নো ম্যানস্ ল্যান্ড

অর্পিতা বাগচী


সেদিন থেকে খুঁজেই যাচ্ছি কোথায়ে যে রাখলাম, আজকাল একটা জিনিস যদি একবারে খুঁজে পেয়েছি! সকালবেলা বেড়োনোর আগে খুঁজতে যাওয়াটাও ভুল, উচিত ছিল রাত্তিরে খোঁজা। তবু যদি একবার পাওয়া যায়।“যাবে না, ছেড়ে দে” কে যেন বলছে। আরেক কে যেন, “আর একটু খোঁজই না, এত তাড়া কিসের!”
পাখা গুলো ঠিক উল্টো ঘোরে, যখন দরকার ‘জোরে ঘোর’ তা না আস্তে আস্তে। আর যেদিন এতো কিছু ছড়ানো দেখতে পাচ্ছে সেদিন ঠিক মাথার ওপর আরো ঘুরবে। না পাওয়া যাবে না, ঠিক তখনি আবার সেই কে যেন, “দেখ না আর একটু”। ‘না, দেখবো না” বলে সারাদিনের যুদ্ধের শেষ প্রস্তুতি, হাতঘড়ি পরতে পরতে রাস্তায়।
বাস আসতে একটু সময় আছে,এই সময়ে সামনের বাড়ির কর্তা চায়ের কাপ হাতে গল্প করেন, মিষ্টির দোকানি কাগজ পড়ে, কোনোদিন বা তার কারখানা থেকে গরম গরম মিষ্টি আসে থালা থালা। বাড়ির পুরুষরা হাঁটু অব্দি না ফুল না হাফ প্যান্ট পড়ে বাজার যান, ছোট্ট মেয়ে হাসতে হাসতে আর তার ভাই দিদির হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে স্কুলে গাড়ির দিকে এগোতে থাকে। এরই মধ্যে নীল বাসের দেখা মেলে। শাড়ি সামলে উঠতে যাবো, পিছনের মহিলা পা বাড়িয়ে আমার আগেই উঠে পড়েন আমি রোজকার রোজনামচায়ে খেয়ালই করিনি কখন উনি এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অবশ্য এটাও রোজকার রোজনামচাই।জানলার ধারে বসে তিনি “মা” কে খবর দেন সাবধানে উঠে, জানলার ধারে এখন। বাস সরকারি তাই সরকার ই ভরসা। “খুচরো হবে না” জানিয়ে দিলেন “সরকারি কর্মচারী” আমি ঝামেলা এড়িয়ে যাওয়ার ইচ্ছেতে খুচরোর খোঁজে হাত বাড়াই। আর তখনি আবার “সেদিন থেকে খুঁজেই যাচ্ছি কোথায়ে যে রাখলাম” এর খোঁজ পরে।কখনো তো এমন হয় না। সংসারের খুঁটি থেকে নাটি অব্দি আমার নখের দর্পণে, তবে! তবে! তবে! তবে আর কি? পাবোই, পেতে তো আমায় হবেই। ই এর জোরে বাস এগোয় আমিও সাথে গতি প্রাপ্ত হই।“ দিদি টিকিট” আমার হাতড়ানো খুচরো উজাড় করে দিই আর মনে মনে বাস থেকে নামার পরে রিক্সাওলার মুখ মনে পড়ে। নেমে, কোন রকমে নিচু স্বরে বলি “আমার কাছে খুচরো হবে না তুমি কি যাবে?” সক্কাল সক্কাল এত বিনয় তার সহ্য হওয়ার কথা নয়, হলও না। আমার সমস্ত বিনয় ছেঁড়া কুচো কাগজের মত দু আঙুলে উড়িয়ে সে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। আমি হাঁটতে থাকি।
উত্তরের এই বাণিজ্জিক শহরের ব্যাবসা এখনো বসেনি। ঘুম থেকে উঠে সে বোধহয় তখন স্নান সেরে নিচ্ছে। অফিসে ঢুকে দেখি নিরাপত্তা রক্ষীর মাথা থেকে জল গড়াচ্ছে। আমি আমার কাঁচের ঘরের ঢুকে যাই। কাঁচের ঘরের ম্যাজিক শুরু হয়। নীচের রাস্তায় গাড়ি বাড়ছে, লোকজন আর তার সাথে ধুলো ,ধোঁয়া। সামনের কাঁচে দূর পাহাড়ের মেঘ এসে লাগে। আমার দৃষ্টি আবছা হয়। সামনের মহাশূন্য আমি হাতড়াতে থাকি। মেঘ সরে না। আমি মেঘ গোছাতে থাকি মনে মনে। মোবাইল সাইলেন্ট।সামনের চেয়ারে জনসংখ্যা বাড়ছে। আমি উঠে দাঁড়াই দৃষ্টির অস্বচ্ছতা নিয়েই। সামনের জনা কুড়ি চোখ আমায় দেখছে। আমি আত্মবিশ্বাস হাতড়াতে থাকি। “Hurt not others with that which pains yourself.” “ What you do not want done to yourself, do not do others.” ইত্যাদি ,প্রভৃতি। সামনের জোড়া চোখ প্রশ্ন করবে বুঝে বলি, যা মনে হচ্ছে লিখে রাখো,সব শেষ এ question answer session কারণ শেষ আমার হাতে। তবে সেই চোখ থামবার পাত্র নয়। “ মাড্যাম ধরুন...” কাউকে ধরবে না, কাউকে ছাড়বে না আর নিজেকে ধরা ছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যাবে। সামনের চোখ জোড়ার আকৃতি বদলে এখন গোল, স্থির আর বড়ো বড়ো। এরপরের জন্য দাঁড়ানোর কোনও মানে না পেয়ে আবছা আমি কাঁচের ঘরের বাইরে আসি। মাসের শেষ, সেলস্ এ এখন প্রায় হাসপাতালের আউট ডোর এর অবস্থা। ফোনে চিৎকার ভেসে আসে, “ আমি তোর খাটে বসে, মাসের শেষ এখনও অফিসে পাত্তা নেই, আবার জানতে চাইছিস , আমি কোথায়! ” মহিলা কণ্ঠের এমন বাক্যালাপ আমাকে ঘাড় ঘোরাতে বাধ্য করে। মুনমুন। সেন কিনা আমার জানা নেই তবুও এতোটা না বল্লেই পারতো ।নাই বা হল সেন তবু মুনমুন তো। আমার হারানোর সন্ধান এখনও পাইনি। এ অবস্থায়ে আবার কাঁচের ঘরে এসে দাঁড়াই। অখেয়ালে প্রশ্ন করি, “ধরো তোমার কোন কিছু হারিয়ে গেছে, কি করবে?” এমন প্রশ্ন কেন করলাম নিজেই জানি না, উত্তরও জানি না। উত্তর আসে প্রশ্ন হয়ে, “ম্যাডাম আপনার কি কিছু হারিয়েছে, সকাল থেকে কেমন একটা আনমনা?” এই প্রথম খেয়াল হল একজোড়া চোখ আমাকেও দেখছে সকাল থেকেই। খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে তার পরে এমন ধাক্কা,আমি প্রায় পরি কি মরি করে শেষ বারের মত সব শক্তি সঞ্ছয় করতে থাকি। আরও প্রশ্ন করি আমিও, যা মনে আসছে তাই, তোমার নাম? কোথা থেকে এসেছো ? কত দিন হল এই কোঃ তে চাকরি করছো?” চোখ জোড়া উত্তর দেয় না।আমাকে দেখে। আর আমি এই প্রথম দেখি চোখ হাসছে আর দেখছে আমার টালমাটাল।
আমার টালমাটাল আমি সামলাতে থাকি অবিন্যস্ত পাইচারি দিয়ে। মুনমুন ঘরে ঢুকে আসে “আসছি” বলেই। এ যাত্রা বেঁচে যাই। মুনমুন গরম আবহাওয়া থেকে আমার ঠাণ্ডা ঘরে এসেই জল খেতে খেতে আমাকে প্রশ্ন করে “কি হয়েছে তোমার? সকাল থেকে অমন হরিদাসীর
মত মুখ করে কেন!” আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে মুনমুন একাই বলে চলে, হাতে এক পয়সার ব্যবসা নেই, বস্ ছাড়াচ্ছে। তোমাকে দেখলে মনে বলে, বোরলীন, জীবনের উঠাপড়া গায়ে লাগে না। ঠিক হয় যাবে। বল? এখন বস্ ছাড়াচ্ছে পরে আমি টেকোর মুখে ব্যবসা ছুড়ে মারব।”
মুনমুন, ব্রাঞ্চ ম্যানেজার। আমি কি করে ওকে ভরসা দিই! তবে ও যখন বলেছে মুখে ছুঁড়ে মারবে ও ঠিক মারবেই। ও চলে যায় ঠাণ্ডা থেকে গরম আবহাওয়ায়।
আমি ঠাণ্ডাতে ঘামতে থাকি। চোখ জোড়া নিভে গেছে দেখে আমার ঠাণ্ডা লাগতে থাকে। সারাদিনের কাজ শেষ হলে আবার রিক্সা আর তারপর বাসে। সরকারী, বেসরকারি বাসের মধ্যে যাত্রী নিয়ে বচসা বাধে। দুই চালক আর তাদের সহকারিরা যে যার জায়গায়ে বসে চিৎকার করতে থাকে। যে যাত্রী কে নিয়ে ঝামেলা তিনি তখন রাস্তায়। কোন বাসে উঠবেন, কেন উঠবেন বা কেন উঠবেন না, ঠিক করতে পারছেন না হয়ত। আমার সামনের সিট ,জানলার ধার খালি। ওনাকে চোখের ইশারাতে ডেকেও কোন লাভ হল না। আমি একমনে বচসা শুনতে থাকি। মাঝে একটি বাইক এসে দাঁড়ায়। যাত্রীটি বেপরয়া ভাবে সরকারি, বেসরকারি সব কিছু অবজ্ঞা করে বাইকে চড়ে বসেন। ঝামেলার অবসান হয়।
চালকের পানের পিক জানলা দিয়ে চেষ্টা করেও সেই যাত্রী অবধি পৌছোয় না। অগত্যা, বাস চলতে থাকে। নামবার সময় খেয়াল হল, এবেলা আর খুচরোর তাড়া নেই , সরকারী কর্মচারী তার সরকারি কাজকর্ম সারছেন হাসি মুখেই। মাসের শেষের ওঠাপড়া নেই। বাস এসে আমাকে নামিয়ে দেয়। যেখানে নামলাম তার সামনের দোকানে মাস কাবারি কিনব বলে পা রেখেই সামনে এক মাসিমাকে দেখে পা তোলার আগেই তিনি আমার হাত ধরে ফেলেন।“ কবে থেকে রাস্তাতে তোমাকে দেখলেই ডাকি। কোন দিনও সারাটি নেই।এবার কি করবে?” আমি ওনার গরু চুরির দায়ে ধরা পড়েছি মনে করে গরুচোরের মত মাথা নিচু হয়ে দাঁড়াই। হাতে যখন পড়েছি সহজে নিস্তার নেই। আমার,আমার পাড়ার, পারলে তাদের চোদ্দ গুষ্ঠির খবর উনি নেবেন। শেষ প্রশ্ন, “তোমার ফ্ল্যাট, কত পড়ল?” আমি এই প্রথম চালে ভুল করি। হ্যাঁ বা না এর বাইরে গিয়ে উত্তর দিই। “আমি তো কিনিনি, তাই জানি না।” উনি আমাকে মাত করার চাল পেয়ে হ্যা হ্যা করে হাসতে থাকেন। “ বাঁ হাতে কিনলে দাম কি কেউ বলে?” বলে, উনি আমার এতক্ষণ ধরা বাঁ হাত ছেড়ে আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই রওনা দেন আর সকাল থেকে একটু একটু করে এতক্ষণে সর্ব হারা আমি বাড়ি ফিরি।
একটি সর্বস্বান্ত আমি কে চান করাই, জামা কাপড় বদলিয়ে, চুল বেঁধে দি। বাইরে থেকে এনে ঘরে বসাই তবু তার সর্বহারা ভাব কাটে না। এরই মধ্যে খবর আসে পাশের বাড়িতে ডাকাত
পড়েছে।আমি ভুল শুধরতে যাওয়ার আগেই খবর বলে উঠে, “চোর না গো ডাকাত, সে ডাকাত ধরা পরার ভয়ে অন্ধকারে ডাব গাছে উঠেছে আর নামছে না। এত ওপরে যে টর্চের আলোতে তার দেখে মিলছে না।”আমার শঙ্কা ভয়ে পরিণত হওয়ার আগে আমি বারান্দাতে গিয়ে দাঁড়াই। আমার বারান্দা থেকে যে ডাব গাছ দেখা যায় তার দিকে দৃষ্টি মেলি। খুব একটা কিছু চোখে পড়ে না। ডাব গাছের উচ্চতা আন্দাজ করে ছাদে উঠি।
সদ্য অন্ধকার আকাশ ঢেকেছে। একে একে তারা জ্বলছে । দূরের উৎসবের আলোতে ঝলমলিয়ে উঠেছে থেকে থেকেই। নীচে রাস্তার হলুদ আলোতে পাড়ার উঠতি বয়স হাসছে। সারা শহর জুড়ে এক চিরকালীন নিস্তব্ধতা। বিস্তৃত ছাদের এক প্রান্তে, ডাব গাছ। দূর থেকে তার কোন সন্দেহ জনক নড়াচড়ায় চোখ আটকায়নি এখনও। তবু নিরাপদ দূরত্বই ভাল। মৃদু বাতাসে ডাকাতে ডাব গাছের পাতা দুলছে । পাতার মধ্যে বাতাস খেলার শব্দ আসছে কানে। ছাদের প্রান্ত থেকে হাত বাড়ালে ধরে ফেলা যাবে ডাব গাছের পাতা। আমি এ প্রান্ত থেকে দেখতে থাকি সব। ডাব গাছ তার আশেপাশের নারকেল, সুপুরি গাছের সাথে দোল খাচ্ছে। আমার শঙ্কা, ভয়, অবিন্যস্ত পায়চারি, সর্ব হারা আমির প্রতি তার এই দোল খাওয়া। আমি প্রান্ত বদল করব বলে হাঁটতে থাকি সামনের আলোর দিকে, আমার ছায়া দীর্ঘতর হয়। ডাকাতে ডাব গাছের প্রান্তে আমি পৌঁছই। হাত ছাদের পাঁচিল টপকায়। অন্ধকারের ডাব গাছের ছায়া এসে পড়ে গায়ে। দৃষ্টি স্বচ্ছতা পায়। আমি ডাকাতে ডাব গাছের পাতা ছুঁই।
পা এর নীচ থেকে সবুজ ঘাস জমি ছড়িয়ে পড়ে ছাদের এপ্রান্ত থেকে ও প্রান্তে।