বক্ররেখা

কাজল সেন

ঘরটা এভাবে না ভাসালেও চলত! বালতি বালতি জল ঢাললে শুধু ঘর কেন, বাড়িও তো ভেসে যেতে পারে! আর ফি বছর তো আছেই নদীর জলে বানভাসি। তা নদীই বা কী করে! যখন তার শরীরে উন্মত্ত যৌবনের ঢল নামে, তখন সেই যৌবন নিজের শরীরে ধরে রাখা কি আদৌ সম্ভব তার পক্ষে! সন্ধ্যাতারা সে কথা জানে। বোঝে। তার শরীরে এমন যৌবনের কতই না বন্যা দেখেছে সে! আসলে যৌবনকে সঙ্গে নিয়েই চলতে হয়। তাকে মানিয়েও নিতে হয়। না হলে এই খরখরে গ্রীষ্মের দুপুরে বালতি বালতি জল ঢেলে সে কেন ভাসালো তার ঘর!

এসব কথা মহুয়াও বোঝে। সে তখন ছিল তার নিজের বাগানে। এই প্রচন্ড গ্রীষ্মের দুপুরে, বাগানে! ধন্যি মেয়ে বটে মহুয়া! আর কত রঙ্গ দেখাবি তুই বল্‌? তা মহুয়া সে কথার পরোয়াও করে না। গ্রীষ্মের যৌবনের খোঁজ আর কে রাখে! কেউ কি রাখে? মহুয়া রাখে। আর তারপর যখন সন্ধ্যে নামবে ধীর পায়ে, সন্ধ্যের নরম বাতাসে স্নিগ্ধ হয়ে উঠবে চারপাশ, তখন মহুয়া তার সারাদিনের ক্লান্তি একে একে খুলে রাখবে সেই সন্ধ্যার আলো ছায়ায়। আর তখন যদি সন্ধ্যাতারা এসে তার পাশে বসে, ভালো লাগবে মহুয়ার। খুব ভালো লাগবে।

অথচ সন্ধ্যাতারা জানে, মহুয়াও জানে, ওই যে সামনের রাস্তাটা এগোতে এগোতে যেখানে হারিয়ে গেছে, সেখানে নাকি গভীর অরণ্য। আর সেখানেই নাকি তাদের জন্য সাজানো আছে আবাসন। ধনপতি কতবার যে সন্ধ্যাতারা আর মহুয়াকে সেখানে যাবার জন্য অনুনয় বিনয় করেছে, সে কথা তো আর ভুলতে পারে না তারা! অথচ কখনই সেখানে আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি দুজনেরই। সন্ধ্যাতারার ব্যস্ততা ছিল বানভাসি বাড়ির দেখভালে। আর মহুয়া ব্যস্ত ছিল গাছেদের নতুন ছায়ার পর্যবেক্ষণে, সারাদিন সারারাত।

আর ঠিক এভাবেই কোনোদিন ডাঙা ছেড়ে জলে যাওয়া হয়নি সরমারও। অথচ শম্ভুনাথ এক বগ্‌গা হয়ে দাঁড়িয়েই থাকল জলে। খাড়া বৃষ্টিতে। জলে থাকলে নাকি তার শরীর স্বাস্থ্য ভালো থাকে। মন থাকে তরতাজা। সরমার ছিল ডাঙার সাধ। যৌবনটাকে জলে নামাতে তার ছিল ঘোর আপত্তি। বরং সে চেয়েছিল, শম্ভুনাথই না হয় চলে আসুক জল ছেড়ে ডাঙায়! ডাঙার মায়া কী আর মামুলি মায়া! কিন্তু শম্ভুনাথ সে কথা বোঝে না। অনেক সাধ্য সাধনা করেও সরমা তাকে বোঝাতে পারেনি। তাকে জল থেকে ডাঙায় তুলতে পারেনি। মানুষটার শরীরটাও যেমন এক বগ্‌গা, মনটাও তাই। এবং এভাবেই শম্ভুনাথ থেকে গেছে জলে আর সরমা তার সাধের ডাঙায়। তাদের আর ভাগাভাগি করে ডাঙা ও জলের স্বাদ গ্রহণের শুভক্ষণ এলো কই! শম্ভুনাথ শেষপর্যন্ত সরমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল – থাকো না সরমা তুমি তোমারই মতো, আর আমিও না হয় থাকি আমারই মতো! কত মানুষের কত সাধই তো এভাবেই থেকে যায় অধরা, তাতে কি আর বিষণ্ন হলে চলে! এই তো ধনপতিও পেতে চেয়েছিল সন্ধ্যাতারা ও মহুয়াকে তার আরণ্যক আবাসনে। কিন্তু তাই হলো কি? সন্ধ্যাতারা তো যায়নি। মহুয়াও যায়নি। ধনপতিকে তা মেনে নিতে হয়েছে। সে বুঝতে পেরেছে, আসলে অরণ্যবাস সবার জন্য নয়। যেমন ডাঙায় বাস শম্ভুনাথের জন্য নয়।

মহুয়ার মাঝে মাঝে দুঃখ হয় সরমার জন্য। সরমা কোনোদিন শম্ভুনাথের ঘরে গেল না। কিন্তু ঘর না করেও সে থেকে গেল শম্ভুনাথেরই মনের ঘরে। সরমার আপত্তি ছিল জলে। জলে থাকলে নাকি কুমিরের ভয়। কিন্তু ডাঙাও তো নিরাপদ নয়। ডাঙায় তো আছে বাঘের ভয়। তাহলে! না, মহুয়াও কোনোদিন যায়নি ধনপতির ঘরে। কতবার যে ডেকেছিল ধনপতি! মহুয়া সাড়া দিতে পারেনি। ধনপতি ডেকেছিল সন্ধ্যাতারাকেও। কতবার। সন্ধ্যাতারাও সাড়া দেয়নি। কেন? কেন দেয়নি সাড়া? মহুয়া শুনেছে, অরণ্যের নেশা নাকি সাংঘাতিক আঠালো নেশা। একবার সে নেশায় ধরা দিলে আর তার পরিত্রাণ নেই। তাকে তখন থেকেই যেতে হবে সেই অরণ্যে। সন্ধ্যাতারা তো এই ভয়েই রাজী হয়নি অরণ্যবাসে। যদি সে আর ফিরে আসতে না পারে! মহুয়াও তাই। এই যেমন অরণ্যবাসের পর ধনপতিও তো আর কোনোদিন ফিরতে পারেনি ডাঙায়। আবার জলেরও বুঝি সেই একই নেশা! একবার জলে নামলে সেই জল থেকে উঠে আসে, এমন সাধ্য কার আছে? সরমা তো এই ভয়েই ডাঙা ছেড়ে জলে নামলো না। আর সরমা যে এত অনুনয় করল, শম্ভুনাথও কি কখনও জল ছেড়ে ডাঙায় উঠে আসতে পারল?

ছন্দাও শুনেছে ধনপতির কথা, শম্ভুনাথের কথা। সে শুনেছে তার সন্ধ্যাতারা পিসি, মহুয়া পিসি, সরমা পিসির কাছে। সে তো প্রায়দিনই ছুটে বেড়ায় সন্ধ্যাতারা পিসির ঘরে, মহুয়া পিসির বাগানে, সরমা পিসির ডাঙায়। বেশি তো বয়স নয় ছন্দার! এই তো সবে পনেরোয় পড়েছে। অথচ শরীরটা তরতরিয়ে বেড়ে উঠেছে লকলকে লাউডগার মতো। আর তার সারা শরীর জুড়ে নতুন যৌবনের কত যে উৎপাত! ছন্দা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, কোন্‌ জাদুবলে তার শরীরে এত বাড় বাড়ন্ত! আর এত বাড়াবাড়ি সে বয়েই বা বেড়াবে কীভাবে! কার জন্যেই বা বয়ে বেড়াবে! সন্ধ্যাতারা পিসি, মহুয়া পিসি, সরমা পিসি – কই, কেউ তো আর বয়ে বেড়াচ্ছে না কারও জন্য কোনো উৎপাত! তবে ছন্দা বুঝতে পারে, একদিন তার মতোই পিসিদের শরীরেও এমনই বন্যা এসেছিল। বানভাসি হয়েছিল। পিসিরা সেদিন নিশ্চয়ই খুব নাকাল হয়েছিল! তবে হাল্কা হাল্কা শুনেছে সে ধনপতির কথা, শম্ভুনাথের কথা। তারা কে? কোথায় থাকে? তারা নাকি পিসিদের ডেকেছিল। তাহলে পিসিরা কেন সাড়া দেয়নি তাদের ডাকে? কেন?

ছন্দার আজকাল কেমন যেন মনে হয়, পাখি যদি না ডাকে, মেঘ যদি না ওড়ে, গাছ যদি ভালো না বাসে, তবে তার জীবনই বৃথা। সে আজকাল কেমন করে যেন ঠিক বুঝতে পারে পাখিদের ভাষা, মেঘেদের ভ্রমণবৃত্তান্ত, গাছেদের প্রণয়কাহিনী।

সন্ধ্যাতারা পিসি কেন এত বালতি বালতি জল ঢালে তার ঘরে? ছন্দার মনে হয়, যেন বন্যার আবহেই থাকতে ভালোবাসে সন্ধ্যাতারা পিসি। সারাটা জীবন বানভাসি হয়ে সে তার যৌবন বইয়ে দিল বন্যারই জলে। যেমন মহুয়া পিসি তার বাগানে সারি সারি গাছের মাঝখানে নিজেও একটা গাছ হয়ে নির্জনে বয়ে বেড়ালো তার ভরাট যৌবন। আর সরমা পিসিকেও বলিহারি! কিসের এত ডাঙার সাধ! যৌবন যখন আর শরীরে ধরে রাখা যায় না, তখন তো ডাঙা ছেড়ে ভাসতেই হবে জলের অকূলে! কিন্তু সরমা পিসি ভাসেনি, ভাসতে পারেনি। তার ভরা যৌবন অহেতুক শুকিয়ে গেল শুকনো ডাঙায়।

না, ছন্দা্র কাছে এখনও পর্যন্ত কোনো সুদূরের ডা্ক এসে পৌঁছায়নি। সে তার উথলে ওঠা শারীরিক সব উৎপাত নিয়ে অপেক্ষা করে আছে, কবে তার ডাক আসবে গভীর অরণ্য থেকে! কবে সে শুনতে পাবে অতল জলের আহ্বান! একটা পাথর গড়াতে গড়াতে কখন যে পাহাড়ের চূড়া থেকে নেমে আসে তার পায়ের তলায়! দুটি সরল ও সমান্তরাল রেখা চলতে চলতে হঠাৎ কখন যে জট পাকিয়ে বক্র হয়ে যায়! ভোরের স্নিগ্ধ নরম বিছানায় কখন যে লেগে যায় উজ্জ্বল আগুনের দুরন্ত আঁচ! না, এত সব কিছু ভাবেনি ছন্দা। তপ্ত কামনায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে সে শুধু থাকে অরণ্যের আশায়, জলের প্রার্থনায়। কোনোদিন কোনো ধনপতি বা শম্ভুনাথ নির্ঘাৎ কড়া নাড়বে তার উস্‌কানো বাসনায়। ছন্দা গাছেদের খুব ভালোবাসে। গাছেরা এসে তার সঙ্গে ভালোবাসার কথা বলে যায়। ছন্দা নিজেকে সাজায়। সাজতে তার ভালো লাগে। সাজতে সাজতে ছন্দার খুব কষ্ট হয় তার পিসিদের জন্য। ছন্দা পিসিদের কথা ভাবে। সাজতে সাজতে ছন্দার খুব কান্না পায় তার পিসিদের কথা ভেবে।