নো ম্যানস ল্যান্ডোঃ একটি প্রাচীন বিতর্ক

শুভ্র চট্টোপাধ্যায়

নারদ নন্দীর বক্তব্য
‘বৈধ’ আর ‘সত্য’ বলে দুটো শব্দ আছে। নো ম্যানস ল্যান্ড বৈধ হলেও ঘোরতর অসত্য। ধরায় ভূমি থাকবে, সেটা ফাঁকা থাকবে, আমজনতা সেখানে পা ফেললে দাদার ঠ্যাং খোঁড়া করে দেবে--- এ বড়ই অসত্য প্রভূ! এ স্রেফ অর্থনীতির মত বৈধ ধাপ্পা বলেই মালুম হয়। ওই নীতি নিয়ে হাজার হাজার পাতার কেতাব রচিত হলেও ধরায় মোট বিত্ত-সম্পত্তি কয়েকটা লোকের হাতেই থেকে যাচ্ছে। বের করা যাচ্ছে না। তবে যদি বলেন যে, রাজনৈতিক সীমানা সম্পর্কিত মানবহীন ভূমির কথা ছেড়ে দিয়ে একটা দুটো সত্য নো ম্যানস ল্যান্ড-এর গপ্প বলো, তবে শোনা যাবে। বাস্তবের হেক্টর-বিঘে-কাঠা বাদ দিয়ে মানব জমিনের কথা বলো। সত্যকার এন এম এল ব্যাপারটা বোঝা যাবে তবে।
কবি লিখেছিলেন, ‘এমন মানব জমিন রইল পতিত, আবাদ করলে ফলত সোনা।’ নিজের মন রূপ জমির নিজেই মালিক। সেখানে ভূমি রাজস্ব দপ্তরের পেয়াদা ঢোকেনা। সীমাহীন কোটি কোটি আলোকবর্ষ ব্যাপী জমি। অথচ দেখ, তার পুরোটাই প্রায় নো ম্যানস ল্যান্ড হয়ে আছে! সীমানা সংলগ্ন এন এম এল-এ অন্ততঃ ক্ষমতাবানের পা রাখেন। তুমি নিজের মানবভূমের অবিসংবাদিত সার্বভৌম ক্ষমতা পেয়েও তাকে পতিত করে রেখেছে ভায়া!
রোমান্টিকরা প্রেমের কথা বলতে গিয়ে দুটি মনের কাছাকাছি আসা নিয়ে বিস্তর কাব্য-সঙ্গীত রচনা করেছেন। ঔপন্যাসিক তিন চ্যাপ্টার খতম করে দিয়েছেন সেই আশ্চর্য অনুভূতির বিবরণ দিয়ে। এবার বিষয়টা ভূমিকম্পবিদের দৃষ্টিকোণ দিয়ে বিচার করুন। দুটি মান কাছে আসছে মানে দুটি মানবভূমির টুকরো কাছাকাছি আসছে। দুই সীমানা পরস্পরকে স্পর্শ করা মাত্রই ভূমিকম্প। দুটি মনের মালিক দুটি দেহ কেঁপে উঠল। তারপর প্লেট টেকটনিক তত্ত্ব মেনে একটা ভূমি উঠে গেল আরেকটার ওপর। এরপরেও যদি এ মানবভূমির রাজা সীমানা পেরিয়ে ওই মানবভূমে প্রবেশ করতে না পারে তবে কী ছাই ঘোড়ার ডিম হলো!
বিশেষজ্ঞরা তাই বলেন যে দুটি মনখন্ড পরস্পরকে ধাক্কা না মেরে একটু তফাতে থাকুক। সীমানা বরাবর যে স্পেসটা তবে তৈরী হবে, সেটায় পা রাখা অভ্যেস করুক। সীমানা টপকানো ব্যাপারটা নাকি ধরায় কেউই মেনে নিতে পারেনা। সে তুমি শামুকই বলো আর হোমো সেপিয়েন্সই বলো। কিন্তু বাস্তবে এ তত্ত্ব প্রয়োগ করা যাবে না। তাহলে নাকি বিশ্বের সব দেশের সবাই নো ম্যানস ল্যান্ডেই থাকবে। দেশগুলো হয়ে যাবে সরু সরু। রাজধানী আর কয়েকটা লোকের আলোচনার জন্য যতটা জমি লাগে। হয় তো রাষ্ট্র ভারতের আয়তন হবে পাঁচ বিঘে।

ন্যায় দার্শনিকের বক্তব্য

দেখ বাপু! চেতনা হলো দেহ আর আত্মার মধ্য যোগাযোগ রক্ষাকারী জিনিস। ওটা লুপ্ত হলে তোমার সঙ্গে তোমার আত্মার লিংক ছিন্ন হয়ে যাও। তুমি মূর্ছা যাও। এই কারণে চেতনালুপ্ত মানবের ‘আমি’ ব্যাপারটা থাকেনা। কেউ বলেনা ‘আমি অজ্ঞান হয়ে আছি’ কিংবা ‘আমি ঘুমোচ্ছি’। এমন কাউকে পাওয়া যায় নি যে দাবি করছে যে সে মরে গেছে।
সুতরাং, কোনও মানব তাঁর মনোভূমি সম্পর্কে অবহিত থাকবে কী ভাবে যদি তাঁর চেতনা স্বচ্ছ আর স্পষ্ট না হয়। এই সব করার জন্য সময় চাই। তোমরা যা জগত বানিয়েছে সেখানে তো দেখি সময় না থাকাটাই গর্বের। ভাগ্যিস আমার গুরুদেবের, কিংবা কলিযুগের ওই আইস্টাইন-রবি ঠাকুরেরা সময় পেয়েছিলেন।
আসলে কলিযুগের মূল সমস্যা হলো অস্থিরতা। প্রতিটি মন যাতে উত্তেজিত ও লম্ফিত থাকে, তার জন্য বিস্তর শলা করে তোমরা আইন-কানুন বানিয়েছ। যদি নো ম্যানস ল্যান্ডে পাশাপাশি বসে একটু ধ্যান করতে, মন যদি স্থির করতে --- তবে বুঝতাম তোমাদের বোধভাষ্যি আছে।
ঘন্টা আছে!!
একবার ভাবো যে নিজেকে নিয়ে নিজে ভাবার সময় তোমার নেই --- এটা কেমন বৃত্তাকার চতুর্ভূজ ধরনের ভাবনা! আরোহ অনুমানে তোমাদের এতই বিশ্বাস যে জীবনে দশ-বারোটা ব্যক্তিকে বিচার করে মানবজাতি সম্পর্কে সিদ্ধান্তে আসিয়া তার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াচ্ছ! আমার উত্তরপুরুষের এই যুক্তিহীনতা দেখে চার্বাকদের কথা মনে পড়ছে। ওরা ধার করে ঘি খেতে বলেছিল। আর বলেছিল যে, আত্মা হলো চৈতন্যমিশ্রিত দেহ। বেয়াকুবরা ভাবেই নি যে, আমি আর আমার দেহ যদি একই হই তবে ‘আমার দেহ’ বলি কেন? তোমরাও তো দেখি মুখে বলো ‘আমার দেহ’ আর কাজে সময় ভাবো ‘আমিই দেহ’।
তোমরা তো নো ম্যানস ল্যান্ড বানাবেই।

মুনিদত্তের টিকা

নো ম্যানস ল্যান্ডঃ নো, নে, না – এগুলি ‘না’ অর্থ বোঝায়। নেই, অভাব – এমন অর্থেও ব্যবহৃত। ম্যানস শব্দে একাধিক পুরুষ (কারণ মহিলা বোঝালে উওম্যানস বলত)। অতএব, নো ম্যানস = পুরুষদের নেই। কী নেই? উত্তর হলো ল্যান্ড। ল্যান্ড একটি অনার্য শব্দ। ল্যান্ডো শব্দ স্বরলোপের কারণে ল্যান্ড হয়েছে। ল্যান্ডো অর্থে পুরুষাঙ্গ বোঝায়।
অতএব, উক্ত নো ম্যানস ল্যান্ড এই অর্থ নির্দেশ করে যে, কোনও পুরুষের পুরুষাঙ্গ নাই।
এটা অসম্ভব। সুতরাং, উক্ত শব্দবন্ধ অসম্ভব। বাস্তবে থাকলে গায়ের জোরে করা হয়েছে বুঝতে হবে।