ড্রিবলিং

অলোকপর্ণা



বাসে উঠে সবচেয়ে অন্ধকার সীটের দিকে এগিয়ে গেল মানুষটা, এমনভাবে,- যেন সে আগে থেকেই তার অবস্থান জানতো, আর শব্দ করে বসে পড়ল সীটে। আমার কাঁধে মাথা রেখে ঢুলতে থাকা গরিমা সেই আওয়াজে একটু নড়ে উঠল। মাথায় হাত রেখে আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম।
সব মিলিয়ে মাত্র ছ সাত জন যাত্রী নিয়ে শহরের রাস্তা ছাড়ছে বাসটা। অন্ধকার রাস্তায় সাদা সাদা দাগগুলো পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাকে। আমাদের সীট থেকে কোণাকুণি সামনের দিকে তাকালে এক জোড়া প্রেমিক প্রেমিকাকে দেখা যাবে। আধো অন্ধকারে অনেক কিছুই করার সুযোগ আছে তাদের। আমি আড়চোখে গরিমার দিকে তাকাই। ওর মাথার স্ট্রেট রেশম চুলগুলোয় চোখ আটকায় আমার। সামনে রাখা ব্যাগ থেকে বোতলটা বের করে আরো খানিক খেয়ে নিই আমি। টের পেয়ে গরিমা বোতল ছিনিয়ে নেয় আর বাকীটুকু নিজের গলায় ঢেলে দেয়।
“যাহ্‌, শেষ করে দিলে!”
“উমমম...”, বোতল ফেরত দিয়ে আবার আমার কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে সে। ফাঁকা বোতলের দিকে তাকিয়ে থাকি আমি। অন্ধকারে আবছা হয়ে আছে বোতলের ভিতর। হাল্কা আলো এসে তার ভিতরটা ধোঁয়া ধোঁয়া করে দিচ্ছে, যেন ঘষলেই জিনি বেরিয়ে আসবে। আচ্ছা, সত্যি যদি জিনি আসে তাহলে আমি কী চাইবো?... গরিমাকে? নাহ্‌, ও আমায় আকর্ষণ করেনা, কিন্তু হিয়া করে। তাহলে হিয়াকে চাইবো? কাউকে এভাবে চাওয়া যায়? যদিবা চাই, যদি পাইও, পুরোটা পাবো? কখনো কাউকে পুরোটা,- পু—রো—টা— পাওয়া যায়?
ধুসসালা, নেশা চড়ছে আমার। গরিমার মাথায় মাথা হেলিয়ে দিয়ে চোখ বুজি আমি। আর শুনতে পাই বাসের আওয়াজের মধ্যে বন্দী একটা গান বেজে চলেছে,- একটা ঘুমপাড়ানি গান।

মদের গন্ধে ভরে গেছে বাসটা, পিছনের ওই অন্ধকার সীটে এসে বসা মানুষটাই হবে। প্রিয়দর্শী আঁখির দিকে তাকাল। এই গন্ধেও ঘুমিয়ে আছে মেয়ে, আর ওর মুখে বাইরে থেকে এসে পড়ছে চাঁদের আলো, প্রিয়দর্শী বুঝে উঠতে পারল না, কী দেখবে,- আঁখির মুখ, না, আঁখির মুখে পড়া চাঁদের আলোকে। উফ্‌, প্রচন্ড কষ্ট হতে থাকে প্রিয়দর্শীর। মুখ ফিরিয়ে নিয়ে পিছনে তাকাতে সে দেখে দুটো মেয়ে নিজেদের গায়ে এলিয়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে। নিষ্পাপ লাগছে মেয়েদুটোকে খুব। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সে। বাসটা এমন অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে যে মনে হচ্ছে এর কোনো গন্তব্য নেই, যেন অনির্দিষ্ট সময় ধরে সে বাসেই আছে, বাসেই থাকবে। ইস, যদি এটাই হত! যদি এইভাবে মুখে চাঁদের আলো মেলে ঘুমিয়ে থাকা আঁখিকে দেখে যাওয়া যেত চিরকাল! আবার কষ্টটা ফিরে আসে প্রিয়দর্শীর বুকে। সে চোখ বুজে ফেলে। এসব সময় নিজেকে উটপাখির মত লাগে তার। যেন চোখ বুজে মাটিতে মাথা লুকোলেই সব কিছু উপেক্ষা করা যাবে। চোখ বুজলেই যেন আঁখির অন্য শহরে চলে যাওয়া মিথ্যে বানিয়ে দেওয়া যাবে। প্রিয়দর্শী নিজেকে উটপাখি ভাবতে থাকে। প্রচন্ড হাওয়ায় তার গায়ের পালকগুলো উড়ে গিয়ে শেষ সীটে বসা অন্ধকার মানুষটার পায়ের কাছে পড়ে। মানুষটা একটু ঝুঁকে পড়ে একটা কালো পালক নিজের নাকের সামনে তুলে ধরে গভীর শ্বাস নেয়। নাক দিয়ে একটা গান ঢুকে আসে তার মাথায়, একা একঘেয়ে সুরের গান, যেটা একবার কানে পৌঁছালে সহজে বের হতে চায় না মাথা থেকে। মানুষটা অল্প হাসে। কিন্তু অন্ধকার তার হাসি খেয়ে নেয়। কিশোর দেখতে পায় না।

এসব রাস্তায় নাকি নিশ্চুপ যেতে নেই কখনো, কথা বলতে বলতে, ভাবতে ভাবতে, নিদেনপক্ষে গান গাইতে গাইতে যেতে হয়, বলেছিল বাদলদা। আগে বাদলদা যখন ছিল তখন কোনো সমস্যাই ছিল না কিশোরের। কিন্তু এখন সাধন, মাস দুয়েক হোল। সাধনের সাথে বলার মত কথা খুঁজে পায় না কিশোর, নিজের সাথে বলার মত কথাও সে পায়না। কাউকেই কিছু বলার মত নেই কিশোরের। সে শুধু শুনতে পারে। বাদলদা যখন কথা বলত সে বাসের স্টিয়ারিং হাতে রাস্তার সাদা সাদা দাগগুলোর দিকে তাকিয়ে একমনে শুনে যেত। ড্রয়ারটা টেনে কিশোর অন্ধকার হাতড়াতে থাকে। একটা সিডি বের করে প্লেয়ারে ভরে দেয়, বাসের টিভি জ্বলে ওঠে, হাল্কা সুরে গান শুরু হয়।

আঁখি চোখ খোলে, প্রিয়দর্শী দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয় তার চাঁদ ধোয়া মুখ থেকে।
“গান কে বাজাচ্ছে?” ঘুম ঘুম গলায় বলে আঁখি।
“ড্রাইভার মনে হয়”
“ওহ... ভালো গান নেই কোনো?”
“কে জানে... বন্ধ করতে বলব?”
“কেন?”
“তুমি ঘুমোচ্ছিলে...”
“না, থাক”
আঁখি জানলায় চোখ রাখে। বাইরেটা এখন চাঁদে ছেয়ে আছে। পৃথিবীটা এত সুন্দর কেন?! আর আজই কেন এতটা সুন্দর! আঁখি জানে এখন আর প্রিয়দর্শী তার দিকে তাকাবেনা। সে চোখ না বুজলে প্রিয়দর্শী তার মুখের দিকে ওরকম চোখে তাকায় না। প্রিয়দর্শী ভয় পায়, ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়। ভয় পেলে যদি এভাবে আঁখির থেকে দূরে পালিয়ে যেতে না পারে! চাপা কষ্ট হয় আঁখির। কিন্তু তার মুখ একটা শান্ত হাসিতে ভরে যায়। এই ব্যথা ব্যথা শান্তিটাই হয়ত সব।

“ভাল গান দিতে বলব?”
“হুম্‌ম...”, জানলায় চোখ রেখে সাড়া দেয় আঁখি।
প্রিয়দর্শী সীট ছেড়ে উঠে যায় সামনের দিকে।

সাদা দাগগুলো চোখ আটকে ফেলেছে কিশোরের। কপালের ঠিক মাঝখান দিয়ে দাগগুলো ঢুকে আসছে ওর মাথায়। কোনো কিছু ভাবার হাত থেকে বেঁচে যাচ্ছে সে। শুধু বাস দাগ বরাবর রেখে এগিয়ে যাওয়া, এভাবেই পৃথিবীর সমস্ত কিছু থেকে দূরে থাকতে পারা যায়। কিশোর দাঁতে দাঁত চেপে বাসটাকে দাগ বরাবর ধরে রাখে সবসময়। পৃথিবীর সমস্ত ড্রাইভারকে এই দাগগুলো নিয়ে নিয়ে যায় রাতের বেলা, কোথায় নিয়ে যায় ভাবার প্রয়োজন হয়না। হয়তো ড্রাইভারদের না ভাবানোর জন্যই রাস্তার মাঝ দিয়ে দাগ কেটে রাখা হয়। দাগগুলো একেকটা রাবারের মতো তাদের মাথায় ঢুকে এসে সব ভাবনা মুছে দিতে থাকে। একটা করে দাগ পার হয়ে আসে বাস, একটা একটা করে চিন্তা মুছে যায় কিশোরদের ভিতর থেকে। ঠিক এইভাবে যখন ঘরে পৌঁছোবে কিশোর, একদম খালি মাথায় ঢুকে পড়বে চৌকাঠ পার করে, যেমন ভাবে নির্ভাবনায় একদিন বেরিয়ে এসেছিল ঘর থেকে।
কিশোর দাগহীণ অচেনা পথে যেতে চায়না, কিশোর অচেনাকে ভয় পায়, জানতে ভয় পায়। যা জানার কথা নয় তাকে জেনে ফেললে যদি আর মোছা না যায়! কিশোর ভাবতে ভয় পায়, সে নিজের চোখকে রাস্তার দাগে আটকানোর জন্যে তৈরী করে নিয়েছে।

কোত্থাও নেই ফোন দুটো, কোনো পকেটে, কোনো খাঁজে, কোনো চেইনে নেই! অসহনীয় লাগে শাহীনের। কোথায় ফেলে এল তাহলে! অটোতে? নাহ্‌, তখন তো বেরই করেনি পকেট থেকে, তারও আগে? রেস্ট্রন্টে? না, তখনও দরকার হয়নি ফোনের। তাহলে?... হঠাৎ হোটেলের বেসিনের পাশে শুয়ে থাকা ফোনদুটোর শেষস্মৃতি জ্বলজ্বল করে ওঠে। ***!!... অফিসের সব কন্ট্যাক্ট, ডেটা থেকে শুরু করে ছবি পর্যন্ত সমস্ত কিছু সেভড্‌ ছিল। নিমেষে কান্না পেয়ে যায় শাহীনের। হোটেলের নাম্বারটা পর্যন্ত ফোনেই ছিল। কাল সকালের আগে হোটেলের নাম্বার জোগাড় করা যাবেনা। যদিও ফোন ফেরত পাওয়ার বিশেষ আশা শাহীনের নেই।
নতুন করে সব কন্ট্যাক্ট জোগাড় করতে তিন থেকে চার মাস লেগে যাবে তার। বাবা মায়ের মোবাইল নাম্বার মনে রাখেনি সে, বাড়ীর ল্যান্ড লাইনের নাম্বারটা ভাগ্যিস মনে আছে, কিন্তু ছবিগুলো, কুণালের সাথে তোলা শেষ ছবিগুলোর ব্যাকআপ নেওয়া হয়নি। নিজের চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে হয় শাহীনের। কুণালের নাম্বার?! ৮৮৩০... আশ্বস্ত হয় শাহীন, ভাগ্যিস সব কিছু এত অল্পে ভোলা যায়না।
অথচ কুণালকে ভোলাবার কত চেষ্টাই না করেছে বৈভব। মুহূর্তের পর মুহূর্ত তৈরী করে কুণালকে মুছে দিয়েছে, আবছা করে দিয়েছে। নুহূর্ত তৈরী করার কাজে বৈভব খুবই দক্ষ, অতি সাধারণ মোমেন্টগুলো বৈভবের ছোঁয়ায় শ্বাশত হয়ে যায়, কিন্তু তবু কুণাল মোছে না। পারমানেন্ট ইঙ্কে করা সইয়ের মতো চকচক করে।

আচ্ছা!,
বৈভবের নাম্বার?-!

অন্ধকার সীটে বসে লোকটা নিজের মনেই বিড়বিড় করে,- ৮৭৩৫...

বাংলা সিনেমার গান চলতে শুরু করেছে বাসে। খুব আস্তে হলেও তা শুনে গরিমা উঠে বসল।
“কে গাইছে গান?”
“কেউ না, বাসে বাজছে”
“আমরা বাসে, রিনি!?”
“হ্যা গরিমা, আমরা চার ঘন্টা হল বাসে উঠেছি”
“তুমি বলোনি কেন আমায়, যে আমরা বাসে উঠেছি?!”
“তুমি নিজেই টিকিট কেটেছিলে গরিমা”
“আমি কেটেছিলাম? ও আচ্ছা। হুমম, তাই হবে হয়তো”
“শুয়ে পড়ো”
“তুমি এতো ভালো কেন রিনি?”
“আমি?, আমি ভালো নই গরিমা”
“কে বলল, তুমি খুব খুব খুব খুব খুব খুব ভালো”
“শুয়ে পড়ো তুমি”
“না, আমি শোবো না, আগে বলো তুমি এত ভালো কেন?!”
“আমি জানিনা রিমা,”
“রিমা! কি সুন্দর ডাকলে তুমি আমায়, অঙ্কিত কখনো এমন ডাকেনি আমায় জানো!”
“ডাকবে, তুমি শুয়ে পড়লেই ডাকবে”
“আমি শুয়ে পড়লেই ডাকবে?”
“হ্যা”
“আচ্ছা”, গরিমা জানলার কাচে মাথা এলিয়ে শোয়, আবার উঠে বসে।
“আমি তোমার কাঁধে মাথা রেখে শুয়েছিলাম, তুমি কিছু মনে করোনি তো?”
“না, কিচ্ছু মনে করিনি, তুমি শোও এবার”
গরিমা স্থির চোখে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে, তারপর বলে, “আমি তোমায় একটা চুমু খাবো রিনি?”
আজ নেশাটা খুবই চড়েছে গরিমার। একটা লেবু যদি কোথাও পাওয়া যেত! “চুমু খাবে, আগে ড্রাইভারের সাথে কথা বলে আসি, তারপর”
“কী কথা বলবে?”
“বলব একটা ভালো গান চালাতে”
“আচ্ছা যাও”

দাগে চোখ ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে কিশোর... বাঁ পাশে ছুটন্ত বাইককে নিখুঁত কাটিয়ে্... অল্প ডান দিক ঘেঁষে, ডিভাইডারের খুব কাছ দিয়ে বাসটাকে আগে বের করে আনছে কিশোর... বাঁ দিকে ছুটে চলা স্করপিও কিশোরের বাসের সাথে পাল্লা দিয়ে এগোতে চায়, কিন্তু তাকে ফাঁকি দিয়ে দুরন্ত বেগে এগিয়ে যায় কিশোর আর কিশোরের বাস... দাগে চোখ রেখে। কিন্তু সামনেই অল ইন্ডিয়া পারমিটের বালি ভর্তি লরি... তাকে হর্ণ মারে সে... কিন্তু না... জায়গা পায় না, অগত্যা রাস্তা ছেড়ে নেমে গিয়ে তাকে কাটায় কিশোর... তারপর উঠে আসে সামনে।
আবার দাগে ফিরে আসে।
নিজের গতিতে এগিয়ে যেতে থাকে। হঠাৎ রাস্তার মাঝখানে ফুরিয়ে যায় দাগগুলো। কিশোর চমকে ওঠে। অন্ধকার সীটে বসা লোকটা খিক খিক করে হাসে।
খুব ভালো করে সে রাস্তাটা পরখ করে, নেই কোনো দাগ। দাগ না থাকলে কিশোর এগোবে কি করে! অসহায় বোধ করে কিশোর। তার কান্না পায়, অ্যাক্সেলেটরে পা রেখে এগিয়ে চলতে চলতে কিশোরের কান্না পায়। কিশোর কাঁদতে থাকে।

“দাদা, একটা ভালো হিন্দি গান চালাবেন?”
প্রিয়দর্শীর দিকে তাকায় না কিশোর। ড্রয়ার থেকে একটা অন্য সিডি বার করে চালিয়ে দেয়। প্রিয়দর্শী সীটে ফিরে আসে। কিশোরের কান্না বেড়ে যায়। সে আশা করেছিল, লোকটা জানতে চাইবে কেন সে কাঁদছে, কিশোররা কেন কাঁদে কেউ জানতে চায়না কোনোদিন। কিশোরের প্রচন্ড রাগ হয় দাগগুলোর ওপর, সে হঠাৎই বাসের গতি বাড়িয়ে দেয়।

বাসের মধ্যে বেজে ওঠে, ‘তেরা মুঝসে হ্যায় পেহলে কা নাতা কোই’...

“এই গানটা ভালো লাগছে?” সীটে বসতে বসতে বলে প্রিয়দর্শী।

আঁখি মাথা নাড়ে চোখ বুজে।
আঁখির বন্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে প্রিয়দর্শী। হঠাৎই বাসের বেগ প্রচন্ড বেড়ে যায়।
আঁখি বলে, “কি হোল!”
“কে জানে”
“বেঁচে ফিরবো তো?”
প্রিয়দর্শী হাসে, “জানো, ড্রাইভারটা কাঁদছিল।”
“কেন?”
“জানিনা...”

“আঁখি,”
“কী?”
“ধরো, যদি আজ আমাদের শেষদিন হয়, তাহলে তুমি কি করতে চাইবে?”
“আমাদের শেষদিন?”
“এই বাসের সমস্ত যাত্রীর শেষদিন”
আঁখি বলে, “কি আর করব, বাড়িতে ফোন করব, শেষবারের মতো কথা বলব মায়ের সঙ্গে।”
“আর?”
“আর? আর কি... আর, আমার যা যা কিছু বলার আছে সব বলে দেবো”
প্রিয়দর্শী কিছু বলে না।
পিছনে বসা মেয়েদুটোর একজন উঠে আসে ড্রাইভারের কাছে। তার গা থেকে গাঢ় মদের গন্ধ পায় প্রিয়দর্শী।
“তুমি কি করবে?” আঁখি জানতে চায়।
“আমি... আমার তো ফোন করার মতো কেউ নেই। আমি গান গাইব বরং”
“কি গান?” আঁখি হেসে জানতে চায়।
“হয়তো এই গানটাই”
দুজনে চুপ হয়ে যায়, বাসে গান বাজতে থাকে।




পর্দা সরাতে দেখলাম কী অন্ধকার রাস্তাটা। ড্রাইভার এরই মধ্যে যে কিভাবে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কে জানে। ড্রাইভারের দিকে তাকালাম আমি। মাঝবয়সী পাতলা চেহারার মানুষ। “দাদা, এর পর কোথায় থামবে বাস?” লোকটা আমার দিকে ফিরেও তাকালোনা। কেন জানি না মনে হল,- সে কাঁদছে। কোনো জবাব পেলাম না আমার প্রশ্নের। কিন্তু আবার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করল না লোকটাকে দেখে। মায়া হল, কে জানে কেন। অথচ লোকটার নাম পর্যন্ত জানিনা আমি। মাঝে মধ্যে নিজেকে বুঝতে পারিনা। সীটে ফিরে আসি, দেখি গরিমা জানলার কাচে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে।
নিশ্চিন্ত হই।




জানে তু ইয়া জানে না...
ঠিক এই গানটাই শাহীনের কলার টিউন ছিল। অসহ্য, এই অবস্থায় এই গানটাই চালাতে হল! শাহীন উঠে আসে সীট থেকে, পর্দা সরিয়ে বলে, “দাদা, প্লিজ গান বদলান!”
কিশোর একহাতে প্লেয়ারে গান বদলে দেয়। সীটে ফিরে আসতে আসতে শাহীন বোঝে ড্রাইভারটা খুব কাঁদছে। ড্রাইভারের মুখ মনে পড়ে শাহীনেরও কান্না পেয়ে যায়। কাঁদতে কাঁদতে একসময় সে ঘুমিয়ে পড়ে।
হোটেলের বেসিনে ফোন দুটো শুয়ে থাকে পাশাপাশি, একটাতে ঘন্টা দুই আগে কুণালের একটা ছোট্ট মিসড্‌কল দেখা যায়, অন্যটায় ভেসে আসে বৈভবের নাম।

বাসের মধ্যে বসা অন্ধকার লোকটা ফিসফিস করে বলে ওঠে, “হ্যালো!”




ভোরের দিকে একটা পেট্রল পাম্পে বাস থামায় কিশোর। বাসের ভেতর সবাই ঘুমোচ্ছে তখন। সাধন নেমে যায় দরজা খুলে। কিছুক্ষন পরে অন্ধকার থেকে উঠে এসে লোকটাও নেমে যায় বাস থেকে। তাকে সাধনের কাছে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। পকেট থেকে সে একটা কিছু বার করে সাধনের হাতে দিয়ে চলে যায়।

তেল ভরা হলে সাধন উঠে আসে বাসে। বাস স্টার্ট করে কিশোর।
“কিশোরদা, ওই লোকটা তোমায় এটা দিতে বলল”
কিশোর দেখে সাধনের হাতে একটা কালো জায়নামাজ। তাতে সুতো দিয়ে অসংখ্য সাদা দাগ কাটা।

বাস ছেড়ে নেমে এসেছে ঘুমপাড়ানি লোকটা। রাস্তায় অসংখ্য বোরখা পরা মেয়েদের মাঝ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে সে।
রাস্তার মাঝে তৈরী হচ্ছে সাদা সাদা দাগ।

সেইসব দাগ দেখে মেয়েরা একে অপরকে কানে কানে বলছে,
“আস্‌তাঘফিরউল্লা রাব্বি মিন কুল্লি জম্বিওন ওয়া অতুবু ইলাইয়াহ...”