ম্যান মার্কিং

বিশ্বদীপ দে

তার কাজই তো তাই। তোমার পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়ানো। কেবল তোমার সমান্তরালে সে দৌড়ে যাবে। আর খুঁজবে একটা সঠিক মুহূর্ত, যখন তুমি অসতর্ক... আর ঠিক তখনই...তোমার পা থেকে কেড়ে নেবে, তোমার শরীরের সঙ্গে লেগে থাকা টুকরো সাফল্য, টুকরো বেঁচেবর্তে থাকা...হয়তো লক্ষ্যের সামান্য সময় আগে একটা আলতো মোচড়ে...
হ্যাঁ, সেই কথা বলতে বলতে তোমার মন, মন একটা চৌকো মাঠের ঘাস, ঘাসের সঙ্গে লেগে থাকা সবুজ রং-কে কেবল চোখের তারায় ধরে বহুদূরে ছুটে যাবে, মাঠের হইহইকে ধীরে ধীরে মুছে দিয়ে আচমকাই একটা নিস্তব্ধ পৃথিবীতে তোমাকে নামিয়ে দেবে। আর তোমার মনে পড়ে যাবে...

আকাশের নীল, নদীর জলের ঘোলা আর জঙ্গলের সবুজ রঙের পোঁচ মিলেমিশে গেছে। কেবল লঞ্চের ভুট ভুট ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই এখানে। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দুপুরের ভেতর থেকে উঠে আসছে জঙ্গলের গন্ধ। যেদিকেই তাকাই দেখি কেউ নেই। তবু জানি, জানি সে আছে। খুব কাছে বা একটু দূরে। যেখানেই থাক, আছে। জঙ্গলের সবুজ রঙের ভেতর হলুদ-কালো রঙের কোনও ঢেউ দেখতে পাই না পাই, সে আছে। লঞ্চের সারেং-ও বলল, ‘তিনি কিন্তু তোমাদের দেখছেন। কেবল তোমরাই দেখতে পাচ্ছ না। সুযোগ পেলেই...’ কথাটা শুনে শরীরের গভীরে ভেসে উঠছিল কী এক গুম্ভীর পিয়ানোর সুর। আর ক্রমশ ভিড়ের মধ্যে থেকে একা, আরও একা হয়ে যেতে লাগলাম। কেউ কোনও কথা বলছে না। কেবল রুদ্ধশ্বাস নজরে চারপাশে জেগে থাকা গেঁওয়া, গরান, হেতালের ফাঁকে চোখ দিয়ে বসে থাকা। লঞ্চ নিজের মতো ভেসে চলেছে।
তারপর এক সময় লঞ্চ এসে দাঁড়াল সজনেখালির ঘাটে। সামনেই ওয়াচ টাওয়ার। উঠতে না উঠতেই শব্দ পেলাম। ‘প্লেন যাচ্ছে।’ কে যেন বলল। শুনে মুচকি হাসলেন স্থানীয় একজন মানুষ। ফিসফিস করে কী যেন বললেন। আমি কান পাতলাম। আবার সেই শব্দ। জঙ্গলের মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছে তার গর্জন। ভেসে ভেসে এ মাথা থেকে ও মাথা হয়ে কখন যেন গুঁড়ি মেরে নেমে এল আমাদের কাছাকাছি। তারপর সঙ্গে সঙ্গে চলতে লাগল।

সেই রাতে আমরা সকলেই জেগেছিলাম অনেকক্ষণ। বাইরে একটা কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে শীতের দুঃখী শরীর নদীর কিনারে বসেছিল। কুয়াশার ভেতর থেকে হলদে হয়ে আসা চাঁদ, আর দূরে ছোট ডিঙি নৌকোয় কাঁকড়া ধরতে আসা জেলের দল। তাদের লম্ফর মলিন আলো আমাদের জানলা থেকে দেখা যাচ্ছিল। অনেক অ-নে-ক রাতে ঘুমিয়ে পড়তে পড়তে শুনতে পাচ্ছিলাম একটা হলদে-কালো স্বর ভেসে বেড়াতে বেড়াতে নেমে আসছে আমার শরীরের দিকে। ধীরে। ধীরে।

সেই স্বর আজও আমার চারিদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বেড়ায়। শক্তি চট্টোপাধ্যায় মনে পড়ে। ভয় আমার পিছু নিয়েছে। ভয়। একটা ঝিম ধরা দুপুর, নিঃঝুম সন্ধে আর কুয়াশাঘেরা নির্জন রাত্তির। লম্ফর আলো, ছোট নৌকোর আড়ালে ভেসে উঠেছে একটা হলদে কালো শরীর। চারপাশ থম মেরে আছে। ডিঙি মেরে ওত পেতে বসে থাকা একটা শরীর। চাইলেই সে লাফিয়ে পড়বে। চাইলেই। কিন্তু আমি জানি এখনই নয়। এখনও তার খেলা শেষ হয়নি। এখন তার ভেসে বেড়াবার সময়। আমার চারপাশে। আমারই ছায়া হয়ে। আমার শরীর ঘিরে, আমার শরীরের মায়া ঘিরে। আমারই পায়ে পায়ে, আমাকেই শেষ করে দিতে সে ঘুরে বেড়ায়। আমার সময় নেই তার দিকে তাকাবার। আমি আমার পথে এগিয়ে যাই। তাকাই না। কিন্তু জানি, সে আছে। আমারই পায়ে পায়ে...আমি জানি...কোনও একদিন সে...আমি জানি...