নো-ম্যান্স ল্যাণ্ড

বিধান সাহা

০১.
‘আদনান সামী কি গান গায় না কান্না করে?’ ‘তেরে চেহরা’ শুনতে গিয়ে এমন আমার আগেও বহুবার মনে হয়েছে। আজ, এই এতো বছর পরও ঠিক তেমনই। মনে হয় মানুষটা গানের উছিলায় আসলে কান্না করে। তার সেই কান্না আমাকে স্পর্শ করে। আমিও ভেতরে ভেতরে কান্নার প্রস্তুতি নিতে থাকি। একটা বিরহ-প্রেমিক হয়ে কল্পনায় প্রেমিকাকে হারিয়ে ফেলে আমি সামীর গানের যোগ্য শ্রোতা হয়ে উঠতে থাকি। আর ভাবি, সত্যি সত্যিই যদি আমার প্রিয় মানুষটি আমাকে ছেড়ে কোনদিন চলে যায়? থাকতে পারবো? এমন ভাবনা এসেছিলো সেই নাইনটি নাইনে একবার। মনে হতো মরে যাবো। মনে হতো... মনে হতো...

তারপর কত জল কত ঘাটে ঘুরলো, মরিনি আর। মাঝখান থেকে জেনে গেছি, পৃথিবীতে কারো জন্যই কোনকিছু আবশ্যক নয়। এই বিশ্বাসটা আজ টলে টলে উঠছে। বর্ষাকে দেখে এসে। রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের জাতীয় কিডনী ইনস্টিটিউটে ভর্তি মেয়েটা। আমার বন্ধু রিগ্যানের স্ত্রী। ও যত-না রিগ্যানের স্ত্রী তারও বেশি আমাদের বন্ধু। কত কত বছর ওরা প্রেম করে কাটালো! পার্কে, কোনো কোনো দিন আমিও তো সঙ্গী হয়ে ওদের প্রেমকে আড়াল করেছি। ওরা বিয়ে করলো। কেউ মেনে নিলো না। ওরা তবু অনড়। ওরা তবু একটি একক। রিগ্যানের কথানুযায়ী বর্ষার দুটো কিডনীই ৮০ শতাংশ ড্যামেজ। রক্ত লাগছে রোজ। এবি পজেটিভ। রক্তের জন্য কত জায়গায় যে হন্তদন্ত হয়ে ফোন করে যাচ্ছে ছেলেটা! ফেরার সময় রিগ্যানের মুখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। ছলছল চোখে একবার বললো— ‘ও কী বাঁচবে? তুমি তো জানো, ও শুধু আমার স্ত্রী ছিলো না কখনও।’ কী বলবো আমি? চুপ করে থাকলাম কিছুক্ষণ। সবাই যা করে আমিও তেমনভাবে বললাম উপরওয়ালা একজন আছেন। তিনি নিশ্চয়ই সুস্থ করে তুলবেন ওকে।

আমার খুব মনে হচ্ছিলো, রিগ্যান আসলে কথা বলছে না। ও কাঁদছে। সেই কান্না কেউ শুনছে না, বুঝতে পারছে না।

সরি, আদনান সামীকে আজ আর নিতে পারছি না। আমার বন্ধুটির গোপন বেদনা কী করে এতো অনুপুঙ্খ ধারণ করলো কণ্ঠে সে আজ? এ এক বিষণ্ন বিষ। এ বিষে মানুষ শরীরে মরে না ঠিক, ভেতরটা খুব করে মরে পড়ে রয়।

ভালো হয়ে ওঠো বর্ষা, বন্ধু আমার।

০২.
আটানব্বই কী নিরানব্বই সাল হবে। সেদিন সকাল সকাল কী ভেবে বগুড়ার অ্যাডওয়ার্ড পার্কের ভেতর একা একা ঘুরছিলাম। এই সময়টায় পার্কের ভেতরটা ফাঁকা থাকে। কিছু স্কুল পালানো ছেলে-মেয়ে আর কতিপয় প্রেমিক-প্রেমিকারা ছাড়া এ সময়টাতে সাধারণত কেউ থাকে না। আমি সেই না-থাকা শূন্যতাকে উপভোগ করতে করতে, বাগানের গোলাপ দেখতে দেখতে, আনন্দ-পায়রার পাশের পুকুরের জলে লাফিয়ে ওঠা মাছের সাঁতার দেখতে দেখতে আনমনে উদ্দেশ্যহীন হাঁটছিলাম। হঠাৎ দেখি রিগ্যান। ডেকে নিলো :
— আরে তুমি? এটি ক্যা?
— আরে তুমি!! কি করতেছো? এই যে এম্নি ঘুরতেছি।
— ও, আসো পরিচয় কোর্যা দেই।
ওর পাশে বসা একটি শ্যামা মেয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। ‘ও বর্ষা।’ শুধু এ টুকুই। বাকিটা আমি বুঝে নিয়েছিলাম। চোখে পুরু করে কাজলটানা মেয়েটা মুহূর্তেই কী যে আপন করে নিলো! এই কথা সেই কথা, কথার খিচুরি পাকালাম আমরা সবাই মিলে। মেয়েটার কাছে হাসতে হাসতে আর্জি জানালাম— দেখো না, আমার তো কেউ নাই। তোমাদের মতো আমারও তো ইট্টু আউলে যায়া কথা ক্যোবার মন চায়। ইট্টু...

মেয়েটাও হাসতে হাসতে বললো— চিন্তা কইরেন না। আমার মেলা বান্ধবী আছে। একটাক ল্যাগা দিমুনি। ওর হাসির সময়ই খেয়াল করলাম, ওর গজদন্ত কী অদ্ভুত সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে। মুগ্ধ হয়েছিলাম প্রথম দিনই।

০৩.
একদিন হঠাৎ শুনি রিগ্যান বিয়ে করে ফেলেছে। বর্ষাকেই। বর্ষার বাবা-মা কেউ মেনে নিচ্ছে না। উপরন্তু পুলিশি হয়রানির হুমকি দিচ্ছে। বর্ষা ডিগ্রীতে পড়ে। রিগ্যান পড়ালেখায় ব-কলম। কিন্তু প্রেমের ক্ষেত্রে ও খুব সৎ। মানুষ হিসেবেও। বর্ষাকে রিগ্যানদের বাড়িতে নিয়ে এসেছে। রিগ্যানের বাবা-মা মেনে নিয়েছে। আমরা সবাই দলবেঁধে রিগ্যানদের বাড়িতে গেলাম। বর্ষা এলো। আমরা রিগ্যানের ফ্লোরিং করা বেডে গোল হয়ে বসলাম। কত কথা! মেয়েটাকে তার বাবা-মা মেনে নিচ্ছে না এতে ওর একটুও মন খারাপ নেই। মুহূর্তেই আমাদের দলে মিশে গেলো। ও নারী পুরুষের গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের বন্ধু হয়ে উঠলো। তারপর বহুবার, বহুদিন কলেজপাড়া থেকে ধুনট বাজারে ওরা দু’জন এসেছে স্রেফ আড্ডা দিতে। আমাদের সাথে। হয়তো সকলে মিলে একটু চা-টা খেলাম। ওই পর্যন্তই। ওতেই আমরা মহাখুশি।

০৪.
তারপর অনেকদিন ওদের সাথে, বিশেষ করে বর্ষার সাথে আমার আর যোগাযোগ হয় নাই। রিগ্যানের সাথে তাও দু’একবার দেখা, আড্ডা হয়েছে। সেখানেই হয়তো বর্ষার সম্পর্কে গতানুগতিক খোঁজ নেয়া— ‘বর্ষা কেমন আছে?’ রিগ্যানও হয়তো উত্তর দিয়েছে— ‘ভালো’। আমি ঢাকায় চলে এলাম। ওরাও যে কে কী করছে, সেভাবে খোঁজ নেয়া হয়নি আর। সেদিন হঠাৎ রিগ্যানের ফোন— হ্যালো, আমি রিগ্যান।
— আরে রিগ্যান, কেমন আছো?
— ভালো না। খুব বিপদে পড়ে ফোন করছি।
— কি হইছে?
— বর্ষাক নিয়া আসছি। এবি পজেটিভ রক্ত লাগবে। ওর কিডনীতে ডায়লেসিস করতে হবে।
— বলো কী! আচ্ছা চিন্তা করো না। আমি দেখতেছি।
তারপর একা একা খানিক চুপ করে থাকলাম। কী করা যায়? ফেসবুকে রক্ত চেয়ে একটা স্ট্যাটাস দিলাম। কয়েকজন বন্ধু নিজ থেকে এগিয়ে এলো। পরদিন আমি অফিস শেষ করে শেরে বাংলা নগর জাতীয় কিডনী ইনস্টিটিউটে গেলাম বর্ষাকে দেখতে। মেয়েটার মুখের দিকে একবার মাত্র তাকিয়েছিলাম। দেখেই মনে হচ্ছিল খুব কষ্ট পাচ্ছে ও। আমি তাই কথা না বাড়িয়ে, রিগ্যানকে ব্লাড-ডোনারদের ফোন নাম্বারগুলো লিখে দিচ্ছিলাম। ফেরার সময় রিগ্যান একবার বললো— তুমি তো জানো, ও শুধু আমার স্ত্রী ছিলো না। এগারো বছর একসাথে আমরা! কত স্মৃতি! বর্ষার কিছু হলে... ওর কণ্ঠ জড়িয়ে যাচ্ছিলো। ওর চোখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না আমি। কী বলবো বুঝতে পারছিলাম না। শুধু বললাম— ভেবো না, সব ঠিক হয়ে যাবে। উপরওয়ালা একজন নিশ্চয়ই আছেন।

০৫.
সেই যে এলাম তারপর ফোনে খোঁজ নেয়া হলেও, নানা ব্যস্ততায় যাই যাই করেও আর যাওয়া হয়নি। ভেবেছিলাম একদিন গিয়ে বর্ষার সাথে গল্প করে আসবো। আমার এক বন্ধু আমার স্ট্যাটাস পড়ে বর্ষার জন্য ফুল নিয়ে যাবে বলেছিলো। বলেছিলো, বর্ষা ফুল পেলে নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে। আমিও ভেবেছিলাম— এই ঢাকা শহরে যেখানে নিজেদের আত্মীয়রাই খোঁজ-খবর নিতে চায় না, সেখানে অপরিচিত কেউ ওর জন্য ফুল নিয়ে গেলে নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে মেয়েটা। আমার বন্ধুটিকে বলেছিলাম— আমি বাড়ি থেকে ফিরে আসি তারপর বর্ষাকে দেখতে যাবো, কেমন?

আমার বন্ধুটি হয়তো সেই আশায় আছে এখনো।

০৬.
আদনান সামীর কণ্ঠটা আজ বোধ করি আরো বেশি করে বিষণ্ন হয়ে উঠেছে। সমগ্র কলেজপাড়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রিগ্যানের নীরব হাহাকার। আমার অন্য বন্ধুরা হয়তো নির্বাক দাঁড়িয়ে আছে ওর পাশে। আজ বর্ষার উপর কারও কোন অভিমান, ক্ষোভ, ক্রোধ, লালসা নেই।

বর্ষা মেয়েটা আজ মারা গেছে।