নোম্যানস ল্যাণ্ড

মৃগাঙ্ক শেখর গঙ্গোপাধ্যায়

একটা কাঠের চেয়ার পাতা থাকত। পাশে একটা টিনের মগ। তাতে জল। আর মগের কানায় একটা বাতাসা। বাতাসাটা ব্যালেন্স করে দাঁ ড়িয়ে থাকত,আমার মনে হত। আসলে ভেসে থাকত বাতাসে। ড্রাগন যখন খেলতে আসত, আমার সবে একপাতা লেখা হয়েছে। অ আ। দশ পাতা না হলে বাবা খেলতে দিত না। একবার ড্রাগণ লিখে দিয়েছিল আমার হয়ে। ও খুব জলদি লিখত। বাবা ধরতে পারে নি। বাবা আমার হাতের লেখা চিনিত না। কেবল পাতা গুণে ছেড়ে দিত। মা বকেছিল। মা, যাকে মিশনে ভর্তির পর আর দেখি নি। অনেক রাত স্বপ্ন দেখেছি, মায়ের একহাত মাটির উনুন। এক হাত কুয়োতলা। একটা কোথায় কোথায় মাঠে দূরে তালগাছে। যেমন আমার স্কুলের অক্ষরগুলো। খাতায় না ধরলে, আমি পাঠিয়ে দিতাম, এখানে সেখানে। মা বলত হাতের লেখাটা তোর ভালো হল না। ক্ষেত তালগাছ উনুন থেকে ফিরে আসত ওরা। সুন্দর হয়ে। আমি বলতাম, মা আমাকেও সুন্দর করে দাও। আমায় সবাই খেপায় স্কুলে- চুল ভুরু নেই। কাঠের চেয়ারের পাশে একটা রেডিও থাকত। রেডিওটার এণ্টেনা বেশ বড় ছিল। আমার কোমর অবধি। সেটা ধরে নাড়া নাড়ি করলে খক খক কাশি আসত ভেতর থেকে। ড্রাগনের ধারনা ছিল, ওর ভেতরে কেউ আছে। নিশ্চয়ই আছে। "কে বলল তোকে? এইটুকুর মধ্যে মানুষ ঢোকে? "- আমি বলেছিলাম। তো ও তো শুনলো না। বলল, মাঠের ওপারে দাদুর কাছে নিয়ে যাবে। আমাদের বাড়ির পেছনে একটা মাঠ ছিল। বিশাল মাঠ। খুব ধূ ধূ। দুপুর বেলা ওর সামনে দাঁড়ালে একটা হাওয়া দিত। দিতই। বারবেলার হাওয়া। সে একবার বুবাই গেল। ফিরল, মুখ চোখ লাল। কথা বলছে না। বসে আছে। ডলি দি ছুঁতে গেল। আর চিৎকার। সাথে সাথে ব্রক্ষ্মা ওঝা। ঝাঁকড়া চুল ঝাঁকিয়ে। ঝাঁটা আর সর্ষে দিয়ে ঝাড়ছে। বুবাইয়ের গলা দিয়ে কে যেন কথা বলছে। খনখনে আওয়াজ। সারাপাড়া শোনা যাচ্ছে। দিপু দা ভোলা দা ধরে রাখতে পারে না। বুবাই আমার থেকেও ছোট। মনে হচ্ছে উড়ে পালিয়ে যাবে। ব্রক্ষ্মা বলছে, "কে তুই কে বল?" বুবাই বলছে, "ও কেন মাঠে গেল। আমার চুল পাড়ালো।" ব্রক্ষ্মা বলছে, "চলে যা। না হলে পুরে ফেলব। তুই জানিস আমার জলপোড়া। "বুবাই মাথা নাড়াচ্ছে। দাঁত বার করছে। ব্রক্ষ্মা বলল, "চেপে ধর। চেপে। " দিপু দা ভোলা দা চেপে ধরল। ব্রক্ষ্মা বুবাইয়ের মুখটা চেপে ধরে জলপোড়া খাইয়ে দিল। ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে ঘুমিয়ে গেল বুবাই। জ্বর ধুম জ্বর। পাইক পাড়ায় চলে গেল তারপর। আর ফিরল না। তো সেই মাঠের ওপারে এক দাদু থাকত। সে এরকম রেডিও টিভি নিয়ে বসে থাকত। ভাঙা চোড়া। স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে কি সব করত। ড্রাগণ বলল, ওর কাছে নিয়ে যাবে। - "রোববার তোর বাবা অফিস গেলে নিয়ে যাব। " বাবা রেলে ছিল। রবিবার অপিস যেত। অফিসে বেরলেই আমি ড্রাগন বেরিয়ে যেতাম। বাঁশ ঝাড়, দিঘীর মাচা, বুড়ির মাঠ - এসব ঘুরে টুরে বেড়াতাম। তো সেদিন মাঠ পেরিয়ে গেলাম দাদুর ঘরে । দাদু শুনে বলল, "এ তো অই দ্যাসের ভাসা। খোকনের। আহা খোকনটা রে কতদিন দ্যাখি নি রে। " আমি চুপ। ড্রাগণ বলল, "কে খোকন? " চেয়ারটার একটা পায়া নেই। তিনটের একটা পায়ার নীচে চড়া পরে গেছিল। আগে নদীজল। জোয়ারের সময় আমাদের ঘরে জল উঠে আসত। মা দরজায় বসে বাসন মাজত। আমি নৌকা বানিয়ে ছেড়ে দিতাম। নৌকার গায়ে কত কি কথা। তুই কেমন আছিস? ভালো আছিস? আমাদের বাড়ি কবে আসবি? একদিন দরজা খুলে দেখি সত্যি একটা নৌকা। কাগজের। আর তার ভেতর লেখা। আমি ভালো আছি। তুই কেমন আছিস? আমি আসব। তুই কবে আসবি? আর একটা সিংহ আকা। প্যাস্টেলের রঙ দিয়ে। তারপর নদী তো অনেক দূরে চলে গেল। চেক পোস্ট বসল। কারা সব এলো। সবুজ সবুজ জামা।
-আর যুদ্ধ?
-না তো।
-কত লোক নাকি মরে গেছিল?
- না তো। ওরা তো বেড়াতে এলো আমাদের বাড়ি। বলল, খুব সুন্দর গো তোমাদের ঘর, চাচা। চাচা বলল, থাকবা? তারপর বাসা অদল বদল হল। চাচারও অই দ্যাস খুব পছন্দ হয়ে গেছিল।
-তোমার ইচ্ছে করে না একবার গিয়ে দেখে আসতে?
-হয় তো। কিন্তু অই সবুজ লোকগুলা কি যে কাগজ চায়! আমার ঘর আমি যাব, তাও কি সব লেখা পড়া করতে হবে। তোমার লেখা পড়া ভালো লাগে?
আমি মাথা নাড়ি।
-আমারও ভালো লাগে না। ব্যাস আর যাওয়া হল না।
রেডিও টা দাদাইয়ের ছিল। দাদাইরা ছিল ফরিদপুরের জমিদার। বাবার কাছে গল্প শুনেছি। আমাদের বিশাল বাড়ি। দুর্গা পুজো হত। বাবাকে বলতাম, আমরা যাব না ফরিদপুর?
-কি করে যাব! চেয়ারের ওই পায়াটা নামত আমাদের বাড়ির ছাদে। দেখছিস না ভাঙ্গা। কি করে যাবি? নামতে তো হবে ছাদে।
আমি চেয়ারের দিকে তাকিয়ে বসে থাকতাম।
এন্টেনা দাদু অনেক নেড়ে চেড়ে বলল, এ সাংঘাতিক জিনিস। এটায় হারিয়ে যাওয়া মানুষদের গলা শোনা যায়। হারিয়ে যাওয়া মানুষ। যেমন তোর দাদাই দিম্মি। -বুবাই? -হ্যা বুবাই। তোর দাদাই সারাদিন এটা নিয়ে অই জন্যই বসে থাকত। ফরিদপুরের সব বন্ধুদের গলা শুনতো।
-আচ্ছা ওরা দাদাইয়ের গলা শুনতে পেত?
-আলবাত পেত। অই চেয়ারের পায়া দিয়ে তৈরী সব রেডিও তেই শোনা যাবে।
আমি আর ড্রাগন ফিরে এসেছিলাম সেদিন।
পরের বছর আমি মিশনে ভর্তি হলাম। সেই বছরই প্রচণ্ড ঝড়ে চেয়ারটা ভেঙ্গে চুড়ে গেল। রেডিওর এণ্টেনাও কেমন নড়বড়ে হয়ে গেল। ড্রাগন ভর্তি হল নবভুবনে। আমার রোববারে পাপড়ি মাসিমণি পড়াতে আসতে লাগল। আমি অঙ্কে একশো পেলাম আর একটা দাবার বোর্ড কিনে দিল বাবা। হাতি ঘোড়া সৈন্য সে যুদ্ধের অনেক কায়দা কানুন।
আমাদের সবার মধ্যেই দুটো দেশ থাকে। আর তার মাঝ বরাবর নো ম্যানস ল্যাণ্ড।
ড্রাগন, এণ্টেনা দাদু, ব্রক্ষ্ম ওঝা, সিংহ আকা নৌক, দাদাই দিম্মা-এরা সবাই এই নোম্যানস ল্যাণ্ডের বাসিন্দা। আমি দুই দেশ থেকে এদের দেখে আসছি। আমার বয়স যত বেড়েছে, আরো দেশ ভাগ হয়েছে। আর তৈরী হয়েছে আরো নোম্যানস ল্যাণ্ড।