হটর পবনের নায়ের আর যে কেশবতীর দেশে যাওয়া হয় না। আটকে গেছে Quarter-life Crisis এর চড়ায়। Lost in Translation অসাধারণ একটি সিনেমা হয়েছে এই বিষয়ের উপর।
কিচ্ছু করার নেই !!
‘ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট’ এর সুপারইগো-র মিরাক্যাল যে সবক্ষেত্রে ঘটে না আজকের খুন ধর্ষণ লুঠতরাজ যুদ্ধের আয়োজনই তো তার নজির। তাতেও কি আমাদের হুঁশ ফেরে? খুনিকে ফাঁসি কিংবা ধর্ষকের যৌনাঙ্গ কেটে ফেলে বা যাবতজীবন জেলে পুরে রাখলেই অপরাধ খতম হয়ে যায় বুঝি ? না বোঝার ভান করে আমরা সুস্থ স্বাভাবিক যারা কোনো না কোনো অপরাধী তৈরির পিছনে সলতে পাকাইনি, বুকে হাত রেখে সত্যি করে বোধহয় বলতে পারিনা।
বেমক্কা কিছু কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। একসময় রঙ্গনা থিয়েটারে চলতি নাটক ছিল ‘ অঘটন ’। ক্লাইম্যাক্সে শ্বশুরমশাই ঘুমিয়ে পড়ছেন আর জামাই অনুপকুমারের মুখে বারবার একটা ডায়লগ ‘ বাবাকে নাড়িয়ে দাও’। এডুকেশনাল সাইকোলজিতে ‘ নোদনা ’ শব্দটাও একইভাবে নাড়া দেয় যার অর্থ তাড়না বা Motivation । স্প্যানিশ আর্মাডা ধ্বংসকারি জলদস্যু কবি প্রাবন্ধিক ওয়াল্টার র‍্যালের কথা বলবোনা, আগে চা ওয়ালা বর্তমান প্রধান মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কথাও না, জেলে ঘরে জন্মানো প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আবুল কালামের কথাও না বরং বলবো ; কখনো না কখনো নাড়া খেয়ে বয়ে’স পার্টিতে পায়ে ঘুঙুর বেঁধে নাচার আক্ষেপ রাখী সাওন্তকে এখনকার ডান্সার কাম অ্যাকট্রেস করে তুলেছে। পর্ণোস্টার সানি লিওন হতে এসেছেন বলিউডের অভিনেত্রী। তাই বোধহয় এখন বেলি ডান্সারের পোশাকে রাখী বা লিওনকে শিল্পীই ভাবতে পারি।
মনের ঘরে বসত করে যে কয়জনা তার মধ্যে সুপারইগো হলেন বিবেকবাবু তথা conscience । crisis এ জেরবার চাকামানুষের শুভাশুভ পরিস্থিথিতে আচরণীয় কর্তব্য নির্ধারক বিবেকবাবু ঘুমিয়ে পড়েন উক্ত শ্বশুর মশাইয়ের মতো। তখন ভৃগুর পায়ের ঝেড়ে লাথ্থৌষধি হিসেবে Motivation একমাত্র সঞ্জীবনী। কানাডিয়ান সাইকোলজিস্ট এলিয়ট জ্যাকুইস 1965 এ মানবজীবন বিকাশের ক্ষেত্রে Midlife crisis কে প্রথম সবার নজরে আনেন। Quarter life-crisis তারই ক্রমগবেষণামূলক আরেকটি দিক। দেখা গেছে জীবনবিকাশের ধারায় পরিবর্তন অমোঘ। তাকে সুষ্ঠু উপায়ে গ্রহণ – বর্জনের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে। বিভিন্ন রিহ্যাবিলিটেশান সংস্থা, ইন্টারনেট, বইপত্র, সিনেমাতে চিকিৎসা, চর্চা চলছে বর্তমানে। নোম্যানস ল্যান্ডে থেমে যাওয়া চাকামানুষ যদি নিজে সে অক্ষম হয়ে পড়ে, যে তার কাছাকাছি , আছো তো তুমি বন্ধু , বাড়িয়ে দাও তোমার হাত। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়া সহযাত্রীকে তুলে দাঁড় করাতে নিশ্চয়ই তুমি ফোন করে দশ মাইল দূরের লোককে খবর দেবে না। একটু ভালবাসায় একটু যত্নে আবার গড়িয়ে দাও চাকা। চরম বিচ্ছিন্নতা থেকে সার্থক লক্ষ্যে পৌঁছে যাওয়ার জন্য বাইতে সাহায্য করো জীবনপঙ্খী নাও......