ধূসর

চিত্রালী ভট্টাচার্য

গ্রে- ম্যটার কাকে বলে জানিস?- ধৈর্য হারিয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিল মানস।
উত্তরে তীর্থ মুচকি হেসে একবার শুধু মুখ ঘুরিয়ে তাকিয়েছিল ওর দিকে,আর তাতেই দ্বিগুণ ক্ষেপে গিয়ে মানস উত্তেজিত গলায় বলেছিল –তোর ওই গ্রে-ম্যটারে পচন ধরে গেছে- পচন—বুঝেছিস ? তুই এখন শুধুমাত্র রুমি নয়, আমাদের সবার পক্ষেই বিপজ্জনক। তোকে জাষ্ট ছেঁটে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ, বলে- ডানহাতের দুটো আঙুল তুলে কাঁচি দেখিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল।
-আরে ,উঠলি কেন? বোস, বোস। অত উত্তেজিত হলে চলে! একটা ডিস্‌কারসন হচ্ছিল মাত্র, আর তুই তাতেই------ বলে তীর্থ আবার আগের মতই হেসে উঠতেই মানস হাত জোড় করে বলেছিল—খুব হয়েছে ,নো মোর ডিস্‌কারসন। ইন ফ্যাক্ট তোকে এডভাইস দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। তুই তোর স্বরচিত জঙ্গলে পশুত্ব কর, আমি চললাম।
--আরে তুই চলে গেলে আমি যে একেবারে একা হয়ে যাব!
--তোর সেটাই দরকার,বলে- মানস আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে চলে গিয়েছিল।
ঘটনাটা ঘটেছিল আজ থেকে ঠিক সাতদিন আগে।
আজ অষ্টম দিন। সন্ধ্যেবেলা। এই মুহূর্তে তীর্থ প্রিন্সেপ ঘাটের আনকোরা বেঞ্চে বসে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে ভাবছে মানস সেদিন বাগবাজারে গঙ্গার ঘাটে বসে যেভাবে উত্তেজিত হয়ে তীর্থকে আণ্ডারলাইন করেছিল আজ প্রিন্সেপ ঘাটের গঙ্গা কি তাকে যথার্থ বলে মেনে নেবে,নাকি------ ? মানস সেদিন বলেছিল গ্রে-ম্যটারের পচনের কথা । তীর্থ মনে মনে বলেছিল-বোগাস। কিন্তু আজ, মানে সাতদিন কেটে যাওয়ার পর বিশ্লেষনে নেমে সে বুঝতে চাইছে –সত্যিই কি তার গ্রে- ম্যটারে-----! কিন্তু তা কি করে সম্ভব! ও যাই বলুক সে নিজে নিজেকে যতটা চেনে তাতে করে তার মধ্যে তেমন কোন বিকৃতি আছে বলে সে মনেই করে না। অবশ্য কোন্‌ পাগলই বা নিজেকে পাগল বলে চিহ্নিত করতে পেরেছে এযাবৎ ? তীর্থর কাছেও নিজের কাজের সপক্ষে বিস্তর যুক্তি আছে । কেউ তাকে আণ্ডার ব্রেকেট করে দিলে ডিফেন্স করার জন্য সে সেসব গুছিয়ে রেখেছে মাথার মধ্যে। থাক সেসব । আজ সে শুধু মানসের কথাগুলো নিয়েই ভাবতে চায়। যদি মানসের কথাগুলো সত্যি বলে ধরে নিলে এই দাঁড়ায় –রুমির সঙ্গে এতদিনের একটা সম্পর্ক ভেঙ্গে দেওয়ার মানে- হয় সে শয়তান নয়ত পচে যাওয়া গ্রে-ম্যটারের কারবারি। হুঃ, কি বীভৎস সরলীকরণ! এভাবে তীর্থকে কি চেনা সম্ভব! মানসের জন্য এই প্রথম তার করুণা জাগল। ও রুমির সর্মথনে দাঁড়িয়েছ।এর পেছনে ওর কি সাইকোলজি প্লে করছে কেজানে!ইন ফ্যক্ট জানতে চায়ও না তীর্থ।ও শুধু নিজেকে বুঝতে চায়। হ্যাঁ ,ও রুমির সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়েছে কিন্তু এছাড়া আর কোনো অপশনও ছিল না ওর সামনে। এই তিন বছরে ওদের দুজনের সম্পর্কটা এমন এক দখলদারি কারবারে পরিণত হয়েছিল যে সেটা কন্টিন্যু করা তীর্থর পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। রুমিও হয়ত আর পারছিল না, তবু---। আসলে আমরা সকলেই এমন একটা হিপক্রেটিক পরিবেশের শিকার যে মন্দটাকে গুছিয়ে মন্দ বলতেও শিখিনি।দুজনের সম্পর্কের মাঝে বিস্তর ক্যাক্‌টাস জন্মালেও সমাজকে একটা মিথ্যে ফটোগ্রাফ দেখানো আমাদের মজ্জায় ঢুকে গেছে।
তীর্থ আরো গভীরে নামল। না, জলের নয়, নিজের। আত্মমগ্ন হয়ে তাকিয়ে থাকল গঙ্গার দিকে।সূর্য ডুবেগেছে কিছুক্ষণ আগে। একটা স্নিগ্ধ ছায়া ক্রমশ গ্রাস করছে এলাকাটাকে। দূরে আলোর মালা। মৃদু অন্ধকারে চারপাশটা আরো লাস্যময়ী । এই প্রেক্ষাপটে তীর্থ নিজেকে নিজের সামনে দাঁড় করালো। প্রশ্ন রাখল নিজস্ব আমির কাছে—কেমন তুমি? তুমি কি সত্যিই অতটা আত্মকেন্দ্রিক আর স্বার্থপর?
--জানিনা। তবে আমি সেই সমগ্রর মধ্যে এমন একজন যার মনের গভীরে এক বিশেষ ধরনের ভাবনাভূমি আছে। সে গোপন ভাবনাভূমি কঠোরভাবে সংরক্ষিত। কারুর ঢোকার এক্তিয়ার নেই সেখানে।
--কেমন সে ভূমি?
--সে এক আদ্ভূত চারণক্ষেত্র। মাইলের পর মাইল ধূসর। কোথাও কোনো আশ্রয় নেই। যেদিকে দুচোখ যায় শুধু মরুভূমির বালির মত বিস্তীর্ণ এক ধূসরতা। নিজের অভিঘাতে নিজেরই জেগে ওঠা সেখানে। আমার নিঃসঙ্গ সত্বা সে ভূমির অধীশ্বর। সে ধূসর ভূমি থেকে সে দার্শনিকের মত চেয়ে দেখে জাগ্রত বাস্তবকে। দেখে অসম্ভব রঙিন এক মুখোশের বাজার, বেচা-কেনা- লাভ লোকসান ,দেখে আনন্ত স্বপ্নের সমাধিস্থল। দেখতে দেখতে নেশা ধরে যায়।
কিন্তু ইদানিং সে ভূমিতে বার বার ঢুকে পড়তে চাইত রুমি। এলোমেলো করে দিতে চাইত সবকিছু। ঝড়ের মতন এসে সবকিছু দখল করে দুমড়ে- মুচড়ে অন্য আদলে সাজিয়ে তুলতে চাইত আমার গোপন সত্বাকে। চাইত অঝোরে বৃষ্টি নামুক সে বন্ধ্যা ভূমিতে। ধুয়ে যাক সব ধুসরতা। তীর্থ নামের এক শামুকের নবজন্ম হোক।
কিন্তু তীর্থ তো তা চায়নি কোনোদিন। চিরহরিৎ্‌ বনভূমি তার জন্য নয়। ধূসরতাই তার তীর্থ।তাই যুদ্ধ ,তাই রুমির দিকে তাক করতে হলো মেধা দিয়ে তৈরি বর্শাফলক এবং শেষপর্যন্ত ধংস হল সম্পর্ক নামের এক নড়বড়ে সেতু।
আসলে ভিন্নধর্মী দুটো মানুষ যখন একসাথে থাকতে শুরু করে তখন নিজের আজান্তেই তারা একে অপরের ভাবনাভূমিকে এইভাবেই হয়ত প্রভাবিত করতে শুরু করে। তারা ভাবে এটা তাদের অধিকার কিন্তু অত্যাচারও কি নয়? কি বলবে তুমি?
ও পক্ষ কোনো উত্তর দিতে পারলনা।
ভাবনা শেষ করে উঠে দাঁড়াল তীর্থ। বিজয়ীর দৃষ্টিতে তাকাল রাতের দিকে। দেখল দূরে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দ্বিতীয় হূগলী সেতু। বেঁধে রাখতে চাইছে দু-প্রান্তকে যদিও দুদিকের শহরই তলিয়ে যাচ্ছে তাদের প্রিয় ধূসরতায় ।