তৃতীয় প্রকৃতি

ইন্দ্রনীল বক্সী

ইলা

“...কি আশ্চর্য ভাগ্য আমার দেখুন ! কখনো আমি অপূর্ব সুন্দরী এক নারী , আবার কখনোবা পুরুষ ! একই অঙ্গে দুই সত্তা নিয়ে রয়ে গেছি বহুদিন বহুদিন ... একে কি সৌভাগ্য বলব ? নাকি দুর্ভাগ্য ! কখনও আমি আমার স্বামী বুধের আমারই রূপমুগ্ধ কামনায় রসসিক্তা – স্বর্গীয় সম্ভোগে সাক্ষাৎ রতিরূপ , কাম তৃপ্ত নারী । প্রতি দিন ,প্রতি রাত অসংখ্য মিলনে পরিপূর্ণতার আগলহীন উচ্ছ্বাসে ভেসে যেতে থাকি । আবার একদিন সকালে হঠাৎ আবিষ্কার করি আমার শরীর বদলে গেছে ! ...আমার শরীর জুড়ে শুধুই পুরুষ , পুরুষ আমার মনেও ! নারীরূপের সব ঘটনা সব রমণের স্মৃতি বিস্মৃত ! ...এমনটা বুঝি আর কারও কখনও হয়নি !
হ্যাঁ এমনি তো ! আমি এক মাস নারী আবার তার পরের মাসে আমিই আবার পুরুষে রূপান্তরিত হই । এই আমার অদৃষ্ট ... আমার ভাগ্য । একই শরীরে বারংবার বদলে যায় আমার সত্তা ...আমার অঙ্গ ... আমার অস্তিত্ব ...
কে আমি ? ...আমি ইলা ... আমায় সুদ্যুম্নাও বলতে পারেন পুরুষ নামে । আমার পিতা শ্রদ্ধাদেব মনু, , মাতা শ্রদ্ধা , আমার ভাই ইক্সভকু -সূর্যবংশের জনক ,আর আমার থেকেই উৎপত্তি চন্দ্রবংশীয়দের । আমার পুত্র পুরুরাভাস চন্দ্রবংশের জনক । হ্যাঁ , একমাস নারী ও একমাস পুরুষ থেকেও আমি আমার স্বামী চন্দ্রপুত্র বুধের ঔরসে সন্তান ধারণ করি , আমার সেই সন্তানই পুরুরাভাস ... আমার শাপমুক্তির আলো ...
কিন্তু এমন তো ছিলাম না , তবে হলাম কিভাবে বলি শুনুন সংক্ষেপে । আমি আমার পিতা মাতার বহু আকাঙ্ক্ষিত সন্তান । বহুদিন সন্তানহীন ছিলেন আমার পিতা -মাতা । অগস্ত্যমুনির পরামর্শে নানা আচার বিচার ,যজ্ঞের মাধ্যমে আমার মা শেষ পর্যন্ত সন্তান ধারণ করেন , আমার পিতা-মাতার ইচ্ছা ছিলো পুত্র সন্তানের কিন্তু কিছু ত্রুটি থেকে যায় আচার-বিচারে আমি জন্মাই কন্যা সন্তান হয়েই - ইলা, তারপর তাঁরা অনেক সাধ্য সাধনা করে ,কৃচ্ছতা সাধন করে মিত্র ও বরুণের দ্বারা আমার লিঙ্গ পরিবর্তন করেন । আমি বেড়ে উঠি সুদ্যুম্না নামে এক রাজপুত্র হিসেবেই । একদিন আমি শিকারে গিয়েছি , পথভ্রমে আমি ভুলবশত প্রবেশ করে ফেলি শিব ও পার্বতীর ব্যক্তিগত সংরক্ষিত শরবনে , যেখানে এক মহাদেব ছাড়া আর কোনো পুরুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ ! পার্বতী প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয়ে আমায় অভিশাপ দেন , আমি নারীতে রূপান্তরিত হয়ে যাই পরমুহুর্তে ! মহাদেবের কাছে আমি আমার দুর্দশা ব্যাখ্যা করায় শেষে তাঁর অনুরোধে পার্বতী কিছুটা শিথিল করেন তাঁর শাপ ... চিরনারী জন্ম থেকে একমাস নারী ও এক মাস পুরুষের জীবন যাপন করব আমি- এই ব্যবস্থা হয় ।
বহুদিন পর আমার সন্তান পুরুরাভাসের জন্মের পর আমার শাপমুক্তি ঘটে মহাদেবের কাছে অশ্বাহুতি দিয়ে ।
এই হলো আমার দ্বৈত সত্তা-লাভের কাহীনি ...আমি ইলা ...একই অঙ্গে দ্বৈত যৌনতারও প্রাচীনতম শ্রুতি । ”



সেইসব ধুসর অঞ্চল
এ তো গেল পুরাণের কথা , ইলার কথা । শেষ পর্যন্ত ইলা মুক্তি পেয়েছে তার দ্বন্দ্ব থেকে । কিন্তু পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অঞ্চল যে রয়ে গেছে ধুসর ! ...মনে নারী শরীরে পুরুষ কিংবা শরীরে নারী মনে পুরুষরা ! ...সহস্র বছর ধরে যে তাদের মুক্তি নেই ... না তারা চিরহরিৎ বর্ষাবন, সুজলা সুফলা ‘নারী’ অঞ্চল ...না তারা কঠিন পাথর পেশীর লালামাটির ঢ়াড় , কৃষিবীজ ‘পুরুষ’ অঞ্চল ... তারা মধ্যবর্তী ধুসর অঞ্চল...স্বীকৃতির জনবিজন অঞ্চল , তাদের কোনো রাষ্ট্র নেই ...পুরুষ রাষ্ট্র – নারী রাষ্ট্র কেউই তাদের নাগরিক মানে না , তারা ছড়িয়ে রয়েছে জনবহুল শহরের গলি তস্য গলি থেকে গ্রামে ,তাদের কন্ঠস্বর ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে ... তারা কিন্নর ,যাদের সাধারণত লোকে ‘হিজড়া’ বলে জানে ।

কিন্নরকথা

কত নাম তাদের ! হিজড়া , খোউজা সিরা , নপুংসকা , থিরুনাঙ্গাই ,আরাভানি ... বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ,বিভিন্ন ভাষায় তাদের ভিন্ন ভিন্ন নাম । হাজার হাজার বছর ধরে লোকগাথায় ,পুরাণে রয়েছে তারা । পুরাণে কিন্তু এঁদের পূর্বসূরি হলেন অম্বা ।
অম্বা মহাভারতের এক অভিশপ্ত চরিত্র । ভাই বিচিত্রবীর্যের সঙ্গে বিয়ে দেবেন বলে ভীষ্ম অপহরণ করেন অম্বাকে তারই স্বয়ংবর সভা থেকে । পরে শাল্বরাজের প্রতি অম্বার অনুরাগের কথা জানতে পেরে ভীষ্ম মুক্তি দেন অম্বাকে ,এদিকে শাল্বরাজ অম্বাকে প্রত্যাখ্যান করেন । প্রত্যাখ্যাত ,অপমানিত অম্বা এই যাবতীয় ঘটনার জন্য দায়ী করেন ভীষ্মকে এবং তাঁকে ধ্বংস করার ব্রতে শুরু করেন কঠিন তপস্যা । শিব সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে বর দেন পরজন্মে অম্বা নপুংসক –শিখণ্ডী হয়ে জন্মাবে এবং ভীষ্মের বিনাশের কারণ হবে । - এর অন্য কাহীনিও রয়েছে মহাভারতে । কথিত -সেই পৌরাণিক চরিত্র অম্বার অভিশাপই বয়ে চলেছে তাঁর উত্তরসূরিরা –আজকের হিজড়ারা ।



রয়েছে আরও অনেক কাহীনি , যেমন বহুছাড়া মাতার কাহীনি , কিন্নর সমাজে অন্যতম পূজ্য দেবী ইনি । মহাদেব শিব ও পার্বতীও এঁদের খুবই আপনার । বিশেষত শিব-পার্বতী বা শক্তির ‘অর্ধনারীশ্বর’ রূপ যা কিনা নারী ও পুরুষের পরিপূরকতা ও যুগ্ম অস্তিত্বের প্রতীক ।
হিজড়ারা বহুকাল ধরেই নিজেদের একটি পৃথক সম্প্রদায় হিসেবেই গড়ে তুলেছে । আমাদের সংস্কৃতিতে হিজড়াদের বহু ভূমিকা থাকলেও সমাজ তাদের মুল ধারায় কখনই সম্পৃক্ত হতে দেয়নি । চির অবহেলিত সমাজের এই তৃতীয় সত্তার গড়ে উঠেছে নিজস্ব অস্তিত্ব , নিজস্ব সংস্কৃতি । রয়েছে তাদের নিজস্ব গোপন ভাষা – হিজড়া ফার্সি বা ‘কোটি’ । সাধারণত আঞ্চলিক ভাষায় কথাবার্তা বললেও উত্তর ভারত ও পাকিস্তানের বহু হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষই এই সাংকেতিক গোপন ভাষা ব্যাবহার করে থাকে । এই ভাষা মূলত উর্দু ও হিন্দি নির্ভর হলেও এটি একটি মৌলিক কথ্য ভাষা যা তাঁরা নিজেদের মধ্যে ব্যাবহার করে থাকেন ।

সম সম্প্রদায়ের হলেও কিছু ক্ষেত্রে হিজড়াদের মধ্যেও বিভিন্নতা রয়েছে ,রয়েছে শ্রেণীবিন্যাস । যেমন কিছু হিজড়ার জীবনে অন্যতম অনুষ্ঠান হলো পুংযৌনাঙ্গছেদন(Emasculation)। শরীরে বিদ্যমান পুরুষ যৌনাঙ্গ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বাদ দিয়ে এই আচারের মাধ্যমে তার পুনর্জন্ম হয় , একজন অক্ষম পুরুষ থেকে সে হয়ে ওঠে একজন সক্ষম হিজড়া । এই আচারের নাম ‘নির্বাণ’ । তাদের বিশ্বাসে তারা যুক্ত হয় একই সঙ্গে মহাদেব শিব ও আরাধ্যা দেবীর সঙ্গে । একমাত্র এর পরেই তারা বিশেষ ক্ষমতালাভ করে এবং নবজাতকের জন্ম ও বিবাহের মতো অনুষ্ঠানে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে স্বীকৃত হয় । অস্ত্রোপচারের পর ৪০ দিন তাকে একান্তে রাখা হয় এবং বিশেষ খাদ্য দেওয়া হয়ে থাকে । ৪০দিন পর তাকে নতুন বধুবেশে সাজিয়ে শোভাযাত্রা বের করা হয় , এই সমগ্র অনুষ্ঠান উর্বরতার প্রতীকীবাদ নির্ভর যা কিনা বিবাহ ও শিশুর জন্মের সঙ্গে সুত্রযুক্ত ।


হিজড়া তথা কিন্নরদের পুরাণের কথা জানলাম। এখন দেখা যাক বিজ্ঞান কি বলছে । বিজ্ঞান বলছে হিজড়ে সাধারণত তিনরকম:
প্রকৃতহিজড়ে(True Hermaphrodite), অপ্রকৃত পুরুষ হিজড়ে (Male Pseudo Hermaphrodite), এবং অপ্রকৃত নারী হিজড়ে (Female Pseudo Hermaphrodite)।
মোটামুটি ভাবে যা জানা যাচ্ছে তা হলো -এই ‘হিজড়া’ জন্মের মুলে রয়েছে মানব শরীরের ‘ক্রোমোজোম’এর ভূমিকা । মানব শরীরের স্বাভাবিক ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম অর্থাৎ ৪৬ টি ক্রোমোজোমের সংখ্যাগত ত্রুটি থাকলে এরকম ঘটনা ঘটে । এমনকি ক্রোমোজোম সংখ্যা স্বাভাবিক থাকলেও গোনাডের ত্রুটিতেও যৌন বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হতে পারে । রয়েছে আরও বহু শারীরবৃত্তিও কারণ , যার বিবরণ একটি বিশদ গবেষণা ও পৃথক নিবন্ধ দাবী করে ।



এই পরিচিতি আধুনিক পাশ্চাত্য লিঙ্গ পরিচিতি বা যৌনতার ধারনার থেকে পৃথক । এমন অনেকেই আছেন এই হিজড়া সম্প্রদায়ে যাঁরা নিজেদের নির্দিষ্টভাবে কোনো লিঙ্গ পরিচয়ে চিহ্নিত করতে চান না । এমন ধারণা যে হিজড়াদের ‘বিশেষ অলৌকিক ক্ষমতা’ রয়েছে যা এসেছে তাদের এই অনির্দিষ্ট লিঙ্গ পরিচিতি থেকেই – কিন্তু বাস্তবিক ক্ষেত্রে এই ধারণা দ্বন্দ্বে পড়ে যায় যখন বেশ বড় সংখ্যায় হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষদের যৌন-বৃত্তিতে দেখা যায় । যেসব “ মেয়েলি পুরুষ ” হিজড়া রয়েছেন এই পেশায় তাঁরা পুরুষ যৌন-সঙ্গীর সঙ্গে যৌন ক্রীয়াকালে গ্রহনক্ষম (Receptive) সঙ্গীর ভূমিকা পালন করে থাকে । এঁদের বলা হয় ‘কোঠি’ । সাধারণ হিজড়াদের সঙ্গে এঁদের কিছু পার্থক্য থাকে । এঁরা সাধারণত মহিলাদের বেশেই থাকেন ,এবং মহিলা-সুলভ আচরণ করে থাকেন । তাঁদের এইসব পুরুষ যৌন-সঙ্গীরা বা খদ্দেররা সাধারণত বিবাহিতই হয়ে থাকে । এই ধরনের যৌন সম্পর্কের কথা সাধারণত বৃহত্তর হিজড়া সমাজে গোপন রাখা হয় । কেউ কেউ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এমনকি বিয়েও করেন ,যদিও এই বিয়ে সমাজ ও আইন বৈধতা দেয় না । এই ধরনের সম্পর্কের কিছু নাম রয়েছে ,যেমন বাংলাদেশে বলা হয় “পন্থি”,দিল্লিতে “গিরিয়া” , কোচিনে “শ্রীধর” ।

যাবতীয় যৌন সম্পর্ক , যৌন ভোগ এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মানসিক বন্ধনের পরও এঁরা স্বীকৃতি পান না সমাজে , এমনকি যৌন সঙ্গীর কাছ থেকেও । এঁরা শুধু শারীরিক ভোগের স্বার্থে যৌন যন্ত্র হিসেবেই ব্যবহৃত হয়ে থাকেন ।

সামাজিকভাবে বঞ্চিত হিজড়াদের বেশীরভাগই অর্থনৈতিক দিক দিয়ে দুর্বল হয়ে থাকে। কোন শিক্ষাক্ষেত্রে , সাধারণ কর্মক্ষেত্রে এঁদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়ায় এঁদের পেশা বলতে থেকে যায় জোর করে ,নানা অসুবিধা সৃষ্টি, হুজ্জতি করে অর্থ উপার্জন (Extortion) , বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অর্থের বিনিময় নাচ-গান ইত্যাদি করা (টোলি) ভিক্ষাবৃত্তি (ধিঙ্গনা) এবং যৌন বৃত্তি – যা বহু প্রাচীন কাল থেকেই তাদেরকে দিয়ে করানো হয় । বর্তমানে রাষ্ট্র তথা আইন তাদের কিছু অধিকার দিয়েছে ঠিকই কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিচ্ছবি সমাজে এখনও দেখা যায় নি ।
হিজড়ারা সুপ্রাচীন কাল থেকেই নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে , জন্মে ,বিবাহে এবং যৌন তাড়নার স্বার্থে ব্যবহৃত হয়ে চলেছে কিন্তু অপর দিকে তারা চরম বঞ্চিত স্বাস্থ্য পরিসেবা, শিক্ষা , আবাসন , আইন ,কর্মসংস্থানের মত বুনিয়াদি প্রয়োজন ও অধিকার থেকে । ‘নারী’ কিংবা ‘ পুরুষ’ কোনো একটি বিভাগে ফেলতে না পেরে আমলাতন্ত্রও তাদের প্রতি বৈষম্যমুলক আচরণ করে থাকে । সামাজিক পরিবেশেও তাঁদের প্রতি হিংসা ,বিদ্রূপ নিত্য ঘটনা । বিশেষ করে যৌন পেশায় থাকা হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষদের প্রতি । এঁরা সাধারণ জনাকীর্ণ স্থানে, পুলিশ থানায় এমনকি সংশোধনাগারেও নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতিত হন।

আমাদের আশেপাশে থাকা একটু অন্য ধরনের প্রকৃতির মানুষগুলি শুধুই আমাদের কৌতূহলের , আমাদের বিদ্রূপের , আমাদের নবজাতক সন্তানদের দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করা কিংবা আমাদের বিকৃত যৌন খিদে নিবারণের জন্যই ! তারা অপর ...তারা ভিন্ন ...তারা আমাদের মানব প্রজাতির ধুসর অঞ্চল – তাই তাদের প্রতি আমাদের কোনো সহানুভূতি থাকতে পারে না ,থাকতে পারে না কোনো দায়ও !



ধুসরাঞ্চলে ক্ষীণ কিরণ

মানব প্রজাতির এই মধ্যবর্তীরা রয়েছেন ৪০০০ বছরের ইতিহাস নিয়ে এবং বহু লক্ষ সংখ্যায় এ দেশে ,এই সমাজের আনাচে কানাচে । প্রথমবার জনসুমারিতে এঁদের কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এইবারে , তাতে ৪৯০০০০ সংখ্যা পাওয়া গেছে , যদিও মনে করা হচ্ছে প্রকৃত সংখ্যা এর ৬-৭ গুন । সুবৃহৎ বঞ্চনা , নির্যাতনের ইতিহাস পেরিয়ে বহু লড়াই বহু প্রয়াসের পর ছবি কিঞ্চিৎ হলেও বদলাচ্ছে । এই বদলে তাঁদের শরিক বিভিন্ন মানবতাবাদী সমাজসেবী সংগঠন , আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা ,কিছু বিরল ব্যক্তি ।
যদিও আই পি সি ৩৭৭ ধারায় “প্রকৃতিবিরুদ্ধ যৌনাচার ” ( নারী ও পুরুষের সন্তানের জন্মের লক্ষ্যে করা যৌনক্রীয়া নয় এমন ) এর অভিযোগে পুলিশ গ্রেফতার করতেই পারে , কিন্তু আজকে সমাজসেবী সংগঠন তাকে আইনি সহায়তা দেবে ।
বিহার সরকার ২০০৬ সাল থেকে ‘হিজড়া’ সম্প্রদায়কে ট্যাক্স আদায়ের কাজে লাগাচ্ছে এবং দেখা যাচ্ছে ট্যাক্স আদায়ের এযাবতকালে ব্যবহৃত পদ্ধতির মধ্যে এটি সবথেকে কার্যকরী ।
রাষ্ট্রও এখন স্বীকার করছে এঁদের অস্তিত্ব । ২০০০ সালে ‘শবনম মৌসি’ প্রথম সাধারণ নির্বাচনে অংশ নিয়ে লোকসভায় যান , তখন থেকে আজ পর্যন্ত অনেকেই তাঁকে অনুসরণ করে জাতীয় রাজনীতিতে যোগদান করেছেন । প্রতিনিধিত্ব বাড়তে থাকা হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষরা এবার সরকারি নীতি নির্ধারণকেও প্রভাবিত করতে থাকে । তামিলনাড়ুতে হিজড়াদের অনুমতি দেওয়া হয় ,যদি তাঁরা মনে করেন রেশন কার্ডের আবেদনপত্রে ‘ F ’ বা ‘M’ এর বদলে ‘ T ’ লিখতে পারে । এবং এই ব্যবস্থা আগামী দিনে পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রেও করা হবে ।এই ‘ T’ নির্দিষ্ট করছে ট্রান্সজেন্ডার (TRANSGENDER) কে, যাদের সরকার ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ বলে স্বীকৃতি দিচ্ছে সাম্প্রতিক কালে । হিজড়ারা ট্রান্সজেন্ডার নয় – এনিয়ে বিতর্ক রয়েছে , তবে সার্বিক দিক দিয়ে বৈষম্য ও নির্যাতনের নিরিখে , বৃহত্তর ক্ষেত্রে এই শব্দটি ব্যাবহার হচ্ছে ।
বদলাচ্ছে , খুব ধীরে এবং ক্ষীণ হলেও আলোর কিরণ এসে পড়ছে সমাজের এই ধুসর অঞ্চলে । আলোকিত হচ্ছে তারা, জাহির করছে –‘আমরা রয়েছি ,প্রবল ভাবেই রয়েছি ’। আমরা আর উদাসীন থাকতে পারছিনা ,অস্বীকার করতে পারছিনা তাদের অস্তিত্ব । এবার একটু শুধু নিজেদেরও বদলাতে হবে ,এই সমাজের বৃহত্তর অংশের , যাঁরা মানব প্রজাতির মানচিত্রে ‘নারী’ কিংবা ‘পুরুষ’ ,তাদের একটু উন্মুক্ত করতে হবে চেতনা – ‘হিজড়া’ , ‘কিন্নর’ বা ‘ট্রান্সজেন্ডার’ যে নামেই ডাকা হোক না কেন , তাদের জুড়ে নিতে হবে সীমান্তরেখার পতিত ‘নো ম্যান্স ল্যান্ড’ থেকে প্রকৃত মানব মানচিত্রে ।
তথ্যসুত্র -
https://en.wikipedia.org/wiki/Ila_%28Hinduism%29
http://www.quora.com/Indian-mythology-Are-there-any-instance s-when-a-male-turned-female
http://kinnarsamaj.blogspot.in/2015/08/blog-post_51.html
http://www.everyculture.com/South-Asia/Hijra-Religion-and-Ex pressive-Culture.html
http://www.datehookup.com/singles-content-hermaphrodite-info rmation-and-resources.htm
http://www.newstatesman.com/world-affairs/2008/05/hijras-ind ian-changing-rights
http://timesofindia.indiatimes.com/city/patna/Transgender-vs -Hijra-debate-hots-up/articleshow/46169219.cms
http://www.glaad.org/blog/indias-census-counts-transgender-p opulation-first-time
**এবং আরও অনেক ।