বেওয়ারিশ চাঁদ

বাবুল হোসেইন

কী সুন্দর নরোম জ্যোৎস্না নেমেছে আজ- ক্রিস্টাল কালারড। বনের ফুলগুলি সপ্রাণ। কলকলানো হাসিতে বইছে বাঁশঝাড়ের লাগোয়া বাতাস-ঝিরিঝিরি ঝিরিঝিরি। শুনো গো দখিনা হাওয়া গাইছে কেউ। উদাস। একান্তে। নীরব হাসির সাথে কী এক যাদুময় সিম্ফোনি তৈরি করছে সেই দখিনা হাওয়া। মুক্তি ফিসফিস করে বলছে জয়কে-
জানিস,কালকে আমরা অন্যদেশের বাসিন্দা হয়ে যাবো।
আমাদেরতো কোনোদিনই কোনো দেশ ছিলো না রে। মানে কী এসবের।
মানে,আমরা বাংলাদেশে থাকতে চেয়েছিলাম কিন্তু সেটা সম্ভব নয়,জানিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আমরা ভারতে চলে যাবো কাল।
জ্যোৎস্নামাখা চরাচরে এক কবর নীরবতা নেমে আসে। মুক্তি ঘরে ফেরে না। দেশহীনতার যে আক্ষেপ সে সারা জীবন লালন করেছে তা আর কোনোদিন শেষ হবে না,বুঝে গেছে সে। জয় কোনো সান্ত্বনা খুঁজে পায় না। ঘরে ফেরে না সেও। তারও কী তবে দেশহীনতার অভিমান নেই,পরের মাটিকে মায়ের মত প্রণাম করতে তার কোনোদিনই অনীহা ছিলো না,তবু সে দেশহীন জনপদের মানুষ। তাকে দেখে টিটকারি দেয় গঞ্জের ছেলেছোকরারা।
অভিমান পোষে রাখে তারা। কী জানি এই অভিমানই তাদের বেঁচে থাকা হয়তো!
এখানে একটা দীঘল জলের নদী। সারাদিন অন্তহীন বয়ে যাওয়া। এই জলে পা ডুবিয়ে শাপলার ডাটা তুলতে তুলতে তারা কোনোদিন স্বপ্ন দেখেছিলো। ডিঙ্গি নায়ের পেটের ভিতর সেইসব স্বপ্ন কবেই হজম হয়ে গেছে। জয়কে,আর কোনোদিন দেখবে না এই সলজ্জ জলের স্রোতে ভেসে যেতে। আর মুক্তির বাবা সারাটা জীবন মুক্ত হবার স্বপ্ন দেখতে দেখতে হেরে গেলেন।
কাঁটাতারে আটকানো যায় না মানুষের অন্তর্গত বেদনা। কেউ বুঝবে না এসব।
চল,আমরা এক দেশেই থাকি।
কিভাবে?
আমরা বিয়ে করে ফেলি। তুই আর আমি এখানেই থেকে যেতে পারবো তাহলে।
এ হয় না মুক্তি। এখানে থাকলেই কী সম্পর্কের ঋণ শোধ হয়ে যাবে? আমাদের বাবা মা পরিবার আছে,তারা সারাটা জীবন কী একটা আক্ষেপ নিয়ে দেশ দেশ করে গেছেন,আর এখন এই দেশভোগের সময়ে কীনা আমরা স্বার্থপরের মত আলাদা করে দেবো তাদের লালিত স্বপ্নগুলোকে।
থাক,এভাবেই থাকি।

গভীরে যেতে যেতে রাত। জ্যোৎস্নার মোলায়েম আলো গলে নিকষ অন্ধকার চরাচরে। তবু ঘরে ফেরে না তারা। বসে থাকে ঠায়। এইখানে এই দূর্বাঘাসের কচিডগায়,বাঁশঝাড়ে,হেলে ্চার পাতায় পাতায় তাদের কল্লোলিত দীর্ঘশ্বাসেরা। এই বেতবনে কতোদিন গুটিয়ে রেখেছে তারা পরস্পরের ব্যক্তিগত উচ্ছ্বাস ও একান্ত অনুভূতিসমগ্র। সবি পর হয়ে যাবে। আসলে,দেশের স্বপ্নও তারা কোনোদিন দেখতে চায় নি। আগে তো ঘর থাকতে হয় নিজের, তারপর দেশ। ঘরের সমাধান না করেই তারা দেশের সমাধান করে কী করে!
যাই যাই করে রাত যেতে থাকে। কেবল জেগে থাকে দুটো বুনোহাঁস। আর জেগে থাকে দুইজোড়া কাতরচোখ-যাদের তৃষ্ণায় কেবলি দেশহীনতার আক্ষেপ আর নিজেদের ভালোবাসাকে বিসর্জন দেয়ার সজল আর্তি। মৃদু হাওয়া নেমে যাচ্ছে ভাটির দিকে। শীতল এবং গীতল। অজস্র আকুলিবেলা বুকের ভেতর রেখে তারাও দূর পরবাসে অন্য সীমানার মানুষ হয়ে যাবে কাল। এই যে ভোর- জেগে ওঠা মোরগফুলের মত খানিক লাল অভিমানী,এই ভোর দেখার যুগল স্মৃতি তাদের তাড়াবে সারাটা জীবনভর,হয়তো পরের জীবনেও।

যদি কোনোদিন আর দেখা না হয় আমাদের?
হবে না তো আর।
আমাকে মনে রাখবি তুই?
কী জানি,মনে রেখেই বা কী লাভ। সীমান্তের কাঁটাতার ডিঙ্গানোর সাধ্য কী আর আমার হবে?
মনের কাঁটাতারে তুই বেড়া দিয়ে দিবি না তো?
দিলামই বা। তাতে কার কী আসে যায়? তোর কিছু আসে?
আসা যাওয়া নিয়ে কিছুই হয় না রে। এই যে বিসর্জন আমাদের,তাতে কারো কিছু যাবে আসবে না। কোনোদিন, কেউ মনেও রাখবে না হয়তো। জগতে প্রেমের থেকেও মহান কীর্তিগাথা মানুষ মনে রাখে নি। আমরা তো অচ্যুত। কোনখানে,এই না-দেশ-না-পরবাস জীবন আমাদের। মরে গেলেও কেউ মনে রাখে কীনা সন্দেহ।
নদীটা বইবে তার মত করেই। পাখি ফুল গাছ লতা আকাশ সূর্য সবি তাদের নিজস্বতা নিয়েই কাটাবে তাদের জীবন,কেবল মানুষের বেলায় যত বিপত্তি। মানুষ তার মত করে যাপন করতে পারে না নিজের জীবনটাকে অবধি। দেশ দেশ করে যখন মাথা কুটে মরেছি তখন দেশহীন এক ভূভাগে নিজের যাবতীয় বিসর্জন দিতে হয়েছে। আর সামান্য খড়কুটো ধরে যখন স্বপ্ন লালন করেছি তখনি বেজেছে ইসরাফিলের শিঙ্গার- চলো হে বেকুব মানুষ,তোমাদের সময় শেষ। এখন হিশেবের পালা। আহ হিশেব- ভেসে যাবার কালে কোথায় ছিলি তোরা!

জয়কে ঘরে যেতে বলে মুক্তি। আর মুক্তি দিয়ে দেয়।
আমরা একটা আস্ত দেশ পাচ্ছি জয়-এইটার কাছে আমাদের সামান্য দেনা পাওনা একেবারেই সামান্য। এটা নিয়ে মন খারাপ করো না। বৃহৎ কিছু অর্জন করতে হলে অনেক বিসর্জন দিতে হয়,জানো তো? শুধু অর্জন নিয়ে থাকলে তো হবে না,বিসর্জনও দিতে হবে।

জানিস এই চাঁদ আমাদের নয়। এটা বেওয়ারিশ চাঁদ। আমাদের নিজস্ব আকাশ ছিলো না কোনোদিন। আমরা অন্যের আকাশের চাঁদ দেখে বড়াই করেছি এতোটাকাল। এই পোড়ামুখে কোনোদিনই চাঁদের আলো পড়বে না রে। গভীর আক্ষেপে জয় সান্ত্বনা দেয় মুক্তিকে। নিজেকেও।


***