খাদ

সরদার ফারুক


খুব রাতে জল গড়িয়ে পড়ার শব্দটা বেশি করে শোনা যায়। কাল জোর বৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়ের খাড়া ঢাল বেয়ে জল নামে। ছোট এই পাহাড়ি শহরে এক সপ্তাহ কেটে গেছে। সারাদিন বনে-বাদাড়ে ঘোরা আর মনে-ধরা দৃশ্যুগুলো ক্যামেরাবন্দী করার বাইরে কোনো কাজ নেই ।এখানে পর্যটক তেমন একটা আসে না , সেভাবে জায়গাটার নামও ছড়ায়নি ।
থাকবার জন্য ভালো কোনও হোটেল বা গেস্টহাউজ নেই , বিখ্যাত জলপ্রপাত নেই - শুধু দুয়েকটা লাজুক ঝর্ণা মৃদুস্বরে নিচের ছড়ায় গিয়ে পড়ে।
তবু সবচে’ সুবিধের ব্যাপার হ’ল , এখানে পরিচিত মুখ নেই - একঘেয়ে কুশল জিজ্ঞাসা আর অবিশ্বাস্য হিতাকাঙ্খা নেই ।
যদি তার অনেক টাকা থাকতো, এখানেই একটা ছোটখাট পাহাড় কিনে বাংলো বানিয়ে থেকে যেতো । খুব সস্তায় আদিবাসীদের ঘরে তৈরি মদ মেলে, সাথে ছোলাভাজা । সন্ধ্যার পরে নিজেই নিজের স্বাস্হ্যপান করতে করতে মনে হয় - আহ্, এই তো বেঁচে থাকা!
অন্য ইচ্ছেগুলো দমিয়ে রাখতেই হয়। দূর থেকে শুধু আলোর ফুলের মতো উজ্জ্বল তরুনীদের দেখে যাওয়া ! কী চমৎকার বাঁধুন , হাসির সারল্য!
আর খুব স্বাভাবিকভাবেই এ সময়ে অভিজ্ঞতার নারীদের কথা মনে পড়বে - কুমারী, সধবা , বিধবা -- সবাইকে ।কেউ নতুনত্বের খোঁজে , কেউ নিরাপত্তার আশায়, আবার কেউ স্রেফ কাগুজে মূদ্রার লোভে ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
কারো ঠোঁটের ওপরের তিল, উরুর জড়ুল, নখের নিচের রক্তাভা মনে আসে, শুধু মুখের আদল ভুল হয়ে যায়। সে কখনো সজ্ঞানে বা কোনো সচেতন পরিকল্পনায় কারো কাছে যায়নি, বলা যায় ব্যাপারগুলো ঘটে গেছে ।বয়ঃসন্ধির জ্বর , অস্হির আগুন কখনো কখনো টের পাওয়া গেছে। ভালোবাসা? বিষয়টা সে এখনো বোঝে না।
একবার এক বিবাহিতা নারী তাকে বলেছিল - “আমাকে বিয়ে করো ।”
নাটকের অভিনেত্রীদের মতো রূপ , মোমের মতো ত্বক , সুপুরুষ স্বামী - এই রমণীর কিসের অভাব?
সে সরাসরি কোনো উত্তর দেয়নি , বলেছিল , “ কেন? তুমি তো একবার বিয়ে করেছো ! বিয়েটা কী এমন জাদু?”
এরপর থেকে আর ফোনেও সাড়া দেয়নি। মাঝেমধ্যে দেখা হ’লে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
শহরে যে অফিসটায় সে কাজ করে , একটা উদ্ভট জায়গা। লোকজন ধর্মেও আছে , জিরাফেও আছে !
আর নানাসব উড়োচিঠি। কতোগুলো নপুংসক লোক বড়ো বড়ো চেয়ারে বসেই থাকে - ছুটির পরেও ।
আজ রাতে বেশ শীত করছে । জানালাটা বন্ধ করতে গিয়ে দেখে বিশাল থালার মতো হলুদ বিমর্ষ চাঁদ , আজ কি পূর্ণিমা ? দো’চোয়ানির ঝোঁকে সে দরোজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে। আবছা আবছা পাথরের চাঙড় , ঝোপঝাড় পেরোতে পেরোতে খাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়ায়।এখান থেকে একটা লাফ দেয়া যায় না ? নিচের অতল গহ্বর তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকে।