হাড়িপুকুর

উমাপদ কর


বাড়ির ভেতরে এক রকমের ভয় সব সময় না হলেও মাঝেমধ্যেই তার উপস্থিতি জানান দেয়। বাইরে বেরোলে আর একটু অন্য ধরণের ভয় মাঝেমধ্যের বদলে প্রায়ই উপস্থিতির পরের স্টেজটায় নিয়ে যায়। এ নিয়ে সমস্যায় থাকি। আরও কেউ কেউ হয়তবা। সমাধানে একটা নীল মশারি টাঙাতে আমি খুব ইচ্ছা পোষণ করি। প্রশ্ন উঠতেই পারে, মশারি কেন? মশারি কি ভয় নিবারক? তা আমি জানি না। জানতে চাইওনা। শুধু এটুকু আন্দাজ করি এইসব ভয়েদের সঙ্গে নীল মশারির কোথাও না কোথাও একটা নিশ্চিত যোগাযোগ আছে। আন্দাজের পেছনে কতগুলো ফ্যাক্ট আছে। কয়েকজন কাছের বন্ধুকে সেগুলো অকপটে বলে দেখেছি, তারা সকলেই একে ‘গল্প’ বলেছে। এতে আমার সমস্যা আরও বেড়ে যায়। তাই সেগুলো এখানে আর বলছি না। বললে সেই একই কাহিনী হবে, আমি নিশ্চিত। মুশকিল হল আমার এই ভয় নীল-মশারি তত্ত্বটা আমি কাউকে বোঝাতে পারিনা। উদাহরন না দিলে কেউ বিশ্বাস করবেনই বা কেন? আর উদাহরণ দিতে গেলেই আষাঢ়ে গল্প চিহ্নিত করে মৃদু ধমকানি সহ তাচ্ছিল্যের হাসি। এই সমস্যাটা আমি মেটাতে পারিনা। কারও কাছ থেকে কোনও হেল্পও পাইনা। অন্যরা যে কী করেন জানতে পারলে বর্তে যাই আরকি। কিন্তু তা আর হয় না। ফলে ভয় আর নীল মশারির মধ্যে কাঁটা হয়ে থাকি।
মেট্রোতে যাতায়াতে আবার আরেক সমস্যা। না, এটাকে ঠিক সমস্যা বলা যায় না। কী বলি, কী বলি! বলি বিভ্রম। কী রকম? মেট্রো চলে উড়ালে আর পাতালে। এখন উড়ালে চললে বেশি শব্দ না পাতালে চললে এ নিয়ে আমার ধন্দ ছিল কিছুদিন আগেও। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই কান খুবই সজাগ রেখে পর্যবেক্ষণে আমার কাছে ধরা পড়ে পাতালেই শব্দের জোর অনেকটা বেশি। বিজ্ঞান পড়ার সুবাদে এখন বলতে হয়, শব্দের মাত্রা যেহেতু পাতালে বেশি তাহলে পাতালে মেট্রোর গতি উড়ালের চেয়ে বেশি। আসলে বলা ভালো গতি বাড়ে বলেই শব্দটাও বাড়ে। গতি কারণ, শব্দ এফেক্ট বা ফল। ঠারেঠোরে বোঝার বহু চেষ্টা করেছি সত্যিই গতি বেশি কিনা? কিন্তু তা ঠাহর করতে পারিনি আজও। কয়েকজনকে এ নিয়ে ধন্দের কথাটা বলেছি। তারা হাসলেও সদুত্তর দেননি। একটা ভালো উপায় ছিল জানার, একদিন ড্রাইভারকে গিয়ে গতির কথাটা জিজ্ঞাসা করা। না, তা আর হয়ে ওঠেনি। মেট্রোতে চড়লেই তাই এই গোলকধাঁধাটা নিয়েই যাতায়াত করে চলেছি। বুঝতেও পারিনা এটাই আমি পছন্দ করছি কিনা!
এই সময় থেকে কাট করে একটা বিশাল ফারাকের ফ্ল্যাশব্যাকে চলে যাই। তখন টু-থ্রি তে পড়ি। প্ল্যান হল, পরিবারের সকলে মিলে বহরমপুর থেকে রাজারামপুরে যাব মাসির বাড়ি দুর্গাপূজায় আমোদ আহ্লাদ করতে। যাব ভাগিরথী নদী পথে নৌকোয়, ৩০ মাইল মত। সেইমত ষষ্টির সকালে খাগড়ার ঘাট থেকে মাসি মেসো মাসতুতো দিদি সহ আমার মা ও দাদা দিদিরা মিলে রওনা হই। আর ছিলেন দিদির মাষ্টারমশাই কে বি বাবু, যাঁর বাঁ হাতটা সম্পূর্ণ অকেজো। রওনা হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সৈদাবাদ ঘাটের কাছে আসা মাত্র কি যেন কী কারণে আমাদের নৌকোটা পাল্টি খেয়ে যায়। প্রায় সবাই জলে গিয়ে পড়ি। বর্ষার পরপর ভরা নদী। তীব্র কারেন্ট। শুধু বুঝতে পারি আমার হাতটা ধরে আছে মা। আর কিচ্ছু মনে নেই। কিছুক্ষণের মধ্যে দেখলাম আমি, আমার ঠিক ওপরের দাদা, মা, কেবি বাবু, মেসো একটা বড় ফেরি নৌকোয়। মা কাঁদছেন। আমার দুই দিদিকে আর পৃথুলা মাসিকে জল থেকে টেনে তুলছেন কিছু যুবক আর মাঝিরা মিলে। জানা গেল মাসতুতো দিদি আর বড়দা সাঁতরে পাড়ে উঠে গেছে। এই আকস্মিকতায় আমি আর দাদা একদম চুপ। ভয়ে সিঁটকানো। যাইহোক প্রাণে বেঁচে গেলাম সবাই। যাত্রা বাতিল হলো। ফিরে এলাম বাড়িতে। পরে শুনলাম, দু দুটো ফেরি নৌকা সে সময় পারাপারে নৌকাডুবির খুবই কাছে ছিল। আর ঘাটে স্নান করা যুবকেরা,যারা আবার কেবি বাবুর ছাত্র, দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। সবাই মিলে আমাদের উদ্ধার করে। মা এসব কথা বিস্তারিত বলত আত্মীয় স্বজন পাড়াপড়শিদের। মার আর যে কথাটা আমার মনে গেঁথে গেল সেখানেই আমাদের দুই ভাইয়ের বেঁচে থাকার চাবিকাঠি। মা জনে জনে বলত—“ সব তাঁর শক্তি। তিনিই আমাকে জুগিয়েছেন। দুই হাতে দুই ছেলের ড্যানা ধরে শূন্যে সাঁতার কেটেছি। একবার ছোটটাকে জলের ওপরে তুলি একবার বড়টাকে”। তখন আমার ভাবার বয়স ছিল না। পরে মার এই ‘শূন্যে সাঁতার কাটার’ বিষয়টা আমাকে খুব হন্ট করত। এখনও করে। ওই দুর্দান্ত কারেন্টে অথৈ জলে সাঁতার না জানা পিঠোপিঠি দুই ভাইয়ের আজো বেঁচে থাকার রহস্যটাতো মার ওই অসম যুদ্ধ, ওই ‘শূন্যে সাঁতার কাটা’। এখন ভাবি মা তো জলে সাঁতার কেটে নিজেকে খাড়া রেখে আমাদের বাঁচিয়েছেন। তাহলে মা ‘শূন্যে’ বলত কেন? তাহলে কি মা সেই অবস্থায় সেটাকে শূন্যই মনে করেছিল?
বছর সাত-আটেক আগে আমি চাকরিসূত্রে বালুরঘাট থাকতাম। তারও বেশ কিছুদিন আগে থেকেই আমার সঙ্গে বাংলাদেশের কবি সম্পাদক মাসাদুর হোসেনের পরিচয় ছিল। সূত্রটা লেখালিখিই। মাসাদুর ‘অপর’ নামে একটা পত্রিকা করত। তাতে আমার লেখার কারণেই আলাপ। ভালোবাসা। দাদা ভাই। তো মাসাদুর থাকে বাংলাদেশের পাঁচবিবি থেকে কিছুটা দূরে সোনাপাড়া। ভারত-বাংলাদেশের বর্ডার হিলি। বালুরঘাট থেকে হিলি ২০ কিমি। আর পাঁচবিবি থেকে ২৫ কিমি। সুতরাং এই বড় সুযোগ দুজনের দেখা করার। অচিরেই দেখা করার দিন সময় ঠিক করা হল। কবি সূরজ দাশ সব ব্যবস্থা করল সীমান্তে। সূরজ আর আমি হাজির হলাম হিলি সীমান্তে। মাসাদুরও অন্য কারও সহায়তায় হাজির ওপার সীমান্তে। সূরজ বি-এস-এফ এর পারমিশান নিল কথা বলার। মাসাদুর বি-ডি-আর এর। আমরা মিলিত হলাম পরস্পর। মাঝখানে বাঁশের দু দুটো আড়াআড়ি বন্ধন কোমর পর্যন্ত পরপর কয়েকটা বাঁশের খুঁটির ওপর। মাসাদুর কোমর যথেষ্ট নুইয়ে প্রথম আড়াআড়ি বাঁশটার নিচ দিয়ে প্রনাম করল। আমি ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম দ্বিতীয় বাঁশটাকে সামলে। মাসাদুরের স্ত্রী সুমাত্রার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় হল। ওর ছেলে প্রথম আমাকে প্রনাম করল। অবিচল বাঁশের খুটি আর টানা বাঁশ। বই পত্র-পত্রিকা আদান প্রদান হল। কথা চলল। কবিতার কথা হল। বেশ কিছুক্ষণ পর বি-এস-এফ, বি-ডি-আর এর তাগাদায় আমরা বাঁশের বেড়া থেকে পিছিয়ে এলাম। আমি ওপারে গেলাম না, মাসাদুরও এপারে আসতে পারল না। কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হল। ফিরতে ফিরতে একটু আবেগতাড়িত হয়ে বেড়াটার কথা ভাবছিলাম। ভাবছিলাম ঐটুকুন ছেলে প্রথমও আমাকে বাবার দেখাদেখি বাঁশের নিচে হাত গলিয়ে প্রনাম করল। ভাবছিলাম মাটিটার কথা, যেখানে দাঁড়িয়ে আমরা কথা চালাচ্ছিলাম। এ মাটি কি সেই মাটি যার কোনও ঠিকানা নেই? কোথায় দাঁড়িয়ে ছিল মাসাদুর? সে কি বাংলাদেশের মাটি? এরপরেও বেশ কয়েকবার আমরা মিলিত হয়েছি হিলি সীমান্তে। কিন্তু প্রথমবারের সেই ফিলিংস্‌ আজও আমাকে তাতায়? শুনেছি আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম তা ছিল ‘নোম্যানস্‌ল্যান্ড’। মাটি মানুষ সব থেকেও নোম্যানস্‌ল্যান্ড? তাই আবার হয় নাকি?

চার এ বেদ। কেন আমি চার-এ এসে থামলাম। নিত্য নিয়ত এর মধ্যেই তো আছি। আছে আমার পরিজন। পায়ের নিচে মাটি পাওয়া যায় না, কিন্তু সহজেই মেলে সাড়ে তিন হাত জমিন। আপাত বিচ্ছিন্ন প্যারাগ্রাফগুলো দুলতে থাকে।
ভয়। আমার ভয়। টাটকা, বাসি, তেতো, টোকো ভয়। আমার যাপনের উপাদান যে কখন হয়ে উঠেছে ঠিক বুঝতে পারি না। আমাদেরও নয় কি? হয়ত। এ থেকে বেরোতে চাই। পারিনা। একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকে দেখেছি, তাও পারিনা। অগত্যা কল্পনা। ভয় নিবারক একটা পরিমন্ডল। নীল মশারি। তামাম ভয় নিবারক। হয়ত অলৌকিক, কিন্তু জরুরী। টাঙানো মশারির নিচেও যে ঢুকতে পারিনা। এত আগ্রহ, তাও না। কেউ কি পারে? জানি ওখানে ঢুকলেই নিশ্চিন্তি। জরুরি এই চাহিদা আর ভয় এই দুইএর মাঝে আমি ভাসতে থাকি। ভাসতেই থাকি। পায়ের নিচে ম্যানস্‌ল্যান্ড পাই না। একটা অসহায়, কিন্তু অবশ্যম্ভাবী অবস্থা। ভাসতে ভাসতে দেখি আরও অনেকেই ভাসছে। তাদের চোখে মুখে তার অন্ধকার আর বিস্তৃতি।
ভ্রমে আছি বুঝতে পারলে বিষয়টা সহজ হয়ে যায়। ভ্রমনাশের তরিকা খোঁজা যায়, প্রয়োগ করা যায়। পা পিছলে পড়লেও একটা হিরোভাব যায় না। সঠিক আছি বুঝতে পারলে আনন্দ হয়। সেখানে আরও কন্টিনিউ করতে ইচ্ছে করে। আবিস্কারের নেশাও ধরে। আর দুই এর বিভ্রমে পড়লে না ঘরকা না ঘাটকা। সংশয় টগবগে। তখন মেট্রোর গতি সম্বন্ধীয় উপপাদ্যটি প্রতিপাদ্য হতে চায় না। বিজ্ঞানের জ্ঞান হারানোর মত অবস্থা। টলোমলো সেই মঞ্চে মাটি এই প্রত্যয়টি হারাতে থাকে। দাঁড়ালেই পড়ে যাব এই ভাবটা মনটাকে বেহালাবাদকের করুণ সুরটির সঙ্গে বেঁধে দেয়। ‘কোথাও দাঁড়াতে চাই’ কে ‘কোথায় দাঁড়াবি?’ এসে ধাক্কা মারতে মারতে জমি ছাড়া করে দেয়। এ আমার ব্যক্তিক নোম্যানস্‌ল্যান্ড।
নৌকোডুবির ঘটনাতে মা কেন জলে থেকেও ‘শূন্যে সাঁতার কাটার’ কথা বলত তখন না বুঝলেও আজ বুঝি সে ছিল মার কাছে শূন্যই। একদিকে তাঁর দুই ছেলেকে তলিয়ে যাওয়ার ভ্রকুটি থেকে রক্ষা করার অদম্য প্রয়াস অন্যদিকে অথৈ জল আর তীব্র কারেন্ট। এ-দুই এর মাঝে তাঁর লম্ব অবস্থানটির নিচে সত্যিই হা-খোলা পাতাল। মা অবশ্য তাঁর এই অসম শক্তিকে মা গঙ্গার শক্তি বলেই ঠাউরেছেন। কিন্তু এটা অনুধাবন করেছিলেন তাঁর পায়ের নিচে মাটিতো নেইই এমনকি জলও নেই। তাঁর এই ফিলিংসটা ছিল শূন্যতার ভারহীন অবস্থানের। প্রকৃত নোম্যানস্‌ল্যান্ডের।
সীমান্তে দাঁড়িয়ে বাঁশের ঘায়ে আবেগতাড়িত হয়ে পড়লেও জ্ঞানের নাড়ী টনটনে রাখা সাব্যস্ত করেছিলাম। মালবাহী ট্রাকগুলো এপার থেকে ওপারে যাচ্ছিল মাটি কামড়ে। একটু দূরেই পা টিপে টিপে কিছু মালপত্র সহ কিছু মেয়ে এদিক থেকে ওদিকে আবার ওদিক থেকেও এদিকে। একটা থমথমে পরিবেশ, এই পর্যন্তই। বাকিটা বাংলাদেশ ভাগে একটা ট্রেনের মাটি কাঁপিয়ে চলে যাওয়া। ফিরে এসেই ভেবেছিলাম আর যাই হোক এ নোম্যানস্‌ল্যান্ড নয়। আজও ভাবি আমি কোনও নোম্যানস্‌ল্যান্ড শরীরে বুঝি নি চোখে দেখিনি মনেও অনুভব করিনি। অনুভব করেছিলাম সেদিন যেদিন সূরজ আমায় হিলির অদূরেই হাড়িপুকুর গ্রামে নিয়ে গিয়েছিল। নোম্যানস্‌ল্যান্ডের মধ্যে এক গ্রাম যার কিছুটা ভারতের ভাগে কিছুটা বাংলাদেশের ভাগে। হায়, নিশ্চয়ই এই অধিবাসিরা সব সময় তটস্থ। প্রতি মুহূর্তের নজরদারি ও খবরদারি এদের ভয়ার্ত কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে রাখে। গ্রাম এক ঠিকানা আলাদা। সীমানা এত নিষ্ঠুর হতে পারে? এদের অস্তিত্বের মধ্যে গজাল প্রশ্ন সব ঠুকে ঠুকে মারা। ওরা হাসলে যেন আকাশ হাসে না, ওরা কাঁদলে যেন বাতাস ভারী হয় না। এমনই বাস্তব নোম্যানস্‌ল্যান্ড। না, আমি আর মাসুদার জমিন খুঁজে নিয়েই আলিঙ্গণ করেছিলাম। আমরা এক আধদিনের অতিথি। আমাদের কাছে এ নোম্যানস্‌ল্যান্ড নয়। কিন্তু হাড়িপুকুরের মানুষজন নোম্যানস্‌ল্যান্ডেই বেঁচে থাকে।