সীমানা

অপরাহ্ণ সুসমিতো

ঘুম ভাঙল এই ধরো মিনিট ১৫। আমি তো একটু দেরিতেই উঠি। লাফ মেরে উঠেই নিজেকে প্রশ্ন করলাম এগুলো আমি কী স্বপ্ন দেখলাম!

সত্যি বলছি ।

অনেক আন্ডাবাচ্চা,পিচ্চিদে ভিড়। সবাই এত পেছনে লাগছে আমার। সেইসব মানুষ যারা আমার কৈশোরের খেলুড়ে,আমার সমবয়সী ভাইঝিরা। তুমি সদ্য স্নান করেছ। আর আমি তখনো স্নান করিনি। তোমার ঠান্ডা বাহুতে আমি আমার গরম গাল ঠেকিয়ে একদম তোমার স্পর্শ পেলাম। আর ওই পিচ্চিগুলোর জ্বালায় তোমার মাথার চুলগুলো একটু ঘেঁটে দিতে পারলাম না। এটা খুব মিস করছি।

আর তুমি আমার সঙ্গে অনেক গল্পও করলে। একদম তাজা সব ব্যাপার। আমার ছোটোবেলার এই পরিবেশে তোমাকে পেলাম। তুমি আমি এই বয়সের আর বাকি সবাই সেই সেই বয়সের। সালভাদর দালি’র ‘দ্য পারসিসট্যান্স অব মেমরি’ পেইন্টিংটার মতো । তাদের মধ্যে কেউ কেউ গত হয়েছেন। আর বাড়িটা আমার ছোড়দা’র বাড়ি,যশোরে। লাল লাল মেঝে,উঁচু বারান্দা,খাঁড়া সিঁড়ি,ছোটো ছোটো জানালা... একটা ছাদ,একটা ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে তুমি উঠে এলে।


আমি জিগ্যেস করলাম কোথায় গেছিলে? তুমি বললে,ওই সিঁড়ি দিয়ে আমি তো রোজ যাই। নিচে মহাশ্বেতা দেবী থাকেন,ওনার সঙ্গে দেখা করতে। ওনার একটা পেন্টিং এক্সিবিশন (ভাবো,উনি নাকি ছবি আঁকেন) আছে, সেটার একটা ক্যাটালগ দিলেন,এই দেখো। বলে আমাকে দেখালে। আরো কী জানো,স্বপ্নের তুমি কিন্তু একজন চিত্রকর! সে লেখে না,ছবি আঁকে! আমি মূহুর্তে তোমার ক্যানভাস হতে চাইলাম । মনে হলো তোমার অন্তর্দৃষ্টির আবেশে আমি ন্যুড মডেল থেকে স্টিল লাইফ হয়ে গেলাম ।

জানো তো,আমি অল্পবিস্তর ভরতনাট্যম জানি,ইজেলের উপরে আমি সেই আঁধো আলোর দ্রবণে প্রাচীন মেণকা রম্ভার মতো তোমাকে শরবিদ্ধ করে দাঁড়ালাম । তুমি দেখছো..আমি কাঁপছি না । তুমি আঁকছো,আমি নড়ছি না । তুমি কথা বলছো না,মগ্ন । আমি লগ্না ইজেলে । আমার মনে হলো তোমাকে এলোমেলো করে দেই । ছোড়দার বাড়ির পাশ গলে নামুক সিঁড়ি,প্যাঁচানো জলপাটি । চিবুকে অসভ্যতা বুনো খাজুরাহো.. ও কবি নগ্নিকাকে দেখবে ?


যশোরে ছোড়দা গাঁটছড়া গুটাচ্ছে,সম্পত্তি শত্রসম্পত্তিতে ঘোষিত হয়েছে । পূর্ব পাকিস্তানে আর থাকা যাবে না । ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’ পড়তে পড়তে মনে হলো আমি তোমার ইজেল থেকে সরে যাচ্ছি । আমাদের মাঝে সত্যি সত্যি সীমান্ত এসে দাঁড়িয়েছে খোলা তরবারীর মতো । আমাদের আবার কোথায় দেখা হবে বলো তো ?


ধর্মতলার মোড়ে আমি নন্দন সাহার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছি । নন্দন সাহা আমাকে লোভীর মতো স্পর্শ করছে অলংকার পরাবার ছলে । সিঁধু পাগলা “লড়তে লেঙ্গে পাকিস্তান’ বলে বলে বেনাপোল চলে যাচ্ছে,তুমি আর ছবি আঁকছো না । চাঁদ তারা পতাকা উড়ছে তোমার ক্যানভাসে ।

আমি ভয় পাচ্ছি,কবি ।আমার ভয় সরছে না । তোমাকে বললাম;কিংস্টর্ক সিগারেট আছে আমার পকেটে।ছোটকু’র পকেট থেকে চুরি করেছি,খাবে ? তুমি রেগে গেলে । বুঝতে পারছিলাম তুমি আমার শরীরে নাভীতে ব্রাশ ঠেঁসে ধরেছো । আমি ব্যাথা পাচ্ছি ..রঙ সরিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে আমার স্তনের ভাঁজে । অসভ্য কবি আমার স্তন এত বিশাল এঁকেছো কেনো ? তুমি কি নবীন সুলতান ? এত ক্রোধ দেশভাগে কেন ? বিড়বিড় করে পড়ছো নেলসন ম্যান্ডেলার তাঁর মেয়েকে লেখা সেই চিঠি ;

: স্তন হবে কামানের গোলার মতো ..

ওহ অসহ্য কবি সরাও তোমার পূর্ব পাকিস্তানী রঙ-তুলি ।


কবি...ও কবি শোনো,শরীর নেবে আমার ? নাও এ সিঁড়ি ভেঙ্গে নেমে যাওয়া স্বপ্নের মেয়েটাকে । তোমার শিল্পে গেঁথে নাও । ধর্মতলার মোড়ে নন্দন সাহা আমাকে যখন সিঁদুর দেবে..উপগতা হবো ওর আর ১০টা অলংকারের মতো.. আমি বেনাপোল সীমান্তের কাছে যন্ত্রণায় হুংকার করে বলবো ;


:আমার বীজতলা ঐ দেখা যায় চাঁদ তারা পূর্ব পাকিস্তানে । ও বাবু শোনো..তোমার চোখ নামছে না আমার স্তন থেকে । আমি শিহরিত হতে চাইছি,খুলবে আমাকে ? খোলো না । স্বপ্নদৃশ্য থেকে চলো আমি তোমাকে নেবো,তোমাকে ছারখার করবো,গভীর করে দেবো তোমার ঠুনকো পুরুষালী ১৮ মিনিটের পৌরুষ । ব্রাশ ঠেঁসে ধরবে আমার উরু সন্ধিতে ? বলো কতক্ষণ ? ১৮ মিনিট ? ভালোবাসো কবি । শরীর ভাগ বন্ধ করো । আমি যদি পারতাম তোমাকে টেনে এনে এই ইজেলের কামার্ত ক্রীতদাসের মতো দাঁড় করাতাম,বলতাম । কিংস্টর্কের ধোঁয়া খুব কড়া । পুরুষ নগ্ন আরো বোমারু সুন্দর ।

ছোটদা তাড়া দিচ্ছে । তাড়াতাড়ি করো তাড়াতাড়ি করো ..অভয়নগরে আমাদের জমি জিরোত শত্রু সম্পত্তিতে পরিণত হবে । নিজ দেশে আমি হবো তোমার শত্রু ? আমি কাল সকালে হু হু করে কাঁদবো,গাইবো সারা জাঁহাসে আচ্ছা হিন্দুস্তান হামারা.. ট্রেন টু পাকিস্তানে কী গিজগিজে ভীড় !


আহ তুমি কাঁদছো, কী অক্ষম নপুংসক লাগছে তোমাকে । তুমি পারছো না আমার বীজতলায়..অক্ষম আক্রোশে নুয়ে পড়ছো তুমি । দেখতে পাচ্ছি তুমি বর্শার মতো ব্রাশ হাতে নিলে..চিৎকার করতে চাইছো..পারছো না । তুমি বুঝতে পারছো যে আমি কোথাও নেই ।


আমি পড়তে পারছি তোমার মন ।


তুমি বলছো : কাত্যায়ন বধ করো । কাত্যায়ন বধ করো