মেলোডির শব্দজাদুঘর

মেঘ অদিতি


স্বপ্ন গাঢ়তার বাঁকে অবাক যে ধ্বনিকাল
বন্ধ জানলার গায়ে তখন এক পোঁচ ধুলোর আস্তর। সাইড টেবিলে ঢাকা দেওয়া আধ খাওয়া জলের গেলাস। আর দেয়ালের কোণে ধীরগতির এক টিকটিকি ও তার ভৌতিক ছায়া।

সকাল ৬:৪৫ এর এলার্ম রিং টোন হিলিয়াম ইন স্নুজ মোড এ। বাজছিল। থেমে থেমে। প্রথমবার লোকটা টের পেলো না। দশ মিনিট পর দ্বিতীয়বারের এলার্ম। এবার ঘুমের ভেতর সে নড়ে উঠল সামান্য। চোখের পাতা কাঁপলো তিরতির। ডানদিকের ভ্রূ সামান্য কুঁচকে আবার সোজা হলো। কপালে একটা ভাঁজ ফুটে উঠতে উঠতে বালিশের নিচ আর বেডসাইড টেবিলে সে ফোনটা খুঁজল। বন্ধ চোখে তা পেয়েও গেল সাই্ড টেবিলে। এলার্ম বন্ধ করতে গিয়ে শেষে অভ্যস্ত হাতে ফোনের সুইচই অফ করে দিল।
পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে গেল।

সাইড টেবিলের ল্যাম্পে তখনও বৃত্তাকার আলো। পাশে ডায়েরি আর একটা কলম পরষ্পর জড়িয়ে। তাদের যৌথতায় হেলান দিয়ে আছে একটা ক্লোজাপিন এর পাতা। ঘুমের ভেতর বারকয়েক আবার এপাশ ওপাশ করল। একবার ডান হাত সামান্য ছড়িয়ে কিছু একটা লেখার ভঙ্গিতে থেকে ফের স্থির হল সে, বন্ধ চোখের তারাদের তখন ঘনঘন স্থানবদল।

পুনরায় ঘুমিয়ে পড়া এই লোকটাকে নামপুরুষে চিনি আমি প্রান্ত বলে।

ঘরের জানলায় ঘন টানা নয় বরং লাইল্যাক কার্টেনগুলো এদিকওদিক এলোমেলো সরানো। কার্টেনের ফাঁক গলে সকালের আলো ঢুকে পড়ছে। বিছানায় পিঙ্ক ফ্লোরাল চাদর। দেয়ালে হালকা শেডেড লাইল্যাক প্যাচ। সাইড টেবিলে ওর হাসি মুখের সাথে আরও একটা মুখ ফ্রেম হয়ে আছে। পুরো ফ্ল্যাটের অন্য কোথাও আর কোনো যুগলবন্দী নেই।

প্রান্ত, যাকে চিনতে হলে আমাদের চলে যেতে হয় শূন্য দশকের কবিদের মাঝে, যে তখন হীরকখণ্ডের মতই ঝকঝকে, প্রাঞ্জল। এ মুহূর্তে অবশ্য ঘুমের ভেতর সে মুখে অসহায়তার আঁকিবুকি। ঘুম আর জাগরণের মাঝামাঝি হয়ত তার ব্রেনওয়েভ এখন ১৩.৯-৭ সাইকেলের আলফা লেভেলে যা তন্দ্রা, স্বপ্ন, বা সৃষ্টির স্তর। হয়ত সে এখুনি ঢুকে পড়বে এক স্বপ্নের ভেতর যে স্বপ্ন তাকে নিয়ে যাবে গাঢ় কোনো প্রিয়তার কাছে। হয়ত তারা হিলি গাঢ় সবুজ থেকে জুমের সবুজের দিকে ঘুরে বেড়াবে। খুব একটা ঢালের মুখে, যখন একটা ঘর প্রান্তর চোখে টান ধরাবে, ঝাপটে উঠবে কিছু রোদ্দুরপাখির ডানা। আর সেই মুহূর্তে আগ্নেয়গিরির মুখ খুলে লাভার মত ছিটকে হয়ত বেরিয়ে আসবে পঙক্তি। যদি তাতে সুর এসে ছোঁয় নি সা গা হ্মা পা ... তখনই ম্যাজিক রিয়ালজম, শুরু হবে ঋষভ-ধৈবত-নিষাদের অবরোহণ। কোমল রে থেকে কড়ি মার টলটলে সুরে সম্মোহিত কবির অবাক ধ্বনিমুহূর্তে চলাচল। চলমান তরঙ্গ থেকে ভাসতে থাকবে হাওয়াই শব্দ। আকাশ ভরে যাবে সেই মুখরতায়। বুকের ভেতর প্রবল টান উঠে সে হয়ত হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চাইছে সেইসব উড়ন্ত ডানা ...

ঠিক তখুনি যদি কেটে কেটে যায় স্বপ্নের সুতো.. দূর থেকে দূর, বহুদূর উড়ে যায় মেলোডির শব্দজাদুঘর নির্মাণ-বিনির্মাণ, সমস্তই কি থেমে পড়ে তখন!

আঙুল অসাড় হলে ঝরে পড়ে মায়ার প্রহর
টুং
টুং..
ডোরবেল আবার টুং। সে অর্থাৎ প্রান্ত তন্দ্রা থেকে ফিরে আসছে জাগৃতিতে- শূন্যদৃষ্টি মেলে দিচ্ছে বন্ধ ঘরের ওর কোণে কোণে। ঘরের ভেতর আটকে আছে যে হাওয়া তাতে নিজেকে মনে হচ্ছে ওর ভাসমান কিছু। মাথার ভেতর তৈরি হচ্ছে শূন্যতা। তৈরি হচ্ছে ছেঁড়া ছেঁড়া কিছু ছবি...

আবার বেল বাজছে। উঠে বসছে ও। ভাসমানতা থেকে সে আবার ফিরেও আসছে নিজের অবস্থানে। দৃষ্টি এদিক সেদিক যেন বড্ড অচেনা যাপনবাড়ির গ্রীষ্মকালীন এই নিবাস। কেমন মাথাভর্তি ঘোর। সে পা ছুড়ছে শূন্যে। কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে পা। নামতে চাইছে জমিনে। গভীর জল।

এক, দুই, তিন- জল..
চার, পাঁচ, ছয়- জল..
জলের ভেতর পড়ছে পা। এই তো দাঁড়াল দিব্যি!
জমিন না কি ঘরের মেঝে..কত জল, কত জল.. পা পড়ছে কোনখানে?
আবার টুং..

টলমলে পায়ে কিছুদূর। দরজা খুলতেই শুভ। কী রে! ঘুম হয়েছে ঠিকঠাক? প্রান্ত দরজা থেকে সরে শুভকে ঢোকার জায়গা করে দেয়। মাথা ঝাঁকায়। মনে পড়ে যায় ঝিম ধরানো এইসব সকাল আর শরীর ভর্তি অবসাদ যা তার নিজস্ব সেখানে প্রায় প্রতিদিনই শুভ সটান ঢুকে পড়ে। ব্যক্তিগত সময় থেকে কিছু সময়ের দখল নেয় ও।

শুভ আসে। শুভ হাসে। এক একটা সকালের আলো এসে শুভর মুখে পড়ে। প্রান্ত তাকিয়ে থাকে সেই মুখে। শুভ হয়ত তখন বাড়ি থেকে বয়ে আনা দুজনের জন্য ব্রেকফাস্ট টেবিলে রাখছে। ওয়েস্ট পেপার বিনের দিকে ঝুঁকে দেখছে কতগুলো কাগজের গোল্লা জমেছে তাতে। আজ দরজায় শুভর সাথে দাঁড়িয়ে আরেকজন। ছেলেটাকে শুভ বলছে, ভেতরে এসো। ওকে দেখে প্রান্তর ভ্রূ কুঁচকে যাবার আগেই শুভ বলে, উপায় কী। ব্লাডটা তো টানতে হবে বন্ধু! সাতদিনে একবারই তো। তেতোগেলা মুখে ও হাত বাড়ায়। সে চলে যাবার পর, শুভ প্রান্তকে নিয়ে টেবিলে বসে। রুটির কোণ ছিঁড়ে খেতে খেতে টুকটাক প্রশ্ন করে। হঠাৎ কী মনে করে বলে, জানিস কী একটা লাইন মাথায় আসছে যাচ্ছে দু’দিন ধরে। ঠিক ধরতে পারছি না কার লেখা।

প্রান্ত ভাবলেশহীন মুখে তাকায়। শুভ বলে, আরে শোন না! তুই তো অনেক পড়িস। আমার এত সময় তো নেই। কিন্তু কী করে যে গত দু’দিন মাথায় ঘুণ পোকার মত এই লাইনটা ঢুকে গেছে আর মগজ কাটছে কুটকুট করে.. আচ্ছা এটা কার লেখা বলতে পারবি?

পুরনো চিঠির ভাঁজ খুললেই গান.. লাইনটা কার বলতো? ঘোরের ভেতর সে শুনতে পায় বাবার টাইপ রাইটারের একটানা খটখট শব্দ। শূন্যদৃষ্টিতে সে মোমদানের পিচরঙা মোম দেখে। না পারার এক অদ্ভুত জগত তার। কবিতার ভাষা অনুবাদে সে যত অক্ষম তার চাইতেও অক্ষম এ কার কবিতার পঙক্তি মনে করতে। মনের অনির্দিষ্টতা থেকে চারপাশে তৈরী হয় যে অসীম শূন্যতা তার মাঝে সে প্রায়ই দুলতে থাকে ঘরের দেয়ালে রাখা বাবার আমলের ওই ঘড়ির পেন্ডুলামের মত। ও কী করে জানবে এ কার কবিতা। মুখ ফিরিয়ে বলে, তুই কবিতা পড়িস কবে থেকে! এ প্রশ্নে শুভ হাসে, কবি বন্ধুদের সাথে ঘোরাফেরা করলে রুখুসুখু থাকি কী করে। বল না কার লেখা.. প্রান্ত বাইরে তাকায়। শুভ উঠে এসে বেসিনে হাত ধোয়। তারপর হাত রাখে ওর কাঁধে। আজ একটা ভাল ইংরেজি মুভি রেখে গেলাম। সময় করে দেখিস, আর হ্যাঁ- ওষুধ ঠিকঠাক খাবি।

শুভ বেরিয়ে গেলে প্রান্ত এসে জানলায় দাঁড়ায় । গ্রিলে হুটোপাটি খেলে আলোকমোড়ানো সময়। শার্সিতে এবার গড়িয়ে নামবে বেলা। জানলার গ্রিল থেকে সে আলো তুলে আঙ্গুলে মাখতে থাকে। বাতাসে ভেসে বেড়ায় গথিক কোনো সুর। প্রান্ত কান পাতে। পুরনো চিঠির ভাঁজ.. কী একটা বলে গেল শুভ.. ভেতর গুঞ্জন তোলে পুরনো চিঠির ভাঁজ; চোখ বুঁজে যায়...

প্রান্ত খুঁজতে থাকে তার অপার্থিব খেরোখাতা আর কলম। মসৃণ মার্বেল হয়ে গড়িয়ে যায় সময়, দিগন্তরেখা ছুঁয়ে তার এমন খরা, কিছুতেই আর খুঁজে পায় না সে সেসব। ধূসরতা ছায়া মেলে শুধু। ঘামতে থাকে। মাকড়সা জাল ছড়াতে থাকে মাথায়। কী যে হয়, একে একে মেঝেতে ছুড়ে ফেলে টেবিলে রাখা বই। পুড়তে পুড়তে নিজস্ব প্রতিবিম্বে অসহায়তায় নগ্ন শরীর পেতে ইতিউতি খুঁজতে থাকে পুরনো প্রান্তকে। বুকে ব্যথার ঢেউ ওঠে। চোখ থেকে নাক, চুল থেকে ত্বক ঝরে পড়ে ঘামবিন্দু টপটপ আর রাশি রাশি অপারগতা।

সৃষ্টিছাড়া রুদ্ধকন্ঠ প্রশ্ন করে-
কে তুমি?

নিউরন সেলে থাকে যত সংযোগ, তাতে কই মনোসংযোগ? সংযোগ বিচ্ছিন্নতার দিনে কুয়াশামোড়া মাইক্রো গ্র্যাভিটির ভেতর ভাসমান সেইসব শব্দপুঞ্জ কেন অনুভবের বাইরে থাকে? কেন অত হাওয়ার ছুটোছুটি!


নৈঃশব্দ্যের ফোকরে জেগে ওঠে মিস্টিক অন্ধকার
জিরো ডেসিবল! পূর্ণ নিরবতাকামী! অসহায় প্রান্ত হাসে.. শব্দহীনতার মোড়কে শব্দের এক অশরীরি জগতে এই তো তার ভ্রূণ হয়ে বেঁচেমরে থাকা, কাছে যারা আসে তারা শুধু তর্জনীই তোলে। তেমন ভালবাসে কই। ছোট ছোট ঢিল বুকের ভেতর। তরঙ্গ জাগে না। দিনের বেশির ভাগ সময় ধরে আতিপাতি খুঁজে যায় সেই কেন্দ্রবিন্দুটি যা থেকে উঠে আসত তরঙ্গ। ধোঁয়া মগজের কোষে কোষে এখন ছড়াতে থাকে যে রঙ তা প্রুশিয়ান আর খানিক ইন্ডিগো.. এই ধোঁয়াশায় আর আর কিছু সে দেখতে পায় কই। বহুদূরে জাগে যে বুদ্বুদ, তাতে খেলা করে আধো শব্দ, সদ্যোজাত শিশুদের মুখ ফোটা বোলের মত কিন্তু আঁধি আসে কেন, কেন সব হারিয়ে যায় এ্যাডিসিভ হোয়াইটের কুণ্ডলীতে..

‘সে এক অনন্ত দৃশ্য, যাতে কৃষ্ণচূড়ার লাল ছিল আকাশ ছেয়ে। রাধাচূড়ায় লেগেছিল আগুন। বর্ণিল আভার বহুবৃত্তিক শব্দমোহ নিয়ে কবিতা কোলাজ উড়ছিল বাতাস কেটে কেটে। পঙক্তির পর পঙক্তি। স্তবক ঘুরে তৈরী হওয়া মেটাফর ভ্রমণকালে ছোট ছোট ঢেউ থেকে প্রবল ঢেউয়ের দিকে তাকে নিয়ে এগিয়ে চলার সেইসব ঠিকরে পড়া আলো যেমন কলসুন্দরের মেয়েদের পায়ে পায়ে বল হয়ে দৌড়ে বেড়ায় তেমনই’ মনে পড়ে?

মনে পড়ে..! মনে পড়ে.. অণুরনিত ছায়াগুলো হেঁটে যায় মনের দীর্ঘ করিডর ধরে।
টানটান ভারী পর্দা জানলায়। ফলে একটা আলগা ছায়া নেমে আসে দিনের বেলার ঘরে। আধশোয়া প্রান্তকে প্রশ্ন করে শুভ। প্রান্ত সামান্য নড়েচেড়ে ওঠে। শুভর হাতে এখন একটা ফুলস্কেপ কাগজ। প্রান্তকে পড়তে বলে। টেবিল ল্যাম্পটা জ্বেলে দেয় উঠে। প্রান্ত কাগজ তুলে নেয়। খুব ঝাপসা কিছু অক্ষর পরপর সাজানো। যেন কবিতা। কী এটা? এ প্রশ্নে শুভ হাসে, নিদান.. পড়ে দেখ।

একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সে। ঝাপসা অক্ষরগুলো সাদা কাগজে ফুটে ওঠে একটু একটু করে।

পুরোনো চিঠির ভাঁজ
খুললেই গান
জেগে ওঠে বীজমন্ত্র স্বপ্নের ডানা

ভেঙে ভেঙে শব্দ করে পড়ে ও। শুভ চেয়ে থাকে প্রান্তর মুখে। পড়ে নিতে চায় মনের ওঠাপড়া।

কবিতাটা কার প্রান্ত? উত্তর নেই।
আজ স্নান করেছিলি? উত্তর নেই।

শূন্য দৃষ্টির প্রান্তর পাশে এসে বসে শুভ। কী ভাবছিলি? নিরুত্তর প্রান্ত খুঁজতে থাকে, কী ভাবছিল যেন.. কী একটা.. দু’ মিনিট আগে.. মনে করতে পারে না। অসহায় মুখ তাকিয়ে থাকে শুভর দিকে। শুভ জানে ওর মন থেকে থেকে উধাও হয়ে একটা ব্ল্যাক হোলে আটকে পড়ে। কিছুতে সেখান থেকে বেরোতে পারে না সে। পারে না কিছুতে মনোসংযোগ করতে। ভুলে যায় একটু আগের ঘটে যাওয়া ঘটনা বা চিন্তার প্রবাহমাণতা। পারি না, পারছি না কিছু এ ওকে ছিন্নভিন্ন করতে থাকে। প্রবল আক্রোশে কখনো সে নিজেকেও শেষ করতে যায়।

এ দুঃসময়ে শুভকে তাই আসতে হয় বারবার প্রান্তর কাছে। দাঁড়াতে হয় প্রিয় বন্ধুর পাশে। ও জানে এ সব কাটিয়ে উঠতে পারলে, প্রান্ত ঠিক ফিরে আসবে কবিতার কাছে। আসবেই। হাত ধরলে আবার ও বেরিয়ে আসবে আগের মত প্রাণবন্ত প্রান্ত হয়ে। পাগলের সাথে ঘর করা এবসার্ড.. বড় কাছের মানুষ যখন এভাবে বলে তখন প্রিয় কবিতাও একটু একটু করে দূরে সরে যায়। আজ প্রান্ত তাই এক খাদের মুখে দাঁড়িয়ে নিজের কাছ থেকে বহুদূরে থাকে। মনে করতে পারে না নিজের লেখা কবিতার কথা। কখনো যে লিখতে পারত এই বিশ্বাসটাই তার উবে গেছে। ডিলিউশন আর হ্যালুসিনেটিভ এক জগতের ভেতর এখন সে কেবল শুনতে পায় অসংখ্য ছায়ামানুষ তাকে তাড়া করছে।

শুভ জানে ওষুধ নয় ওর দরকার কগ্নিটিভ বিহেভিয়র থেরাপি। প্রায় চার মাসের কাছাকাছি ও প্রান্তর সাথে তাই জুড়ে রয়েছে আঠার মত। ওকে ভালো করতেই হবে।

শুভ যখন প্রান্তকে সারিয়ে তোলার চিন্তায় ডুবে যায় প্রান্তর বুকের লাবডুবে তখন উঁকি মারে বিকেল। ওর মনে পড়ে কোনো এক গির্জা থেকে উঠে আসা ঘন্টাধ্বনির সাথে ও দেখেছিল আলোর রঙ পালটে যাচ্ছে পাতার ভাঁজে ভাঁজে। পাক খেতে খেতে ছায়ারা দীর্ঘ হতে শুরু করেছে আর দীর্ঘ হতে হতে ছায়া ঠিক যেন জারুলের রঙ। নীলে নীল সব। তার সাথে কমলা আভা ছড়াতে থাকলে তা হয়েছিল নীলচে বেগুনে আভাস।

সেই থেকে নীল, কোবাল্ট না রয়াল। রয়াল না মিডনাইট?
খুব ধীরে ধীরে রঙ পাল্টে পাল্টে ভাবয়িত্রী জেগে ওঠে মনে।


ছবিগুলো উড়ে আসে জলের আয়নায়
এই এখন, প্রবল কুয়াশা আর জল থৈ থৈ এক মাথা। তবু কী করে যেন কিছুটা শান্তও সে। বেশ ক’দিনই এরকম চলছে। অস্থিরতা কমছে কিছু আবার জলও খুব। তাই ডাঙার খোঁজ সে পাচ্ছে না কেবল জলমগ্নতার মাঝে সে প্রায় দুপুরগুলোতে রিডিং রুমে এসে বসছে আর ফ্লোর ম্যাটে চুপচাপ বসে থাকতে থাকতে সে দেখছে খুব ধীরগতিতে রাইটিং টেবিল থেকে এঁকেবেঁকে মেঝেতে পিছলে নামা দ্বিপ্রাহরিক রোদ। বারান্দায় টবে রাখা একটা জলহীন বিবর্ণ পাতাবাহার তার কৌণিক ছায়া মেলে হয়ত স্লাইডিং ডোর থেকে ঘরের মেঝেতে। ঘরে একরাশ আলো তবু একটা আলো তার ঘরে। বাইরে ধীরগতির দুপুর। বারান্দায় কাপড় শুকোবার তারে ওই একটাই চিহ্ণ তার। সেই কবে থেকে.. ক্লিপের বাঁধন ছোটাতে পারে না বলে হাওয়া এলে যে দুলতে থাকে, যেন ওড়না নয় কিশোরীর দোল খাওয়া বেণি একবার কাঁধের এপাশ আবার ওপাশ। অথচ সে কিন্তু ঠিক পেরেছিল বন্ধন ঘোচাতে। পারতে জানতে হয়। পেরে ওঠাটাই লড়াই। একদিন প্রান্তও পারত। ঈশাণে মেঘ জমলে কপাল ছুঁয়ে বন্ধ চোখের পাতা। ফের কপাল ঘুরে নাকের পাশ, কান থেকে ধীরে গলা। গলা থেকে বাহুসন্ধি.. সুর আর কবিতা । তারপর একরাশ চুল সরালেই তো বিটোভেনের সিক্সথ সিম্ফনি, অনুভূতির সর্বোত্তম প্রকাশ। কনুই থেকে শিড়দাঁড়া পেরোলে ঘনঘন বিদ্যুৎপাত। আহ..কতদিন.. ঠোঁটের কোণ কেঁপে কেঁপে ওঠে। একটা দুটো কাচের চুড়ি হাওয়াই টানে বাজে রিনরিন। প্রান্ত চোখ বন্ধ করে ফেলে। ভেসে বেড়ায় অবসেশনের সুগন্ধ। কানের কাছে ঘন একটা শ্বাস পড়ে। ভেজা শ্বাস। প্রান্তর শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসে। আরেকটু ঘন হয়ে আসে ডিওর পরশ। প্রান্তর বিট বাড়তে থাকে। মেঝেতে পড়ে থাকা একটা বল নিয়ে ল্যাব্রাডরটার অকারণ ছুটোছুটিতে বলটা প্রান্তর কোলে এসে পড়ে। ও চোখ মেলে।

মেঝেতে পড়ে থাকা রোদ তখন তার অবস্থান পাল্টেছে। খাটো হয়ে আসছে তার দৈর্ঘ্য।

টেবিলে খোলা ডায়েরির পাতাগুলো অল্পবিস্তর উড়ছে। কিছুক্ষণ আগে কী মনে করে বইয়ের তাক থেকে পুরোনো ডায়েরিটা টেনে নামিয়েছিল। বাবার ডায়েরি। পাতাগুলো অনেক বছরের ব্যবধানে হলদেটে। খোলা পাতার ওড়া থেকে এক রকমের ঘোর তৈরী হয়। প্রান্ত.. বাবা। বাবা! বাবাই তো দাঁড়িয়ে দরজার কাছে, কিছু ছায়া মেখে। বাবা এসে পাশেই বসলেন। কী একটা পুরোনো দিনের গান তার ঠোঁটে গুনগুন। প্রান্ত টেবিল থেকে ডায়েরিটা এনে একটা দুটো করে পাতা উল্টে চলল। বাবার তুলে রাখা মুহূর্তগুলো ছবির মতো, বাবা মৃদু হাসলেন। মাঝের কোনো এক পাতা উল্টে দিয়ে ইশারা করলেন পড়। বাবার লেখা- অভিধান থেকে সম্ভবত, অসম্ভব, যদি আর ব্যর্থতা্ শব্দগুলো মুছে দিলাম।

মনে পড়ল প্রান্তর, সা্ঁতার শেখাতে গিয়ে বাবা বলেছিলেন, জলের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াটাও শিখতে হয়। প্রান্তর তখন প্রবল ভয়। পারছে না। বাবা এক গলা জলে। প্রান্তও। শুরুতে বাবা পেটের নিচে হাত রেখে হাত পা ছুড়তে বলেছিলেন। হঠাৎ হাত সরিয়ে নিতেই প্রান্ত ভারসাম্য হারাল। ডুবছে। একরাশ জল ঢুকছে পেটে। লাল-নীল টুনি বাতি জ্বলতে শুরু করছে মাথায়। আর দ্রুত শ্বাস কমে আসছে।

বাবা শান্ত। বাবা স্থির। কেবল বলছেন- পারবে। পারতে হবে তোমাকে....পারবে..এই তো পারছো.. নিজেকে বাঁচাতে প্রাণপন লড়ে যাচ্ছে ও তখন জলের সাথে।

বাবা, জানো এখনও আমি জলেই পড়েছি আবার.. বারান্দার গ্রীলে একটা চড়াই এসে বসল।
যুগলবন্দীর মুখ ফ্রেমবন্দী ফের। বাবা ঘুমিয়ে পড়লেন ডায়েরির হলুদ পাতায়। ফাঁকা বিছানা থেকে পুরো ফ্ল্যাট, বিরান প্রান্তর।


শব্দের ঝরা পাতা, ঘুম ভেঙে জ্বেলে দেয় আলো
ঝুলবারান্দায় আজকের বিকেল নেমেছে কিছু মোহন ভঙ্গীতে। শেষবেলায় যদিও ঘরে সামান্য কুয়াশা তবে খুব অস্পষ্টতা নেই আজ। আজ আরেকটু স্থির প্রান্ত। আরেকটু রিলাক্সড। হয়ত তার সময়কাল অল্প তবু সে যে আগের মতো অস্থির নয় তা বোঝা যায়। বারান্দা ছেড়ে রিডিংরুমে এসে বসল ও। মাথার পিছনের আলোটা এখন জ্বলছে না। লোডশেডিং!
‘দু দণ্ড ফোয়ারা..’ ফোয়ারা.. কার যেন? ফোয়ারর পর কী?
মনে পড়ল একটা পঙক্তি, “সম্পর্ক থাকে না। ক্রমে জলে ডুবে যায়”। কার…. ?
ছায়ার মধ্যে সে শেল্ফ থেকে চোখ বন্ধ করে একটা বই তুলে নিল। আনমনে পাতা উল্টে যেতে যেতে চোখ থমকে গেল, “চরাচর তোমাকে ডাকছে অমল, অমল বলে”.. কার? এ কার লেখা তা দেখতে আর আগ্রহী হলো না সে। বইটা হাতে ধরা, চোখ বন্ধ করে নিজের ভেতর এবার ডুব দিল। আর তার কিছু পরেই সাইকোডেলিক একটা আলোর ঢেউ এল বুকে। আর বুক থেকে উঠে এলেন বাবা। ডাকলেন, বাবু..বাবু.. প্রান্ত আধশোয়া থেকে সোজা হলো।

একটা শব্দ উঠে এল মনে, মৃত্যু। উঠে এল, গোপন। প্রান্ত কলম তুলে নিল।

সাদাকাগজে কেটে কেটে বসল মৃত্যু, সঙ্গোপনে, জেগে, আছি, আজো.. উহুঁ না। কেটে দিল।

ক্লাউড ফল। লিখল, ইচ্ছেমৃত্যুর পাশে, শুয়ে আছি ফুলেল বিভ্রমে.. কেটে দিল। হচ্ছে না।

কাগজ ছিঁড়ে গোল্লা বানাল। পেপার বিনে ছুড়ে মারল.. মিসিং লিঙ্ক.. হবে। আবার শব্দ বসল। হলো না। কাগজ ছিঁড়ল আবার। ঘরময় কাগজের উড়োজাহাজ ভাসল।

আজ আবার নীল ছড়াতে থাকল ঘূর্ণির মতো।

শব্দগুলো হঠাৎ যেমন এল, হারিয়ে গেল হঠাৎই। প্রান্তর মনে হলো শব্দের কি রঙ আছে? যা কিছু দেখা তা তো রঙের ভিত্তিতে দেখা। কিন্তু শব্দ তরঙ্গ যাকে নিশানা মেনে পথ চলে যারা তারা কি চেনে শব্দের রঙ? কী করে! আল্ট্রা ভায়োলেট এলে চোখে কি আঁধার নামে! মাথার ভেতর ছড়ানো রঙ এঁকেবেঁকে গেলে সব কি সাদাটে ধোঁয়াশা! না কি ঘোলাটে সাদা থেকে ক্রমে সাবট্রেকটিভ রঙের দিকে যাত্রা তার ..

আরও খানিকটা নীল ছড়াতে থাকল মগজের কোষে।
ফোন অন করল ও! ঢুকে পড়ল রাশি রাশি বার্তা। অর্থহীন। সে চোখ সরাল সন্ধের নেমে আসার দিকে।

প্রায়ন্ধকার ঘরের ভেতর এল অনেকগুলো ছায়ার মানুষ। প্রান্ত জানে এইসব ছায়া ছায়া মানুষ তাকে ঘিরে থাকে প্রায়ই। একটা কালো গহ্বর তখন কী প্রবল বেগে তাকে টানতে চায় নিজের দিকে। এগোতে থাকে এইসব অচেনামুখ। ফিসফিস থেকে ক্রমে শব্দ বাড়তে শুরু করে। আর্ট গ্যালারি, সিনে প্লেক্স, একাডেমি, রবীন্দ্র সরোবর.. সমস্ত হুল্লোড় ঢুকে পড়ে ওর নিঃস্তব্ধ এই ফ্ল্যাটে..

আজও সন্ধের মুখে সে ওই কৃষ্ণ গহ্বর আবার দেখতে পায়। হাতে রাখা মুঠোফোনটা সেদিকে ছুড়ে মারে। এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়ে টুকোরো হতে থাকা মুঠোফোন। সেদিকে তাকিয়ে মনে করতে চায় ও দুটো দৃশ্যের সংঘর্ষ ঘটিয়ে তৃতীয় মাত্রাটিকে অর্থবহ করে তুলে আনার নামই মন্তাজ কি না।

তখন নীলের মাঝে এ্যাংকর ব্ল্যাক। কালার স্প্ল্যাশ। বাইরে কৃষ্ণ গহ্বর। টিল্ট শিফট। প্রবল টান। শুভকে মনে পড়ে। মনে পড়ে বীজমন্ত্র, পুরনো চিঠি... আহ..

গ্র্যাভিটি টানতে থাকে, আলো নেই। গ্র্যাভিটি টানতে থাকে, কৃষ্ণ গহ্বর। প্রান্ত টলে যায়।
সে প্রবল অন্ধকারের কাছাকাছি হতে ও ল্যাব্রাডরটাকেই হঠাৎ চিৎকার করে ডাকতে যায়, জিম..জিমম..জিম্মিইইই.. গলায় স্বর নেই। ইশারায় ডাকতে থাকে। আর কী আশ্চর্য সেই ল্যাব্রাডর তখন বিপরীত বেগে সরে সরে যায় দূরে। ওয়েস্ট পেপারবিনের হা মুখ থেকে বেরিয়ে আসা রাশি রাশি কাগজের কুচি উড়তে থাকে ঘরময়।

আর ঠিক তখনই মুখ থুবড়ে পড়তে পড়তেও প্রান্ত দেখতে পায় মাথার পিছনে আলোটা দুপ জ্বলে উঠল।
ডোর বেল বাজল!

টলতে টলতেই ও এগোয়। দরজার হাতল ঘোরায়। বাইরে থেকে শুভ ঝড়ের মতো ঢুকে পড়ে ঘরে।
একে একে সবগুলো ঘরের আলো জ্বালে ও। সটান শোবার ঘরে ঢুকে যায়। প্লেয়ার চালায়।
গমগমে কন্ঠ থেকে ভেসে আসে-
পুরনো চিঠির ভাঁজ
খুললেই গান
জেগে ওঠে বীজমন্ত্র
স্বপ্নের ডানা

দৃষ্টির গোপনতম দৃষ্টিতে
অকস্মাৎ ধ্বনি হয় সে
বেজে ওঠে নীলাভ চুম্বন
তোমার শরীরে

কেঁপে কেঁপে
ওম গলে নামে অন্ধকার
নেমে আসে অবাক চিবুক
তোমার শরীরে

প্রকৃত খরার দিনে
শস্যদানা আলোছায়া সোডিয়াম ঠোঁট
আছো জেগে, প্রিয় ধ্বংসস্তূপ!
জেগে আছো তুমি?



আহ...ভিনটেজ ঘোরের রঙ সরে সরে ক্রমে কমতে থাকে ব্ল্যাকহোলের টান।


ধনুকের জ্যার মত টানটান হতে থাকে প্রান্ত।


.......
উদ্ধৃত পঙক্তি ঋণ : জয় গোস্বামী, নবারুণ ভট্টচার্য