না-মানুষীর কথকথা

তন্বী হালদার

রূপালীর জীবনের সকল ব্যাকরণই তছনছ হয়ে গেছে। রূপালীকে এ তল্লাটে একসময় হেমামালিনী বলতো সবাই। ডাঁটো চেহারা, মাজা রং আর দীঘল চোখের চোরা ঘূর্ণিতে অনেক ডিঙি, খেয়া, পালতোলা তো বটেই, বড়ো বড়ো জাহাজও ডুবেছে। তবে কলার মান্দাসের মতো ভেসে আছে এখনও পর্যন্ত শুধু একজনই, ‘হারাধন’। কুপির আলোর মতো টিমটিম করে জেগে আছে একদা এ এলাকার ‘ধর্মেন্দ্র’। একসময়ের সেই রূপবান, উদার ধর্মেন্দ্রর জন্য অনেকেই পাগল হয়েছে। তুলসী, বাসন্তী, রেখা, মালা কে না ছিল সে তালিকায়! রেখার সঙ্গে তো রূপালীর একবার হাতাহাতি পর্যন্ত হয়ে গেছিল। হারাধন জুঁইয়ের মালা, বাংলা পাইট আর রুটি- তড়কা কিনে রূপালীর ঘরে যাচ্ছিল। কিন্তু রূপালীর ঘর যেতে গেলে রেখার চৌকাঠ ডিঙ্গিয়ে যেতে হোত আর রেখা সেখানেই হাইজ্যাক করে নেয় জুঁইয়ের মালা। সে খবর রূপালীর কানে যেতেই গ্যাকগ্যাক করে তেড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল রেখার উপর। ভাগ্যের কি নিদারুণ পরিহাস! সেই রেখাই এখন মাঝে মাঝে কেওড়াতলা শ্মশানের পাশে চেতলা ব্রিজের উপর থার্মোকলের থালায় ভাত দিয়ে যায় রূপালীকে। রেখার বাঁধাবাবু ঘরে জায়গা দেয় নি রেখাকে। কিন্তু একটা সন্তান দিয়েছে। পুত্র সন্তান। পান, সিগারেট, গুটখা আর লুকিয়ে সিক্সটি-ফরটির একটা দোকান শেতলা মোড়ে করে দিয়েছে। রেখা ছেলেকে নিয়ে এখন শেতলাতলার বস্তিতে দুটো ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে। ছেলে বলেছে, ‘মা এখানে তো জমি বাড়ি করা আমাদের সাধ্যি নয়। তাই আর কিছু টাকা জমিয়ে নামখানার ওধারে একটু জমি কিনব। মাছের ব্যবসা করবো’। ছেলের চোখে রেখাও স্বপ্ন দেখে, একটা লকলকে কুমড়োর মাচান, ঝুমকো জবা আর বাঁধানো তুলসীর মঞ্চ। সেই সঙ্গে মনের গোপনে আর একটা সাধ আছে, ছেলের বিয়ে দিয়ে একেবারে একটা ভরা সংসার।
রূপালীর ঠাইঠিকানা, ভোটার কার্ড, আধার কার্ড কোন পরিচয় পত্র কিচ্ছু না থাকাতে সে এখন যেন মূর্তিমান একটা না-মানুষী, যক্ষীর চেহারা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। হাতে থাকে একটা পুঁটুলি। সেই পুঁটুলির বহর শ্মশানের মৃত মানুষের পোশাকে ক্রমশ বাড়ছে। সেই পুঁটুলির ভেতরে কোন কালের একটা স্টিলের ঘটি আর সত্তর হাজার টাকার মৃত চেক রয়েছে। সেই চেক বার করে মাঝে মাঝে পথচলতি ব্যস্ত মানুষদের ধরে ধরে বলে, ‘হ্যাঁরে তোরা আমার এই চেকটার একটু ব্যবস্থা করে দে না। সেই কোন কালের সরকার দিয়েছিল। এই টাকাগুলো পেলে তোদের মেসোর চিকিৎসা করাব। আর আমি জর্দা দিয়ে মিঠে পান খাব, তারপর গাজি সিল্কের শাড়ি পরে তোদের মেসো আর আমি গড়ের মাঠে ঘোড়ার গাড়িতে চরে হাওয়া খেতে বেরোব সন্ধ্যাবেলা। সরকারকে একটা তার পাঠাতেও হবে। এতগুলো টাকা দিল। ভাগ্যিস দোতলা বাসটা চাপা দিয়েছিল আমায়’। মানুষ বিরক্ত হয়ে মুখ ঘুরিয়ে চলে গেলে শুরু হয় গালাগালি। ছেলে ছোকরারা মজা পায়। কালীঘাট মন্দির লাগোয়া প্রায় সকলেই তার এক সময়কার ‘হেমামালিনী’ নামটা জানে। কেউ যদি কুটুস করে ডেকে দেয়, ‘ও হেমামালিনী’। ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যাবে তার সাত গুষ্টির উদ্ধার। খিস্তির ফোয়ারা ছুটবে, ‘শুয়োরের বাচ্চা তোর মা রে হেমামালিনী’। কেউ যদি বলল, ‘কিগো তোমার ধর্মেন্দ্রর খবর কি?’ কাপড় তুলে বলে দেবে, ‘গু খেগোর ব্যাটা, তোর বাপ হল আমার ধর্মেন্দ্র’। কালীঘাট মন্দিরে খিচুড়ি নেওয়ার লাইনে অন্য ভিখারিদের সঙ্গে মারপিট করে কিছুদিন আগে মাথা ফাটিয়েও এসেছিল। এখন রূপালীর ঘরে যে নেপালি মেয়েটা থাকে ‘মনীষা’, সেই ডাক্তার দেখিয়ে দুদিন রেখেছিল নিজের ঘরে। কিন্তু দুদিন পরেও যখন রুপালী নড়তে চায় না, উল্টে মনীষাকে গাল দিয়ে ভূত ভাগিয়ে বলে, ‘এটা আমার ঘর। প্রতি মাসে মাসীকে আমি ভাড়া দেই। দূর হতে হলে তুই হ। আমায় গন্ধ সাবান দিয়ে চান করতে হবে, জবাকুসুম তেল দিতে হবে মাথায়। এবার রথের মেলাতে যে জরি দেওয়া গোলাপি ফিতেটা কিনেছিলাম বেড়া বিনুনি করবো তা দিয়ে। বাবু দু’বছর আগে যে সোনার নথটা কিনে দিয়েছিল সেটা পড়ব। হারমোনিয়ামটায় হাওয়া ঢুকে গেছে, দোকানে দেওয়া। মুখপোড়ার দুদিন আগে দিয়ে যাওয়ার কথা। রামধনকে পাঠিয়ে দেখতে হবে হয়েছে কিনা। যতই ‘রাম’ টানুক বাবু, উহু বাপু আমার গান না শুনলে তার নেশাই জমে না’। এই বলে ডান কানে হাতের পাতা দিয়ে চেপে ঘড়ঘড়ে গলায় গান ধরলে, ‘পেয়ার কিয়া তো ডরনা কিয়া............’। মনীষার অনুনয় বিনয়ে যখন কাজ হয় না তখন একালে রামধনের জায়গায় বহাল হওয়া এ তল্লাটের লম্বুকে খবর দিতে হয়। ঐ হাড় জিরজিরে শীর্ণকায় শরীরটাকে ইচ্ছা করলেই মনীষা টেনে বার করে দিতে পারে। কিন্তু নেপালের প্রত্তন্ত গ্রামে মায়ের অবয়বটা আবছা ভেসে ওঠে।
লম্বু এসে বিশ্রী করে মনীষাকে প্রথমেই এক হাত নেয়, ‘দরদে শালির প্রাণ ফেটে যাচ্ছে। দুদিন ধান্দায় দাঁড়াস নি। এই বুড়ি মাগীকে নিয়ে বসে থাকলে হবে তো?’
মনীষা হাত জোর করে বলে, ‘গায়ে হাত তুলিস না, একটু বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিয়ে যা’।
লম্বু মুখ ভেংচে বলে, ‘সেই কোন কালে নেপাল থেকে চালান হয়ে এসেছিস, বাংলা ভাষা আমাদের থেকেও ভালো বলিস। তবু মন থেকে দরদের পোকাটা গেল না’।
স্মিত হাসে মনীষা। তারপর নিজেই ঝুঁকে পড়ে বলে, ‘ও মাসি তুমি লম্বুদার সঙ্গে যাও। আমি পয়সা দিয়ে দিচ্ছি। ও তোমাকে রুটি আর তরকা কিনে দেবে’।
লোভে চকচক করে ওঠে রূপালীর চোখ দুটো। ‘সত্যি! তালে আর দুটো টাকা বেশী করে দে না। কতদিন পাউরুটি আর কষা মাংস খাই না। তোদের মেসোও খুব ভালবাসতো। পাউরুটি আর আমার হাতের রান্না কষা মাংস। সঙ্গে যদি হুইস্কি থাকত তাহলে দেখে কে’।
লম্বু খিঁচিয়ে ওঠে, ‘এই মনীষা তোদের এই ঢ্যামনামি শোনবার মতো সময় আমার নেই’।
মনীষা তোষকের তলা থেকে কুড়িটা টাকা বার করে লম্বুকে দেয়।
রূপালী উঠে দাঁড়িয়ে লম্বুর কাছে ছোট ছেলের মতো আবদার করে, ‘একটা সিগারেট দে না’।
টং করে খিঁচিয়ে ওঠে লম্বু, ‘এই বুড়ি তুই যাবি তো চল। সিগারেট ফিগারেট হবে না’।
মনীষা একটা প্লাস্টিকের কৌটোয় রাখা বিড়ির বান্ডিল বার করে চারটে বিড়ি রূপালীর হাতে দেয়। ভেউ ভেউ করে কেঁদে ওঠে রূপালী। তারপর পুঁটুলিটা বুকে চেপে ধরে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়।


রূপালীর এক সময়ের বাবু যে কিনা গড়ের মাঠে সকালবেলা জল দেওয়ার কাজ করতো আর সন্ধ্যাবেলায় কালীঘাটের বেবুস্যে পাড়ায় মেয়ে মহলে বাবুয়ানি করে বেড়াতো, সেই লোকটা এখন কেন্নোর মতো গুটিয়ে সারাদিন পড়ে থাকে কোন গাছের নিচে। রাতে যে কোন দোকানের শেডের নিচে শুয়ে থাকে। কোন জন্মের তালিতুলি দেওয়া একটা কোর্ট প্যান্ট পড়ে থাকে। লোকের ফেলে দেওয়া বিড়ি সিগারেট চুরুটের কায়দায় ধরে খায় আর মাঝে মাঝে শোলে সিনেমার ডায়লগ ঝাড়ে, ‘এই কুত্তোকে সামনে তু মাত নাচ বাসন্তী’। কখনও কখনও ছানি আর পিচুটি পরা প্রায় দৃষ্টি নিভে যাওয়া চোখ দুটো থেকে অনর্গল জল পড়তে থাকে। অনেকে বলে, ‘তুমি নিজের বাড়ি চলে যাও না কেন? এই বয়সে পথেঘাটে মরে পড়ে বেঘোরে প্রাণটা যাবে’। এই কথার উত্তরে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে হারাধন। কলকাতার দূষণে ঢাকা আকাশটার দিকে খানিকক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থেকে কি যেন খোঁজে। তারপর কনফেশন বক্সে দাঁড়িয়ে স্বীকারোক্তি দেওয়ার মতো বলে, ‘সমস্ত জীবনটা এখানেই কাটিয়ে দিলাম। যা রোজগার করেছি সবটাই ও পাড়ায় ঢেলেছি। ছেলে মেয়েদুটোর কোন খোঁজ রাখি নি। ওদের মা শুনেছি লোকের বাড়ি কাজ করে লেখাপড়া শিখিয়েছে। মানুষের মতো মানুষ করেছে। এখন পোকা ধরা এই কাঠামোটা নিয়ে কি দাবি নিয়ে ওদের সামনে দাঁড়াবো! তার চেয়ে এই ভালো। মাঝে মাঝে হেমামালিনী আসে, আমিও যাই। তবে এখন তো দুজনেই সর্বস্বান্ত তাই ..................’। বলে থেমে যায়। একটু কাছে এসে ফিসফিস করে বলে, ‘বাবু একসময় হেমামালিনী বিয়ের জন্য খুব জোরাজুরি করতো। তখন করি নি। কিন্তু এখন মনে হয় বিয়ে করে ওকে একটা পরিচয় দিলেই ভালো হত’। তারপর নিজের মনে বলে যেতে থাকে, ‘এখন বিয়ে করলে ও কি পাবে কোন পরিচয়!’


দিন যত যায় রূপালী তত বদ্ধ উন্মাদে পরিণত হতে থাকে। ওয়ার্ড কাউন্সিলারের বাড়ির সামনে কদিন ধরে খুব ঝামেলা করছে। কিন্তু ভোটের খাতায় নাম না থাকায় তার প্রতি কোন দরদ নেই নেতা-হাতাদের। তবে নেতার কোন ফচকে চামচা রূপালী বুড়ির মাথায় ঢুকিয়ে দেয়, ‘মাসি তুমি একটা বিয়ে করে ফেলো। তাহলে তোমার একটা পরিচয় পত্র তৈরি করা যেতে পারে। আর ব্যাংকের বই করে তুমি তাহলে তোমার চেকও ভাঙিয়ে নিতে পারবে’।

রেখার কাছে গিয়ে হামলে পড়ে রুপালি। ‘তুই আমার বিয়ের ব্যবস্থা কর রেখা। তাহলে আমার পরিচয় পত্র মিলবে। আমার সত্তর হাজার টাকার চেকখানা তাহলে ভাঙাতে পারব’।
রূপালীর থুঁতনি ধরে রেখা বলে, ‘তা হেমামালিনী তোমায় কে সাঙা করতে আসবে শুনি?’
চোখ পাকিয়ে ওঠে রূপালী। শনের নুড়ির মতো চুলগুলোয় নখ ভর্তি ময়লা নিয়ে সরু সরু আঙুল ঘ্যাঁস ঘ্যাঁস করে চালিয়ে বলে, ‘কেন আমার ধর্মেন্দ্র। তোদের হারাধনবাবু’।
রেখা আতুর দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে থাকে রূপালীর দিকে। তারপর ধীরে ধীরে পরম মমতায় বলে, ‘মুখপুড়ি যখন তোর সব ছিল তখন সে তোকে পরিচয় দিল না। আর আজ সেও শ্মশানঘাটে এক পা বাড়িয়ে রেখেছে। সে করবে তোকে বিয়ে!’
পুঁটুলিটা খুলে চেকটা বার করে রূপালী। রেখার সামনে মেলে ধরে। পিঁচুটি পড়া চালসে ধরা চোখদুটোয় জলে ভরে যায়। ফিসফিস করে বলে, ‘দ্যাখ রেখা এই কাগজটায় কত টাকা আছে। দোতলা বাসটা আমায় চাপা দিয়েছিল বলেই না সরকার এই টাকাগুলো আমায় দিয়েছে। আমরা সেই কোন কাল থেকে গতর খাটিয়ে এর কানাকড়িও পাই নি। আমার পরিচয় প্রমাণ হলে এই কাগজটা ভাঙিয়ে অনেক টাকা পাবো। তোকে সোনার নথ গড়িয়ে দেবো। তুই আমার নিজের লোক। আমার হয়ে তোকেই তো থাকতে হবে’।
এ তল্লাটে কে যে কার নিজের লোক সে বড়ো জটিল তত্ত্ব। দুনিয়াদারির মজাই এটা। যৌবন বয়সে হারাধন যদি রেখার দিকে ফিরে কখনও দুটো রসের কথা বলেছে তো চুলোচুলি, হাতাহাতি কিছুই বাদ যেত না রূপালী আর রেখার। রেখার ঘরে বাসি ঘুগনি দিয়ে মুড়ি আর চা খেয়ে শান্ত মনে ফিরে আসে রূপালী।
কিন্তু তারপর থেকে প্রতিদিনই গিয়ে হামলা করা শুরু করে, ‘কিরে মুখপুড়ি গিয়েছিলি?’
রেখা ভুজুং ভাজুং দেয়। কোনোদিন বলে, ‘গেছিলাম দেখা হয় নি’, কোনোদিন বলে, ‘ভেবে দেখবে বলেছে’। একদিন ঝাঁঝিয়ে উঠে বলে, ‘তুই নিজে গিয়ে বল না’।
লজ্জাবতী লতার পাতার মতো দু’চোখ বুজে ফেলে রূপালী, ‘যা, নিজের বিয়ের কথা নিজে মুখে বলা যায় নাকি! আমি হলাম গিয়ে কনে’।
‘মরণ আর কি’ বলে হাসতে হাসতে রেখার পেটে ফিক লেগে যায়। রূপালী চলে যাওয়ার পড়ে রেখা ঠিক করে, না একবার গিয়ে কথাটা পারতে হবে হারাধনের কাছে।


গড়ের মাঠে গিয়ে হারাধনকে খুব বেশী খুঁজতে হয় না। রসগোল্লার রসে পাউরুটি চুবিয়ে খাচ্ছিল। রেখা বেশ সাজগোজ করে গিয়েছিল। বেশ রঙ্গ করে বলে, ‘কি গো ধর্মেন্দ্র চিনতে পারছ? কি অবস্থা হয়েছে তোমার?’
হারাধন সত্যি সত্যি চিনতে পারে না। তার উপর তার সঙ্গে কেউ দেখা করতে আসতে পারে এ বড়ো অবাস্তব ব্যাপার লাগে তার কাছে।
ঝুঁকে পড়ে সিঙ্গারা আর জিলাপির ঠোঙাটা সামনে নামিয়ে রাখে রেখা। বলে, ‘বে’র বিষয়ে কথা বলতে এলাম তাই নোনতা আর মিষ্টি নে এলাম’।
বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে ঠোঙা দুটো তুলে নেয় হারাধন। জানতে চায়, ‘তুমি কে?’
রেখার বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। হা ভগবান মানুষটার মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি! আঁচল দিয়ে চোখদুটো মুছে নিয়ে বলে, ‘আমি তোমার হেমামালিনীর বোন গো। তোমার শালি। আধি ঘরওয়ালি’।
হারাধন বেশ খানিকক্ষণ রেখার মুখের দিকে চেয়ে থেকে অবাক হয়ে বলে, ‘রেখা! আমার কাছে কেন?’
রেখা ম্লান হেসে উত্তর না করে হারাধনের পাশে ঘাস জমিতে থেবড়ে বসে, সিঙ্গারার ঠোঙা থেকে সিঙ্গারা বার করে হারাধনের হাতে দেয়। বলে, ‘তোমার হেমামালিনীর তো মাথাটা বিগড়েছে। চার বছর আগে তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসে দোতলা বাস চাপা পড়েছিল। হাসপাতালে তিন মাস ছিল। তখন নাকি সরকার থেকে মেলা টাকার চেক দেয় একটা। তা মাগী তো বরাবরের কুচুটে, হিংসুটে। সে সময় কাউকে বলেনি, পাছে ওর টাকায় কেউ ভাগ বসায়। যখন বলল তখন সে চেক মরে ভূত হয়ে গেছে। তা ওরে নাকি কোন নেতা-হাতা বলেছে বিয়ে করলে পরিচয় পত্র মিলবে। তাই বলছিলাম বিয়েটা তুমি করেই ফেল ধর্মেন্দ্র ঐ হেমা বুড়িকে’।
রেখা ভেবেছিল হারাধন হয়ত এমন প্রস্তাব হেসে উড়িয়ে দেবে। কিম্বা রেখাকে খেঁকিয়ে দূর করে দেবে। কিন্তু সে এ দুটোর কোনটাই করল না। গম্ভীর মুখে বলে, ‘আমি রাজি, কবে বে করতে হবে বলিস’।
আনন্দে রেখার দু’চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। বলে, ‘সেই নাগর ধরা দিলে, এদ্দিন পড়ে দিলে? সময়ে দিলে হতভাগীটা একটা নিজের সংসার পেত’।
রেখা ভাবল এ বিয়ের আবার দিনক্ষণের বালাই কি, শুভস্য শীঘ্রম্‌। আজ বুধবার, সামনের রবিবারই বিয়ের আয়োজন সেরে নিতে হবে। কালীঘাট মন্দিরে শিবুর শাখা-পলা-নোয়া দিয়ে পুজো দিয়ে প্রসাদী সিঁদুর হারাধন রূপালীর সিঁথিতে দিয়ে দিলেই হবে। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে এ বিয়ে সেটা সফল হবে কিনা জানবার জন্য রেখা জিজ্ঞাসা করে, ‘হ্যাঁ গো বাবু তোমার ভোটের কার্ড আছে তো?’
হারাধন বলে, ‘সে তো মেদিনীপুরের বাড়িতে’।
রেখা ভাবে ওটি না হলে এ বিয়ে কোনও কাজে লাগবে না রূপালীর। তাই তড়িঘড়ি কাঁধের খয়েরি রঙের ফোমের ব্যাগটা থেকে সত্তর টাকা বার করে হারাধনের হাতে দিয়ে বলে, ‘তুমি এখনই রওনা দাও বাবু। সেখান থেকে ভোটের কার্ড, রেশন কার্ড যা যা পরিচয়ের কাগজ আছে তোমার নে এসো। পারলে কিছু টাকাও এনো। বিয়ের খরচ আছে তো একটা। মহল্লায় একটু মিষ্টি মুখ তো করাতে হবে’।

রেখা আর সময় নষ্ট না করে উঠে আসে। আনন্দে গুড়গুড় করছিল পেটের ভিতরটা। চাপতে না পেরে সোজা এ মহল্লার মাসির কাছে যায়। মাসিও এখন লোলচর্ম বৃদ্ধা। শুনে খুশিই হয়। আলমারি থেকে একটা লাল রঙের রোলেক্সের শাড়ি আর একশো টাকা দিয়ে বলে, ‘রূপালীকে দিস’।
মনীষা ওর এক বাক্স পুরনো ইমিটেশনের গয়না দিয়ে বলে, ‘রূপালী মাসীকে সাজিয়ো বিয়ের দিন’।
রেখার ছেলে বলে, ‘মা তুমি কদিন রূপালী মাসিকে আমাদের কাছেই এনে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখো’।


হারাধন বলেছিল, ‘সে ঠিক সকাল দশটার মধ্যে রেখার বাড়ি পৌঁছে যাবে। রেখা খুব যত্ন করে সাবান শ্যাম্পু দিয়ে রূপালীকে স্নান করিয়ে লাল রোলেক্সের শাড়ি পরিয়ে কপালে চন্দনের কলকা এঁকে মনীষার দেওয়া গয়নায় সাজিয়ে দেয়। বুকের ভিতর চিনচিনে একটা হিংসা হয়।
কিন্তু সময় গড়িয়ে যায়। হারাধন আর আসে না। হারাধন কোনদিনই আসে না। রবিবারের রাত শেষ হয়ে সোমবার পড়ে গেলে রেখা হাউহাউ করে মরা কান্না কেঁদে ওঠে। রূপালী নিঃশব্দে উঠে যায়। রেখার ঘরের দেওয়ালে লাগানো আয়নাটায় নিজেকে অনেকক্ষণ ধরে দেখে। তারপর এক ছুটে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়।


সপ্তাহ গড়িয়ে মাস চলে যায়। রূপালীর মুখের চন্দন ধুয়ে মুছে গেছে। রোলেক্সের শাড়িটা নোংরা ধুধধুরে হয়ে গায়ে জড়ানো। রেখার কাছেও সে আর আসে না। তার সবচেয়ে রাগ রেখার উপর। রেখাই নাকি ছল করে হারাধনকে ভাঙ্গিয়ে দিয়েছে। তবে সে এখন আর কাউকে গালাগালি করে না। কেওড়াতলা শ্মশানের এক কোণে শুয়ে বুক চাপড়ে চাপড়ে শুধু কাঁদে। সেই পুঁটুলি আর চেকখানাও আর তার কাছে নেই। কোথায় হারিয়ে ফেলেছে। কেউ দয়া করে কিছু খেতে দিলে খায়। নতুবা শ্মশানে পড়ে থাকে মৃত মানুষেরই মতো।

মেদিনীপুরে সত্যি গিয়েছিল হারাধন। এত বছর বাদে ছেলেমেয়ে বাবাকে দেখে অবাক হয়েছিল। ওদের মা বছর দুয়েক আগে মরে গেছে। হারাধন জানত না। ছেলের বিয়ে হয়ে গেছে। ফুটফুটে একটা নাতিও হয়েছে। ছেলের বউটা বেশ ভালো। বলে, ‘বাবাকে আর যেতে দিও না’। তারপর নাতিটাকে হারাধনের কোলে তুলে দিয়ে বলে, ‘বাবা একে এবার থেকে সামলানোর ভার তোমার’।
হারাধন অদ্ভুত একটা অন্যরকম আনন্দে ভেসে যায়। অতীত ক্রমশ মুছে যেতে থাকে। ছেলে মেয়ে দু’জনেই বলে, ‘জীবনের শেষ কটা দিন এখানেই থেকে যাও বাবা। এখানেই তো তোমার সব পরিচয়’।
বাচ্চা ছেলেটা হারাধনের গলা জড়িয়ে ধরে বলে, ‘বাবা, এটা আমার দাদু?’
হারাধন আনন্দে খুশিতে নিজের পরিচয়ের বীজটুকু বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘হ্যাঁ মানিক, আমিই তোমার দাদু’।