বসতি

দেবার্চনা সরকার

আমার কোন দেশের বাড়ি নেই। যখন ছোট ছিলাম আমার প্রায় সব বন্ধুদেরই একটা দেশের বাড়ি ছিল। যেখানে পূজোতে বা শীতের ছুটিতে আনায়াসে যাওয়া যায়। দেশের বাড়ি মানেই যেতে হয় ট্রেনে চড়ে, সেখানে ইলেকট্রিসিটি থাকেনা, তাই রাত হলে পড়াশুনা নেই। সেখানে ভোর হয় সবার আগে, লাল থালার মত এত্তবড় একখানা সূর্য্য হেলাবটতলা বা আশানগড়ের মাঠের পাশ দিয়ে টুক করে আকাশে ওঠে। যেখানে অনেক গাছ, অনেক পাখী, অনেক আদর আর অঢেল সময়। এমন একটা মজার জিনিস – দেশের বাড়ি, আমার কোনদিন ছিলনা।
আমার ছিল উঁচু উঁচু সিমেন্ট বাঁধানো বারান্দা, কংক্রিটের রাস্তায় হাতটানা রিক্সা আর ছোট বড় গাড়িদের সারি। বন্ধু বলতে ছিল সেই একখানা ছাতিমগাছ আর কদমগাছ। কদমগাছটা ছিল আমাদের ঘরের একদম গা ঘেঁষে। বর্ষাকালে যখন টোপা টোপা কদমের ফুল ধরত, আমাদের সারাটা ঘর ম ম করত তার গন্ধে। হাত বাড়ালে অনায়াসেই নাগালে চলে আসত ফুলগুলো, হাত বোলালে সারা হাতে মাখামাখি হয়ে যেত কদমের রেণু। ছাতিম গাছটার গল্প ছিল অন্যরকম। পূজোর পর পর সন্ধ্যে হলেই মনে হত কেমন একটা ঝাপসা রহস্যময় অন্ধকারের চাদর গায়ে দাঁড়িয়ে আছে গাছটা। অনেক শীতের রাতে হঠাৎ কখন চোখ চলে গেলে ওদিকে, গা ছম্‌ছম্‌ করে উঠত।
ওই বাড়িটা ছেড়ে চলে এসেছি আজ প্রায় ১২ বছর হয়ে গেল। সেই কদমগাছটা, ছাতিমগাছটা, ঘুপচি আন্ধকার, স্যাঁতস্যাতে ছাতা পড়া দেওয়াল, উঁচু উঁচু পুরোন দিনের সিঁড়ি একতলা-দুতলা করবার, আর সেই লম্বা লম্বা গারদ দেওয়া জানলা, মার বাড়ি ফিরতে দেরি হলেই যেখানে আমি আর দিদি পা ঝুলিয়ে বসে থাকতাম। আমার শৈশবের রূপকথা আর কৈশোরের সমস্ত গান ফেলে এসেছি আজ ১২ বছর হয়ে গেল।
আমার কোন দেশ নেই, এই যে পোড়া দেশে এত বছর বাস করলাম তার প্রতি কোন টান, কোন আবেগ, কোন প্রেমবোধ নেই আমার। শুধু মনে হয় একদল চোখবন্ধ মানুষের পাশে, চোখে ঠুলি এঁটে আমিও বসে আছি। বোধশূন্য হয়ে নিয়ম মাফিক চলছি, নিয়ম মত দেখছি, বুঝছি, হাসছি, গাইছি – লক্ষ্যহীন, বিনা প্রশ্নে, বিনা বাক্যব্যয়। এখানে গাছ কেটে রাস্তা বড় হয়, আর সেই সব পলাশ, কৃষ্ণচুড়ার লাশ ভেসে যায় শহরের ড্রেনে। এখানে শয়ে শয়ে পথের মানুষ-কে কটি টাকার পূজোর সার্কাস দেখান হয় ফি বছর। আজ ৩০ বছর ধরে নিয়মিত ঘটে যাওয়া হাজারো জেনোসাইড, রাজনৈতিক এবং অরাজনৈতিক খুন, জখম, দাঙ্গা, বিবাদ, কলহ মিথ্যাচারের সাক্ষী থাকতে থাকতে স্নায়ু শিথীল হয়ে আসে। শুধু যখন পাড়ার বাচ্চারা পাশের বড় পুকুরটায় দাপাদাপি করে, আর ঘন হয়ে আসা মেঘলা দুপুরে পানকৌরি টুপ্‌ টুপ্‌ জলে ডুব দেয় তখন আমার সেই কখনও না থাকা দেশের বাড়ির জন্য মনটা হূ হূ করে ওঠে।
আমার নিজের কোন ঘর নেই। এই ফ্ল্যাটের দুটো ঘর নিয়ে ভাগাভাগি করে থাকি আমি, মা আর আমাদের দুটো কুকুর। জায়গা অনেক শুধু আমার নিজের কোন জায়গা নেই, যেখানে একা একা জেগে থাকা যায় অনেক রাত অবধি, যেখানে কিচ্ছু না করেই কাটিয়ে দেওয়া যায় একেকটা গোটা দিন, যেখানে নিজের সঙ্গে অনর্গল বকে যাওয়া যায়। ছটোবেলায় মনে পড়ে আয়নার সামনে বকবক করতে ভারী ভাল লাগতো আমার। দুপুর বেলায় যখন সারা বাড়ি ঘুমিয়ে কাদা, আমি চুপি চুপি এসে বসতাম আমাদের পুরোন কাঠের আলমারিটার সামনে, তার গায়ে লাগানো বিশাল আয়না। বেশ খানিক্ষন চুপ করে নিজের ছায়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলেই একটা সময় মনে হত সামনে যে আছে সে অন্যকেউ, আমি না। আর তারপরই শুরু হত কথা। যে আমি ঠিক আমি না তার সঙ্গে। চুরি করে রান্নাঘর থেকে কড়াইশুটি খাওয়ার গল্প, আবার কখনো দিদির উপর যত রাগ একনাগারে উগরে দিতাম। বয়েস কম হলে অনেক কিছুই ছেলেমানুষি বলে পার পাওয়া যায়। কিন্তু একবার বয়েসটা বাড়িয়ে ফেললেই এইসব কাণ্ডকারখানা লোকের চোখে ধন্দ জাগায়। তাই আজ সেই আয়নাটা থাকলেও তার সামনে লুকিয়ে বসা আর হয়ে ওঠেনা। তখন মনে হয় আহা নিজের একখানা ঘর যদি পেতাম......... কি না করতাম আমি, সারারাত জানলায় বসে থাকতাম, অথবা ভরদুপুর আবধি কিছুতেই মুখ তুলতাম না বালিশ থেকে, খাতা বই কাগজ কলম উসখো-খুসকো হয়ে ছড়িয়ে থাকত চারদিকে আর আমি বুকের নীচে বালিশ নিয়ে উপুর হয়ে শুয়ে থাকতাম। আথবা ফিরেও দেখতাম না ওই ঘরটার দিকে, মার বিছানাটাই আনেক বেশী টানত আমায়, রোজ রাতে বাড়ি ফিরে মা-কে বলতাম “ আজ না হয় তোমার পাশেই শুই”। তবু নিজের বলতে একখানা ঘর তো আমার হত। এই যে মস্ত পৃথিবী, এত আলো, হাওয়া, গাছ, ফুল, পাখী, গ্রহ-নক্ষত্র ছড়িয়ে আছে চারদিকে তার মাঝখানে একটুখানি জায়গা,আমার নিজের। তবু কোন দিনই আমার নিজের একটা ঘর হল না।
শুধু রোজ রাতে কিছুটা সময় নিয়মকরে আমাদের ঘরের লাগোয়া বারান্দায় আন্ধকারে গিয়ে বসি। বারান্দার কোণে একটা টবে মা আপরাজিতার গাছ লাগিয়েছে। এবারের বর্ষায় সেটা লকলকিয়ে বেড়ে উঠেছে অনেকটা। আমার সাদা কুকুরটা খানিকবাদে পাশে এসে বসে। সামনে সদা ব্যস্ত ভি আই পি রোড, অত রাতে খানিকটা ক্লান্ত। তবু ঘর ফিরতি মানুষের আনাগোনার অন্ত নেই। ধীরে ধীরে রাস্তা, তার পাশে গাছেদের সারি পেরিয়ে চোখ চলে যায় আকাশের দিকে। এক সময় কলকাতার আকাশে কত তারা দেখা যেত। মনে পড়ে, তখন কলেজে পড়ি , দুর্গাপূজোর নবমীর রাতে আমরা কয়েকজন বন্ধু সারারাত ছাদে কাটিয়ে ছিলাম। সেদিনও আকাশে অনেক তারা ছিল।আজ এই কয়েকটা বছরের ব্যবধানে সেইসব তারাগুলো কোথায় হারিয়ে গেল কে জানে? নাকি আমিই বেশ খানিকটা বুড়িয়ে গেছি? মন আর চোখ দুটোই ঘোলাটে হয়ে গেছে? এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে লোহার রেলিং-এ মাথা রাখি। এ পৃথিবীতে এত প্রিয়, এত নিবিড় সুখের আশ্রয় আর কিছু আছে বলে মনে পড়ে না।
আমার ছোট্ট একফালি বারান্দা, পাশে এ পাড়ার বড় পুকুর, সামনে চার-পাঁচটা সজনে ডাঁটার গাছ। অনেক রাতে একটা দুটো পেঁচা উড়ে যায়। হূ হূ করে হাওয়া দেয়, আমার সারাটা শরীর কেঁপে কেঁপে ওঠে। আপরাজিতার পাতা তিরতির করে কাঁপতে থাকে হাওয়ায়ে, আমার সাদা কুকুর গুটিসুটি মেরে গা ঘেঁষে বসে। আমার অপ্রশস্ত বারান্দা, মার হাতে লাগানো আপরাজিতার গাছ, আমার সাদা কুকুর – আমার ঘর, আমার দেশ, আমার আঁকড়ে পড়ে থাকার বসত-ভিটে। রেলিং- এ মাথা এলিয়ে বসে থাকি আমি। ঘুম আসে।