Imagine There’s No Gender : অ-পুং-ভূমি থেকে না-মানুষি জমিন – লিঙ্গভাবনায় নোম্যানস্ল্যান্ডের নানা দ্যোতনা

শতাব্দী দাশ

কুয়াশা-ঢাকা একটা ফাঁকা রাস্তা। একটানা ঝিঁঝিঁর ডাক। দুজন হেঁটে চলেছে। ক্যামেরা তাদের অনুসরণ করছে পেছন থেকে। একজন পুরুষ। অন্যজন নারী। একটি সাদা বাড়ি দেখা যায়। ঝিঁঝিঁর ডাক থামে। সি-মেজরে পিয়ানো বেজে ওঠে। এরপরই শুরু হবে সেই গান, “ a paen of humanity” ।লেনন এক না-মানুষি জমিন “Imagine” করতে বলবেন। না-মানুষি, কারণ দেশহীন, দ্বেষহীন, ধর্মহীন এই জমিন মানুষি নীতি ও রাজনীতির বাইরের এক কল্পিত স্থানাঙ্ক, এক উত্তমতর অপর।

বয়স কম ছিল যখন, প্রতি স্তবকের শেষে লেনন পাখির মতো ‘ইয়ু হু’ ডেকে উঠলে অভিকর্ষ কমে যেত, আলোর ডানা দেখা দিত কাঁধের দুইপাশে। আর জীবনের আনাচে-কানাচে না-মানুষি আবাদে বসত করা মানুষদের সাথে দেখাও হয়ে যেত সে’ সময়ে। যৌথ খামার না দেখলেও আমরা অনাদি-পাগলকে দেখেছিলাম – পি. এফ.-এর সব টাকা পার্টির তহবিলে দান করে নিঃস্ব যে বুড়ো শেষ বয়সে পাগল হয়ে স্টেশনে আস্তানা গেড়েছিল। আমরা অবৈতনিক ছাত্র পড়িয়ে ধীমানকাকুকে লাস্ট ট্রেন থেকে নামতে দেখেছিলাম, গুজব-মতে যিনি ক্যানালের পাশের ফাঁকা রাস্তাটায় আক্রান্ত হবার পর চোরকে ঘড়ি খুলে দিয়ে শ্রেণীসংগ্রাম-টংগ্রা বুঝিয়েছিলেন। এসব গল্পকথাই হবে হয়তো! কিন্তু অনাদিবুড়োর ঘেয়ো পায়ের কাছে এক অনধিকৃত চরাচর আমরা বহুবার সৃষ্টি হতে দেখেছি। ধীমানকাকু বহুবার কোনো জনশূন্যতায় লাস্ট ট্রেন থেকে নেমে হেঁটে চলে গেছেন একটা ভাঙা কাঠের বাড়ির দিকে। সেই কাঠের বাড়িটায় কোন্ অন্য গানের
ভোরে পৌঁছব আমরা?

খানিক বড় হয়ে দেখা গেল, সমস্যা গূঢ়তর। এমনিতেই খেলায় নেয়নি কেউ, রেখেছে মাঠের বাইরে। য়োকো ওনো সেই সাদা বাড়িটার দরজা-জানলা খুলে দেন বটে, আলো আর বাতাস ঢালেন লেননের বুকে, মুখে, কন্ঠে, আর চুপ করে শোনেন লেননের অতিলৌকিক স্বপ্নের কথা, নির্বাক আলোতোয়া প্রেমিকাটি হয়ে – যে স্বপ্নে ‘Imagine there’s no gender’ স্থান পায় না।

ধীরে বোঝা যায় – এ’ দেশ, এ’সমাজ, এ’ পরিবার, এ’ দর্শন, এ’ বিপ্লব, কিছুই পুরোপুরি তোমার না, তোমার জন্যে না, প্রকৃত প্রস্তাবে। তুমি দেখতে পাও, ঢাকুরিয়ার একমানুষ -চওড়া একটা গলিতে যে দিদিমণি ভাড়া থাকেন, যাঁকে দেখলে ইস্কুলে তোমার বাক্যিরোধ হয়, যাঁর ভাড়াঘরের জানলায় উঁকি মেরে তুমি পূর্ণেন্দু পত্রী, সুবিমল মিশ্র বা ডরিস লেসিং-দের প্রথম দেখতে পাও – তাঁর না-মানুষি জমিনটি আরও খানিক নির্জন। প্রতীতিগত তিনি No man’s land –এর বাসিন্দা তো বটেই, আক্ষরিক অর্থেও তাঁর দুনিয়া No MAN’S Land - অ-পুং-ভূমি। পুরুষ বিবর্জনের এই পথ তোমার অ্যাবসার্ড লাগে, উদ্ভট লাগে। কিন্তু খোঁজখবর নিয়ে দেখা যায়, এই কল্পরাজ্যের একটা ইতিহাস আছে, পারম্পরিক রাজনৈতিক স্টেটমেন্ট আছে।

NO MAN’S LAND : সাহিত্যে অ-পুং-ভূমির রাজনীতি

সাহিত্যের পরিভাষায় যাকে “ফেমিনিস্ট ইউটোপিয়া” বলে, তার ইতিহাস শতাধিক বছরের পুরোনো। “ইউটোপিয়া” কথাটির আক্ষরিক অর্থের মধ্যেই আছে নো-ল্যান্ডের ভাবনা – যে ভূমি যতটা বাস্তব, তার চেয়ে অনেক বেশি মানসিক। প্লেটোর স্বপ্নের ‘Republic’ থেকে শুরু করে ষোড়শ শতকীয় মুরের আদি ’Utopia’– সবই কিন্তু আদতে পুরুষতান্ত্রিক। Thomas More তাঁর অর্থনৈতিক সাম্যের ধারণা দেন পরিবারতন্ত্র ও রাষ্ট্রতন্ত্রকে কায়েম রেখে, যেখানে সন্তান পিতার, স্ত্রী স্বামীর এবং বয়োকনিষ্ঠ বয়োজ্যেষ্ঠের বশংবদ।

নারীবাদের দ্বিতীয় ঢেউ তখন আছড়ে পড়েছে পশ্চিমে ‘ব্যক্তিগত ও আদ্যন্ত রাজনৈতিক’-এই ঘোষণা করে।আবার আ্যটকিনসন তাঁর বিতর্কিত মন্তব্যটি করছেন- Feminism is the theory, Lesbianism is the practice… এবং চরমপন্থী নারীবাদ নারী-সমকামিতার রাজনীতিকরণের মাধ্যমে এক পুরুষবর্জিত সমাজের রূপরেখা আঁকার চেষ্টা করছে খানিক বিচ্ছিন্নভাবে। আর ভ্যালেরি সোলানাস-এর মতো জঙ্গী নারীবাদী তখন প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছেন : “…there remains to civic-minded, responsible, thrill-seeking females only to overthrow the Government, eliminate the money system, institute complete automation and eliminate the male sex.”

ঠিক এইরকম সময়ে, নারীর ব্যক্তিগত চাহিদা ও সামাজিক ভূমিকা পালনের আকাশ-পাতাল বৈষম্য থেকে বিস্ফোরণ-সম্ভাবনাময় কিছু গদ্য সৃষ্টি হল নারীবাদী লেখিকাদের কলমে। ‘ফেমিনিস্ট’ তত্ত্বের আলোকে তাঁরা এক ‘আদর্শ অপর’ দেশের সন্ধান করছেন। এবং সেই জঁর কোথাও গিয়ে মিশে যাচ্ছে কল্পবিজ্ঞানের সাথে, কারণ তাঁদের মননে চরম নারীমুক্তির ধারণার সাথে প্রযুক্তিগত উন্নয়নও ওতোপ্রোত জড়িয়ে আছে। বিজ্ঞানই হয়ে উঠছে নারীর বিকল্প ঈশ্বর, যে তাকে উৎপাদন ও প্রজননের শ্রম থেকে মুক্তি দেবে। এহেন ধারণার সীমাবদ্ধতা নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু সে আলোচনা পরে হবে। আপাতত এটাও মাথায় রাখতে হবে, এইধরণের কাল্পনিক যাপনের সাহিত্য, এরকম ‘এস্‌কেপ লিটারেচর’ – সায়েন্স ফিক্‌শন বা ফ্যান্টাসি – কখনোই সাহিত্যিক ক্যাননের কেন্দ্রে ছিল না, এবং অনেকের মতে তা হীনতর সাহিত্যও বটে। কিন্তু পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখার ছাড়পত্র যেহেতু ইউটোপিয়ান সাহিত্যের লাগামছাড়া, তাই শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা তা অনায়াসে বহন করতে সক্ষম।

ভ্যান,নিক,জেফ-তিন পুরুষ অভিযাত্রী এক মাতৃতান্ত্রিক ভূখন্ডের কথা শুনল। কেমন হবে সেই দেশ? নিক আমাদের রসিক ছেলে,পাক্কা প্লেবয়। তার মনে বালুকাবেলার হাজার লাস্যাময়ী ভেসে ওঠে।জেফ প্রথাগত পুরুষ-ভাবে নিশ্চয় শিশু আর ন্যানারি থিকথিক করছে সেখানে। আর ভ্যান যখন তথাকথিত বুদ্ধিজীবী তখন সে যে আমাজন ইত্যাদির তুলনা টানবে, তা বলাই বাহুল্য। অবশেষে অনুপ্রবেশ করেই ফেলল তারা। কোথায়? Charlotte Perkins Gilman-এর Herland-এ। গিলম্যান লেখেন ‘Herlend’ ১৯১৫-এ, ধারাবাহিকভাবে, ‘Forerunner’ ম্যাগাজিনে, যদিও তা পুনরাবিস্কৃত হয় ১৯৭০ নাগাদ। ।এই আশ্চর্য মাতৃতান্ত্রিক দুনিয়ায় দ্বন্দ্ব নেই, যুদ্ধ নেই, সমৃদ্ধি আর প্রাচুর্যের জীবন। জনন হয় অযৌন পদ্ধতিতে, এবং জন্ম নেয় শুধু কন্যাসন্তান। তবে হারল্যান্ডের প্যারাডক্স হল – প্রচলিত জেন্ডার মিথগুলি সুদক্ষভাবে ভাঙা হলেও মাতৃত্বের ধারা ও সহজাত মাতৃপ্রবৃত্তিকে Gilman অর্থনৈতিক উন্নয়নের উৎসমুখ বলে ধরেন। নারীরা বুদ্ধিমান, শক্তসমর্থ, কিন্তু ধৈর্যশীল, কেননা মাতৃরূপ তাদের সহজাত। মজার ব্যাপার হল, নারীসম্প্রদায়ের তরফ থেকে কোনোরকম বিরোধের সম্মুখীন না হয়েও এই তিন অভিযাত্রীর পুং-অস্তিত্ব বিপন্ন হয়, নিজেদের ‘like a lot of neuters’ মনে হয়, কারণ তাদের পুরুষস্বত্বা একটি নির্মাণ মাত্র। নারীর দুর্বলতা, নিষ্ক্রিয়তা ইত্যাদি বিপরীত নির্মাণ ছাড়া যার অস্তিত্ব নেই।

এরপর লাগামছাড়া কল্পনাকে থামায় কে? ১৯৪০ সাল নাগাদ Wonder Woman কমিক স্ট্রিপে একই রকম পুরুষবর্জিত মাতৃতান্ত্রিক দেশের দেখা মেলে। নায়িকা ডায়না প্রিন্স মোটামুটি সুপারম্যান এর মহিলা সংস্করণ।তার আবাসভূমি প্যারাডাইস আইল্যান্ড এক সুপরিকল্পিত অপুংভূমি।

Sally Miller Gearhart –এর Wonderground : Stories of the Hill Women (১৯৭৮)-এও মেয়েরা শহর ছেড়ে,পাহাড়ে নতুন বসত গড়ে অবক্ষয়ী পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চোখরাঙানিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। এই উন্নততর বিশ্বে তারা অলৌকিক সব কান্ড ঘটায় – তারা টেলিপ্যাথির মাধ্যমে পরস্পরের সাথে যোগযযোগ স্থাপন করে, তারা উড়তেও পারে। আবার প্রকৃতির সাথেও তাদের নাড়ীর যোগ, প্রকৃতিতে প্রত্যার্বতনের এক ঘোষিত নীতি তারা বহন করে। এবং অবশ্যই তারাও পুংহীন প্রজননে সক্ষম ও সমকামী। তাদের প্রতিটি অতিমানবিক ক্ষমতাই পচনশীল, মননহীন, প্রকৃতিবিচ্ছিন্ন পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে সাবভার্সন।

Marge Piercy –র Woman on the Edge of Time প্রকাশ পায় ১৯৭৬-এ। এটি একটি নির্ভীক নারীবাদী ইউটোপিয়াও বটে, আবার সেই ইউটোপিয়ার বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দীহানও বটে। ত্রিশোর্ধ কনি। নিজের চারপাশের সাথে লড়তে লড়তে বিধ্বস্ত মেয়ের জায়গা হয় অ্যাসাইলামে শেষমেশ।তবু মেয়ের সেরে ওঠার লক্ষণ নেই। কনির নিজস্ব এক ফিউচারিজিম শুধু নেই, সে রক্তে-মাংসে মাঝেমাঝেই এক জেন্ডার-উত্তর সমাজে পৌঁছেও যায়। এই সমাজ কি সত্যি আছে ভবিষ্যতের গর্ভে? কনি কি সত্যি পা রাখে সেখানে কখনো-সখনো? নাকি, সবই নিছক কনির পাগলামি? উত্তরগুলো ধোঁয়াশায় থেকে যায়।

এরকম আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যেতেই পারে, কিন্তু এইবেলা নিজভূমে চোখ ফেরানো যাক।অবিভক্ত বাংলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম নারী,আলোকিত মন আর মনন নিয়ে ক্রমাগত আক্রমণ করছেন প্রথার হেজিমনি।ভাবছেন ‘পর্দা’-র দমন ও অবদমনের রাজনীতি পুরুষের কপালে জুটলে কেমন হয়! ‘Herlend’ -এরও দশবছর আগে, ১৯০৫ সালে, রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ‘Sultana’s Dream’ লিখে ফেলেছিলেন, যা প্রকাশিত হয়েছিল মাদ্রাজের ইংরেজি পিরিওডিক্যাল The Indian Ladies Magazine-এ। এখানেও আমরা দেখছি, চোখ-ধাঁধানো প্রযুক্তি নারীকে তথাকথিত নারীসুলভ শ্রম থেকে মুক্তি দিয়েছে। সুলতানার সলতনতের ভিত হল ভালবাসা আর সহমর্মিতা। শুধু গৃহবন্দী পর্দানসীন পুরুষ এই উন্নয়ন থেকে আলোকবর্ষ দূরে থাকে। অর্থাৎ অত্যাচারী-অত্যাচারিত র সমীকরণটি স্রেফ উল্টে দেওয়া হয়, হয়তো কয়েক শতাব্দীর পীড়নের অবচেতন প্রতিশোধ হিসেবে।

আপাতভাবে এই পুংহীন সমাজ এক প্রকৃতিবিরুদ্ধ নাশক ভাবনা। ঠিকই। কিন্তু এই নাশকতার গান-পাউডার জমা হয়েছে দীর্ঘ অসহায়তার কালক্রম জুড়ে। তথাকথিত স্বাভাবিক বা বিষম-স্বাভাবিক যৌনতার পৃথিবীতে নারীর সঙ্কটের কথা বলেননি কি সিমোন দ্য ব্যুভোর? তুমি আসলে তুমি নয়। তুমি আছ,কিন্তু স্বত্বাহীন।এক নির্মিত ‘অপর’,এক ‘বস্তু’ যা ‘ব্যাক্তি’র (পড়ুন পুরুষের) ধারণা নির্মাণে কাজে আসে। (সিমোন ‘সাবজেক্ট’ ও ‘অবজেক্ট’ পরিভাষা দুটি ব্যবহার করেন।) এই বস্তুকে দখল করতে হয়, অধিকারে রাখতে হয়, ভূখন্ডের মতো করেই। এই বস্তুর ওপর কতগুলো মনগড়া ‘না’ ও ‘না-পারা’ চাপাতে হয়। তবেই ‘ব্যক্তি’র ‘পারা’ অবয়ব পায়; স্বীকৃতি, বাহবা, হাততালি, আরও কত কি পায়। এক কথায় তুমি একটি মজারু আয়না যেখানে পুরুষ তার বহুগুণবিবর্ধিত প্রতিচ্ছবি দেখে গোঁফে তা দেয়। স্বত্ত্বা হারানোর এ সঙ্কট মূলগত ও সর্বব্যাপী। সামাজিক বা আচরণগত ভূমিকা পালনের এ’ নিষ্ফলতা যখন উপলব্ধিতে কড়া নাড়ে, তখন ব্যুভোরের নারীর ক্রাইসিসের সাথে কামু বা সার্ত্রের অস্তিত্ববাদী সঙ্কট মিশে যায়। সিসিফাসের মতো এক নারীর পাহাড়ে-পাথর-তোলা ব্যর্থ দিনরাত আমরা অনুভব করতে পারি হয়তো। বা এক নির্জন না-মানুষি জমিতে সে নারীর নিষ্ক্রমণ দেখতে পাই। আর তা যদি পারি, তবে ভাব-দুনিয়ায় তার নাশক অথচ হাঁফ-ছেড়ে-বাঁচার ছাড়পত্রটি হাতে তুলে নেওয়ার প্রেমিসটি বোঝা যায়, হয়তো।

এইভাবে একটি সামগ্রিক জঁর বা ঘরানা হিসেবে যদি ফেমিনিস্ট ইউটোপিয়ান সায়েন্স ফিক্‌শনগুলির পুনর্বিবেচনা হয়, তবে কতগুলি বিতর্কিত ফাঁকফোকর অবশ্যই চোখে পড়বে। প্রথমত, নারীপুরুষের দ্বি-বিভাজন তত্ত্বটি যে বায়োলজিক্যাল ও ধ্রুব, তা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। তার সামাজিক বা আচরণগত দিকটি কম গুরুত্ব পায়। জৈবিক তফাতকে বৈষম্যের একমাত্র কারণ ধরে নিয়ে তাকেই অতিক্রম করতে চাওয়া হচ্ছে বিজ্ঞানের সাথে, সাইবারনেটিক্স-এর সাথে সই পাতিয়ে। অথচ এই প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির সাথে, যন্ত্রের সাথে পুঁজিবাদের গাঁটছড়ার কথা বেমালুম ভুলে যাওয়া হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, পুরুষ-নারী – এই দ্বিমাত্রিক পরিচয়ের বাইরে লিঙ্গবৈচিত্রের যে সাতরঙা স্পেকট্রাম, তাকে এহেন সাহিত্য ধরতে পারছে না, পারে না – কারণ লিঙ্গসাম্য আন্দোলনের তৃতীয়, সর্বব্যাপী ঢেউটি আছড়ে পড়তে তখনও বাকি আছে।

আরো যত নোম্যান্সল্যান্ড

রূপির সাথে তোমার ট্রেনে আলাপ, লেডিজ কামরায়। তাকে বা তাদেরকে ভয় পেতে শিখিয়েছে তোমার বেড়ে -ওঠা। যদিও রূপিকে বেওসার সময় ছাড়া বিকট হাততালি দিতে তুমি কখনো দেখনি। রূপির চোখদুটি সুন্দর। বারুইপুরে রূপির খোলে যাওয়ার তোমার আমন্ত্রণ আছে। হয়ে ওঠেনি। রূপির নোম্যান্সল্যান্ড, এমন কি, সেই খোলও নয়, তুমি জান। তা আছে বুকের গভীরে।

হরিয়ানার সেই ছেলেকে তুমি চেনোনা, যাকে ‘সংশোধন’ করতে তার পরিবার ধর্ষণ করিয়েছিল। ধর্ষিত হবার সময় তার শুকনো চোখ অন্য কোথাও পাড়ি দিচ্ছিল হয়তো। যন্ত্রণার শেষে একলা হয়ে যাওয়ার না-মানুষি জমিনে।

তবে গ্রাম থেকে আসা সেই দুই ফুটবলার মেয়েকে তুমি চিনতে। একজনের বিয়ে হয়ে গেলে অন্যজন কোথায় যেন হারিয়ে গেল। কোনো দুই মেয়ের রক্ত চেটে খেয়েছে ভোরের ট্রেনলাইন, এমন খবর শুনলে তোমার সেই হারানো বন্ধুদের জন্যে বুক কাঁপে। ভালবাসার মায়াজলে গা ধুয়ে তারা যেখানে পাড়ি দিল, সেখানে কাঠের বাড়িটা খুঁজে পেল কি?

এক আজন্ম-মেয়ের বুক খামচে ধরতে তুমি দেখেছিলে অত্যুৎসাহী পুলিশকে। তার সমস্ত শরীরে তখন রগুড়ে জনতার দখলদারি, যা খুঁড়ে খুঁড়ে বার করা হচ্ছে পুরুষচিহ্ন, ‘চোর ধরেছি’ উল্লাসে। এক্স ওয়াই ক্রোমোজম, হ্যানা ত্যানা হরমোনে সবার তখন প্রভূত ব্যু্ৎপত্তি।

তুমি ‘বৌদি’ পুরুষদের দেখেছ। দেখেছ তারা আসলে স্বীকৃত পৌরুষের ধারণার জন্য কতটা ক্ষতিকর,আর তাই তাদের দাবিয়ে রাখার কি প্রচন্ড সঙ্ঘবদ্ধ চেষ্টা। রূপান্তরিত নারীর এমনকি ধ্রুপদী সনাতনী নারীবাদ থেকে দূরত্ব- তাও তো চোখ মেললেই দেখা যায়।

এদের সবারই আছে এক-একটি একলা হয়ে যাওয়ার না-মানুষি জমিন, যেখানে তারা নির্বাসিত – এবং না, সব নির্বাসনই স্বেচ্ছা-নির্বাসন নয়।

লিঙ্গতত্ত্ব যখন যৌনচেতনার রামধনুকে তার চর্চাভূমিতে এনে ফেলে, সমকামিতা, রূপান্তরকামিতা বা নানা অন্তর্লিঙ্গ অবস্থান যখন ঢুকে পড়ে তার পরিসরে, আর পুরুষত্বের মেকি ধারণা ডিকন্সট্রাক্ট করার দায়ও ষখন সে নিয়ে ফেলে, তখন পুরুষ-বিবর্জিত পৃথিবী কল্পনাও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে ধীরে ধীরে। প্রতিটি ব্যক্তিমানুষের যা কিছু ‘ম্যাস্কুলাইন’ ও ‘ফেমিনিন’ – তার নানামাত্রিক প্রকাশে অভ্যস্ত হওয়াই তো লক্ষ্য, সেভাবেও তো ভেঙে ফেলা যায় লিঙ্গভিত্তিক-মিথের মিথ্যে। অন্তত চেষ্টা তো হতেই পারে। চড়া রং-মাখা মানুষেরা রামধনু প্যারেডে সেই প্রকাশবৈচিত্র্যই চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, অতিরেকে বোঝায়। তারপর সন্ধে নামে, আবার সমাজচ্যুত, রাষ্ট্রচ্যুত এক না-মানুষি জমিন তাদের সামনে।

আবার দেখ, যা কিছু প্রাচীন, প্রাগৈতিহাসিক, অন্ধ, বস্তাপচা – তা ত্যাগ করেই বা তুমি যাবে কোথায়? অন্যপ্রান্তে হাঁ-মুখ অপেক্ষায় যে দাঁড়িয়ে , তার নাম নব্য-আধুনিক, নব্য-উদারনৈতিক বাজার , যা সাম্যের বুলি, আদর্শ বা সংগ্রামকেও স্রেফ প্রোডাক্ট হিসেবে দেখে। ৮ই মার্চ তাই নারীর নব্য ক্রেতা স্বত্ত্বায় উদ্‌বর্তনের দিন হয়ে দাঁড়ায়। নারীভোগ্য পণ্যে ডিসকাউন্ট আর রিবেটৈর দিন। নারীর ক্রয়ক্ষমতা জাহিরের দিন। সমকামী আন্দোলনও বিজ্ঞাপন হয়ে বিকিয়ে যায় ফ্যাশনিস্তা কাপড়ের ব্র্যান্ডের কাছে। সেই বিজ্ঞাপণে নারীযুগল ভারি ‘ব্র্যান্ডেড’, ভারি শোভন, ভারি ‘এথনিক’ সেজে, ভারি ভালমানুষ হয়ে অভিভাবকদের আশীর্বাদ-প্রত্যাশায় প্র্রহর গোনে।

এই দুই মেরু থেকে সমদূরত্বে, তোমার সামনে, তোমাদের সামনে তখন আবারও এক না-মানুষি জমিন – সেই কাঠের বাড়ি... দোদুল্যমান, তবু অনধিকৃত, স্বয়ম্ভর। সেখানেই শুধু নাস্তি-কে থামিয়ে অস্তি কথা বলে ওঠে,যেমন বলেছিলেন উন্মাদিনী সিলভিয়া প্লাথ : “I took a deep breath and listened to the old bray of my heart – I am, I am, I am.” সেখানে পৌঁছনোর পথকে অনেকে বলে ‘সংগ্রাম’, অনেকে বলে ‘এলিয়েশন’, তুমি সে পথকে ‘জীবন’ নামেও ডাকতে পার।