ট্যাকল

সংহিতা মুখোপাধ্যায়

আপিসে যাব বলে বেরিয়েছি। ইটপাতা গলি পেরিয়েই পিচরাস্তায় বাসস্টপ। গলির এখানে ওখানে গর্ত। সেই গর্তে জমে আছে নর্দমা উপছানো কালো পেঁকো জল। ছোটা-হাঁটার মাঝামাঝি বেগে সেই সব টপকাতে টপকাতে বাসস্টপের দিকে ছুটতে গিয়ে পা-টা পড়ল গর্তে। হালকা মোচ লাগল। আপিস যাওয়ার উপযোগী পাটভাঙা সালোয়ার চুপচুপে হয়ে গেল কালো পেঁকো জলে। গায়ের ডিওস্প্রে দমে গেল পায়ের গোড়ালি থেকে গোছ-ছোঁওয়া দুর্গন্ধে। আর বাক স্বাধীনতায় বলে ফেললাম, “শালা, হারামি। ভোট দিয়ে রাখলুম রাস্তা, নর্দমা সাফ করার জন্য। ঘাড়ে হেগে দিয়ে গেল, শালা!”
“জনপ্রতিনিধিত্ব প্রত্যাহারের অধিকার চাই” দাবিটাই গজগজাতে লাগল মাথার মধ্যে। ইন্সট্যান্ট হামলা, তাৎক্ষণিক প্রতিশোধ। ডজ করে সিন বোনে কিক দিয়েছ কী... আম্মোও। বাসস্টপে পৌঁছে ধৈর্য ও উদ্বেগের দ্বৈরথ শুরু। আপিসে ঢোকার আগেই নিপিড়ীত স্নায়ুর হাঁপানি শুরু হয়ে গেল। তার মধ্যে একটা চ্যাংকা মতো ছোকরা ঝাড়ি মারছে। দিতে হয় কানের গোড়ায় ঠাসিয়ে এক...। অন্যদিকে তাকানোর উপায় নেই। সেখানে তাবৎ পুরুষে হালকা হচ্ছে উটপাখির মন নিয়ে। দেওয়ালমুখো যেহেতু, উনি।ওঁরা দেখছেন না আমাকে, মানে আমিও দেখছি না ওঁকে।ওঁদের। সবার বাড়িতে হালকা হওয়ার উপায় আছে, কিন্তু বাসস্টপে রাস্তার ওপর ওটা না করলে যেন দিনটা মিথ্যে হয়ে যাবে! উফ্‌, কিছু একটা করা উচিৎ। কিন্তু কিইবা করা যায়? একলা আমি, আর ওরা অতজন। যদি ওদের নাকের গন্ধ সংবেদী স্নায়ুগুলো দশগুণ বেশি সক্রিয় করে দেওয়া যেত একটা কিছু গুঁড়ো-টুড়ো দিয়ে...। ঠিক হোতো। নাহ্‌, হচ্ছে না। এ ভারি কল্পনাবিলাস হয়ে যাচ্ছে। একটা বেশ এমন কিছু...।
বাস এসে গেল। চড়েও পড়লাম। পিঠে যেটা লাগছে সেটা কী? পিছনের লোকটার ব্যাগের কোনা নাকি...। স্টপেজ এসে গেছে। নামতে হবে। শরীরের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে স্নায়ুগুলোকে ঘুম পাড়িয়ে নেমে পড়লাম। তারপর ফুটপাথ, এলিভেটর হয়ে আপিসে নিজের খুপরিতে। আর মনে নেই সালোয়ারে লাগা পাঁক ছোপের কথা। কিংবা বাসস্টপের দূর্বিসহ দৃশ্যদূষণের কথা, ঘ্রাণ দূষণের কথা এবং বাসের ভেতরের যাবতীয় স্পর্শদূষণের কথাও। এখন শুধু টু-ডু লিস্টকে তাড়া করা আর এডিট করা।
গা গুলোলে একটা ডোমেস্টল। মিটিঙের মাঝে মাথাব্যাথা শুরু হলে সহ্য করে যাওয়া, তারপর গোগ্রাসে খাওয়া আর কখন বমি হবে ভেবে সন্ত্রস্ত হয়ে থাকা। তারপর আবার বাসে। খুব ভিড় নেই। তাই স্পর্শদূষণও নেই। তবে কন্ডাক্টর পিঠে হাত বুলিয়ে টিকিট চাইল, “কোথায় যাবে?” মাথা ব্যাথাটা ছোবল লাগালো রগে। ভাড়ার টাকাটা পুরো দিয়ে বললাম, “একটা সাত টাকা।” টিকিটটা দেওয়ার সময় গলায় হাত দিল লোকটা। আবার পাঁচ মিনিট পরে বাহুমূল ধরে জানতে চাইল, “টিকিট করেছো?” জরুরী মনে হলো তাই বলে ফেললাম, “গায়ে হাত দিচ্ছিস কেন বারবার?” সামনের সিটে বসে থাকা মহিলারা বলে উঠলেন, “অমন করে কথা বলে? ভদ্দরলোকের মেয়ের মতো দেখতে... ওদের ভরসাতেই তো যাতায়াত, ওদের সাথে অমন করে কথা বলে!” জবাবটাও জরুরী মনে হলো। তাই বললাম, “আমি কারুর ভরসায় রাস্তায় বেরোয় নি। আমার গায়ে অকারণে হাত দিলে হাত ভেঙে দেব এরপর।” প্রত্যুত্তর এলো, “তা বলে তুইতাকারি করবে?” আমিও ছাড়ব না, সেই সকাল থেকে মুখ বুজে সহ্য করছি (এই এতোগুলো লোককে), “আমাদের ভাষায় অপরিচিতকে আপনি বলার রেওয়াজ, তোরা যখন তুমিতে নামিয়েছিস, আমি নাহয় তুইতে নেমেই দেখালাম যে সবার সাথে বেয়াদপি করা চলে না।” সাবধান বাণী আসে, “যদি কিছু করে...” প্রতিসাবধান বাণী ছুঁড়ে দিই, “করুক দেখি...” পাশের ছাত্রীটি একচড় বসিয়ে দিয়েছে কন্ডাক্টরের গালে। সে নাকি ওর গায়ে বিশ্রী করে ছুঁয়েছে টিকিট কাটার সময়। ‘তুমি’-টা সহ্য করা যায়, গায়ে হাত দেবে কেন?
শোরগোলের মধ্যে বাস হঠাৎ এমন ছুটতে লাগল যেন লেজে রাখাল মোচড় দিয়ে দিয়েছে। চীৎকার করলাম, “এই আমার স্টপেজে দাঁড়ালে না কেন?” কন্ডাক্টর টোন কাটল, “হেঁকেছি ম্যাডাম, ঝগড়া করছিলে শুনতে পাও নি।” ছাত্রীটি বলল, “একটা খেয়ে আশ মেটেনি না? দাঁড়া এখানে, লাগাব আরেকটা, শুয়োর কোথাকার!” ড্রাইভার ঘ্যাঁচ করে এমন ব্রেক দিল, সবাই সিট ছেড়ে ঝাঁকিয়ে উঠল, রড ধরে হেলে গেল। নামার সময় ছাতা বাগিয়ে বললাম, “নেমে দাঁড়া নিচে। ভেবেছিস কী, আমি নামব আর তুই আমার গায়ে হাত দিবি? এক্ষুনি নাম না হলে মেরে মাথা ফাটিয়ে দেব...” লোডশেডিং-এ অন্ধকার হলেও কপা পিছিয়ে নিজের বাসস্টপ আর বাড়ির গলি চিনে নিতে ভুল হয় নি, জনতার উন্মুক্ত শৌচগন্ধে।
জিরোনোর সময়ে ফোন এলো প্রিয়বন্ধুর। তার বড়ো দুঃখ। কেউ তার কথা শোনে না। দুনিয়ার বড়ো দুঃসময়। কারা যেন কাদের দেশ দখল করে নিয়েছে। কারা যেন কাদের মেয়েদের ধর্ষণ করেছে। কারা যেন না খেতে পেয়ে মরে গেছে। কারা যেন খুচরো ব্যবসার স্বার্থে মিছিল করেছে। কারা যেন সরকারে পরকীয়া প্রেমপত্র পড়ে নেবে বলে বিক্ষোভ করেছে। কোন সাংসদ নাকি কুরুচিকর হুমকি দিয়েছে। কোন ভাষার আগ্রাসনে তার ভাষাটি বুঝি যেতে বসেছে। কারা যেন ধর্মের নামে পড়শিতে পড়শিতে ঝগড়া মারপিট বাধিয়ে দিয়েছে। তার দুঃখ আর সমবেদনায় ভাসতে ভাসতে বলে ফেললাম, “ব্যস, এসব আটকাতে তুই কী করলি? কী করতে পারিস? যারা যাদের দেশ দখল করেছে, তাদের কী তুই বুঝিয়েছিস যে এই দেশ দখল করার চাকরিটাও সুখের নয়? যতদিন না ওদের জীবন ওদের মেরে বা মেরে ফেলে শেখাচ্ছে আমাদের কারুর কিচ্ছু করার নেই। তাহলে এই কাঁদুনি গাওয়ার কী গুরুত্ব? নিজেকে সজাগ, সচেতন সংবেদনশীল প্রমাণ করা? মেয়েদের সম্পত্তি ভাবা হয় আর যথেচ্ছ তাদেরকে অপমান করা হয় শারিরীক মানসিক নির্যাতনে, ক্ষমতার প্রদর্শনে। আজ অবধি একটাও ক্ষমতা দেখানো পুরুষকে সমানভাবে শারিরীক মানসিক নিগ্রহ দিয়ে জানিয়েছিস কী ক্ষমতা তোরও আছে? পেরে উঠবি কিনা সন্দেহটাই থাকত না, যদি একবার কাজটা করে দেখতিস। যারা খেতে না পেয়ে মারা গেছে তাদের স্বার্থে গলা উঁচু করে বেশি ফসলী শস্যের তাঁবেদারি করেছিস কী? কিংবা শস্তায় খাবার সর্বত্র পাওয়ার জন্য ফসলের নষ্ট হওয়া বন্ধ হওয়া উচিৎ আর তার জন্য সংগঠিত পাইকার ও খুচরো ব্যবসার প্রতিযোগিতা দরকার সে কথা গলা তুলে বলেছিস কী? নাকি ভেবে চলেছিস যে কবে সরকারের রেশন ব্যবস্থা থেকে চোরেরা উবে যাবে আর যুধিষ্ঠিরের অবতারেরা হাল ধরবে? যারা মনে করছে সরকারে তোর পরকীয়া প্রেমপত্র পড়ে নেবে, তাদের বলেছিস কী ভয়টা তাদের যাদের পরকীয়া আছে আর যারা সততার মূর্তি সাজতে সেটাকে আড়াল করেছে তাদের। অকর্মার ধাড়িরাই এসব অপকর্মের কল্পনা করতে পারে কারণ তাদের ধারণা নেই পরকীয়া পড়ানোর মতো ভস্মে ঘি ঢালার বন্দোবস্তে রেস্ত কতো লাগবে। সাংসদে যা বলেছে তাতে তার ভোটাররা তালি দেয় নি? এতই যদি অপছন্দ সাংসদকে তো একটা প্রত্যাহারের অধিকার কেন চাওয়া হচ্ছে না? তোর ভাষাটা তুই কতো সজাগ হয়ে শুদ্ধ বলিস? কতোবার বানান নিয়ে সচেতন হয়েছিস? কতোবার নিজের ভাষাকে অন্যদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার জন্য আদ্ধেক পৃথিবী পাক দিয়ে নতুন দেশের দখল নিয়েছিস? পড়শিকে পড়শির দরকার থাকলে তাদের মধ্যে অন্য কেউ কী করে ঝগড়া বাধাবে? বা তাদের পরস্পর বিরোধী স্বার্থ না থাকলে তাদের বিরোধটা বাধবে কী করে? কেবল কাঁদুনি গাইলে হবে? কেবল হুমকি দিলে হবে? করছিসটা কী ভেবে দেখ।” রেগে গিয়ে বন্ধু ফোন কেটে দিল।
আমিও ভাবলাম আরেকবার স্নান করে ঘুমিয়ে পড়ব। সারাটা দিন যা গেল! কাঠবেড়ালির মতো। বেঁচে আছি তাই খিদে পায়। খাবারের পেছনে ছুটছি সকাল থেকে, সেই ছুটোছুটিতে খাবার হজম হয়ে যাচ্ছে, তাই আরও খাবারের প্রয়োজনে আরও দৌড়। আর তার ফাঁকে ফাঁকে বাধাবিপত্তি। টপকে, মেখে, ছড়িয়ে দিন শেষ।