গুটেনবার্গের সৈন্য

এমদাদ রহমান


কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আলো নেই। শব্দ? তাও নেই, শুধু একটা চাপা গোঙানি। অন্ধকার। কে? কে এমন চিৎকার করে উঠল :
আমরা যাইনি ম\'রে আজো- তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়...
আলো নেই। অন্ধকার। ঘোর অন্ধকার। তবু, কার কণ্ঠ যেন বলে-
মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায়...
মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায়...
মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায়...
আবার। আবার। আবার। থেমে থেমে। তবু কেবলি দৃশ্যের...
মহীনের ঘোড়াগুলো...
একটা কণ্ঠ। কণ্ঠের চাপা গোঙানি শুধু। আর চিৎকার নেই। আর কিছু নেই। আলো নেই। আবার সেই কণ্ঠ! সেই গোঙানি :
প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন- এখনো ঘাসের লোভে চরে
পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর \'পরে।
অন্ধকার আরও ঘন হয়। কুকুর ডাকে। এক সঙ্গে কুকুরেরা ডাকে আর মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায়...
মানব\'দা, কে তোমাকে একদিন আততায়ী হয়ে কুপিয়ে হত্যা করে ফেলে রেখে যায়? জান?
আমরা রাত জেগে তোমার মৃত্যু সংবাদ টাইপ করতে করতে এক সময় পাশাপাশি লিখে ফেলি দুটি শব্দ- অতিকায় ডায়নামো। বার বার লিখি। খটখট। অবিরাম শব্দ তুলে। আর লিখতে লিখতে তোমার মৃত্যু সংবাদের ভেতর থেকে আমরা রাতভর খুঁজে বের করি শব্দের ভেতর আছে ঢেউ, আছে অন্ধকার আর একটি শব! তখন আমাদেরই আশেপাশে ছদ্মবেশ... আততায়ী। কেউ চাকু, ঝা-চকচকে, কেউ চাপাতি... আর আমরা কেউ কেউ বিশ্বজিৎ অভিজিৎ নিলয়... রাত ভোর হচ্ছে। মাতৃগর্ভের জলাশয় ভেদ করে আজ আমাদের কত সন্তানের জন্ম হল, মা? মানব\'দা তবু বলে যেতে থাকে : মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায়...
প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন...
পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর \'পরে... আহঃ! একটা মানুষ মরতে মরতে প্রমাণ করে যায় এই পৃথিবীর মাটি তার ভাল লেগেছিল! এদিকে, সারারাত ধরে টাইপরাইটারের খটখট : একদিন মানব\'দা দেখলেন তাঁর পায়ের নিচে মাটি নেই। পিছু নিয়েছে গুপ্ত ঘাতক। কোথাও দাঁড়াবার জায়গাটুকুও নেই। কারফিউ, মগজে। কারফিউ, রাজপথে। সারারাত ধরে আমরা আমাদের গুটেনবার্গের সৈন্য দিয়ে লিখছিলাম একটা মাত্র শব্দ : মৃত্যু। আমাদের মগজে ঘাই মারছিল শুধু জীবনানন্দের কবিতা : প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন- এখনো ঘাসের লোভে চরে
পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর \'পরে।
... হয়তো আমরা বিলাপ শুনছিলাম কোনও মৃত্যুপথযাত্রীর, ফেরিওয়ালার বাক্সে ছিল মানুষের জড়োয়া-মুখ। জ্বলছে। প্রচণ্ড ক্রোধে জ্বলছে। মানুষ-মুখোশ-মুখ! আমাদের হাতে গুটেনবার্গের সৈন্যগুলি। এক একটি অক্ষর। মহামতি গুটেনবার্গ, নমস্কার আপনাকে... বাঁচতে হলে শ্বাস লাগে- এই জানা সত্যটুকুই আরও গাঢ় করে আমরা জেনে নিয়েছিলাম। কারণ, আমদের মগজে কারফিউ। নো ম্যানস ল্যান্ডে- আমরাই একা। দেখছি- দানব। দেখছি গুলি চলছে। দেখছি ঝুলে আছে ফেলানি। একটা মেয়ে। একটা লাশ। একটা গুলি। একটা জীবন। আহা, জীবন! ...এভাবেই, কাঁটাতারের বৃত্তে লিখিত হয়ে যাচ্ছিল আমাদের ইতিহাস। আমরা কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা। হে দেশ, দেশমাতা... আমরা স্মরণ করছি বাঘ, স্মরণ করছি হরিণার নাম। স্মরণ করছি টারজান। জীবনকাল কত দীর্ঘ আমাদের? কতদূর আয়ু! আমাদের জানা ছিল না জীবন না আয়ু- কে বেশি সাংকেতিক! আত্মহনন না আত্মপ্রতিকৃতি! আমাদের জানা ছিল না আর কিছু? জীবন, তুমি কি চিরহরিৎ? কেন শুভ্র বল্কলে ঢেকে গিয়েছিল আমাদের পিতামহের মুখ? কেন জননীর জ্যোতির্ময় ঢেকে দেয় গোপন হন্তারক? মরতে মরতে একদিন আমরাই পথে নেমেছিলাম। মিলিয়ে ছিলাম গলা, চিৎকারে চিৎকারে পৃথিবী কাঁপছিল কিন্তু হঠাৎ দেখি আমরা থেঁৎলে যাচ্ছি বুটের তলায়। ভারি বুট। সুসজ্জিত। আমরা যেন এক দঙ্গল শুয়োর। লাথি মারতে মারতে আমাদের খোঁয়াড়ে ঢুকান হয়েছিল! ঠিক তখন থেকেই আমাদের কানে হ-ঠা-ৎ বাঁশি বেজেছিল আর আমরাই সূচনা করেছিলাম আত্মপ্রতিকৃতির। এ এমন এক কৌশল যেখানে উপুড় করে ঢেলে দেয়া যায় নিজেকে নিজের ভেতর! হ্যাঁ, আজ রাতেই আমরা লিখে ফেলব মানব\'দার কথা। একটা তীব্র প্রাণ ঘাতকের চাপাতিতে শেষ হয়ে পড়ে রইল রক্তেভেজা মানচিত্রের উপর... মানব\'দা, কবিতা পড়ছেন! কী অদ্ভুত তাঁর গলা। জীবন যেন ফোঁটায় ফোঁটায় গড়িয়ে নামছে তার গলা থেকে : প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন- এখনো ঘাসের লোভে চরে
পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর \'পরে...
অন্ধকার আরও ঘন হয়। কুকুর ডাকে। এক সঙ্গে কুকুরেরা ডাকে আর মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায়... আমরা গোল হয়ে একটা মৃতদেহকে ঘিরে রাখি। আমাদের মানব\'দা নেই। কোন সে ঘাতক আজ হত্যা করল তাকে? আমরা ভাবছিলাম মানুষের সেই ভয়ানক আবিষ্কারের কথা- আত্মহত্যা! অথচ মানব\'দা, আমরা কী তীব্রভাবেই না এই জীবনটাকে ভালবেসেছিলাম...
হ্যাঁ, আমরাই প্রতিরাতে জরায়ুতে ঠেসে দিয়েছি মৃত্তিকা, জন্ম হয়েছে আমাদেরই ভূমিপুত্রদের আর তারা রাত জেগে পাহারা দিয়েছে মাতৃস্তন আর বেঁচে থাকবার শ্বাস। পিতামহ-প্রপিতামহের হারিয়ে যাওয়া মুখরেখার সন্ধানে চলেছি ধাবমান বাতাসে। আমরাই জননীর সামনে ধর্ষণ করেছি আত্মজাকে। আমরাই গেয়েছি শেকলভাঙার গান। আমরাই দগ্ধ বনানীর ভেতর খুঁজে চলেছি সবুজপাতার সুধা। আমরাই দল বেঁধে উড়িয়েছি বিমানভরা আগুন। পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছি ডানাভরা গান, বাঁশিভরা সুর, বাগানভরা গোলাপ আর গর্ভভরা মানুষ... তখন, মানব\'দা চিৎকার করে পড়ছেন-
আমরা যাইনি ম\'রে আজো- তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয় :
মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায়...
মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায়...
মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায়...
প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন- এখনো ঘাসের লোভে চরে
পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর \'পরে... একদিন মানুষ আর খুঁজবে না তাঁর প্রেমিকার সমাধি! খুঁজবে না হারিয়ে ফেলা অরণ্যগান। কত কত বিমানে আগুনের গোলা ভরে আমরা উড়ে চলেছি দেশের পর দেশ পেরিয়ে আরেক দেশে। সেখানে মানুষ আছে। তাই মৃত্যুও আছে। তাই আমাদের বিমানে এত গোলা। তাই আমাদের পদাতিক বাহিনী এত চৌকশ! পৃথিবীর যে-বংশীবাদক আমাদেরকে অরণ্যের গান শুনিয়েছে, তাকে মেরে আমরা প্রমাণ করতে পেরেছি- আমরা যুদ্ধ করতে সক্ষম। সেই বংশীবাদক এখন আমাদেরই রক্তে শায়িত। তবে কি আমাদের সমবেত চিৎকারে ঘুম ভাঙবে না তার? টারজান, বন্ধু, এই কথাটির উত্তর তুমিই দাও! মানব\'দা বাজখাই গলায় জীবনানন্দ পড়েন-
প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন- এখনো ঘাসের লোভে চরে
পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর \'পরে... আমরা তখন তার মৃত্যুর কথা লিখি। এক একটা অক্ষর এক একটা সৈন্য আমাদের। আমাদের গুটেনবার্গের সৈন্য। সারারাত তাই আমাদের নিষ্ফল খটখট। আমাদের টাইপরাইটারে গুটেনবার্গ! আমরা তখন নুয়ে পড়ি ভূমির উপর। আজ বুঝি পুনরুত্থান হবে পৃথিবীর প্রথম বংশীবাদকের! কিন্তু আমরা যে কুচকাওয়াজ করছি! দেখো, প্রান্তরে সমবেত আমরা। হায়, আমরাই কাঁধে করে বয়ে চলেছি মারণাস্ত্র আর আমাদেরই কণ্ঠে আজ জীবননাশক মন্ত্র! কিন্তু, আমরা তো জন্মের অব্যবহিতে কেঁদেও ছিলাম! জন্মকে তাই নমস্কার করে মারা গেছে আমাদের প্রথম বংশীবাদক। এখন আমরা তাই খুঁজে বেড়াই ভাঙা এক সাঁকো... আমরা তখন মানব\'দার নিথর দেহ ঘিরে নতমুখে... আমরা আমাদেরকে দেশহীন দেখি। দেখি আমরা পরবাসী। মাটি! মাটি পৃথিবী, মৃত্যু ...
দীর্ঘ দিনের চলতে থাকা যুদ্ধও একদিন শেষ হয়ে যায়। যুদ্ধ শেষে যারা বেঁচে থাকে আর যারা জন্ম নেয়, তারা শুধুই বেঁচে থাকে আর তারা চেয়ে থাকে চারপাশের ভাঙা কাচের দিকে। ভাঙাকাচ মানে মানুষের ভাঙা বুক। যুদ্ধের ময়দানে তখন ধর্ষিতার মত কাঁদতে থাকে নিকষ অন্ধকার। অন্ধকার আর বিষণ্ণতা, অন্ধকার আর বিষাদ, অন্ধকার আর নৈঃশব্দ্য, অন্ধকার আর ভাঙা কাচ।
নিঃসঙ্গতার কামড়ে ক্ষতবিক্ষত জীবন জন্মের যন্ত্রণায় কাৎরাতে কাৎরাতে নো ম্যানস ল্যান্ডে এসে দাঁড়ায়।
নো ম্যানস ল্যান্ডে, জীবন ... তার পাশে কিছু শামুক, তার পাশে কিছু পাতা, গন্ধ আর ঘ্রাণ, স্মৃতি আর জীবন-
শুয়োরের বাচ্চারা, সাবধান হবি, সা আ আ আ আ ব ধা আ আ আ আ আ ন...
ধুপধাপ আওয়াজ হয়। বাতাসে গোঙানি। চাপা। গন্ধ আসে। গন্ধ যায়। ভেঙে যাওয়া থেঁতলে যাওয়া এক কণ্ঠস্বরঃ হরিদাশ, হরিদাশ... সাবধান হবি...মানব, মানব... শুয়োরের বাচ্চারা, সাবধান... বাবা ডাকছেন। মা ডাকছেন- হরিদাশ! হরিদাশ কি গুম হয়েছে? সেই ছেলেটা ঝাঁকড়া চুল রঙচটা জিন্স। হারিয়ে গেল! কোথায় পাওয়া যাবে তার লাশ? হরিদাশ। হরিদাশ। আমরাও হরিদাশের সন্ধানে বের হই, আসলে আমরা সবাই হরিদাশ ছিলাম! মা ডাকেন- হরিদাশ... আমরা তখন মানবদা\'র মৃতদেহের চারপাশে গোল হয়ে নতমুখে। আমরাই গুটেনবার্গের সৈন্য দিয়ে লিখি হত্যার খুঁটিনাটি। কিন্তু...
রাজা সাবধান করে দিয়েছেন। কেউ কারো মুখের দিকে তাকাবি না।
কেউ কারো মুখের ভাষা পড়বি না।
ঘেউ ঘেউ। দূরে। থেমে থেমে। ঘেউ ঘেউ। চারপাশে ভয়-পাওয়া কুকুর।
বাতিগুলো নিভে যায়। আসলে, নিভে যেতে চায়...
শুয়োরের বাচ্চারা, সাবধান হবি, সা আ আ আ আ ব ধা আ আ আ আ আ ন... ফুটপাতে পড়ে আছে মানবদা\'র লাশ! নতুন দিনের খবরের কাগজের শিরোনাম-- খুন হলেন আরও একজন! ছাদের ওপর ফিডলার। ভায়োলিন বাজাচ্ছে। আমরা দেখি নো ম্যানস ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে এক মানুষখেকো। এক শয়তান। তখন, আলবেয়ার কামু তাঁর ডাইরিতে লিখছেনঃ আমি অস্তিত্বের অভিঘাতের দিকে অগ্রসর হতে অস্বীকার করি না, কিন্তু আমি এমন কোনও যাত্রাপথও আকাঙ্ক্ষা করি না, যা মানুষ থেকে দূরে সরে গেছে। আমরা কি আমাদের তীব্রতম অনুভূতিগুলোর শেষে ঈশ্বরকে খুঁজে পাব?
খুঁজে পাওয়া? পাওয়ার অপেক্ষা? আর কত? সত্যি আর সহ্য করতে পারছি না। কিছু একটা ঘটুক। হঠাৎ লেলিহান আগুন জ্বলে উঠুক কিংবা হাত থেকে পড়ে যাক ওয়াইনের গ্লাস। এখনই একটা মানুষ চিৎকার করে উঠুক। কুকুরটা ঘৃণাভরে পা তুলে প্রশ্রাব করুক আমাদের দিকে কিংবা ভেঙে পড়ুক সমস্ত নিরাপত্তার কাচ। অবারিত শান্তি ঝনঝন শব্দে ভেঙে যাক। দুন্দুভি বেজে উঠুক দ্রিম দ্রিম। কান ফাটিয়ে বিস্ফোরিত হয়ে যাক সমস্ত করাতকল। দাউদাউ দাবানল ছড়িয়ে পড়ুক। একটা চাপা গোঙানি। বুক-ভেঙে-আসা কান্না-
হরিদাশ... হরিদাশ... এই মহাপৃথিবীতে আমরা কী আসলেই কোনও জীবন চেয়েছিলাম? একটু বেঁচে থাকব বলে? একটু দুধভাত! একটু কান্না। কিন্তু আর কত লিখব তবে যুদ্ধের নির্মমতা- এই গন্ধ বসনিয়া ক্যাম্পে আটক যুবকদের পোড়া মাংশের। জ্যান্ত বন্দিদের সামনেই আমরা অন্য বন্দিদের গুলি করে হত্যা করি। তারপর লাশের স্তূপে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিই। মেয়েদের ধর্ষণ করি প্রাণ ভরে। মেয়েরা যদি বেশি বাড়াবাড়ি করে, তাহলে তাদের বুকের ওপর বুট চেপে ধরে পেচ্ছাব করে দিই। তাদের বলি, এই পেচ্ছাব গিলে ফেলতে হবে। যুদ্ধ আসলে এমনই। যুদ্ধের অর্থ শুধুই যুদ্ধ। মেগাডেথ। ম্যাডনেস। কখনই তাই জানালা খুলতে বল না। যুদ্ধের অন্যতম শর্ত- বন্ধ জানালা।
তাই, জানালা বন্ধ থাকুক। খোলা জানালার বাতাসে চিৎকার মিশে থাকে। আলোয় মিশে থাকে রক্ত। রক্ত আর চিৎকার যুদ্ধবাজের প্রিয় শব্দ। তালিয়া বাজাও...
কী করা যায়? মনে মনে খেলা দেখা যায়? কে সেই খেলার পুতুল? আমরা? আমাদেরকে পুতুলনাচ নাচাচ্ছে কে- ভ্লাদিমির পুতিন, বারাক ওবামা, না কি নেতানিয়াহু? নাকি শচীন, সেরেনা, উসাইন? খেলা বড় আশ্চর্য হয় এখানে। চার। ছক্কা। হৈ হৈ। সেঞ্চুরি। ডাবল সেঞ্চুরি। উল্লাস। গ্যালারিতে আজ বড় উল্লাস। ব্যাটসম্যানের ব্যাটে আজ ঝড়। শচীনে-সেরেনায়-উসাইনে আজ ঝড়। তীব্র উল্লাসে ফেটে যাচ্ছি আমরা। খেলা। জয়। পরাজয়।
খেলার উল্লাসে চাপা পড়ে যাচ্ছে গণহত্যার কান্না। পৃথিবীর ঘাতকরাও অবাক আমাদের উল্লাসে। এক ভূখণ্ডে মানুষের ব্যাট-বলের কারবারে উল্লাস, অন্যখণ্ডে বিমান থেকে মানুষের জন্য প্লাস্টিকের পা নামছে। তালিয়া বাজাও। তালিয়া বাজাও। তালি... চমৎকার। যুদ্ধে পেতে রাখা মাইনে যাদের পা উড়ে গেছে, শুভ্র আকাশযান তাদের জন্য নকল পা নিয়ে এসেছে। এবার শুরু করো। দৌড়। ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে যে আগে যেতে পারবে, সে-ই আজ মালিক বনে যাবে একখানি নকল পায়ের। একশ\'জনের ভিতর মাত্র কয়েকজন শুধু পাবে। নকল পা-ও বেশি নেই। এই দৃশ্য সরাসরি দেখা যাবে বিবিসি, সিএনেনে। চমৎকার। মখমলবাফ তার কান্দাহারে এরকমই দেখিয়েছিলেন। বহু বছর পর, আমাদের যখন দেখা হবে কিংবা যেদিন আমরা আলেকজান্দ্রিয়া স্টেশনের হলদে আলোর স্রোতে মানুষের ভিড়ে মিশে যাব... আমরা দেখব আমাদের সৈন্যগুলি সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে।
উত্তেজনা আর সহ্য হচ্ছে না। অবসর চাই। বিজ্ঞাপন বিরতির অবসর। নায়িকার শৈল্পিক শরীর... শরীর। যুদ্ধেও শরীর। নাচেও শরীর। জন্মে, মৃত্যুতে, খেলায়, হত্যায় শুধু শরীর। শরীর এক ভিয়েন। ... হেমিংওয়ে, দেখছ তোমার সান্তিয়াগো লোকালয় ছেড়ে বহুদূর চলে এসেছে আজ, তবু সিংহের ফোলা কেশরের উদ্দাম আনন্দ অনুভব করছে রক্তে! এবার ফিরবার পালা, ওই শোন হুইটম্যানের ডাক। তুমি কি পৃথিবীর সব কবির মত রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে অনুভব করতে ব্যর্থ হয়েছ অসীম শুন্যতা? এখনও দরিয়ায় বাঁধা পড়ে আছ তুমি? হাসি পায়। আমাদের হাসি পায়। আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে অন্ধকার রঙমহলে ছবি দেখছি। যুদ্ধের ছবি আমাদের বড় ক্লান্ত করে। হত্যা, ধর্ষণ, হত্যা, ধর্ষণ, হত্যা, ধর্ষণ... আমাদের চোখের পাতা ভারি হয়ে আসে।
না, জানালা বন্ধ কর না। খুলে দাও। পৃথিবীর সমস্ত বন্ধ জানালা টান মেরে খুলে ফেল... আমাদের কানে জীবনানন্দের কবিতার শব্দগুলি যেন ভেঙে পড়ে-
আমরা যাইনি ম\'রে আজো- তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয় :
মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায়...
মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায়...
মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায়...
অন্ধকার। বিষণ্ণতা। নৈঃশব্দ্য। অন্ধকার আর ভাঙা কাচ।
... আমরা ভাবতে থাকি। আমরা একটি শব্দ খুঁজে পাই। বৃষ্টি। বৃষ্টি মানে সৃষ্টি, বৃষ্টি মানে স্মৃতি। আমাদের তখন জিনিয়া ফুলের গন্ধের কথা মনে পড়ে। মনে পড়লে কোথায় যেন বৃষ্টি পড়ে। বৃষ্টি পড়লে ঈশ্বরকে মনে পড়ে। বুড়ো ঈশ্বর। ক্লান্ত। বিষণ্ণ। আসলে, আমরা তো ঈশ্বরের বাগানে সাপলুডু খেলছিলাম। মই বেয়ে উঠছিলাম সাপের মুখে পড়ে নিচে নামছিলাম। উত্থান আর পতন! তারপর- একটার পর একটা বাতি নিভিয়ে দেয়া হল।
আমরা তোমার বাগানে আসহায়, আলোহীন! আর, তুমি বাতিগুলি নিভিয়ে দিতে চাইলে! দেখলে না মানবদা\'র ডেডবডির পাশে পাথর হয়ে বসে আছেন তার মা! আমরা তখন মাকে স্মরণ করি। জানতে চাই, এই পৃথিবীর মাটির গন্ধ কেমন মা? মা বলেন-
তখন তোরা আমার পেটে! আমরা কেঁপে উঠি। রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বলছে-
বড় বেশি বলে ফেলছি আমরা! এবার থামতে হবে। থাকতে হবে নতমুখে। সবাই এখন শব। লাশকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নিষেধ। এখানে কেউ আর কালপুরুষ হবে না। সব শেষ। আমরাই শুরু, আমরাই শেষ। কালপুরুষ বলে কিছু নেই। সার্কাস নেই। ক্লাউন নেই। আমরাই সার্কাস। আমরাই ক্লাউন। আমরাই দানব। আমরাই গুলি। আমরাই সব... তখন, মানবদা\'কে চাপাতি দিয়ে হত্যা করা হয়। একটা বই লিখেছিলেন মানব\'দা। আশ্চর্য নাম রেখেছিলেন সে বইয়ের- একটি কিম্ভূতকিমাকার রূপকথা... আর মৃত্যু ছাড়া জীবনে আর কিছুই করতে পারেন নি তিনি। জীবনানন্দের কবিতা পড়েছেন অনর্গল- প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন- এখনো ঘাসের লোভে চরে
পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর \'পরে...
আমাদের মগজে ঠেসে দেয়া হয় কথা-অমৃত-
আমরাই কোমল, আমরাই কঠোর। আমরাই মন। আমরাই মগজ। বিদেশ থেকে ডলার দিয়ে সেলাইমেশিন আসছে... মানুষের চামড়ার মুখ কী মসৃণভাবেই না সেলাই করা যাবে...
না। এইসব বাস্তব নয়। স্বপ্ন। আমরা এইসব উদ্ভট স্বপ্নই দেখছি, আজকাল। পৃথিবী তুমুল অন্ধকার হে মাতৃগর্ভ! আমরা জানি, হে মাতৃগর্ভ, হে জননীজঠর, একদিন আমাদের সঙ্গে এই মাঠে এসে বসবেন মণীন্দ্র গুপ্ত।
তারপর কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে পড়বেন তার কবিতাখানি-
তুমি একটি ঐশী আণবিক রিঅ্যাকটার।
সেই বহুদিন আগে তোমার দু ভরি ছাই
নিঃশ্বাসের মধ্য দিয়ে শরীরে নিয়েছিলাম।
তারপর থেকেই আমি বাঁশপাতা মাছের মতো
নদীর কালো জলের তলায় গিয়েও
বিচ্ছুরিত হতে থাকি।
এই তেজস্ক্রিয়া অক্ষয়।
আমাকে যে খাবে তার মধ্যে আবার
প্রবেশ করবে এটি- হয়তো সে
প্রভাময় পতঙ্গের মতো, গাছের খানিকটা আলো করে,
এসে বসবে তারপর... এক পঙক্তি কবিতা পড়বেন মাসুদ খান-
শ্রবণ বধির করে দিয়ে বয় মহাবৃত্তের হাওয়া...
তখন আর কি কিছু অবশিষ্ট থাকবে? পৃথিবীতে তখন আমরা শুধু আমাদের কঙ্কালগুলোকেই দেখছি! আর একটি গাছ বেঁচে আছে। গাছের পাতায় গল্প লেখা, সেই গল্পে হারিয়ে যাওয়া মানুষের প্রজ্ঞার কথা লেখা! আর একজন মা বেঁচে আছেন তখনও, তার সন্তানকে ডেকে চলেছেন- হরিদাশ... হরিদাশ...