ঠিকানা

আফসানা বেগম

হাসপাতালের ওয়েটিং এরিয়ায় বসে মা ঘনঘন চোখ মুছছিলেন। আমার কেন যেন কান্না পাচ্ছিল না। আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম কী হতে যাচ্ছে; আমি বরং অন্য কিছু ব্যাপার নিয়ে খানিকটা দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে ছিলাম। নানার কাছে শেষ পর্যন্ত জানতে পারিনি কোন দেশটাকে তিনি নিজের দেশ মনে করছেন। আসলে নানা কি শেষ পর্যন্তও সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন? জানতে চাইলেও কোনো লাভ হতো বলে মনে হয় না। বহুদিন তাকে এ নিয়ে ভাবতে দেখেছি, চিন্তিত মুখে ধীরে ধীরে বিরক্তি ফুটে উঠতে দেখেছি, তারপর দেখেছি কী করে তা অসহায় থেকে নিরুপায় হয়ে যায়। সেই মুখের সামনে আলোচনাটা সেখানেই থেমে গেছে। একটু পরে ডাক্তার যা বলবেন বলে আমি ধারণা করছিলাম, সত্যি যদি তা-ই হয়, তবে আমার সিদ্ধান্ত নিতে বেশ অসুবিধা হবে। কিন্তু দুশ্চিন্তার ভেতরে বসেও অনেক আগের নানান ঘটনা কেন যেন ছবির মতো চোখের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিল।
কি শীত কি গ্রীস্ম, এত বয়সেও নানা ভোরবেলা উঠে নীচতলার লম্বা বারান্দায় হনহন করে হাঁটতেন। দেরি করে ঘুম থেকে উঠলে প্রতিদিন একই বকা শুনতে হতো আমাকে। হাঁটতে হাঁটতে নিশ্বাস ছোটো হয়ে যেত বলে তিনি থেমে থেমে বলতেন, ‘কী রে, তোরা আজকালকার ছেলেপেলে, কলেজ না থাকলে বুঝি সারাদিনই ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিতি!’ কোনো উত্তর না দিয়ে মুচকি হেসে নানার সামনে থেকে সরে যাওয়াই তখন নিরাপদ। কথায় কথা বাড়ত। নানা তার দীর্ঘ জীবনের ছোটোখাটো উদাহরণ টেনে কথা শুরু করতেন, হাঁফাতে থাকলেও সে কথা আর থামত না, শেষে আমার কলেজের দেরি হয়ে যেত। তখন নানাকে পাশ কাটানোই ভালো ভেবে অন্ধকার বারান্দা পেরিয়ে গোসলে চলে যেতাম। তবে বরাবর আমাদের বারান্দা এমন অন্ধকার ছিল না। ঝকঝকে সূর্য আমাদের বারান্দায় ভোর হতে না হতেই আছড়ে পড়ত। বাসার ঠিক সামনে সরু বাঁশের একটা বাঁশঝাড় আর তাতে অসংখ্য চড়–ইয়ের আনাগোনা লেগে থাকত। নাস্তার আগ পর্যন্ত লম্বা বারান্দায় নানার পায়চারির শব্দ আর দিনভর চড়–ইদের পাখসাট আমাদের দৈনন্দিন অভ্যস্ততায় মিশে থাকত। শব্দগুলো আমাদের কানে স্পষ্ট জানান দিত কারণ বাড়ির আশেপাশে তার চেয়ে বড়ো শব্দ তখনো ছিল না। তারপর সব বদলে যেতে লাগল, আমাদের সেই বারান্দা আর খোলামেলা থাকল না। বলতে গেলে পুরো বাড়িটা নিয়ে আমরা একটা গর্তে ঢুকে গেলাম। চারদিকে অন্ধকার ধেয়ে এল। মানুষ শুনলে ভাববে ভূমিকম্প হয়েছিল আর সবকিছু তুমুল উলোটপালট হয়ে গেছে। কিন্তু আসলে তেমন কিছুই না।
দেশে সামরিক সরকার এল, আমি তখন স্কুলে, সিদ্ধান্ত হলো আমাদের বাড়ির সামনে একটা রাস্তা যাবে। নানা খুশি মনে পেপারের প্রথম পাতা মেলে আমাকে আর মাকে ডেকে বোঝাতে লাগলেন রাস্তাটা কোথা দিয়ে কোথায় যাবে। আঙুল দিয়ে পেপারে আঁকা ম্যাপের ওপরে দেখিয়ে বললেন, ‘ঢাকায় চলাচলের মূল সমস্যা কি জানিস?’
‘কী?’
‘মূল সমস্যা হলো ঢাকার উত্তর-দক্ষিণে কয়েকটা রাস্তা আছে কিন্তু পূর্ব-পশ্চিমে কোনো রাস্তা নেই। তো আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যদি পান্থরোড নামে এই রাস্তাটা হয়ে যায় তবে দেখবি সমস্যাটা অনেকটা কমবে। আর চিন্তা কর আমাদের আর মগবাজারের গলি দিয়ে এগোতে হবে না, বিশাল রাস্তা ঘরের সামনেই!’
নানাকে খুশি খুশি দেখাচ্ছিল। পেপারটা মুড়িয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। বাঁশঝাড়ের দিকে তাকিয়ে সামনে বিস্তৃত রাস্তার কথা ভেবে বুঝি প্রশান্তির নিশ্বাসও ফেলেছিলেন। নানার কল্পনা অনুসরণ করতে করতে আমিও সেখানে চড়–ইদের দ্রুত চলাফেরার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তাদের চালচলন আমার কাছে ভিডিওতে দেখা ফাস্ট ফরোয়ার্ডের মতো লাগত। স্বাভাবিক গতিতে ওই পাখিগুলো কিছু করতে পারে কি না এ নিয়ে আমি প্রায়ই ভাবতাম। সেদিনও ভাবছিলাম, আমদের জন্য যেটা সাধারণ গতি, মানে সেকেন্ডে চব্বিশটা মুভমেন্ট, পাখিদের জন্য হতে পারে তিরিশ কি বত্রিশটা। অল্পবয়সে বিধবা হওয়া আর বরাবর অনিশ্চয়তায় ভোগা আমার মা তখন দেখলাম নানার কাছে জানতে চাইলেন, ‘রাস্তাটা হলে আমাদের বাড়ির দাম তো অকে বেড়ে যাবে, তাই না, বাবা?’
সিলিন্ডারের মতো মোড়ানো পেপারটা দিয়ে বারান্দার গ্রিলে দুটো বাড়ি দিয়ে বিজয়ের ভঙ্গিতে নানা মায়ের দিকে তাকিয়েছিলেন।
বাবা ছিল না বলেই হয়ত ছোটোবেলা থেকে আমার কাছে নানা ছিল ফাদার ফিগার। জ্ঞান হবার পর থেকে আমি মায়ের সাথে নানা বাড়িতেই। ছোটোবেলা পুরোনো ঢাকায় আর তারপর নানার সিদ্ধান্তেই আমরা বড়ো মগবাজারের দিকে চলে এসেছিলাম। তখন আমাদের বাড়িটাই ছিল ওদিকটার শেষ প্রান্ত, তারপর থেকে লেক। ধীরে ধীরে আমাদের সাদা দোতলাসহ চোখের সামনে আমরা কী করে যেন কিছু উঁচু বাড়ির মাঝখানে আটকা পড়ে গেলাম। চওড়া রাস্তার পরিবর্তে বাড়িগুলোর ফাঁকফোঁকড়ের সরু গলি দিয়ে আমাদের যাতায়াত করতে হতো। সেসব নিয়ে খনিক আক্ষেপ থাকলেও বাড়ির সামনে দিয়ে বড়ো রাস্তা যাবার কথায় নানাকে বেশ আনন্দিত মনে হচ্ছিল। তবে সে আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হলো না। একদিন বাড়িতে এক নোটিস এল আর নানাকে দেখলাম রাগে লাল হয়ে বারান্দায় বসে আছেন। স্কুল থেকে ফিরে নানার রাগ আর মায়ের উৎকণ্ঠিত মুখ দেখে আমার মতো ক্লাস টেনের বালকের তেমন কিছু বোঝার উপায় ছিল না। কৌতূহল দমিয়ে রাখাও ছিল কঠিন। ভয়ে ভয়ে নানাকে জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম ঘটনা কী। মেজাজ খারাপ করে নানা যে কাগজটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন তা ছিল একটা উকিল নোটিস। ভয়ানক বেদনায় কুচকে থাকা তার মুখ থেকে কেবল একটাই কথা বেরিয়ে এল, ‘আমার ঠিকানা কি কোনোদিনই স্থায়ী হবে না?’
ওই একটামাত্র কথায় নানার মুখে হাজারবার শোনা তার সাতচল্লিশ, তার একাত্তরের কাহিনি আমার চোখের সামনে ভাসতে লাগল। ওই উকিল নোটিসে যা-ই লেখা থাকুক না কেন, আমি জানতাম আঘাত তার কোথায় লেগেছে।
‘শুধু এক ধর্মের ভিত্তিতে দেশটা টুকরো টুকরো হয়ে গেল, বুঝলি?’Ñ এভাবেই নানা গল্পটা শুরু করতেন। তার চোখে থাকত বিস্ময়। আমি গল্প শোনার আনন্দেই সেই গল্পের ভয়াবহতাকে স্পর্শ করতে চাইতাম। প্রতিবার বলতেন প্রথম বলার মতো করে, আমিও ছিলাম এমন শ্রোতা যেন এই প্রথম শুনছি, চোখ গোল গোল করে তার কথার ফাঁকে ফাঁকে জানা উত্তর শোনার জন্য প্রশ্নও করতাম টুকটাক।
‘খুব গরম সেদিন। শিয়ালদহ থেকে রিপন স্ট্রিটের মোড়ে এসে পেঁছেছি, সারা শরীরে ঘাম, তোর নানি বলল একটা ওষুধ লাগবে তার, তখনই। কী আর করব, আবার বেরিয়ে পড়তে হলো। বেরোনোর আগে আবার তিনি নানাভাবে আমাকে সাবধানও করতে লাগলেন, একই পাড়ায় রফিকদের বাড়ি আগের দিন সকালে হিন্দুরা ঘিরে ফেলেছিল। বাড়ির লোকজন তখন থেকেই উধাও। কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না তারা বেঁচে থাকল কি মেরে ফেলা হলো। আমাদের পাড়াটা ছিল বলতে গেলে মুসলমান পাড়া। একটা মাত্র বিশাল হিন্দু বাড়ি ছিল। যৌথ পরিবার।’
‘তো, মুসলমানরা তাদের কিছু করত না?’
‘সে তো বিরাট ঘটনা। হামলা হবার খবর পেলে রাতে পাড়ার জোয়ান ছেলেরা দল বেঁধে চিৎকার করে সাবধান করত। একবার তারা যাচ্ছিল সেই বাড়ির পাশ দিয়ে। চেঁচামেচি শুনে বাড়ির লোকেরা ভাবল তাদের বাড়িতে মুসলমানেরা হামলা করেছে। মুসলমানদের হাতে মরার চেয়ে নিজেরাই আগুন জ্বালিয়ে একে একে আটত্রিশজন লোক তাতে ঝাঁপ দিল। বাড়ির বউগুলো তাদের বিয়ের গয়নাগাটি পরে ঝাঁপ দিয়েছিল, চিন্তা করতে পারিস?’
‘কেন ওভাবে মরতে গেল?’
‘কী করবে, নিজের বাড়ি ছেড়ে কেউ যাবেও না আবার শত্রুর হাতে মরবেও না।’
‘এত কিছুর পরেও তুমি ভয় পেতে না?’
‘কী করব, বাড়িঘর ফেলে কোথায় যাব? ঠিকানা যে কী জিনিস! যাই হোক, ওষুধ না আনলে তোর নানি বাতের ব্যথায় তখন এমনিতেই মারা যাবে। আর তাছাড়া আমিও তো সেসব গ-গোল নিয়ে তেমন ভাবতাম না, কী আর এমন হবে, কদিনের মধ্যেই সব ঠান্ডা হয়ে যাবে, ভাবতাম শত টুকরো হলেও আমার দেশ আমারই আছে। টেবিলে খাবার দিতে বলে ঘামে ভেজা ফতুয়াটা বদলে আমি বেরিয়ে গেলাম। বাসার কাছে ছোটো বাজারমতো জায়গাটাতে যেতেই এক দুঃসম্পর্কের আত্মীয় সিরাজুলের সাথে দেখা। তাদের ওদিককার অবস্থা কী, আর মৃত্যুর খবর ভালো লাগছে না এসব নানান কথা বলতে বলতে ফুটপাথ ধরে এগোচ্ছিলাম দু’জনে। হঠাৎ মনে হলো ঠিক পেছনে কেউ নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল। তখনো হাঁটা কিন্তু থামাইনি আমরা। শুধু মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতে যাব, তার আগেই দেখি সিরাজুলের মাথাটা গলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মাটিতে টুপ করে পড়ল। রক্ত ছড়িয়ে পড়ল শুকনো ধুলোয়। হাঁটার গতিতে আমি যেমন আমি পরের পা ফেলেছিলাম, মাথাবিহীন সিরাজুলও কিন্তু আরেকটা পা ফেলেছিল। এমনকি জানিস, তার পরের পা-টাও ফেলতে চাচ্ছিল, পাশে তাকিয়ে আমি দেখেছি, বিশ্বাস কর! শরীরে তো কম্যান্ড দেয়াই ছিল, মাথা না থাকলেও তাই দুই পা এগিয়েছিল শরীরটা আর তারপর কেমন যেন চুপসে যাওয়া বেলুনের মতো মোচড় খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে যেই পেছনে তাকালাম, দেখি তলোয়ারের দ্বিতীয় কোপটা আমার গলার দিকে ধেয়ে আসছে। আমি প্রাণপণ দৌড় লাগালাম। জানতাম যে একই পরিণতি আমারও হতে যাচ্ছে কয়েক সেকেন্ডেই। অথচ দৌড়োতে দৌড়োতে হঠাৎ মনে হলো পেছনে কেউ নেই। ফিরে তাকিয়ে দেখি ধুতি আর পাগড়ি পরা লোকটা তলোয়ার উঁচিয়ে তার সঙ্গীদের সাথে আরেকজনকে ধাওয়া করতে লেগে গেছে। রাস্তা পেরিয়ে অন্যদিকে চলে যাচ্ছে তারা। এদিকে আমি তখন একা। হতভম্বের মতো এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকলাম সেখানেই। তারপর খানিক দূরে সিরাজুলের শরীর আর মাথার মধ্যে চার-পাঁচ ফুট রক্তের ¯্রােতের দিকে চোখ পড়তেই ঘোর কেটে গেল। পরে আর পেছনে তাকাইনি। তাকাইনি মানে নিজের দেশের দিকেও ফিরে তাকাইনি। বাড়ি ফিরে মাত্র তিন ঘণ্টার গোছগাছে তোর নানিসহ সবাইকে নিয়ে ঢাকায়।’
‘ঢাকায় কিছু ছিল তখন তোমাদের?’
‘না তো! ওটাই আমাদের প্রথম ঢাকায় আসা। পুরোনো ঢাকার র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিটে এসে থাকা শুরু করলাম।’
‘তিন-চার ঘণ্টার মধ্যে সঙ্গে করে কিছু নিয়ে আসতে পারলে?’
‘কী আর আনা যায় ওইটুকু সময়ের মধ্যে? তোর নানির ছিল এক বাক্স গয়না, সে তো সেই বাক্স কিছুতেই ছাড়বে না। আমি অনেক মানা করলাম। শুনল না। প্রথমে ট্রেন তারপর নৌকা, তারপর আবার ট্রেন, কিছু পথ হাঁটা, এভাবে কি সঙ্গে মালপত্র নিয়ে চলা যায়? ব্যস, গয়নার বাক্স গেল হারিয়ে।’
‘হারিয়েই গেল!’
‘হারিয়ে গেল মানে কোথায় ছাড়া পড়ে গেল কে জানে। সেই শোকে তোর নানি তখন উম্মাদ প্রায়।’
‘কিন্তু সে যাই হোক, ঢাকায় এসে শান্তি তো পেলে।’
‘নিজেদের বাড়ি মানে ঠিকানা হলো। কিন্তু শান্তি? সেটা বলতে পারব না। কত আত্মীস্বজন ওপারে রয়ে গেল আর ঠিকানাটা কি স্থায়ী হয়েছিল আদৌ?’
‘কেন?’
‘সেই স্থায়ী ঠিকানা ফেলে একাত্তরে আবার পালিয়ে যেতে হলো যে!’
‘নিজের বাড়িতে বসে দুপুরে খাচ্ছিলাম আমরা, হঠাৎ রাস্তা থেকে একটা গুলি এসে কানের পাশ দিয়ে চলে গেল। দেখলাম সামনের ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটা ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল। সবাই খাটের নীচে আশ্রয় নিলাম। কিন্তু খাটের নীচে তো আর আমরা মাসের পর মাস থাকতে পারতাম না। বাইরে বেরোলেই রাস্তায় লাশ পড়ে আছে, এমন অবস্থা তখন। সব দেখেশুনে আবার সবাইকে নিয়ে পালিয়ে গেলাম কোলকাতায়।’
‘পরে আবার তো সেই ফিরেই এলে।’
‘কী করব, ঢাকায় চাকরি করি আর কোলকাতায় কি তখন আর সেসব কিছু নিজেদের ছিল? বাড়িঘর সব হাতছাড়া হয়ে গেছে। ঠিকানা একবার ছেড়ে দিলে আর তা নিজের থাকে না। হৃত সা¤্রাজ্য কখনো ফেরত পাওয়া যায় না।’
ঠিকানা হারানোর দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে দিয়ে প্রতিবার নানার গল্প শেষ হতো।
চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পরে র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিট থেকে বড়ো মগবাজারের দিকটায় চলে এসেছিলেন নানা। ওদিকের গ্যাঞ্জাম এড়িয়ে একটু খোলামেলা থাকবেন বলে। তখন এদিকটা ছিল বলতে গেলে খাল-বিল। অবারিত পানির ওপর দিয়ে বয়ে আসা ঠান্ডা বাতাসে বসে নানা কি ভাবতেন যে এটাই তার স্থায়ী ঠিকানা? কোনোদিন ভেবেছিলেন কি না এটাই তার দেশ, আমার ঠিক জানা নেই। তিনি কোলকাতাকেই বুকে ধারণ করতেন, বাস্তবে থাকতেন ঢাকায়। মুখে বলতেন, ‘কোনো দিন ছেড়ে যেতে হলে বুঝবি, দেশ কোনো জায়গা নয়, দেশ হলো একটা কনসেপ্ট। তুই যেখানে যাবি, দেশ তোর সঙ্গে যাবে।’
সেদিন কতকগুলো সংখ্যার নীচে লাল দাগ দেয়া উকিল নোটিসটা থেকে আমি তেমন কিছুই উদ্ধার করতে পারিনি। পরে খেতে বসে নানাই জানালেন, পান্থরোড নামে রাস্তাটা আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে নয়, আমাদের বাড়ির ওপর দিয়ে যাবে। মানে, মোট কথা হলো আমাদের খুব দ্রুত সরে যেতে হবে। শুনে আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, ‘আবার?’
‘আমি যাব না।’ নানার দৃঢ় কণ্ঠস্বর খাবার ঘর পেরিয়ে লম্বা বারান্দায় গমগম করতে লাগল। সেদিন বিকেল গড়িয়ে এলে বাঁশঝাঁড়ে ফিরে আসা চড়–ইগুলোর গালগল্পেও আমি নানার কথারই প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলাম। বাঁশঝাঁড় বলছে সে যাবে না, চড়–ইরা বলছে তারা যাবে না। শুনতে শুনতে বারান্দার গ্রিল ধরে আমি নিজেও চিৎকার করে উঠেছিলাম, ‘আমি যাব না।’ আমার চিৎকার শুনে মা ভেতর থেকে ছুটে এসেছিলেন, ‘তুইও তোর নানার মতো পাগল হলি রে, খোকা?’ বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি আর মা জড়াজড়ি করে কাঁদছিলাম। আমি জানি মা-ও তখন মনে মনে বলছিলেন, ‘আমি যাব না।’
উকিল নোটিসের তারিখটা ছিল ছয় মাস পরের। আমাদের চোখের সামনে আশেপাশের উঁচু বাড়িগুলো ছেড়ে মানুষজন চলে গেল। ভেঙে বিক্রি করে অন্তত কিছু পয়সা পাবে এই আশায় একে একে বাড়িগুলো মাটির সাথে মিশিয়ে দিল। শুধু আমরাই রয়ে গেলাম। নানা বলেছিলেন কমপেনসেশন বলে আসলে কিছু নেই। ট্যাক্স ফাঁকি দেবার জন্য রেজিস্ট্রি অফিসে জমির যে নামমাত্র দাম ধরে রাখা হয়েছে, সেই দামটাই কোনোরকম ধরিয়ে দেয়া হবে। সেটার চেয়ে বড়ো কথা তিনি তার নিজের জায়গা ফেলে কোথাও নড়বেন না। তিনি লড়াই শুরু করলেন, লড়াইটা জেদের পর্যায়ে চলে গেল। আশেপাশের সব বাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে সোনার গাঁ হোটেলের পাশ দিয়ে রাস্তার জন্য মাটি উঁচু করা হলো। প্রতিদিন সেই উঁচু ঢিবি আমাদের বাড়ির দিকে ধেয়ে আসতে লাগল। সড়ক ও পরিবহন সংস্থার লোকজন প্রায়ই আমাদের বাড়িতে হানা দিতে লাগল। নানা কখনো তাদের বকাবকি করতেন, কখনো বাড়িতে ঢুকতেই দিতেন না। সেই দৈনন্দিন অশান্তি থেকে মুক্তি পেতে আমি আর মা নানাকে অনুরোধ করতে লাগলাম, ‘চলেন এবারে চলেই যাই আমরা।’ নানা কোনো কথায় কান দিতেন না।
উঁচু ঢিবিগুলোর ওপরে ইট-পাথর পড়ল, রাস্তা তৈরির সরঞ্জামে আমাদের বাড়ির চারপাশ সয়লাব হয়ে গেল। পান্থরোড এগিয়ে যেখানে টঙ্গি ডাইভার্সশন রোডে এসে উঠল, এক সময় আমাদের বাড়িটা পড়ে গেল সেই মিলনের জায়গায়। বাড়ির চারদিক দিয়ে উঁচু রাস্তা চলে গেল। বাঁশঝাঁড় কাটা পড়েছে অনেক আগেই, চড়–ইয়েরা শব্দ আর ধুলায় কোথায় পালিয়েছে কে জানে। শুধু আমরাই সেখানে পড়ে থাকলাম। আমাদের কোনো প্রতিবেশি নেই, আমরা যেন লোকালয়বিহীন কোনো ধূসরিত জগতে বাড়িসহ আটকা পড়লাম। আমাদের নীচতলাটা তখন গুহার মতো, দোতলার জানালার ওপরের দিক দিয়ে খানিক আলো আসে। জানালার কাচে চোখ রাখলে চার ফুট দূরে একই উচ্চতায় নেভি ব্লু পিচের রাস্তা। নানার বানানো কাঠের সিঁড়ি বেয়ে রাস্তা থেকে আমাদের বাড়িতে নামতে হতো। প্রায় অন্ধকার বারান্দায় বসলে চওড়া রাস্তার ওপরে দ্রুতগামী বাস-ট্রাকের ওড়ানো ধুলোয় এক মিনিটেই নিজেকে মাটির মূর্তির মতো লাগত। দরজা জানালা চব্বিশ ঘণ্টা সাধ্যমতো লাগিয়ে রেখেও রাস্তার ধুলোর হাত থেকে কিছুতেই বাঁচা গেল না। মা ঘরবাড়ি পরিস্কার করতে করতে বিরক্ত হয়ে গেলেন। আমাকে বললেন নানাকে বোঝাতে। আমি তখন কলেজ ছেড়ে ইউনিভার্সিটিতে ঢুকেছি। নিজেকে আকস্মিক বিরাট পরিসরে আবিষ্কার করে খানিকটা অহঙ্কার সবে জন্মাতে শুরু করেছে। নানার জেদের কারণে শেষ পর্যন্ত একদিন পুলিশ এসে আমাদের বাড়ির জিনিসপত্র বাইরে ছুঁড়ে ফেলবে, সেটা আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারব না। তাই বুঝলাম যা করার আমাকেই করতে হবে।
পরে সত্যিই কমপেনসেশন বলতে আমাদের তেমন কিছু দেয়া হলো না। উলটো সময়মতো বাড়ি না ছাড়ার জন্য কিছু ফাইন ধরা হলো। কলাবাগানে বাড়ি ভাড়া করে চলে গেলাম আমরা। ঘিঞ্জির মধ্যে তিন তলার সেই ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে বিরক্ত মুখে বসে থাকতেন নানা। কখনো অপ্রাসঙ্গিকভাবে বলে উঠতেন, ‘এই দেশে এসে শেষ পর্যন্ত আমাকে কিনা ভাড়া বাড়িতে থাকতে হলো!’ মা অবশ্য তখন ঠোঁট উলটে বলতেন, ‘এমনই তো হবে, বাবা। স্বাধীনতার পরপর মাত্র এক হাজার টাকা দিলে ধানমন্ডিতে প্লট পাওয়া যেত, তখন তো তুমি রাজি হলে না। শেষে সেই র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিট ছাড়তেই হলো, মাঝখান থেকে আজ আমাদের এই দশাÑ’
নানা হয়ত পুরোনো ঢাকাকেই নিজের বাড়ি ভাবতে শুরু করেছিলেন। তবে তার যাবতীয় আক্ষেপে আমি দেখতাম কী করে জীবনের দ্বিতীয় চল্লিশ বছর প্রথম চল্লিশ বছরের কাছে হেরে যায়। এখানকার কিছুই তার আগের মতো আপন লাগে না। সব কথার শেষে একটাই কথা, ‘আগের মতো কিছু আর হয় না, বুঝলি?’
‘কেন হবে না, নানা, কী খারাপ আছি আমরা?’
‘কী খারাপ আছি মানে! আমরা কত ভালো ছিলাম তা তুই জানিস? একটার পর একটা জায়গা বদল; এভাবে চলতে থাকলে মানুষের কোনো আইডেন্টিটি থাকে?’
‘থাকবে না কেন, তুমি আসলে এ দেশে এসেছ ঠিকই কিন্তু এদেশটাকে কখনোই নিজের বলে ভাবতে পারনি, সেটাই তোমার সমস্যা।’
নানা কিছুক্ষণ চুপ। আমি তখন অনুশোচনায় ভুগতে লাগলাম। তর্কের খাতিরে তর্ক করতে গিয়ে নানাকে আঘাত করেছি সেটা জানতাম। সামনের বইপত্র গুটিয়ে আমি নানার পাশে গিয়ে বসলাম।
‘স্যরি, নানা, আমি মুখ ফসকেÑ’
‘নাহ্, ঠিকই বলেছিস তুই। এদেশের আলোবাতাসে এতগুলো বছর কাটল, তার পরেও দেশবোধ জন্মানো হয়ত কঠিন। তবে কী জানিস, এই যে একেকটা জায়গা থেকে বারবার উঠে যেতে হচ্ছে, এরপর তুই আমার কাছে সেই বোধটা আশা করবি কী করে?’
আমি চুপ করে থাকলাম। কে জানে আবার মুখ ফসকে কী বলে ফেলি। নানা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে আবার শুরু করলেন।
‘আমার মনে হয় আমি সেই সময়টাতেই আটকে আছি।’
‘কোন সময়?’
‘ওই যে, শত শত মানুষ বর্ডার পেরিয়ে চলে আসছে, তাদের মধ্যে আমিও একজন। কাঁটাতারের বেড়া নেই কিন্তু আমরা জানতাম সীমানা কোথায় শেষ, জানতাম আরেকটা সীমানা কোথায় শুরু। আমার কেবলই মনে হয় যুগযুগ ধরে আমি সেই জায়গাটায় আটকে আছি। চলছি আর চলছি কিন্তু একটা সীমানা পেরিয়ে আরেকটা সীমানায় কিছুতেই পৌঁছতে পারছি নাÑ’
তাকিয়ে দেখলাম নানার চোখে চিকচিক করছে পানি। নানা কেঁদে ফেলবেন নাকি! সেরকম হলে আমি বিব্রত হব ভেবে আমার অস্বস্তি লাগল। নানা চোখের পানি শুঁষিয়ে নিয়ে বললেন, ‘ঠিক জানি না আমি মালিকানাবিহীন সে জায়গাটা পেরিয়ে কোনোদিন নিজের দেশের সীমানায় পৌঁছতে পারব কি না।’
নানার কথাগুলো আমার কাছে অদ্ভুত লাগছিল। বয়সের ভারে মাখা খারাপ হয়ে গেল নাকি! চটিয়ে লাভ নেই ভেবে চুপ করে থাকলাম। তিনি আরো অদ্ভুত কথা বলতে লাগলেন। বললেন, ‘আচ্ছা, বল তো, মানুষ যেখানে জন্মায় সেটা তার দেশ হওয়া উচিত নাকি যেখানে বেড়ে ওঠে, মৃত্যুবরণ করে, যে দেশের মাটিতে তার শরীরের শেষ কণা মিশে যায় সেটা তার দেশ হবার কথা?’
আমি বিভ্রান্ত চোখে তাকিয়ে থাকলাম।
‘আমি মরে গেলে আমাকে কোথায় কবর দিবি?’
‘কী আশ্চর্য, তুমি মরতে যাবে কেন!’
কবর কোথায় দেয়া হবে সে প্রসঙ্গে কথা আর আগায়নি। নানা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন শুধু।
কলাবাগানের বাড়িতে আসার পর থেকে নানা কখনোই ভালো ছিলেন না। সেখানেই তার প্রথম স্ট্রোক হলো। স্ট্রোক হবার পরে হাসপাতাল ঘুরে বাড়ি ফিরলেও নানা ঘুমানোর আগে প্রায়ই বলতেন, ‘আচ্ছা, আর কতদিন ফুফুর বাড়িতে থাকব, বাড়ি যাব না আমরা?’ মা তখন নানার ওরকম অদ্ভুত কথার কী জবাব দেবেন ভেবে না পেয়ে মশারি ঠিকঠাক করে নিজের ঘরে চলে যেতেন।

হাসপাতালের চেয়ার মোটেও আরামের নয়। আমি উশখুশ করছিলাম। চেয়ারগুলো হয়ত এতক্ষণ বসে থাকার জন্য বানানো হয়নি। মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখলাম চোখের পলক ওঠানামা ছাড়া তার আর কোনো নড়াচড়া নেই। আই সি ইউ ইউনিটের বিশাল দরজাটা হঠাৎ খুলে গেল। ডিউটি ডাক্তার আমার দিকে এগিয়ে এলেন। ‘সেকেন্ড স্ট্রোকে অনেকেই সারভাইভ করতে পারে না। ক্লিনিক্যালি ডেড বলা যায়। আপনারা বললে লাইভ সাপোর্ট খুলে দেব’, বলে ডাক্তার আর দাঁড়ালেন না। যেন কী স্বাভাবিক একটা ব্যাপার, অ্যালজেব্রার সূত্রের মতো।
আমি মায়ের দিকে তাকাতে ভুলে গেলাম। তখন কত ভাবনা যে ঠেলেঠুলে আমার মাথায় জায়গা করে নিচ্ছিল! নানার শরীর কি এই দেশেই থাকবে? তিনি কি তাতে খুশি হবেন? আমার আসলেই জানা নেই। বাড়ি থেকে বেরোবার সময় ব্যথায় যখন তিনি তিনি লিফটের ভেতরে দাঁড়াতে পারছিলেন না, কে যেন একটা মোড়া এগিয়ে দিয়েছিল বসার জন্য। কথা বলার মতো অবস্থা না থাকলেও তিনি কোনোরকমে বলেছিলেন, ‘মোড়াটা এখানেই রেখো, ফিরে এসে ওপরে ওঠার সময়ে লাগবে।’ মোড়াটা কি সেখানেই পড়ে আছে? ফিরে গিয়ে কি আমি মোড়াটা দেখতে পাব? দেখলে কি আমার মনে হবে না যে নানা মারা গেলেও তার ঠিকানা খোঁজার চেষ্টা মরেনি? নানাকে কোথায় কবর দেয়া হবে তা তার কাছে জেনে রাখিনি, এই দুশ্চিন্তা ছাপিয়ে কেন মনে মনে আমি তুচ্ছ মোড়াটাকে নিয়ে তখন ব্যস্ত হয়ে গেলাম, আমার জানা নেই।